ঢাকার বৃষ্টি সবসময় সুন্দর হয় না।
কখনো সেটা রাস্তায় জল জমায়, যানজট বাড়ায়, মানুষের বিরক্তি বাড়ায়।
কিন্তু সেদিনের বৃষ্টিটা ছিল অন্যরকম।
রাত তখন সাড়ে দশটা।
রাস্তায় মানুষ কমে এসেছে। দোকানগুলোর শাটার নামছে একে একে। রাস্তার বাতিগুলো বৃষ্টির পানিতে ঝাপসা হয়ে গেছে।
নীলা ছাতা হাতে বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছিল।
তার ফোনের ব্যাটারি মাত্র তিন শতাংশ।
আর রায়ান এখনও আসেনি।
নীলা ফোনে শেষবার মেসেজ করল—
“তুমি আসবে তো?”
কিছুক্ষণ পর উত্তর এল।
“আমি আসছি। একটু অপেক্ষা করো।”
নীলা হেসে ফেলল।
রায়ানের এই “একটু” কথাটার কোনো নির্দিষ্ট অর্থ ছিল না।
কখনো পাঁচ মিনিট।
কখনো আধা ঘণ্টা।
কখনো এক ঘণ্টা।
ঠিক তখনই একটা কালো গাড়ি এসে তার সামনে থামল।
জানালা নামল।
রায়ান বলল,
“উঠো।”
নীলা ভ্রু কুঁচকে বলল,
“এত দেরি করলে কেন?”
“জ্যাম।”
“ঢাকায়?”
“হ্যাঁ।”
“রাতে?”
“হ্যাঁ।”
“বৃষ্টিতে?”
রায়ান একটু হেসে বলল,
“তুমি চাইলে আমি অন্য কোনো অজুহাতও দিতে পারি।”
নীলা হাসি চাপতে না পেরে গাড়িতে উঠে বসল।
গাড়ির ভেতরে হালকা গান বাজছিল।
বাইরে বৃষ্টি।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।
তারপর নীলা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল,
“জানো, আমি মাঝে মাঝে ভাবি… তুমি আমাকে আসলে কতটা ভালোবাসো?”
রায়ান রাস্তার দিকে তাকিয়েই বলল,
“এই প্রশ্নের উত্তর কি প্রতিদিন নতুন করে দিতে হবে?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
“কারণ আমি শুনতে ভালোবাসি।”
রায়ান এবার তার দিকে তাকাল।
“আমি তোমাকে ভালোবাসি।”
নীলা কিছু বলল না।
“আর?”
“আর কী?”
“আর কিছু বলো।”
রায়ান একটু ভেবে বলল,
“আমি তোমাকে শুধু ভালোবাসি না।”
নীলা তার দিকে তাকাল।
“তাহলে?”
“তোমাকে নিয়ে আমার একটা অভ্যাস হয়ে গেছে।”
“কী রকম?”
“সকালে ঘুম থেকে উঠে তোমার মেসেজ খুঁজি। রাতে ঘুমানোর আগে তোমার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করে। কোনো সুন্দর জায়গা দেখলে মনে হয়, তোমাকে এখানে নিয়ে আসা দরকার।”
নীলার চোখ নরম হয়ে এল।
রায়ান বলল,
“আর তুমি যখন রাগ করো…”
“হুম?”
“তখন তোমাকে আরও বেশি ভালো লাগে।”
নীলা হেসে বলল,
“তুমি অসম্ভব বিরক্তিকর।”
“জানি।”
“তবুও তোমাকে ভালোবাসি।”
গাড়ি তখন ধীরে ধীরে একটা নির্জন রাস্তার পাশে থামল।
বৃষ্টি এখনও পড়ছে।
রায়ান ইঞ্জিন বন্ধ করল।
চারদিকে শুধু বৃষ্টির শব্দ।
নীলা জানালার দিকে তাকিয়ে ছিল।
রায়ান ধীরে বলল,
“একটা কথা বলব?”
“বলো।”
“তুমি কি কখনো ভেবেছ… আমরা যদি সত্যিই একসঙ্গে থাকি?”
নীলা এবার তার দিকে তাকাল।
“কীভাবে?”
“একটা ছোট বাসা। হয়তো খুব সুন্দর হবে না। একটা বারান্দা থাকবে। তুমি গাছ লাগাবে।”
“আর তুমি?”
“আমি প্রতিদিন ভুলে যাব গাছে পানি দিতে।”
“তারপর?”
“তুমি আমাকে বকা দেবে।”
“আর?”
“রাতে আমরা বারান্দায় বসে চা খাব।”
নীলা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর বলল,
“আর যদি কোনোদিন আমাদের মধ্যে ঝগড়া হয়?”
রায়ান মৃদু হেসে বলল,
“তাহলে?”
“তুমি কি চলে যাবে?”
“না।”
“নিশ্চিত?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
রায়ান তার হাতটা নিজের হাতে নিল।
“কারণ ভালোবাসা মানে শুধু সুন্দর সময়ে পাশে থাকা না।”
বাইরে বজ্রপাত হলো।
নীলা একটু চমকে উঠল।
রায়ান তার হাতটা আরও শক্ত করে ধরল।
“ভয় পেয়েছ?”
“না।”
“মিথ্যা বলছ।”
“হয়তো।”
রায়ান মৃদু হেসে তার দিকে তাকাল।
দুজনের চোখ কয়েক সেকেন্ডের জন্য এক হয়ে গেল।
কেউ কিছু বলল না।
কিছু মুহূর্ত থাকে, যেগুলোর কোনো ভাষা লাগে না।
সেই মুহূর্তটাও তেমন।
নীলা ধীরে ধীরে মাথা রাখল রায়ানের কাঁধে।
রায়ান তার চুলে হাত বুলিয়ে দিল।
বৃষ্টির শব্দ আরও ঘন হয়ে এল।
নীলা চোখ বন্ধ করে বলল,
“রায়ান?”
“হুম?”
“এই মুহূর্তটা যেন কখনো শেষ না হয়।”
রায়ান তার কপালে খুব নরম করে একটা চুমু দিল।
“শেষ হবে না।”
“কীভাবে?”
“আজকের রাত শেষ হবে।”
সে একটু থামল।
“কিন্তু তোমাকে ভালোবাসার গল্পটা না।”
নীলা চোখ খুলল।
তারপর খুব ধীরে হাসল।
গাড়ির কাঁচে তখন বৃষ্টির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছে।
শহরটা বাইরে ছুটে চলেছে।
আর গাড়ির ভেতরে—
দুজন তরুণ মানুষ নিজেদের ছোট্ট পৃথিবীটা খুঁজে পেয়েছে।
সেই রাতে তারা বাড়ি ফিরেছিল অনেক দেরিতে।
কিন্তু দুজনের কারও মনেই তাড়া ছিল না।
কারণ তারা জানত—
কিছু রাত ঘড়ির কাঁটায় মাপা যায় না।
কিছু ভালোবাসা—
শুধু অনুভব করা যায়।