অনেক দিন আগের কথা। চাঁদের বুড়ি প্রায়ই পৃথিবীতে আসতেন বাজার-সদাই করতে।
তোমরা কি জানো, এই চাঁদের বুড়িটা আসলে কে?
পৃথিবীর একটি উপগ্রহ আছে—তাতো শুনেছ তোমরা। সেই উপগ্রহের নাম চাঁদ। মেঘমুক্ত পূর্ণিমার রাতে আকাশে মৃদু আলোর যে গোল থালাটি দেখা যায়, ওটাকেই বলে চাঁদ। ভালো করে খেয়াল করলে দেখবে, ওই চাঁদের মধ্যে কুঁজো হয়ে একটি ছায়া আছে। গল্পচ্ছলে বলতে গেলে, ওটা ঠিক ছায়া নয়। ওর আড়ালে আছেন একজন থুরথুরে বুড়ি। যাকে আমরা সবাই চাঁদের বুড়ি নামেই ডাকি।
বুড়ির অনেক ধৈর্য। সারাক্ষণ সুতো তোলেন।
এত সুতো দিয়ে কী করেন বুড়ি?
লোকে বলে, সূর্যের চারপাশে যে মস্ত বড় গ্রহ-উপগ্রহ ঘুরে বেড়ায়, সেগুলোই বেঁধে রাখা হয় এই সুতো দিয়ে।
হলেও হতে পারে, আবার নাও হতে পারে!
সেবার বর্ষা শেষ হয়েছে। চাঁদের বুড়ির খোরাক ফুরিয়ে গেল। থুরথুরে বুড়িটা তার প্রিয় বাহন দৈত্যাকার টিয়া পাখির পিঠে চড়ে বসলেন। তারপরÑফড়ফড়ফড়ফড়!
টিয়া পাখি ডানা মেলে উড়ে চলল পৃথিবীর দিকে।
পৃথিবীর ঠিক কোন জায়গায় সেবার তারা নেমেছিল, তা নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না। কোনো বুড়ো মানুষকে জিজ্ঞেস করলে হয়তো বলতে পারবেন। বুড়ির বয়স এত বেশি ছিল যে ঠিকমতো হাঁটতে পারতেন না। পৃথিবীতে পা দিয়েই তিনি প্রথমে ডাকলেন মৎস্যক‚লকে।
‘এই যে মাছেরা! কোথায় তোমরা?’
বুড়ির ডাকে, পুকুরের পানি দুলে উঠল। নদীর পানি কাঁপল। খালের কচুরিপানা সরিয়ে ছোট-বড় নানা মাছ উঁকি দিতে লাগল।
বুড়ির সোজা আবদারÑচাঁদে আমিষের অভাব দেখা দিয়েছে। কয়েক প্রজাতির মাছ লাগবে। তোমরা কে কে যেতে চাও...
মাছেরা বুড়িকে খুব ভালোবাসত। অনেকেই রাজি হয়ে গেল।
কেউ বলল, ‘আমি যাব।’
কেউ বলল, ‘আমিও যাব।’
আবার কয়েকটি মাছ লেজ নাড়িয়ে পানির গভীরে ডুবে ফিসফাস করলো, চাঁদে গিয়ে কাজ কি আমাদের? শেষে দেখা গেলো সবাইকে ভেজে খেয়ে ফেলবে।
আরেকজন বলল, চাঁদে যে যাবো বাঁচবো কেমনে? ওখানেতো পানি নেই।
বুড়ি বললেন, খামোখা দুশ্চিন্তা করছ। বিজ্ঞানীরা বলেছেন চাঁদে মানুষ বাস করতে পারবে। মানুষ যেতে পারলে মাছও যেতে পারবে। তাছাড়া আমি তোমাদের জন্য পুকুর বানিয়ে রেখেছি।
‘সেই পুকুরে কি জোয়ার-ভাটা হয়?’ প্রশ্ন করলো পুঁটি। বুড়ি পড়লেন মহা মুছিবতে। চাঁদে হয়তো পুকুর খনন করা হয়েছে কিন্তু ওখানেতো নদী নেই যে জোয়ার-ভাটা হবে। তবে আলোচনার মাধ্যমে শেষ পর্যন্ত কিছু মাছ যেতে রাজি থাকলো, কিছু গেলো না। বুড়ি তালিকা করে রাখলেন। কায়ক্লেশে পা ফেলে এবার বনের সামনে দাঁড়ালেন।
‘অ্যাই যে বনবন্ধুরা। তোমাদের সাথে জরুরি কথা আছে।’
বুড়ির কণ্ঠ পেয়ে বনের মধ্যে সোড়গোল পড়ে গেলো।
ঘেউ ঘেউ।
হুক্কাহুয়া।
গর্জন।
কিচিরমিচির।
পাতার আড়াল থেকে হরিণ উঁকি দিল। বানর গাছের ডালে উঠে বসল। হাতি কান নেড়ে দাঁড়াল। বাঘ দূর থেকে তাকিয়ে রইল। পশুদের মধ্যে শিয়াল যেহেতু বুদ্ধিমান, তাই সবাই সিদ্ধান্ত নিল—শিয়ালই বুড়ির সঙ্গে কথা বলবে।
শিয়াল গলা খাঁকারি দিয়ে সামনে এসে বলল, হুক্কাহুয়া বুড়িমা, আপনার কী দরকার?
