ভুলের পরে...
রাশেদের সেই শীতল, ভয়ঙ্কর প্রশ্নটা ঘরের বাতাসে জমে ছিল—"কী হয়েছে এখানে?"
সগিরের ফ্যাকাসে মুখ আর শাইলার বুকের মধ্যে থরথর করে কাঁপতে থাকা রিয়ার দিকে তাকিয়েই রাশেদ সবটা বুঝে নিল। তার মস্তিষ্ক যেন এক মুহূর্তের জন্য কাজ করা বন্ধ করে দিল। তারপরই এক তীব্র, আদিম ক্রোধ তার পুরো সত্তাকে গ্রাস করল। সে একটা হিংস্র পশুর মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল সগিরের উপর। অতিথিদের কোলাহল, পার্টির সঙ্গীত—সবকিছু ছাপিয়ে ফ্ল্যাটের ভেতর থেকে ভেসে আসতে লাগল রাশেদের চিৎকার আর ভাঙচুরের শব্দ।
পার্টি ভেঙে গেল এক মুহূর্তে। হতভম্ব অতিথিরা যে যার মতো করে বেরিয়ে গেল, পেছনে রেখে গেল এক ধ্বংসস্তূপ। সেই ধ্বংসস্তূপ শুধু ভাঙা কাঁচ বা উল্টে পড়া আসবাবপত্রের ছিল না, ছিল দুটো মানুষের বিশ্বাস, ভালোবাসা আর সাজানো জীবনের।
সেদিন রাতে ফ্ল্যাটটা যেন এক কবরস্থানে পরিণত হলো। রিয়াকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেওয়ার পর রাশেদ আর শাইলা বসার ঘরের দুই প্রান্তে দুটো পাথরের মূর্তির মতো বসে রইল। অনেকক্ষণের নীরবতা ভেঙে রাশেদ প্রথম কথা বলল, তার কণ্ঠস্বর ছিল বরফশীতল, "তোমার জন্যই আজ সব শেষ হয়ে গেল। তুমিই ওকে মাথায় তুলেছিলে! কেন তোমার চোখে পড়েনি কিছুই?"
শাইলার ভেতরটা কান্নায় দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছিল। সে ভাঙা গলায় জবাব দিল, "আমার চোখে পড়েনি? ও তোমার সেরা বন্ধু ছিল, রাশেদ! তুমি ওর নোংরা রসিকতায় হেসেছো! আমি যখন বলেছিলাম, সগিরের আদরটা কেমন অস্বাভাবিক লাগে, তুমিই উড়িয়ে দিয়েছো! তুমি তোমার বন্ধুকে চিনতে পারোনি, তার দায় আমার উপর দিচ্ছো?"
শুরু হলো পারস্পরিক দোষারোপের এক বিষাক্ত খেলা। তারা একে অপরের দিকে কাদা ছুঁড়ছিল, কারণ নিজেদের দিকে তাকানোর মতো সাহস বা শক্তি কোনোটাই তাদের অবশিষ্ট ছিল না। তাদের প্রত্যেকটা অভিযোগ ছিল আসলে নিজেদের অপরাধবোধের চিৎকার। সেই রাতে তাদের সুন্দর বেডরুমটা আলাদা হয়ে গেল। তাদের মধ্যে তৈরি হলো এক অদৃশ্য দেয়াল।
পরের কয়েকটা দিন কাটল এক দুঃস্বপ্নের মতো। রিয়া কথা বলা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। সে সারাক্ষণ আতঙ্কিত হয়ে থাকত, ঘুমের মধ্যে চিৎকার করে উঠত। তার হাসিখুশি মুখটা একটা ফ্যাকাশে মুখোশের আড়ালে ঢাকা পড়ে গিয়েছিল। মেয়ের এই অবস্থা দেখে শাইলার মাতৃসত্তাটা জেগে উঠল। সে বুঝতে পারল, এভাবে দোষারোপ করে তারা শুধু নিজেদের নয়, তাদের মেয়েটাকেও শেষ করে দিচ্ছে।
একদিন সকালে সে রাশেদের সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, "আমাদের রিয়ার জন্য সাহায্য দরকার। আমি একজন চাইল্ড সাইকোলজিস্টের খোঁজ পেয়েছি। আমাদের যেতে হবে।"
রাশেদ প্রথমে আপত্তি করেছিল। "লোকে কী বলবে?"—এই পুরনো ভয়টাই তাকে আঁকড়ে ধরেছিল। কিন্তু মেয়ের নিষ্প্রাণ চোখের দিকে তাকিয়ে তার সব প্রতিরোধ ভেঙে গেল।
