Story

আদরের আড়ালে ৩

September 28, 2026

15 views

শিশুর নীরব চিৎকার

 

সময় গড়িয়ে চলার সাথে সাথে রাশেদ আর শাইলার কাঁচের ঘরে অদৃশ্য ফাটলগুলো আরও চওড়া হতে শুরু করল, যদিও বাইরে থেকে তা বোঝার উপায় ছিল না। রিয়ার জীবনে সগিরের আনাগোনা আগের মতোই ছিল, কিন্তু যে জিনিসটা বদলে গিয়েছিল, তা হলো রিয়া নিজে। তার সেই উচ্ছল হাসির ঝর্ণাধারাটা যেন কোথায় হারিয়ে গেছে।

পরিবর্তনটা প্রথম চোখে পড়েছিল এক শনিবারের বিকেলে। সগির আসবে, এই খবরটা শাইলা বেশ আনন্দের সাথেই রিয়াকে দিয়েছিল। "জানো সোনা, আজ তোমার সগির মামা আসবে। নিশ্চয়ই তোমার জন্য নতুন কোনো সারপ্রাইজ আনবে।"

আগে হলে এই খবরে রিয়া খুশিতে লাফিয়ে উঠত। কিন্তু আজ সে তার খেলার ব্লকগুলো থেকে মুখ না তুলেই নিচু গলায় বলল, "আসবে?" তার কণ্ঠস্বরে আনন্দের লেশমাত্র ছিল না, ছিল এক অদ্ভুত নির্লিপ্ততা। শাইলা মেয়ের এই নিরুৎসাহী ভাবটা খেয়াল করল কিন্তু খুব একটা পাত্তা দিল না। ভাবল, হয়তো খেলার মনোযোগ নষ্ট হওয়ায় বিরক্ত হয়েছে।

কিন্তু বিপত্তিটা ঘটল সগির ঘরে ঢোকার পর। সগির তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে "আমার মামণি কই?" বলে চিৎকার করে ঘরে ঢুকল। রিয়া তখন সোফার এক কোণায় বসে ছবি আঁকছিল। সগিরের গলা শুনেই সে যেন জমে গেল। তার ছোট্ট কাঁধ দুটো কেঁপে উঠল। সে পেন্সিল ফেলে ছুটে মায়ের কাছে চলে এলো এবং শাইলার শাড়ির আঁচলের পেছনে মুখ লুকালো।

সগির দৃশ্যটা দেখে অবাক হওয়ার ভান করল। হাতে থাকা খেলনার বাক্সটা দেখিয়ে বলল, "একি প্রিন্সেস, মামার উপর রাগ করেছো? দেখো তোমার জন্য কী এনেছি!"

রিয়া শাইলার আঁচলের ভেতর থেকে একচুলও নড়ল না বরং আরও শক্ত করে মাকে জড়িয়ে ধরল।

এই অপ্রত্যাশিত আচরণে শাইলা আর রাশেদ দুজনেই ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। অতিথির সামনে মেয়ের এমন ব্যবহার তাদের কাছে চরম অভদ্রতা বলে মনে হলো। শাইলা প্রায় জোর করেই রিয়াকে নিজের পেছন থেকে বের করে এনে বলল, "রিয়া! হোয়াট ইজ দিস? মামা এসেছে, উইশ করো। কী হচ্ছে এসব?"

রিয়া ভয়ে ভয়ে সগিরের দিকে একবার তাকিয়েই আবার মুখ নামিয়ে নিল। তার চোখে স্পষ্ট আতঙ্ক।

সগির কাছে এসে রিয়ার মাথায় হাত রাখতে চাইতেই সে ছিটকে সরে গেল। সগির আহত গলায় বলল, "কী হলো রে মা? মামার কোলে আসবি না?"

