Story

আদরের আড়ালে ৮ (শেষ পর্ব)

September 30, 2026

3 views

নতুন সকালের শপথ

 দু'টো বছর কেটে গেছে। সময় হয়তো সব ক্ষত সারিয়ে তুলতে পারে না, কিন্তু কিছু ক্ষতকে বয়ে নিয়ে বেঁচে থাকার শক্তিটা ঠিকই জুগিয়ে দেয়। রাশেদ আর শাইলার জীবনটাও এখন বয়ে চলেছে, তবে এক সম্পূর্ণ নতুন খাতে। তাদের সেই ঝকঝকে কাঁচের ঘরটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে, আর তার জায়গায় তারা ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছে ইট-পাথরের এক সত্যিকারের নিরাপদ আশ্রয়।

আজ রিয়ার আটতম জন্মদিন। ফ্ল্যাটের ভেতরে কোনো জাঁকজমকপূর্ণ পার্টি নেই, নেই কোনো কোলাহল। আছে শুধু অনাড়ম্বর আয়োজন আর আপন মানুষ। রিয়া এখন ক্লাস থ্রি-তে পড়ে। তার মুখে আগের সেই সারল্যের সাথে মিশেছে এক ধরনের শান্ত প্রজ্ঞা। সে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি চুপচাপ, কিন্তু তার নীরবতা আর ভয়ের নয়, আত্মবিশ্বাসের।

বিকেলে জন্মদিনের কেক কাটার সময় তার এক দূর সম্পর্কের মামা এলেন। তিনি রিয়াকে দেখে উচ্ছ্বসিত হয়ে তাকে কোলে তোলার জন্য যেই না হাত বাড়িয়েছেন, রিয়া আলতো করে এক পা পিছিয়ে গেল। সে শান্ত কিন্তু স্পষ্ট গলায় বলল, "আমি হেঁটেই তোমার পাশে দাঁড়াব মামা, কোলে উঠতে আমার ভালো লাগে না।"

পুরোনো দিনের রাশেদ বা শাইলা হলে মেয়ের এই 'অভদ্রতা'য় হয়তো অপ্রস্তুত হয়ে পড়ত। কিন্তু আজকের রাশেদ সাথে সাথেই এগিয়ে এসে লোকটির কাঁধে হাত রাখল। হেসে বলল, "ও এখন বড় হয়ে গেছে তো, তাই নিজের প্রাইভেসি নিয়ে খুব সচেতন। ওর সিদ্ধান্তকে আমরা সম্মান করি।"

লোকটি একটু থতমত খেয়ে গেলেও পরিস্থিতি সামলে নিলেন। এই ছোট্ট দৃশ্যটাই ছিল রাশেদ আর শাইলার বদলে যাওয়ার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। তারা এখন আর সামাজিকতার চাপে সন্তানের অস্বস্তিকে অগ্রাহ্য করে না। তারা শিখেছে, সন্তানের 'না'-কে সম্মান জানানোই অভিভাবকত্বের প্রথম এবং প্রধান শর্ত।

রাতে রিয়া ঘুমিয়ে যাওয়ার পর রাশেদ আর শাইলা তাদের সেই পুরোনো ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। দু'বছর আগের সেই রাতের মতো আজও আকাশে চাঁদ, শহরে নিয়ন আলো। কিন্তু আজ তাদের মনে কোনো শূন্যতা নেই, আছে এক গভীর প্রশান্তি। সগির এখন জেলে। দীর্ঘ এক আইনি লড়াইয়ের পর তার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। সেই লড়াইটা ছিল কঠিন, ছিল লজ্জাজনক। সমাজের হাজারটা প্রশ্নবাণে তারা বিদ্ধ হয়েছে, কিন্তু তারা একে অপরের হাত ছাড়েনি।

শাইলা আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, "আজ রিয়াকে দেখে বুকটা ভরে গেল। দেখেছো, ও কেমন নির্ভীকভাবে 'না' বলতে শিখছে?"

রাশেদ শাইলার হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, "কারণ ও জানে, ওর 'না'-এর পেছনে আমরা দুজন পাহাড়ের মতো দাঁড়িয়ে আছি। আমরা ওর বন্ধু হতে পেরেছি, শাইলা। এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় জয়।"

তাদের জীবনে এখন আর কোনো আধুনিকতা নেই। আছে গভীর বোঝাপড়া। তারা এখন রিয়ার সাথে তার স্কুল, বন্ধু, ভালো লাগা, খারাপ লাগা—সবকিছু নিয়ে খোলামেলা আলোচনা করে। তারা তাকে শিখিয়েছে 'ভালো স্পর্শ' আর 'খারাপ স্পর্শ'-এর পার্থক্য। তাকে বুঝিয়েছে, তার শরীরটা একান্তই তার নিজের, এর উপর আর কারো অধিকার নেই। তারা তাদের মেয়ের জন্য এক দুর্ভেদ্য মানসিক সুরক্ষার দেয়াল তৈরি করেছে।

এই দু'বছরে তারা বুঝেছে, তাদের দুর্গটা কোনো বাইরের শত্রু ভাঙেনি। নিজেদের অজ্ঞতা, উদাসীনতা আর মিথ্যে সামাজিকতার বোধ দিয়েই তারা সেই দুর্গের দেওয়ালে ফাটল ধরিয়েছিল। সেই ভুলের মাশুল হয়তো তাদের সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে, রিয়ার মনের গভীরে থাকা ক্ষতটা হয়তো কখনোই পুরোপুরি শুকাবে না। কিন্তু সেই ভুলের শিক্ষাটাই তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় পাথেয় হয়ে উঠেছে।

রাশেদ স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, "মাঝে মাঝে মনে হয়, ওই ঝড়টা না এলে আমরা হয়তো কোনোদিনই ঘুম থেকে উঠতাম না। ওই ভাঙা কাঁচের টুকরোগুলোই আমাদের সত্যিকারের চোখ খুলে দিয়েছে।"

শাইলা স্বামীর বুকে মাথা রাখল। বাইরে ভোরের আলো ফুটতে শুরু করেছে। সেই আলোটা তাদের দুজনের মুখে এসে পড়ল। তাদের নতুন সকালগুলো আর অনুশোচনার ভারে ন্যুব্জ নয়, বরং সচেতনতার উজ্জ্বল আলোয় ভরা। কারণ তারা শিখেছে, অভিভাবকত্ব কোনো ভুলের ঊর্ধ্বে থাকা নয় বরং প্রতিটি ভুলের পর সন্তানের জন্য আরও শক্তিশালী হয়ে জেগে ওঠার এক অবিরাম শপথ। তাদের সামনে যে নতুন সকাল, তা নিখুঁত নয়, কিন্তু তা সত্য, এবং সবচেয়ে বড় কথা, তা নিরাপদ।

(সমাপ্ত)

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login