শ্রাবণের এক থমথমে বিকেলে ঢাকা শহরের বাসাবোর তিন তলার স্যাঁতসেঁতে ঘরটায় বসে আকরাম সাহেব হঠাৎ আবিষ্কার করলেন, নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও আজকাল তার কানে শীতল শোনায়। ষাট ছুঁইছুঁই বয়স, একসময় কলকারখানার সরঞ্জাম বিক্রির ব্যস্ত ব্যবসা ছিল, অথচ আজ ঘরের কোণে জমে থাকা ধুলো ছাড়া তার আর কোনো সঙ্গী নেই। একটা সময় ছিল যখন এই মানুষটাই হাজারটা দরকারে সারা দিন ছুটাছুটি করতেন, ব্যস্ততার অজুহাতে নিজের ছায়াকেও সময় দিতে পারতেন না। কিন্তু এখন বয়স আর একাকীত্ব তাকে আষ্টেপৃষ্টে বেঁধে ফেলেছে, আর দিনগুলো কেটে যায় জানালার বাইরে ঝুলে থাকা বিষণ্ণ তারের সারির দিকে তাকিয়ে। স্ত্রী মারা গিয়েছেন এগার বছর হয়ে গেল। এক ছেলে, সেই যে লেখাপড়া করতে বিদেশ গেল, এঁর এলো না। সেখানেই বিয়ে থা করে থিতু হয়ে গেছে। মাস্যা এক দুবার ফোনে কথা হয় বটে, তবে সেটা নেহায়েত সামাজিকতা। এখন এই একাকীত্বে পুরো শহরটাকে তার মনে হয় যেন একটা বিরাট প্লাস্টিকের বয়াম, যার ভেতরে বিশুদ্ধ বাতাস নেই, কেবল ধোঁয়া, কোলাহল আর মানুষের যান্ত্রিক দৌড়াদৌড়ির একটা প্রতিধ্বনি।
একদিন সকালে উঠে তিনি আলমারি থেকে কয়েকটা খাদি জামাকাপড় গুটিয়ে নিলেন, যেন কোনো এক অদৃশ্য শক্তি তাকে অলক্ষ্যে থেকে ইশারা করছিল। মনের মধ্যে একটা অদ্ভুত ঝড় বইছে। সেটা ঠিক কীসের জন্যে তা তিনি ধরতে পারছেন না। তিনি জানতেন না সেখানে ঠিক কী অপেক্ষা করছে, তবে এটুকু জানতেন যে তাকে এই ইট-পাথরের বন্দিশালা ছেড়ে কোথাও অনেক দূরে যেতে হবে। বাসে উঠে তিনি চলে গেলেন ময়মনসিংহের সীমান্তবর্তী হালুয়াঘাটের দিকে, যেখানে ভারতের মেঘালয়ের পাহাড়গুলো অন্ধ ও রহস্যময় দৈত্যের মতো আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।
সীমান্তের কড়ইতলী বাজারের ছোট চায়ের দোকানে বসে তিনি দেখা পান স্থানীয় ইউপি মেম্বার ফজলুল হকের। এই লোকটি আকরাম সাহেবের পূর্ব পরিচিত। এই ফজলুল হকের বড় ভাই একসময় আকরাম সাহেবের কাছে ছিল। তার ব্যবসায় কর্মচারি হিসেবে ছিল। ফজলুল মেম্বারের চোখের কোণে এক অদ্ভুত হিসেবী হাসি ছিল, আর তার চামড়া রোদে পুড়ে তামাতে রূপ নিয়েছিল।
পাহাড়ের মানুষ তো আমরা না কাকা, ফজলুল মেম্বার বিড়ি টানতে টানতে বলেছিল, বিড়ির ধোঁয়াগুলো বাতাসের সাথে মিশে অদ্ভুত কোনো নকশা তৈরি করছিল, তবে হ, আপনের যদি একান্তই শহরের ঘিঞ্জি থিকা মন ওঠে যায়, তবে গাবড়াকুড়ির দিকে একডা খালি ঘর আছে। তবে বাড়িটা যার, সেইখানে এক অদ্ভুত লোক থাকে। একা থাকে, মানুষের গন্ধ পছন্দ করে না আবার সময় সময় মানুষ দেখলে হাইসা কথা কয়।
সেই ঘরটা ছিল টিলার একদম গা ঘেঁষে তৈরি, বাঁশ আর ভিজে মাটির গন্ধ মাখা। চারপাশটায় ঘন জঙ্গল, কড়ই আর শাল গাছের ডালপালা আকাশটাকে এমনভাবে আটকে রেখেছে যে দিনের বেলাতেও সেখানে গোধূলির আলোছায়া খেলা করে। আকরাম সাহেব যেদিন সেখানে গিয়ে উঠলেন, সেদিন বিকেলেই আকাশে সূর্য ডোবার বদলে একটা অচেনা বেগুনি আলোর আভা ছড়িয়ে পড়েছিল, যা দেখে মনে হচ্ছিল সময় যেন হঠাৎ দিক হারিয়ে ফেলেছে। সে আলোর দিকে তাকালে কেউই সে সময়টাকে বিকেল বলবে না। তাই বলে সেটিকে দুপুর বা সকালও বলবে না।
ঘরের দাওয়ায় বসে ছিলেন বিবাগী লোকটা, তার নাম রমেশ। বয়েসে আকরাম সাহেবের চেয়ে কিছুটা ছোট হলেও তার চোখে ছিল এক গভীর, বহু শতাব্দী পুরোনো ক্লান্তি। বছরখানেক আগে কুষ্টিয়ার লালনের আখড়া আর গড়াই নদীর পার ছেড়ে তিনি নাকি হুট করেই এখানে চলে এসেছিলেন, এই চলে আসার রহস্য কেউ কোনোদিন জানতে পারেনি। তারপর কীভাবে যেন এখানে এই মেঘালয়ের পাদদেশের নির্জনতায় এসে থাকা শুরু করলেন।
