Story

আদরের আড়ালে ২

September 27, 2026

15 views

বিষাক্ত প্রজাপতি

 

সগির যেন রাশেদ আর শাইলার জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সে শুধু রাশেদের বন্ধু নয়, এই পরিবারের একজন স্বঘোষিত অভিভাবক। সপ্তাহান্তে তার আগমন একপ্রকার নিয়মেই পরিণত হয়েছে। তার আসার অর্থই হলো রিয়ার জন্য সীমাহীন আনন্দ আর নতুন কোনো চমক। সগির অনেকটা রঙিন প্রজাপতির মতো, যার উপস্থিতিতে পুরো ঘরটা যেন আরও বেশি জীবন্ত ও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।

সেদিন ছিল শুক্রবারের এক অলস দুপুর। রাশেদ আর শাইলা ব্যালকনিতে বসে চা খাচ্ছিল, আর রিয়া তার রঙ-পেন্সিল নিয়ে আঁকিবুঁকিতে ব্যস্ত। কলিংবেলের শব্দে রিয়াই সবচেয়ে আগে দৌড়ে গেল। দরজা খুলতেই তার ছোট্ট মুখটা খুশিতে ঝলমল করে উঠল।

"সগির মামা!"

সগির হাসিমুখে ঘরে ঢুকল। তার হাতে বিশাল এক বাক্স, চকচকে র‍্যাপিং পেপারে মোড়া। রিয়ার চোখ লোভে আর বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। সগির এসেই নিচু হয়ে রিয়াকে শূন্যে তুলে ধরে ঘুরপাক খাওয়াল। রিয়ার খিলখিল হাসিতে ফ্ল্যাটের দেয়ালগুলোও যেন হেসে উঠল।

রাশেদ এগিয়ে এসে বলল, "আরে সগির, আয় আয়! আবার এতকিছু আনার কী দরকার ছিল?"

সগির রিয়াকে কোল থেকে না নামিয়েই সোফায় বসল। বলল, "আমার রাজকন্যার জন্য আনব না তো কার জন্য আনব? মামণি, চোখ বন্ধ করো।"

রিয়া দুই হাতে চোখ ঢাকতেই সগির বাক্সটা তার কোলের উপর রাখল। রিয়া চোখ খুলে বিস্ময়ে চিৎকার করে উঠল। বাক্সের ভেতরে অপরূপ সুন্দর এক 'বার্বি ড্রিমহাউজ'। যেটা কেনার জন্য সে বাবাকে গত কয়েক মাস ধরেই বলছিল। রাশেদ আর শাইলা একে অপরের দিকে তাকাল। একটা খেলনার পেছনে এত টাকা খরচ করার জন্য মনে মনে বন্ধুর উপর বিরক্ত হলেও, মেয়ের এমন বাঁধভাঙা আনন্দ দেখে তারা কিছু বলতে পারল না।

শাইলা বলল, "সগির, তুমি রিয়াকে একদম বাঁদর বানিয়ে ফেলছ। এত দামী উপহারের কী দরকার ছিল?"

সগির রিয়াকে কোলে বসিয়েই তার চুলে হাত বোলাতে বোলাতে বলল, "আরে ভাবি, ওর আনন্দের চেয়ে বেশি দামী আর কী আছে? আমার তো আর কেউ নেই। এই মামণিটাই আমার সব।" কথাগুলোয় এত আন্তরিকতা মাখানো ছিল যে, শাইলার আর কিছু বলার মুখ রইল না।

এরপর পুরো বিকেলটা সগির রিয়াকে নিয়েই মেতে রইল। সে এক মুহূর্তের জন্যও রিয়াকে কোল থেকে নামাল না। ড্রিমহাউজটা সেট করার সময়, বিকেলে নাস্তা করার সময়, এমনকি রাশেদের সাথে ক্রিকেট নিয়ে তর্কের মাঝেও রিয়া তার কোলেই বসা ছিল। সগির অনবরত রিয়ার গালে, কপালে চুমু খাচ্ছিল আর "আমার জান", "মামার কলিজা" বলে আদর করছিল।