ডক্টর আফরিনের চেম্বারটা ছিল খুব শান্ত আর স্নিগ্ধ। সেখানে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না। তিনি রিয়ার সাথে সরাসরি কোনো কথা বললেন না। তার সামনে ছড়িয়ে দিলেন অনেকগুলো রঙ-পেন্সিল আর সাদা কাগজ। রিয়া প্রথমে ইতস্তত করলেও, পরে আঁকতে শুরু করল। সে একটা ছবি আঁকল—একটা বিশাল, কালো ছায়ার মতো মানুষ, আর তার পায়ের কাছে পড়ে থাকা একটা ছোট্ট প্রজাপতি, যার ডানা দুটো ছেঁড়া।
এরপর তিনি রিয়াকে কয়েকটা পুতুল দিলেন। রিয়া দুটো পুতুল হাতে তুলে নিল—একটা বড় পুরুষ পুতুল আর একটা ছোট্ট মেয়ে পুতুল। সে পুতুল দুটোকে দিয়ে সেই 'সিক্রেট গেম' খেলতে শুরু করল। তার ছোট্ট গলায় বলা সংলাপ, "ডোন্ট টেল মাম্মা... ইটস আওয়ার সিক্রেট..." শুনে রাশেদ আর শাইলার শরীর হিম হয়ে গেল।
সেশন শেষে ডক্টর আফরিন তাদের বোঝালেন, রিয়াকে systematically 'গ্রুম' করা হয়েছে। বিশ্বাস অর্জন করে, উপহার দিয়ে, স্নেহের আড়ালে ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনি বললেন, "শিকারী একা শিকার করে না। সে পুরো পরিবেশটাকে নিজের অনুকূলে তৈরি করে নেয়। আপনাদের অন্ধ বিশ্বাসই ছিল তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র।"
চেম্বার থেকে বেরিয়ে গাড়িতে বসার পর অনেকক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। বাইরের পৃথিবীর ব্যস্ততা তাদের স্পর্শ করছিল না। অবশেষে রাশেদ স্টিয়ারিং হুইলে মাথা রেখে কান্নায় ভেঙে পড়ল। সেই প্রথম শাইলা রাশেদের চোখে জল দেখল। সে রাশেদের কাঁধে হাত রাখল। সেই মুহূর্তে তাদের ভেতরের সব দেয়াল ভেঙে পড়ল। তাদের আর একে অপরকে দোষ দেওয়ার কিছু ছিল না।
রাশেদ ভেজা গলায় বলল, "উনি ঠিকই বলেছেন, শাইলা। দুর্গটা আমরা নিজেরাই দুর্বল করে রেখেছিলাম। আমরাই ওকে হায়েনার মুখে ঠেলে দিয়েছি।"
শাইলার চোখ দিয়েও জল গড়াচ্ছিল। সে বলল, "ভুলটা আমাদের দুজনেরই। কিন্তু এখন আর অনুশোচনা করার সময় নেই। এখন লড়াই করার সময়।"
সেই একটি বাক্যই যেন তাদের নতুন করে বাঁচার শক্তি দিল। তাদের অপরাধবোধ রূপান্তরিত হলো এক তীব্র প্রতিজ্ঞায়। তারা ঠিক করল, সগিরকে তারা ছাড়বে না। সমাজের ভয়ে, লজ্জায় তারা নিজেদের গুটিয়ে নেবে না।
পরদিন সকালে রাশেদ আর শাইলা একসাথে থানায় গেল। একজন পুলিশ অফিসারের সামনে বসে ভয়ঙ্কর আর লজ্জাজনক ঘটনাটার বর্ণনা দেওয়াটা ছিল নরকযন্ত্রণার মতো। কিন্তু তারা একে অপরের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছিল। তারা শুধু স্বামী-স্ত্রী ছিল না, তারা ছিল এক আহত কন্যার যোদ্ধা বাবা-মা।
তারা যখন থানা থেকে বেরিয়ে এলো, তখন এক আলো ফুটছে। সেই আলোটা তাদের কাছে নতুন দিনের কোনো বার্তা নিয়ে এলো না, নিয়ে এলো এক দীর্ঘ, কঠিন লড়াইয়ের ঘোষণা। তাদের জীবন আর কখনো আগের মতো হবে না, কিন্তু তারা জানত, এই লড়াইটা তাদের লড়তেই হবে। তাদের ভাঙা কাঁচের ঘরের ধ্বংসস্তূপের উপর দাঁড়িয়ে তারা তাদের মেয়ের জন্য এক নতুন, দুর্ভেদ্য দুর্গ তৈরির শপথ নিল।
(চলবে)