রমেশ আকরাম সাহেবের দিকে সরাসরি না তাকিয়েই মাটির পাত্রে তুলসী পাতা ভিজানো জল ঢালতে ঢালতে বললেন, আসবেন জানতাম। গত পরশু রাতে ভোগাইয়ের জলে একডা ছায়া দেখছিলাম, ওটা আপনারই ছায়া ছিল কাকা।
আকরাম সাহেব একটু চমকে উঠলেন, কারণ তিনি তো এখানে আগে আসেননি। ভোগাই নদীর নাম শুনেছেন তিনি। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে ছোট নদী। কী ভেবে তিনি বললেন,
আমাকে চিনতেন নাকি আগে? নাকি স্বপ্নে দেখেছেন? কীভাবে ছায়া দেখে ভাবলেন আমিই সেই লোক?
মানুষের চেনার কিছু নাই কাকা,
রমেশ এক গাল হাসল, যে হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না কিন্তু ঠোঁটের কোণে যেন এক রহস্যের আলো খেলে গেল। সে আরো বলল,
শহরের মানুষ গন্ধ নিয়া আসে। আপনার গা দিয়া এখনো পোড়া ইট আর পিচের গন্ধ বাইরায়, যে গন্ধ পাহাড়ের বাতাস সহ্য করতে পারে না।
গল্পের সুতোটা কিন্তু সেদিন বিকেল থেকেই সোজা পথে এগোয়নি। ঘটনাগুলো নদীর বাঁকের মতো একে একে যেন পেছনের দিকে আর ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করে।
যেমন ধরুন, সেই ঘটনার ঠিক তিন দিন পরের একটা রাতের কথা। আকরাম সাহেব তখন মাটির দাওয়ায় বসে রমেশের সাথে বসে বিড়ি টানছেন। গত তিনদিনে এ অভ্যাসটা রপ্ত করেছেন তিনি রমেশের কাছ থেকে। চারপাশের পাহাড়ি জঙ্গল তখন নিঝুম হয়ে এসেছে। রাত তিনটা। চারপাশ এত নীরব যে মনে হচ্ছিল পৃথিবীর সব আলো আর শব্দ কেউ এক বিশাল চটে বেঁধে পাহাড়ের ওপারে কোনো খাদে ফেলে দিয়ে এসেছে।
হঠাৎ আকরাম সাহেব লক্ষ্য করলেন, টিলার ধারের ঘন বাঁশঝাড়ের ভেতর দিয়ে চার-পাঁচটা ছোট ছোট আলোর গোলক হেঁটে যাচ্ছে। না, সেগুলো সাধারণ জোনাকি নয়, কারণ জোনাকির আলো এত স্থির, স্নিগ্ধ আর নীল হয় না। গোলকগুলো মাটির কোনো ছোঁয়া না পেয়ে শূন্যে ভেসে ভেসে একে অপরের সাথে এক অলৌকিক নাচে মেতে উঠেছে।
ওগুলো কী রমেশ? আকরাম সাহেব বিস্ময়ে ফিসফিস করে উঠেছিলেন, তার গলার আওয়াজ কেমন যেন পাতলা শোনালো।
রমেশ মাটির মাটির উনুনে আগুন দিতে দিতে ধীর ও গম্ভীর গলায় বলল, ওগুলা সময় কাকা। আমাদের ছেড়ে যাওয়া দিনগুলো, যেগুলো আমরা বাঁচাতে পারি নাই। কুষ্টিয়ায় থাকতে আমি গড়াই নদীর ওপর এসব আলো ভাসতে দেখতাম। এখানে এসে দেখি এরা পাহাড় থিকা কুয়াশার মতো নামে। সময় সবখানেই থাকে, কাকা।
সময় মানে? মানুষের অতীত জীবন? আকরাম সাহেব জিজ্ঞেস করলেন।
অতীত না, রমেশ মুখ তুলে তাকাল, তার চোখের মণি দুটো রাতের অন্ধকারে কোনো বুনো পশুর মতো স্থির। যে ভবিষ্যৎ আমরা কোনোদিন বাঁচতে পারি নাই, অথচ বাঁচতে চাইছিলাম; সেই ভবিষ্যৎগুলা আলো হয়ে ঘুরে বেড়ায়। ওই যে একটা আলো দেখছেন না একটু বেশি উজ্জ্বল আর নীল? ওটা হয়তো আপনার সেই জীবন, যেটা আপনি ওই ঢাকার ইট-কাঠের বোতলে না থাইকা অন্য কোথাও কাটাইতে পারতেন, কোনো পাহাড়ি নদীর তীরে।
আকরাম সাহেব চুপ করে রইলেন, তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ভারী হয়ে উঠল। তার মনে পড়ল ত্রিশ বছর আগের এক বৃষ্টিভেজা বিকালের বালিকার কথা, যার নাম ছিল নীলিমা, আর যার চোখের দিকে তাকিয়ে তিনি কোনোদিন নিজের ভালোবাসার কথা বলতে পারেননি। সেই না বলা কথা আর থমকে যাওয়া জীবন কি তবে আজ রাতে হালুয়াঘাটের এই অন্ধকার বাঁশঝাড়ে আলো হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে?
