ইভান: একটা জিনিস খেয়াল করেছ, এস্তেজা? এই দেশে ধীরে ধীরে এমন কোনো পেশা বাকি রাখা হয়নি— যেটাকে রাজনীতির ভেতরে টেনে আনা হয়নি।
এস্তেজা: হ্যাঁ। শিক্ষক, শিল্পী, অভিনেতা, খেলোয়াড়, চিকিৎসক, সাংবাদিক— যারা সমাজের নৈতিক মেরুদণ্ড হওয়ার কথা, তাদের সবাইকে একসময় না একসময় আওয়ামী সরকার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে রাজনীতির মাঠে নামিয়েছে।
ইভান: আর নামানোটা ছিল ভয়ংকর রকম পরিকল্পিত। কেউ স্বেচ্ছায় ঢুকলেও, অনেককে ঢুকতে বাধ্য করা হয়েছে— পদ, সুযোগ, নিরাপত্তা কিংবা ভয় দেখিয়ে।
এস্তেজা: সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে প্রতিষ্ঠানগুলোর। একজন শিক্ষক যখন দলীয় পরিচয়ে পরিচিত হন, তখন আর তিনি নিরপেক্ষ জ্ঞানচর্চার মানুষ থাকেন না— তিনি হয়ে যান “আমাদের” কিংবা “ওদের”।
ইভান: ঠিক তাই। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দেখো— শিক্ষক সমিতি মানেই রাজনৈতিক শাখা অফিস। গবেষণা, মেধা, যুক্তি— সবকিছুর ওপরে দলীয় আনুগত্য।
এস্তেজা: শিল্পী আর অভিনেতাদের ক্ষেত্রেও একই।একসময় তারা সমাজের আয়না ছিল। আজ তারা পোস্টারবয়, মঞ্চে তুলে দেওয়া হাততালি দেওয়া মুখ।
ইভান: খেলোয়াড়দের কী অবস্থা বলো তো! জাতীয় দলের জার্সি পরে যে মানুষটা সব মানুষের প্রতিনিধিত্ব করার কথা, তাকেই ট্রাকে তুলে স্লোগান দেওয়ানো হলো।
এস্তেজা: আর চিকিৎসকরা? যাদের কাছে মানুষ জীবন নিয়ে যায়, তাদেরকেও দলীয় পরিচয়ে ভাগ করে ফেলা হলো। কেউ চিকিৎসা পায়, কেউ পায় না, কারণ পরিচয়টা ঠিক ছিল না।
ইভান: সাংবাদিকদের অবস্থা তো আরও ভয়াবহ। সংবাদপত্র, টিভি চ্যানেল— সবকিছুই হয়ে গেল রাজনৈতিক লড়াইয়ের অস্ত্র। সাংবাদিক মানে আর সত্যের অনুসন্ধানকারী না, সে এখন একজন পক্ষের সৈনিক।
এস্তেজা: এই যে সবাইকে রাজনীতির ভেতরে ঢুকিয়ে দেওয়া— এর ফল কী হয়েছে জানো?
ইভান: বল।
এস্তেজা: রাজনীতি যেমন শুদ্ধ হয়নি, তেমনি শিক্ষা, সংস্কৃতি, চিকিৎসা, সাংবাদিকতা— কোনোটাই আর পবিত্র থাকেনি।
ইভান: একটা দেশ তখনই ভেঙে পড়ে যখন তার প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে। আর এখানে সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে গিয়ে ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল করেছে।
এস্তেজা: কারণ শক্ত প্রতিষ্ঠান মানে প্রশ্ন। আর প্রশ্ন মানে জবাবদিহি। এই সরকার প্রশ্ন চায়নি, চেয়েছে আনুগত্য।
ইভান: সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার কী জানো? এখন অনেকেই ভাবছে— এইটাই নরমাল।
এস্তেজা: হ্যাঁ। একটা প্রজন্ম বড় হয়েছে দেখে—
শিক্ষক দল করে,
শিল্পী মিছিল করে,
সাংবাদিক পক্ষ নেয়,
খেলোয়াড় প্রচারণা চালায়।
ইভান: এরা জানেই না নিরপেক্ষতা কাকে বলে, নৈতিক দূরত্ব কাকে বলে।
এস্তেজা: এই কারণেই আজ দেশটা রক্তশূন্য।
শিক্ষক আছে, কিন্তু গুরু নেই।
শিল্পী আছে, কিন্তু বিবেক নেই।
সাংবাদিক আছে, কিন্তু সত্য নেই।
ইভান: আর এখন ফল ভোগ করছি সবাই। সমাজ ভেঙে পড়ছে, বিশ্বাস ভেঙে পড়ছে, আর মানুষ দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছে।
এস্তেজা: একটা রাষ্ট্র টিকে থাকে তার প্রতিষ্ঠান দিয়ে, দল দিয়ে না।
ইভান: কিন্তু আমরা উল্টোটা করেছি। দল টিকিয়ে রাখতে গিয়ে রাষ্ট্রটাই দুর্বল করে ফেলেছি।
এস্তেজা: এই ক্ষতি পূরণ হতে সময় লাগবে, ইভান। হয়তো অনেক সময়। কারণ প্রতিষ্ঠান ভাঙা সহজ, কিন্তু বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা কঠিন।
ইভান: তবু কথা বলা বন্ধ করা যাবে না। কারণ নীরবতাই ছিল এই সর্বনাশের সবচেয়ে বড় সহযোদ্ধা।
এস্তেজা: ঠিক বলেছ। এখন অন্তত এটুকু স্পষ্ট করে বলতে হবে—
সব পেশাকে রাজনীতির হাতিয়ার বানানো কোনো উন্নয়ন না, এটা রাষ্ট্র ধ্বংসের নীরব কৌশল।