১
নিপাদের বাড়িতে আজ সবাই তীব্র আতংকের মধ্যে আছে। তীব্র আতংকের কারণ হলো তার বাবা মাহবুব সাহেব। মাহবুব সাহেব সকাল থেকে খেপে আছেন। উনি ক্ষেপে গেলে কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেলেন, ভাংচুর করেন এবং যাচ্ছে তাই গালাগালি করেন। তাদের বাড়ির পাশেই বড় রাস্তা। সে রাস্তায় রাতদিন চব্বিশ ঘন্টা লোকজন যাতায়াত করে। মাহবুব সাহেব যখন চেঁচামেচি করেন, তখন
বাড়ির সামনের রাস্তায় লোক জমে যায়। এসময়ে নিপা এবং তার মা দুজনেরই লজ্জার শেষ থাকে না।
আজ সকালে মাহবুব সাহেব ঘুম হতে উঠেই দেখলেন, বাসার কাজের ছেলেটা তার বিছানার পাশে চা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ ছেলেটাকে তিনি সহ্য করতে পারেন না। অমনি শুরু হয়ে গেলো তার চেঁচামেচি, গালিগালাজ। আজ এখন পর্যন্ত তিনি কোন কিছু ভাংচুর করেননি। আজ অবশ্য রাগের মাত্রা কিছুটা কম। রাগ বেশি হলে হাতের কাছে যা পান, তাই ছোঁড়াছুড়ি শুরু করেন।
এই মূহুর্তে পাশের রুমে নিপা আর তার মা জড়োসড়ো হয়ে খাটের উপর বসে আছে। মাহবুব সাহেব যখন ক্ষেপে যান, তখন এই দুজনের ঠিকানা এই খাট। নিপা ফিসফিস করে তার মাকে বলল,
আচ্ছা মা, পৃথিবীতে এত লোক থাকতে এই বদমেজাজি মানুষটাকে বিয়ে করেছিলে কেন?
চুপ কর, বেয়াদপ। নিজের বাবা সম্পর্কে কেউ এরকম বলে?
আমি খারাপ কি বলেছি? আমি শুধু জানতে চেয়েছি, তোমার বাবা মা কি ছেলের মেজাজ সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়নি?
নিয়েছিলো। তখন তোর বাবার সে কি মধুর ব্যবহার!
ও বুঝতে পেরেছি। তুমি, তোমার বাবা মা সবাই একযোগে ধোঁকা খেয়েছ।
আবার বাজে কথা বলছিস? থাপ্পড় খাবি। নীপা চুপ করে রইলো।
এসময় বাসার কলিং বেল বেজে উঠলো। কে যেন বাসায় এসেছে। কলিং বেল এর আওয়াজ শুনে নিপা বলল,
মা, তুমি যাও। তোমাকে যদি বাবা দেখেও, এখন যে অবস্থায় আছেন তার চেয়ে বেশী রাগ হবেন না। শত হলেও তুমি তার স্ত্রী।
তুই যা। দেখ দরজায় কে এসেছে। যাহ্ , দরজা খোল।
উপায় নাই দেখে নিপা নিজেই গেলো দরজা খুলতে।
দরজা খুলেই সে অবাক। দরজার সামনে দুজন পুলিশ দাঁড়িয়ে আছে। থতমত খেয়ে নিপা জিজ্ঞেস করলো,
আপনারা? কাকে চাচ্ছেন?
এই বাসা হতে চিৎকার শোনা যাচ্ছে। এখনো কেউ একজন চিৎকার করছে। কি হয়েছে, দেখতে এসেছি।
আপনাদেরকে তো আমরা খবর দেইনি।
না, আমরা এই রাস্তা ধরে টহল দিচ্ছিলাম। আমরা চিৎকার শুনে এসেছি।
আমার বাবা চিৎকার করছেন। উনি আজ ক্ষেপে গেছেন। উনি ক্ষেপে গেলে এরকম চিৎকার করতে থাকেন। গালিগালাজও করেন।
আমরা কি উনার সাথে দেখা করতে পারি?