রিয়া প্রায় কাঁদো কাঁদো গলায় ফিসফিস করে বলল, "না।"

এই একটা 'না' শব্দ যেন ঘরে বোমার মতো ফাটল। রাশেদের মুখটা কঠিন হয়ে গেল। সে ধমকের সুরে বলল, "কী বললে? 'না'? এত বড় হয়ে গেছো যে মুখের উপর 'না' বলছ? যাও, মামার কোলে গিয়ে বসো। কী অসভ্যতা!"

বাবার ধমক শুনে রিয়ার চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়তে শুরু করল। কিন্তু সে এক পা-ও নড়ল না। তার ছোট্ট শরীরটা জেদ আর ভয়ে শক্ত হয়ে আছে।

শিশুর এই অব্যক্ত অস্বস্তি, বিপদ চেনার এই সহজাত প্রবৃত্তি—তার বাবা-মায়ের চোখে পড়ল না। তাদের চোখে পড়ল শুধু সামাজিকতা, বন্ধুর সামনে নিজেদের সম্মান আর মেয়ের 'বদমেজাজ'। তারা মেয়ের নীরব চিৎকারটা শুনতে পেল না, তারা শুধু দেখল একগুঁয়ে একটা বাচ্চার অভদ্র আচরণ।

সগির পরিস্থিতি সামলে নেওয়ার জন্য উদারতার মুখোশ পরে বলল, "আরে ছাড়ো তো! ও ছোট মানুষ, মুড নেই হয়তো। তোমরা ওকে বকছো কেন? থাক, ও খেলা করুক।" এই কথা বলে সে রাশেদ আর শাইলার চোখে আরও মহান হয়ে উঠল।

কিন্তু এরপর পুরো সন্ধ্যা জুড়েই রিয়া অস্বাভাবিক আচরণ করতে লাগল। সে সগির যেদিকে ছিল, সেদিকের সোফা এড়িয়ে চলল। একবারও সগিরের চোখের দিকে তাকাল না। সগির যখন চলে যাচ্ছিল, তখন শাইলা জোর করে রিয়াকে দিয়ে 'বাই' বলাতে চেয়েছিল কিন্তু রিয়া মুখ ঘুরিয়ে ঘরের ভেতরে দৌড়ে পালাল।

সগির চলে যাওয়ার পর রাশেদের সব রাগ গিয়ে পড়ল মেয়ের উপর। "আজকাল মেয়েটার ব্যবহার দিন দিন খারাপ হচ্ছে। এত আদর দিয়ে মাথায় তুলে ফেলেছো!"

শাইলাও ক্লান্ত গলায় বলল, "বুঝতে পারছি না কী হয়েছে ওর। সবার সামনে আমাকে লজ্জায় ফেলে দেয়। সগিরের কী ভাবল বলো তো?"

তারা দুজনেই মেয়ের আচরণ নিয়ে চিন্তিত হলো। কিন্তু সেই চিন্তার কারণ ছিল সামাজিকতা । কেন তাদের হাসিখুশি মেয়েটা হঠাৎ এমন গুটিয়ে গেল, কোন ভয়টা তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে—এই মূল প্রশ্নটা তাদের মাথাতেই এলো না।

সেদিন রাতে রিয়া ঘুমের মধ্যে ভয়ে চিৎকার করে কেঁদে উঠেছিল। শাইলা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে শান্ত করার চেষ্টা করতে করতে ভাবছিল, কালই ডাক্তারের কাছে নিয়ে যেতে হবে। নিশ্চয়ই ওর শরীর খারাপ, তাই মেজাজ খিটখিটে হয়ে গেছে।

তাদের সুরক্ষিত কাঁচের ঘরের ভেতর থেকে রিয়া তারস্বরে চিৎকার করছিল, কিন্তু সেই চিৎকার তার বাবা-মায়ের কান পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছিল না। তারা বাইরের কাঁচের দেওয়ালে নিজেদের সুন্দর প্রতিবিম্বটা দেখতেই ব্যস্ত ছিল, কাঁচের ভেতরের দমবন্ধ করা শূন্যতাটা তারা দেখতে পায়নি।

(চলবে)

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login