বোরহানউদ্দিন সাহেবের দুই ছেলে আর এক মেয়ে।
তবে মেয়েটি তাঁর নিজের সন্তান নয়—পালক মেয়ে অন্তত কাগজে-কলমে তাই লেখা ছিল।
কিন্তু বাড়ির কেউ কোনোদিন তাকে সেই কথাটা বুঝতে দেয়নি। বরং দুই ছেলের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়, এমনকি কখনো কখনো একটু বেশিই আদরে বড় হয়েছে মেয়েটি।
বোরহানউদ্দিন সাহেব তাকে ডাকতেন—“আমার ছোট মা।”
মেয়েটিও বাবাকে ছাড়া নিজের পৃথিবী কল্পনা করতে পারত না।
কখনো তার মনে প্রশ্ন জাগত না—কেন বাবা তাকে এত ভালোবাসেন?
মানুষ ভালোবাসার হিসাব চায় না, যতদিন সে ভালোবাসার ভেতরে নিরাপদ থাকে।
বোরহানউদ্দিন সাহেবের জীবনে একটি অধ্যায় ছিল, যেটি তিনি কাউকে কখনো বলেননি।
অনেক বছর আগে, এক তরুণীর সঙ্গে তাঁর গভীর সম্পর্ক ছিল। সম্পর্কটি হয়তো ভালোবাসার চেয়েও বেশি কিছু ছিল। কিন্তু সমাজ সব ভালোবাসাকে স্বীকৃতি দেওয়ার মতো উদার নয়।
পরিবার, সম্মান, বংশ, সামাজিক অবস্থান—সবকিছুর ভারে সেই সম্পর্ক একদিন নিঃশব্দে ভেঙে গিয়েছিল।
তরুণীটি তাঁর জীবনের বাইরে চলে গিয়েছিল।কিন্তু রেখে গিয়েছিল একটি শিশু।
একটি কন্যাশিশু।
বোরহানউদ্দিন সাহেব শিশুটিকে নিজের নামে নিতে পারেননি। পারেননি তার মাকে নিজের জীবনের সঙ্গী করে আনতে। সমাজের সামনে দাঁড়িয়ে বলতে পারেননি—“এই আমার ভালোবাসা, এই তার সন্তান।”
তবু পিতৃত্বকে অস্বীকার করার মতো কঠিন মানুষ তিনি ছিলেন না।
তাই অন্য একটি পরিচয়ে তিনি শিশুটিকে নিজের জীবনে নিয়ে এসেছিলেন।
পালক কন্যা।
সমাজের কাছে এটাই ছিল সত্য।
আর তাঁর নিজের কাছে?
সত্যটা ছিল আরও গভীর।
তিনি জানতেন, মেয়েটির মুখে তিনি সেই মানুষটির ছায়া দেখেন, যাকে তিনি জীবনে হারিয়েছেন। আর সেই ছায়াকে ভালোবাসতে ভালোবাসতেই একসময় তিনি ভুলে গিয়েছিলেন—মেয়েটি তাঁর কাছে আসলে কীভাবে এসেছিল।
বছর কেটে গেল।
দুই ছেলে বড় হলো। ব্যবসা সামলাতে শুরু করল। মেয়েটিও পড়াশোনা শেষ করে নিজের জীবনের স্বপ্ন দেখতে শুরু করল।
বোরহানউদ্দিন সাহেব বৃদ্ধ হলেন।
তবু প্রতিদিন রাতে ঘুমানোর আগে মেয়েটির ঘরের দরজার দিকে একবার তাকিয়ে নিতেন।
যেন নিশ্চিত হতে চাইতেন—তার পৃথিবীটা এখনও নিরাপদ আছে।
তারপর এক বর্ষার বিকেলে, হঠাৎ একটি দুর্ঘটনা।
সবকিছু থেমে গেল এক মুহূর্তে।
বোরহানউদ্দিন সাহেব আর বাড়ি ফিরলেন না।
বাড়িতে কান্না নামল।
দুই ছেলে বাবার জানাজা, দাফন, আত্মীয়স্বজন—সব সামলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
মেয়েটি শুধু এক কোণে বসে ছিল।
তার মনে হচ্ছিল, পৃথিবীর সবচেয়ে শক্ত মানুষটিও বুঝি সত্যিই একদিন চলে যেতে পারে।
বাবার ঘর গোছাতে গিয়ে পুরোনো আলমারির একটি ড্রয়ার খুলল বড় ছেলে।
সেখানে কিছু কাগজপত্র।
ব্যাংকের নথি।
ব্যবসার হিসাব।
আর একটি উইল।
উইলটি পড়তে পড়তে বড় ছেলের মুখের রং বদলে গেল।
বাড়ির অধিকাংশ সম্পত্তি—ব্যবসার অংশ, জমি, বাড়ি, ব্যাংকের অর্থ—সবকিছু সেই পালক কন্যার নামে।
দুই ছেলে পেল সামান্য অংশ।
ঘরে যেন হঠাৎ বাতাস ভারী হয়ে গেল।
কেউ কিছু বলছিল না।
তারপর ছোট ছেলে ফিসফিস করে বলল,
“এটা হতে পারে না।”
কথাটা খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল।
কেউ বলল, মেয়েটি নিশ্চয়ই বাবাকে ভুল বুঝিয়েছিল।
কেউ বলল, বৃদ্ধ বয়সে বাবার ওপর প্রভাব বিস্তার করেছিল।
কেউ বলল, নিশ্চয়ই কোনো গোপন কারণ আছে।