কথাটা শুনেই নিপা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস বললো, আপনারা দেখা করবেন! কি বলছেন? আমরাই তো এখন বাবার ভয়ে বাবার সামনে যাচ্ছি না।
অসুবিধা নাই, আমরা শুধু উনাকে দেখে আসবো। আসলেই ক্ষেপে আছেন নাকি আপনারা বা কেউ উনার উপর কোন কিছু করেছে? উনার কন্ডিশনটা শুধু দেখে আসবো।
কথাটা শুনে নিপা ভীমড়ি খেলো। আচ্ছা, আসুন। বলে পুলিশ দুজনকে ঘরের ভেতর এনে মাহবুব সাহেবের রুমটা দেখিয়ে দিলো। পুলিশ দুজন মাহবুব সাহেবের রুমে ঢুকার সাথে সাথেই মাহবুব সাহেব একেবারে চুপ হয়ে গেলেন। পুলিশ দুজন তার সাথে কথা বলছেন। নিপা অবাক হয়ে দরজার বাইরে থেকে শুনল, তার বাবা খুব স্বাভাবিকভাবে পুলিশের সাথে কথা বলছেন এবং বাবা পুলিশ দুজনের সাথে কথা বলতে বলতে একফাঁকে চিৎকার করে ডাকলেন,
এই ফ্লোরা, ফ্লোরা। বাসায় মেহমান এসেছে। চা দাও উনাদের।
নিপা অবাক হয়ে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, যাও তোমার স্বামী এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছেন পুলিশ দেখেই। চা দিয়ে আসো মেহমানদের।
ফাজিল মেয়ে। বলে ফ্লোরা বেগম চা বানাতে গেলেন।
কিছুক্ষণ পর মা চা দিয়ে এসে নিপাকে বললেন,
কি আশ্চর্য। তোর বাবা তো দেখছি একদম নরমাল এখন। পুলিশের ঠেলা কাকে বলে, এখন বুঝুক।
এর মাঝে সপ্তাহ দুয়েক কেটে গেলো। মাহবুব সাহেব বাসায় আর রাগারাগি করলেন না। নিপা তার বাবার এ পরিবর্তন দেখে অবাক হয়ে গেলো। রাস্তায় বেরোলে মাঝে মাঝে ঐ দুই পুলিশের সাথে নিপার দেখা হয়। দুজনই এখন তাকে দেখলেই জিজ্ঞেস করে, আপনার বাবা এখন কেমন আছে?নিপাও বলে,
আপনারা কি করলেন যে, আপনারা যাবার পর থেকে বাবা আর রাগারাগি করছেন না।
২
সকালে কলেজে যাবার সময় রাস্তায় আজ ঐ দুইজন পুলিশের একজনের সাথে দেখা হয়ে গেলো। নিপা জিজ্ঞেস করলো,
আংকেল, আপনার সাথে ঐ আংকেল কই?
পুলিশ সদস্যটা মুখ কালো করে বললো,
উনার একটা সমস্যা হয়েছে।
কি হয়েছে?
সকাল বেলা ঘুম হতে উঠেই চেঁচামেচি করছেন। গালাগালি করে একাকার অবস্থা।
নিপা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলো,
আমার বাবার মতো অবস্থা হয়েছে?
হ্যাঁ। সব দোষ আপনার বাবার। গতকাল আমিও সেরকম করেছি। বাসায় খুব চিৎকার করেছি। দুটো গ্লাস ভেঙ্গেছি। রাগারাগি করেছি। আপনার বাবার কাছ হতেই শিখেছি।
কি বলছেন? আমার বাবা কখন শেখালেন আপনাদের?
সেদিন আপনার বাবার সাথে কথা বলতে গেলে উনিই ফিসিফিস করে আমাদের বলে দিয়েছেন এরকম করতে মাঝে মাঝে।
কেন? আমার বাবা এ কথা বলতে গেলেন কেন আপনাদের?
উনার বিয়ের পরই এক মুরুব্বি উনাকে এটি করতে বলে দিয়েছিলেন। এরপর হতে উনি এটি করে আসছেন।
এটি করে লাভটা কি?
এতে সারাজীবন বউ স্বামীর উপর চোটপাট করতে পারবে না। নিজে যেচে ঝগড়া করবে না। বরং রাগারাগি আর গালিগালাজের ভয়ে বউটা সিঁধিয়ে থাকবে।
ও আচ্ছা, তাহলে এই ব্যপার।
আমি কাল এরকম করার পর হতেই আমার বউ একদম ঠাণ্ডা হয়ে গেছে।
দেখলাম সিস্টেমটা ভালো কাজ করেছে। তাই কাল আমার ঐ কলিগকে বলেছি।
আজ ও সেটা ওর বাসায় সকাল হতেই শুরু করেছে। বলেই লোকটা হি হি করে হাসতে লাগলো।
নিপা কিছু না বলে খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর উল্টো ঘুরে বাসার দিকে রওনা হলো।
(গল্পটি আমার লেখা অপ্রাকৃত গল্পগ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছিল)