বরিশালের উজিরপুরের তুবা এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী সুজার প্রতি রইল আন্তরিক প্রীতি ও ভালোবাসা।
একটি ছোট্ট অথচ অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন উজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী সুজা। কিছুদিন আগে উজিরপুরে চোর সন্দেহে এক ব্যক্তিকে খুঁটির সঙ্গে রশি দিয়ে বেঁধে রাখার যে ঘটনা ঘটেছিল, সেই মানুষটির ছোট্ট মেয়েটির কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে। তার নাম তুবা। বাবাকে যখন প্রকাশ্যে হেয় করা হচ্ছিল, তখন সেই শিশুই বাবার জন্য চা-বনরুটি নিয়ে এসেছিল। পরম মমতায় নিজ হাতে যত্ন করে খাইয়ে দিচ্ছিল। দৃশ্যটি আমাদের সমাজের বিবেককে আরেকবার প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল।
একজন মানুষের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে, অপরাধের অভিযোগের তদন্ত ও বিচার হতে পারে। কিন্তু সেই অভিযোগের দায় তার সন্তানের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়ার অধিকার কোনো সমাজের নেই। অথচ তুবার ক্ষেত্রে সেটিই যেন ঘটতে যাচ্ছিল।
যে সমাজে চেয়ারম্যান-মেম্বার থেকে শুরু করে নানা স্তরের প্রভাবশালী মানুষজন নিজেদের নানা অন্যায়ের দায় এড়িয়ে চলেন, সেই সমাজই আবার একজন কথিত চোরের বিচারক হয়ে বসে যায়। শুধু তা-ই নয়, তুবার নিজের বাড়িতে তার বসবাস নিয়েও উঠেছিল নানা প্রশ্ন। তাদেরকে একঘরে করার ফন্দিফিকির চলছিল বলেও অভিযোগ উঠেছে। শেমিং, বুলিং আর সামাজিক অপমানের বোঝা একটি শিশুর কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছিল -শুধু তার বাবার পরিচয়ের কারণে।
কিন্তু একটি শিশুর পরিচয় তার বাবার সম্ভাব্য অপরাধ দিয়ে নির্ধারিত হয় না। তুবা কোনো অপরাধ করেনি। সে কেবল একটি ঘটনার অনিচ্ছুক সাক্ষী, অনাহূত ইনসিডেন্টের শিকার, একজন মানুষের সন্তান এবং সর্বোপরি একজন শিশু -যার নিজের মতো করে বেড়ে ওঠার, পড়াশোনা করার, বন্ধুদের সঙ্গে হাসার এবং স্বপ্ন দেখবার অধিকার আছে।
এই জায়গাতেই মানবিকতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন উজিরপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী সুজা।
তিনি শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেননি; সংবেদনশীল একজন মানুষ হিসেবে নিজে তুবার হাত ধরে তাকে স্কুলে নিয়ে গেছেন। সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলেছেন। বুঝিয়েছেন -তুবা অন্য সবার মতোই একজন শিশু। একটি ঘটনার কারণে তাকে আলাদা করে দেখার কোনো কারণ নেই। সে তাদেরই বন্ধু; তাদের সঙ্গে চলাফেরা করবে, পড়াশোনা করবে, খেলবে -এটাই স্বাভাবিক।
একজন প্রশাসনিক কর্মকর্তার এই ছোট্ট উদ্যোগের তাৎপর্য আসলে অনেক বড়। কখনো কখনো একটি শিশুর পাশে দাঁড়ানোর জন্য বড় কোনো প্রকল্পের প্রয়োজন হয় না; প্রয়োজন হয় শুধু একজন মানুষের সাহস, সংবেদনশীলতা ও বিবেকের। তুবার অন্ধকার হয়ে আসা পৃথিবীতে সেই মানুষটিই হয়তো একটুখানি আলো জ্বেলে দিয়েছেন।
সমাজের নিষ্ঠুরতা একটি শিশুকে যেখানে মাথা নিচু করে বাঁচতে শেখাচ্ছিল, সেখানে একজন সরকারি কর্মকর্তা তাকে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর সাহস দিয়েছেন। মেঘে ঢাকা আকাশে হঠাৎ এক ফালি রোদ যেমন মন ভালো করে দেয়, তুবার জীবনে এই উদ্যোগটিও তেমনই এক টুকরো সুবর্ণ আলো।
মোহাম্মদ আলী সুজার প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। আমরা চাই, দেশের প্রতিটি জনপদে এমন মানুষ থাকুন -যারা শুধু আইন দেখবেন না, আইনের আড়ালে থাকা মানুষটিকেও দেখবেন; শুধু অপরাধের অভিযোগ শুনবেন না, একটি শিশুর কান্নাটিও শুনবেন।
তুবার মতো প্রতিটি শিশুর জন্য সমাজ হোক নিরাপদ, সহমর্মী ও মানবিক। আর মিস্টার সুজার মতো এমন সোনার মানুষ শুধু উজিরপুরে নয় -আবির্ভূত হোন প্রতিটি জনপদে, ঘরে ঘরে।
▪️
লেখক: সাংবাদিক
২ অক্টোবর ২০২৬