Story

আদরের আড়ালে ৪

September 28, 2026

15 views

স্ক্রিনের ওপারে দানব

 

এই ঘটনার পর থেকে রিয়া আরও চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। তার চঞ্চলতার জায়গায় বাসা বেঁধেছিল এক ধরনের ভীরু নীরবতা। সে আগের মতো আর ছোটাছুটি করত না বরং ঘরের এক কোণে নিজের খেলনা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকত। মেয়ের এই পরিবর্তন রাশেদ আর শাইলার চোখ এড়ায়নি। কিন্তু তারা এর কারণ খোঁজার চেয়ে সহজ সমাধানটাই বেছে নিল। তাদের মনে হলো, রিয়া হয়তো একা থাকতে থাকতে বিরক্ত হয়ে যাচ্ছে।

এই ভাবনারই ফল হলো, তাদের পুরোনো স্মার্টফোনটা রিয়ার নতুন সঙ্গী হয়ে উঠল।

শুরুটা হয়েছিল এভাবেই—শাইলা তার অনলাইন বুটিকের জরুরি একটা ভিডিও কলে ব্যস্ত, ঠিক তখনই রিয়া এসে এটা-ওটা নিয়ে বিরক্ত করতে লাগল। শাইলা কোনো উপায় না দেখে তার পুরোনো ফোনটা চার্জ দিয়ে, ইউটিউবে কার্টুন চালিয়ে মেয়ের হাতে ধরিয়ে দিল। ম্যাজিকের মতো কাজ হলো। রিয়া মুহূর্তেই শান্ত হয়ে গেল। এরপর থেকে এটাই নিয়ম হয়ে দাঁড়াল। রাশেদ যখন অফিস থেকে ফিরে ল্যাপটপে কাজ করত, কিংবা শাইলা যখন রান্নাঘরে ব্যস্ত থাকত, রিয়ার হাতে তুলে দেওয়া হতো ফোন। এই ডিজিটাল বেবিসিটার তাদের জীবনকে অনেক সহজ করে দিয়েছিল। তারা ভাবত, অন্তত মেয়েটা তো কার্টুন দেখেই শান্ত থাকছে, চোখের সামনেই তো আছে।

কিন্তু স্ক্রিনের ওপারে যে এক অদৃশ্য দানব ওঁৎ পেতে বসে আছে, সেই খবর তারা রাখেনি।

ধীরে ধীরে ফোনটা রিয়ার সর্বক্ষণের সঙ্গী হয়ে উঠল। সে খাওয়া বা ঘুমের সময়ও ফোন ছাড়তে চাইত না। তার আচরণেও কিছু অদ্ভুত পরিবর্তন দেখা যাচ্ছিল। মাঝে মাঝে সে এমন কিছু ইংরেজি শব্দ বলত বা এমন গানের লাইন গুনগুন করত, যা তার জানার কথা নয়। একদিন শাইলা শুনেছিল, রিয়া তার পুতুলকে বলছে, "ইউ আর আ ব্যাড গার্ল, আই উইল গিভ ইউ ইনজেকশন।"

শাইলা শুনে হেসে ফেলেছিল, ভেবেছিল কোনো কার্টুন থেকে শিখেছে। সে বুঝতে পারেনি, এই আপাত নিরীহ সংলাপগুলো কোন অন্ধকার জগতের প্রতিচ্ছবি।

সেদিন ছিল ছুটির দিন। শাইলার নিজের ফোনটা চার্জে দিয়ে সে কিচেনে কেক বানাচ্ছিল। হঠাৎ একটা রেসিপি দেখার দরকার পড়ল। রিয়া পাশেই সোফায় বসে ফোনে এতটাই মগ্ন ছিল যে, বাইরের জগতে কী হচ্ছে তার কোনো খেয়ালই ছিল না।

শাইলা এসে বলল, "সোনা, ফোনটা একটু দাও তো। একটা জিনিস দেখব।"

রিয়া প্রায় আঁতকে উঠে ফোনটা বুকের কাছে জড়িয়ে ধরল। কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, "না, দেব না! এটা আমার!"