শাইলা রান্নাঘর থেকে কয়েকবার এই দৃশ্যটা দেখল। সগিরের এই অতিরিক্ত আদিখ্যেতা তার চোখে যে একেবারেই পড়ছিল না, তা নয়। মাঝে মাঝে তার মনে হচ্ছিল, সগিরের স্পর্শ, তার তাকানোর ভঙ্গিটা কেমন যেন অস্বাভাবিক। কিন্তু পরক্ষণেই সে মনকে ধমক দিল। 'ছি! কী সব আজেবাজে চিন্তা করছি! সগির তো এমনই। ও একটু বেশিই ইমোশনাল। ওর মনে কোনো পাপ নেই।'

সগির অনেকটা সেই বিষাক্ত প্রজাপতির মতোই ছিল। যার ডানার রঙ আর সৌন্দর্য সবাইকে মুগ্ধ করে, কাছে টানে। কিন্তু সেই ডানায় যে লুকিয়ে আছে স্নায়ু অবশ করে দেওয়ার মতো বিষ, তা কেউ বুঝতে পারে না। রাশেদ আর শাইলাও সেই প্রজাপতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ ছিল। তারা দেখছিল, তাদের বন্ধু তাদের মেয়েকে কতটা ভালোবাসে, কতটা স্নেহ করে। তারা এটা দেখছিল না যে, এই স্নেহের আড়ালে ধীরে ধীরে একটি শিশুর ব্যক্তিগত সীমানার দেয়াল ভাঙা হচ্ছে। তাকে শেখানো হচ্ছে যে, এই ধরনের ঘনিষ্ঠ স্পর্শ বা কোলে বসে থাকাটাই স্বাভাবিক।

সন্ধ্যার আগে সগির রিয়াকে বলল, "মামণি, চলো তোমাকে আইসক্রিম খাইয়ে আনি। শুধু তুমি আর আমি যাব।"

রাশেদ সাথে সাথেই বলল, "হ্যাঁ হ্যাঁ, যা না। ঘুরে আয়। রিয়ারও ভালো লাগবে।"

শাইলা একবার ইতস্তত করে বলেছিল, "একা একা কেন, আমরা সবাই মিলে যাই?"

সগির হেসে উত্তর দিয়েছিল, "আরে ভাবি, মাঝে মাঝে ভাগ্নির সাথে মামার একটু একা সময় কাটাতে হয়। ওর সব সিক্রেট কথা তো আর তোমাদের সামনে বলবে না।"

এই যুক্তিটার কাছে শাইলার ক্ষীণ আপত্তিটাও উড়ে গেল। সে হাসিমুখে মেয়েকে জামা পাল্টে দিল। সগির রিয়ার হাত ধরে যখন বেরিয়ে যাচ্ছিল, তখন রিয়া খুশিতে লাফাচ্ছিল। রাশেদ আর শাইলা দরজায় দাঁড়িয়ে তৃপ্তির সাথে সেই দৃশ্য দেখছিল। তাদের পরম বন্ধু তাদের মেয়েকে কতটা আগলে রেখেছে!

তারা বুঝতেও পারল না, শিকারী ঠিক এভাবেই ধীরে ধীরে বিশ্বাস অর্জন করে। প্রথমে পরিবারের সামনে ঘনিষ্ঠ হয়, তারপর একা সময় কাটানোর সুযোগ তৈরি করে। তারা নিজেদের হাতেই তাদের আদরের সন্তানকে সেই বিষাক্ত প্রজাপতির সাথে একা উড়ে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে দিল। তাদের কাঁচের ঘরে সেই প্রজাপতিটা এখন এতটাই আপন হয়ে গেছে যে, সে যখন খুশি উড়ে আসতে পারে, যখন খুশি বেরিয়ে যেতে পারে। আর তার রঙিন ডানার আড়ালে থাকা বিষাক্ত উদ্দেশ্যটা তখনো সবার চোখের আড়ালেই রয়ে গেল।

(চলবে)

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+35 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login

  • তারা বুঝতেও পারল না, শিকারী ঠিক এভাবেই ধীরে ধীরে বিশ্বাস অর্জন করে।

    • Salam Khokon 1 day ago

      সেই সেই ভাই। ভালো থাকবেন।