‘চাঁদের খাবার ফুরিয়েছে। মাছেদের সাথে কথা বলেছি। ওরা কেউ কেউ যাচ্ছে আমার সাথে। এবার দরকার মাংস।’
শিয়ালের মুখে চিন্তার রেখা, ‘চাঁদে বনমোরগ থাকলে অবশ্যই যাবো।’
কথাশুনে সবাই হেসে উঠলো। বুড়ি বলল, চাঁদেতো বনই নেই মোরগ পাবে কোথায়?
আড়মোড়া ভাঙলো বাঘ। ভারী গলায় বলে, রাতভর শিকার করে দিনে অন্তত আরামে আমার ঘুম চাই। গহিন বন না হলে ঘুম আসে না। পৃথিবীর একটা বন নিয়ে যেতে পারলে আমি যেতাম।
হাতি বললো, পৃথিবীর বনে কলাগাছ কমে গেছে। তাহলে আমি গিয়ে কি করবো।
সাতপাঁচ না ভেবেই সামনে লাফিয়ে এলো বানর। বলল, আমি যাব! আমি যাব! আমি যাব!
বানকে দেখে রাজি হয়ে গেলো শিয়াল। অবশ্য শর্ত জুড়ে দিলো, চাঁদের ক্যাশিয়ার বানালে আমি যাচ্ছি।
‘আচ্ছা।’ বুড়ির উত্তর।
বানর আর শেয়ালই নয় একে একে অন্যরাও রাজি হতে লাগলো। বুড়ি বুঝলো পশুদের মাঝে অদ্ভুদ প্রতিযোগীতা। কাজেই অল্পক্ষণে পশুদের তালিকা করে এবার পা ফেললেন, বাজারের দিকে। চাঁদের পাহাড়াদার হলেও কয়েকজন মানুষ চাই।
বাজার ছিল কিছুটা দূরে। মাঝখানে ফসলের ক্ষেত। যেতে যেতেই কথা হয় তৃণদের সাথে।
বুড়ি বলল, চাঁদের মাটি যথেষ্ট খড়খড়া। তোমরা যাবে নাকি সে মাটিতে প্রাণের সঞ্চার করতে?
তৃণ বলল, ওখানে সূর্যের তেজ কেমন? জলীয়বাষ্প কি বাতাসে ভাসে?
বুড়ি বলল, হুম—চাঁদে মানুষ বসতি গড়তে চাইছে।
কথা শুনে তৃণদলের মাথা নেতিয়ে গেল। হতাশ হয়ে বলল, পৃথিবীকে সবুজে আচ্ছাদিত করেছি আমরা। অথচ মানুষ আমাদের ধ্বংস করে দিচ্ছে। চাঁদেও যদি মানুষ যায় তাহলে আমাদের যাওয়া হচ্ছে না।
এবার মুখ খুললো ধানগাছ। বলল, বুড়িমা তুমিতো সবাইকে নিতে চাইছ—এত প্রাণ বাঁচাবে কি করে?
বুড়ি বলল, সবাইকে নয় যাদের ছাড়া চাঁদের সংসার চলবে না, শুধু তাদেরকে নিতে চাই।
‘তোমার তালিকায় তাহলে ধানগাছ রেখো না।’
‘তোমাদের ছাড়া চাঁদে মানুষ বাঁচবে কিভাবে?’
ধানগাছের মুখে হাসি। বলল, মানুষের ক্ষুধা মেটাতে আমাদের প্রয়োজন কিন্তু আমাদের বেঁচে থাকার জমিও যে মানুষ ধ্বংস করে দিচ্ছে সে কথা মনে আছে তোমার?
স্তম্ভিত হয়ে পড়লেন চাঁদের থুরথুরে বুড়ি। দম নিয়ে বললেন, চাঁকে বাঁচাতেই তোমাদের নিতে চাই। চাঁদে যদি ধান ফলাতে পারি তাহলে পৃথিবীর মাটি নষ্ট করবে না মানুষ।
ধানগাছের পাশে দাঁড়ানো শীর্ণকায় আগাছা বলল, চাঁদের জলবায়ু কেমন?