মানুষ অদ্ভুত প্রাণী।
মৃত মানুষের ভালোবাসার চেয়ে জীবিত মানুষের সন্দেহ অনেক দ্রুত ছড়ায়।
মেয়েটি কিছুই বলল না।
সে শুধু বাবার পুরোনো চেয়ারটায় বসে রইল।
সেদিন রাতে আলমারির একেবারে নিচে একটি পুরোনো খাম পাওয়া গেল।
খামের ওপর লেখা—
“আমার ছোট মায়ের জন্য।”
কাঁপা হাতে মেয়েটি চিঠিটি খুলল।
ভেতরে মাত্র কয়েকটি পৃষ্ঠা।
বোরহানউদ্দিন সাহেব লিখেছিলেন—
“ছোট মা,
তোমাকে কখনো সত্যিটা বলতে পারিনি।
ভেবেছিলাম, সত্য জানলে হয়তো তুমি আমাকে অন্য চোখে দেখবে।
তোমার জন্মের গল্প সমাজের কাছে হয়তো লজ্জার হতে পারে। কিন্তু আমার কাছে তুমি কোনোদিন লজ্জা ছিলে না।
তুমি ছিলে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ভালোবাসার শেষ চিহ্ন।
তোমার মাকে আমি আমার জীবনে রাখতে পারিনি। সেই ব্যর্থতা আমার। কিন্তু তোমাকে কোনোদিন হারাতে চাইনি।
তোমাকে পালক মেয়ে বলে পরিচয় দিয়েছি, কারণ সমাজকে সত্যিটা বলার সাহস আমার ছিল না।
কিন্তু আমার হৃদয় কোনোদিন তোমাকে পালক বলে মানেনি।
তুমি আমার মেয়ে।
রক্তের কারণে নয়।
আমি তোমাকে বাবা হয়ে ভালোবেসেছি বলে।
এই সম্পত্তি তোমার জন্য রেখে গেলাম—তোমাকে বড় করার ঋণ শোধ করার জন্য নয়। ভালোবাসার ঋণ কখনো সম্পত্তি দিয়ে শোধ হয় না।
শুধু চাই, আমার মৃত্যুর পর কেউ যদি তোমাকে প্রশ্ন করে—‘তুমি কে?’
তুমি যেন মাথা তুলে বলতে পারো,
আমি বোরহানউদ্দিন সাহেবের মেয়ে।
কারণ সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে সত্য পরিচয়।”
চিঠির শেষ লাইনে কালি ছড়িয়ে ছিল।
সম্ভবত লেখার সময় তাঁর হাত কেঁপে গিয়েছিল।
মেয়েটি চিঠিটা বুকে চেপে ধরে কাঁদতে লাগল।
সেই কান্নায় কোনো সম্পত্তির আনন্দ ছিল না।
ছিল একজন বাবাকে হারানোর শূন্যতা।
পরদিন দুই ভাইয়ের সামনে সে উইলটা নিয়ে বসে বলল,
“বাবা আমাকে যা দিয়েছেন, তার একটাও আমি চাই না।”
দুই ভাই অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
সে বলল,
“কিন্তু বাবার ভালোবাসাটা আমি কাউকে দেব না।”
ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।
তারপর সে ধীরে ধীরে বলল,
“তোমরা সম্পত্তি ভাগ করে নাও। কিন্তু একটা কথা মনে রেখো—বাবা আমাদের কাউকে কম ভালোবাসেননি। শুধু আমাদের ভালোবাসার ধরন আলাদা ছিল।”
বড় ভাই মাথা নিচু করল।
হয়তো প্রথমবার তার মনে হলো, বাবার সম্পত্তি কে পেল—এই প্রশ্নটির চেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল,
বাবা কাকে কীভাবে ভালোবাসতেন?
আর সেই প্রশ্নের উত্তর তিনি জীবিত থাকতে কাউকে দেননি।
মৃত্যুর পর দিয়ে গেলেন।
মানুষের মন বড় বিচিত্র।
কখনো সামাজিক স্বীকৃতির ভয়ে মানুষ সত্যকে লুকিয়ে রাখে, অথচ সেই লুকানো সত্যই তার জীবনের সবচেয়ে নির্মল ভালোবাসা হয়ে থাকে।
কখনো মানুষ রক্তের সম্পর্ককে অস্বীকার করে, অথচ ভালোবাসার সম্পর্ককে নিজের সমস্ত অস্তিত্ব দিয়ে সত্যি করে তোলে।
আর কখনো একজন মানুষ চলে যাওয়ার পর তার রেখে যাওয়া সম্পত্তি নয়—
তার নীরব কাজগুলোই তার জীবনের সবচেয়ে বড় স্বীকারোক্তি হয়ে দাঁড়ায়।
বোরহানউদ্দিন সাহেবও তাই রেখে গিয়েছিলেন।
একটি বাড়ি, কিছু জমি, বিপুল সম্পত্তি—
আর তার চেয়েও বড় কিছু:
একটি মেয়েকে, যে মৃত্যুর পরও প্রথমবারের মতো নিশ্চিত হলো—সে কোনোদিনই পালক ছিল না। সে ছিল একজন বাবার অপ্রকাশিত ভালোবাসা।
আজিমপুর , ঢাকা
০৭/১০/২০২৬