Story

প্রাণভ্রমর

September 30, 2026

8 views

সিসিইউতে সময় ঘড়ির কাঁটায় চলে না।সেখানে সময় চলে হৃদস্পন্দনের শব্দে।

টুপ... টুপ... টুপ...

একটা শব্দ থেমে গেলেই যেন পৃথিবী থমকে দাঁড়ায়। আরেকটা শব্দ ফিরে এলে মনে হয় জীবন এখনও একটু বাকি।

চল্লিশ ঘণ্টা। মাত্র চল্লিশ ঘণ্টা, অথচ মনে হয়েছিল চল্লিশ বছর কেটে গেছে। সিসিইউর দরজার ওপাশে পৃথিবীটা স্বাভাবিক। মানুষ হাঁটছে, কথা বলছে, হাসছে, ফোন দেখছে, ব্যস্ততায় ছুটছে। আর এই দরজার এপাশে প্রতিটি নিঃশ্বাসের আলাদা মূল্য। এখানে এসে বোঝা যায়, মানুষ আসলে কতটা অসহায়। টাকার হিসাব থাকে না। পদমর্যাদার হিসাব থাকে না। কে কত বড়, কে কত ছোট তার কোনো অর্থ থাকে না। শুধু একটা প্রশ্ন থাকে আর কতক্ষণ? মেশিনের আলো জ্বলে-নিভে। মনিটরে ওঠানামা করে কয়েকটি রেখা। কখনো দ্রুত, কখনো ধীরে। প্রতিটি রেখা যেন জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর এক অদৃশ্য কথোপকথন। সিসিইউতে দাঁড়িয়ে তখন মনে হয়, পৃথিবীর সবচেয়ে দামি জিনিস কোনো বাড়ি নয়, কোনো গাড়ি নয়, কোনো সম্পদ নয়। একটা স্বাভাবিক নিঃশ্বাস। একটা চোখ মেলে তাকানো। একটা সকাল। আর একটা দিন বেঁচে থাকার সুযোগ। অদ্ভুত ব্যাপার, বাইরে থাকতে ঈশ্বরকে নিয়ে কত প্রশ্ন থাকে। বিশ্বাস নিয়ে কত দ্বিধা থাকে। পৃথিবীর ব্যস্ততায় সৃষ্টিকর্তাকে ভুলে যাওয়া খুব সহজ। কিন্তু সিসিইউতে এসে সেই প্রশ্নগুলো কোথায় যেন হারিয়ে যায়। সেখানে অহংকারও ভয় পায়। বিজ্ঞান যতটা পারে চেষ্টা করে। চিকিৎসকরা যতটা পারেন লড়াই করেন। মেশিন যতটা পারে শরীরকে সময় দেয়। তারপরও কোথাও একটা অদৃশ্য সীমারেখা থেকে যায়। সেই সীমারেখার সামনে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রথমবার নিজের সমস্ত যুক্তির চেয়ে বড় কোনো শক্তিকে অনুভব করে। মনে হয়, যদি আরেকবার সকাল দেখি! যদি আরেকবার স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে পারি! যদি আরেকবার প্রিয় মানুষগুলোর মুখ দেখতে পারি! তাহলে হয়তো জীবনের কাছে আর কিছুই চাইব না। সিসিইউ তাই শুধু অসুস্থ মানুষের জায়গা নয়। এটা মানুষের অহংকার ভেঙে যাওয়ার জায়গা। এখানে এসে বোঝা যায়, আমরা আসলে জীবনকে নিজের বলে যতটা ভাবি, জীবন ততটা আমাদের নয়। এক মুহূর্ত আগে যে মানুষটি ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করছিল, পরের মুহূর্তে তার ভবিষ্যৎ হয়তো কেবল কয়েকটি নিঃশ্বাস। আর সেই নিঃশ্বাসগুলোও তার নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। চল্লিশ ঘণ্টা পর সিসিইউ থেকে বেরিয়ে মনে হলো পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জায়গা হয়তো অন্ধকার কোনো স্থান নয়। পৃথিবীর সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জায়গা হলো সেই জায়গা, যেখানে দাঁড়িয়ে মানুষ প্রথমবার খুব কাছ থেকে মৃত্যুকে দেখতে পায়। যেখানে প্রতিটি বিপ্ শব্দ মনে করিয়ে দেয় প্রাণভ্রমর যে কোনো মুহূর্তে উড়ে যেতে পারে। আর তখন বুঝতে পারি, আমরা মৃত্যুকে ভয় পাই বলে ঈশ্বরকে খুঁজি না। বরং মৃত্যুর এত কাছে গিয়ে বুঝতে পারি, জীবনটা আসলে আমাদের হাতে ছিলই না। তাই সিসিইউ থেকে ফিরে আসার পর পৃথিবীটা আর আগের মতো লাগে না। একটা আকাশ একটু বেশি সুন্দর লাগে। একটা সকাল একটু বেশি মূল্যবান মনে হয়। প্রিয় মানুষটির পাশে বসে থাকা হয়ে ওঠে বড় কোনো প্রাপ্তি। আর নিঃশ্বাস নেওয়ার সময় বুকের ভেতর থেকে নিঃশব্দে একটা কথাই আসে, “আলহামদুলিল্লাহ, আজও প্রাণভ্রমরটা ফিরে আছে।”

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login

  • প্রতিটি রেখা যেন জীবনের সঙ্গে মৃত্যুর এক অদৃশ্য কথোপকথন। চমৎকার।

    • ইরাবতী 1 day ago

      ধন্যবাদ আপনাকে।