Article

কথার ভেতর কথা ২৫

October 7, 2026

26 views

ইভান: একটা জিনিস খেয়াল করেছ, এস্তেজা? এই দেশে ধীরে ধীরে এমন কোনো পেশা বাকি রাখা হয়নি— যেটাকে রাজনীতির ভেতরে টেনে আনা হয়নি।

এস্তেজা: হ্যাঁ। শিক্ষক, শিল্পী, অভিনেতা, খেলোয়াড়, চিকিৎসক, সাংবাদিক— যারা সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড হওয়ার কথা, তাদের সবাইকে একসময় না একসময় আওয়ামী সরকার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাজনীতির মাঠে নামিয়েছে।

ইভান: আর নামানোটা ছিল ভয়ংকর রকম পরিকল্পিত। কেউ স্বেচ্ছায় ঢুকলেও, অনেককে ঢুকতে বাধ্য করা হয়েছে— পদ, সুযোগ, নিরাপত্তা কিংবা ভয় দেখিয়ে।

এস্তেজা: সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর। একজন শিক্ষক যখন দলীয় পরিচয়ে পরিচিত হন, তখন আর তিনি নিরপেক্ষ জ্ঞানচর্চার মানুষ থাকেন না— তিনি হয়ে যান “আমাদের” কিংবা “ওদের”।

ইভান: ঠিক তাই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখো— শিক্ষক সমিতি মানেই রাজনৈতিক শাখা অফিস। গবেষণা, মেধা, যুক্তি— সবকিছুর ওপরে দলীয় আনুগত্য।

এস্তেজা: শিল্পী আর অভিনেতাদের ক্ষেত্রেও একই।একসময় তারা সমাজের আয়না ছিল। আজ তারা পোস্টারবয়, মঞ্চে তুলে দেওয়া হাততালি দেওয়া মুখ।

ইভান: খেলোয়াড়দের কী অবস্থা বলো তো! জাতীয় দলের জার্সি পরে যে মানুষটা সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার কথা, তাকেই ট্রাকে তুলে স্লোগান দেওয়ানো হলো।

এস্তেজা: আর চিকিৎসকরা? যাদের কাছে মানুষ জীবন নিয়ে যায়, তাদেরকেও দলীয় পরিচয়ে ভাগ করে ফেলা হলো। কেউ চিকিৎসা পায়, কেউ পায় না, কারণ পরিচয়টা ঠিক ছিল না।

ইভান: সাংবাদিকদের অবস্থা তো আরও ভয়াবহ। সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল— সবকিছুই হয়ে গেল রাজনৈতিক লড়াইয়ের অস্ত্র। সাংবাদিক মানে আর সত্যের অনুসন্ধানকারী না, সে এখন একজন পক্ষের সৈনিক।

এস্তেজা: এই যে সবাইকে রাজনীতির ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া— এর ফল কী হয়েছে জানো?

ইভান: বল।

এস্তেজা: রাজনীতি যেমন শুদ্ধ হয়নি, তেমনি শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিকিৎসা, সাংবাদিকতা— কোনোটাই আর পবিত্র থাকেনি।

ইভান: একটা দেশ তখনই ভেঙে পড়ে যখন তার প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে। আর এখানে সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে গিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করেছে।

এস্তেজা: কারণ শক্ত প্রতিষ্ঠান মানে প্রশ্ন। আর প্রশ্ন মানে জবাবদিহি। এই সরকার প্রশ্ন চায়নি, চেয়েছে আনুগত্য।

ইভান: সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার কী জানো? এখন অনেকেই ভাবছে— এইটাই নরমাল।

এস্তেজা: হ্যাঁ। একটা প্রজন্ম বড় হয়েছে দেখে—

  • শিক্ষক দল করে,

  • শিল্পী মিছিল করে,

  • সাংবাদিক পক্ষ নেয়,

  • খেলোয়াড় প্রচারণা চালায়।

ইভান: এরা জানেই না নিরপেক্ষতা কাকে বলে, নৈতিক দূরত্ব কাকে বলে।

এস্তেজা: এই কারণেই আজ দেশটা রক্তশূন্য।

  • শিক্ষক আছে, কিন্তু গুরু নেই।

  • শিল্পী আছে, কিন্তু বিবেক নেই।

  • সাংবাদিক আছে, কিন্তু সত্য নেই।

ইভান: আর এখন ফল ভোগ করছি সবাই। সমাজ ভেঙে পড়ছে, বিশ্বাস ভেঙে পড়ছে, আর মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।

এস্তেজা: একটা রাষ্ট্র টিকে থাকে তার প্রতিষ্ঠান দিয়ে, দল দিয়ে না।

ইভান: কিন্তু আমরা উল্টোটা করেছি। দল টিকিয়ে রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রটাই দুর্বল করে ফেলেছি।

এস্তেজা: এই ক্ষতি পূরণ হতে সময় লাগবে, ইভান। হয়তো অনেক সময়। কারণ প্রতিষ্ঠান ভাঙা সহজ, কিন্তু বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা কঠিন।

ইভান: তবু কথা বলা বন্ধ করা যাবে না। কারণ নীরবতাই ছিল এই সর্বনাশের সবচেয়ে বড় সহযোদ্ধা।

এস্তেজা: ঠিক বলেছ। এখন অন্তত এটুকু স্পষ্ট করে বলতে হবে—

সব পেশাকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানো কোনো উন্নয়ন না, এটা রাষ্ট্র ধ্বংসের নীরব কৌশল।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login