আলুগাছ বলল, মাটির উর্বরতা কেমন?
পাটগাছ বলল, অবারিত পানির স্রোত আছে?
আখগাছ বলল, আমার চাই মিষ্টি রোদ। আছেতো?
সবার প্রশ্নে ভরকে গেলেন বুড়ি। ধানগাছ আবার বললে, চাঁদে যদি সত্যিই মানুষ বসতি গড়ে, তাদের বলবেন যেন পৃথিবীকে ভুলে না যায়।
পৃথিবীকে আবার কেউ ভুলতে পারে? বুড়ির প্রশ্ন।
মানুষ সব পারে। ধান কেটে নেওয়ার পর ওরা আমাদের পুরো শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়। গরুর ওলান থেকে দুধ চুরি করে নিয়ে খায়। মনে নাই মানুষ জীবন বাঁচাতে গ্রাম ছেড়ে শহরে এসেছিল। তারপর তারা গ্রামটাকে ভুলে গেছে। সেখানেও শহর বানাতে শুরু করেছে। একদিন হয়তো চাঁদেও মানুষ বড় বড় ভববন তুলবে। আমাদের ধানগাছের তখন অস্তিত্ব থাকবে না।
বুড়ির মুখে উত্তর নেই। শুধু ধানক্ষেতের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
কিছুক্ষণ পর তিনি পা ফেললেন বাজারের পথে। বাজারে অনেক মানুষ কিলবিল করছিল। বুড়ি কাকে বলবে তা বুঝতে পারছিল না। কেউ হাতে লাঠি নিয়ে ঘুরছে, কারো ঠোটে বাঁশি। কেউ দোকানে খোশগল্পে মশগুল। বুড়ি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলো। গলা পরিষ্কার করে বললেন, আমি চাঁদের বুড়ি। তোমরা কেউ চাঁদেযেতে চাও?
একসাথে ঘাড় ফিরে তাকালো সবাই। বাজারে যেন বোমা ফুটলো। সবার চোখমুখ চকচক করে উঠলো।
চাঁদে?
সত্যি?
চাঁদে গিয়ে কী খাব?
থাকবো কোথায়?
বিদ্যুৎ আছে?
ইন্টারনেট?
মৃদু কণ্ঠে একজন জানতে চাইলো, বুড়ি মা চাঁদে বাইক চালানো যায়?
বুড়ি বললেন, না।
সঙ্গে সঙ্গে লোকটি জবাব দিলেন, আমার যাওয়া হচ্ছে না।
বুড়ির মাথায় হাত। কেউ রাজি হলো না যেতে। বুড়ি ভাবলো, নতুন কিছু করতে মানুষের চেয়ে প্রাণীক‚লইতো সাহসী।
শেষ পর্যন্ত মানুষ ছাড়াই চাঁদের বাজার বন্ধ করলেন বুড়ি। মুশকিল হলো আস্ত একটা বন, বাঘ, শিয়াল, হাতি, ধানক্ষেত, নদী-জলাশয় নিয়ে চাঁদে যাবেন কিভাবে? ডাকা হলো টিয়া পাখিকে। সে পারবে না, স্রেফ জনিয়ে দিলো।
তখন হেলে দুলে এসে দাঁড়ালো মাকড়সা। অভয় দিয়ে বলে, বুড়ি মা আমার কাছে সমাধান আছে।
সমবেত পশু-পাখিরা হো হো করে হাসলো। বলল, তুমি সারাক্ষণ দেয়ালে ঝুলে থাকো। তুমি এর সমাধান দিবে কি?
মাকড়সা বলে, বুড়িমা যদি সুতো দিয়ে একটা বিশাল জাল বোনে তাহলেই সবগুলোকে একসাথে চাঁদে নেওয়া সম্ভব।
সত্যিইতো, বুদ্ধিটা পছন্দ হলো সবার। রাজি হয়ে গেলেন চাঁদের বুড়িও। কিন্তু পৃথিবীতেতো বুড়ির সুতো তোলার চড়কা নেই। তাহলে উপায়?
টিয়া পাখির পিঠে চড়ে বুড়ি উড়াল দিলেন চাঁদে।
সুঁই ঢুকল—ফোঁড়!
সুঁই বের হলো—ফোঁড়!
সুতো গেল—ঝুঁই!
সুতো এল—ঝুঁই!
গান গাইতে গাইতে বুড়ি জাল বুনছেন। আগামী বর্ষার আগেই প্রাণের সঞ্চার করতে চান চাঁদে।