মেয়ের এই অস্বাভাবিকতা দেখে শাইলা অবাক হলো। সে একটু কঠিন গলায় বলল, "কী হলো? দাও বলছি!" প্রায় জোর করেই ফোনটা মেয়ের হাত থেকে নিল।

ফোনটা হাতে নিয়েই সে ইউটিউব খুলল। আর খুলতেই তার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। হোমপেজে সার দিয়ে যেসব ভিডিওর থাম্বনেইল দেখা যাচ্ছে, সেগুলো কোনো স্বাভাবিক কার্টুন নয়। অদ্ভুত বিকৃত চেহারার স্পাইডারম্যান, গর্ভবতী এলসা, একে অপরকে ইঞ্জেকশন দিচ্ছে, কাঁদছে—রঙচঙে ছবির আড়ালে এক বীভৎস জগৎ।

শাইলার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল। সে কাঁপা কাঁপা হাতে ইউটিউবের হিস্ট্রি চেক করল। সেখানে যা দেখল, তা আরও ভয়ঙ্কর। কার্টুনের নামে ভূত, ভয় দেখানো আর প্রাপ্তবয়স্কদের কনটেন্টে ভরা। তার মাথা ঘুরতে শুরু করল। সে দ্রুত গুগলের সার্চ হিস্ট্রি খুলল। সেখানে শিশুর অসংলগ্ন ইংরেজিতে লেখা— "scary monster crying", "bad uncle video", "girl crying punishment"।

প্রত্যেকটা শব্দ শাইলার বুকে ধারালো ছুরির মতো বিঁধছিল। তার মনে হচ্ছিল, সে তার নিজের সন্তানকে নিজ হাতে এক উন্মুক্ত নর্দমায় ঠেলে দিয়েছে।

রাতে রাশেদ বাড়ি ফিরলে শাইলা কান্নায় ভেঙে পড়ল। ফোনটা রাশেদের সামনে ধরে বলল, "দেখো, দেখো আমাদের মেয়ে কী দেখছে! আমরা নিজেরা ওকে কী বানিয়েছি দেখো!"

রাশেদ ফোনের স্ক্রিনে চোখ রেখে রাগে, অপমানে আর আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল। তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে উঠল। সে ফোনটা প্রায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে বলল, "আনবিলিভেবল! এই শয়তানের বাক্সই যত নষ্টের গোড়া। এই ইন্টারনেট, এই ইউটিউব—এগুলোই বাচ্চাদের মাথা খাচ্ছে! কালকেই বাড়ি থেকে ওয়াইফাই তুলে দেব!"

তারা দুজনেই সেই রাতে অনেকক্ষণ ধরে নিজেদের গাফিলতি নিয়ে কথা বলল। তারা ঠিক করল, রিয়ার স্ক্রিন টাইম একেবারে বন্ধ করে দেওয়া হবে, তার সাথে আরও বেশি সময় কাটানো হবে। তারা সমস্যাটা চিহ্নিত করতে পেরে এক ধরনের স্বস্তি পেল। তাদের মনে হলো, 'দানব'টাকে তারা চিনে ফেলেছে, আর সেই দানব হলো স্ক্রিনের ওপারের ইন্টারনেট জগৎ।

কিন্তু তাদের একবারের জন্যও মনে হলো না, ছয় বছরের একটা শিশু নিজে থেকে "bad uncle video" লিখে সার্চ করতে পারে না। তার কচি মাথায় এই শব্দগুলো কেউ ঢুকিয়ে দিয়েছে। তাদের সন্দেহের তালিকায় প্রযুক্তি ছিল, সমাজ ছিল, ছিল নিজেদের অবহেলাও। কিন্তু সেই তালিকায় তাদের প্রিয় বন্ধু, রিয়ার 'সগির মামা'র নামটা ছিল না। কারণ সে তো তাদের পরিবারেরই অংশ, তাদের সুরক্ষিত কাঁচের ঘরের এক বিশ্বস্ত বাসিন্দা।

তারা ডিজিটাল দানবকে তাড়ানোর পরিকল্পনা করল, কিন্তু যে আসল দানবটা মানুষের মুখোশ পরে তাদের ঘরে অবাধে বিচরণ করছে, সে রয়ে গেল সব সন্দেহের ঊর্ধ্বে, আরও ভয়ঙ্কর কোনো আঘাত হানার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য।

(চলবে)

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login