অথচ, এই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার ঠিক আগের দিন দুপুরেই আরেকটা ঘটনা ঘটেছিল, যা যুক্তির সব সীমানা ভেঙে দেয়।
তখন ঠিক দুপুর ১২টা। কিন্তু আকাশের রূপ হঠাৎ বদলে গিয়ে গাঢ় তামার মতো থমথমে রঙ ধারণ করল। পাহাড়ের গায়ে যে ঘন কুয়াশা জমত, সেটা নিচ থেকে ওপরের দিকে না উঠে ওপরের আকাশ থেকে অঝোর বৃষ্টির মতো ঝরে পড়ছিল। আকরাম সাহেবের তৃষ্ণা পেয়েছিল তখন। রমেশ এখানে একটা কূপ থেকেই পানি নেয়। সেটা রমেশ বানিয়েছে নাকি আগে থেকেই সেখানে ছিল, সেটি তিনি জিজ্ঞেস করেননি। কুয়ো থেকে পানি তুলতে গিয়ে দেখেন, বালতিতে কোনো পানি উঠছে না, বরং বালতির ভেতর থেকে আসছে এক অস্পষ্ট সুর, কাঁচের গ্লাসে কেউ যেন ভেজা আঙুল ঘষে ঘষে এক মায়াবী সুর বাজাচ্ছে।
রমেশ! কুয়োর ভেতরে এগুলো কী? তিনি আতঙ্কিত হয়ে ডেকে উঠেছিলেন।
রমেশ দৌড়ে এসে কুয়োর পাড়ে শক্ত করে ধরেছিল আকরাম সাহেবের কাঁধ। আজ পানি তুলবেন না কাকা, একদম ছুঁবেন না। আজ পাহাড় উল্টা শ্বাস নিচ্ছে।
পাহাড় উল্টো শ্বাস নিচ্ছে মানে? এসব কী বলছ তুমি?
পাহাড়ের মেজাজ আজ ভালো নাই, রমেশ বিষণ্ণ মুখে বলল। এই যে সীমান্ত দেখছেন, এই সীমান্তে শুধু দুইটা দেশ আলাদা হয় নাই কাকা। এখানে পৃথিবীর দুইটা পিঠ জোড়া লাগানো। আমরা যে পাশে আছি, সেটা চেনা রূপ, রোদ্দুর আর মাটির রূপ। আর ওই কুয়াশার ওপারে যা আছে, তা মানুষ চেনে না। মাঝে মাঝে সীমান্তটা পাতলা হয়ে গেলে দুই পাশ এক হয়ে যায়।
কথাটা শেষ হতেই আকরাম সাহেব সাহসে ভর দিয়ে কুয়োর ভেতরে উঁকি দিলেন, আর তার বুকের রক্ত হিম হয়ে গেল। কুয়োর ভেতরে জল নয়, দেখা যাচ্ছে এক বিশাল ও অচেনা শহর। সেখানে উঁচু উঁচু দালানভাঙা অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু কোনো মানুষের চিহ্ন নেই; বড় বড় অশ্বত্থ গাছ ঘরের ছাদ ফুঁড়ে উঠে গেছে, আর সেই শূন্য শহরের তামাটে আকাশে তিনটে চাঁদ একসাথে জ্বলছে। তিনি আঁতকে উঠে পিছিয়ে গেলেন, নিজের চোখকেও যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
রমেশ শান্তভাবে কুয়োর উপরে একটা বাঁশের বেড়া এনে বন্ধ করে দিল। বলল,
কুষ্টিয়ায় যখন ছিলাম, নদী ভাঙনের রাতে জলের নিচে অমুক শহর আর ঘরবাড়ি দেখতাম। আমরা ভাবি আমরা এক জায়গায় স্থির আছি, আসলে আমরা একই সাথে হাজারটা জায়গায় আর হাজারটা সময়ে থাকি। কেবল চোখ দিয়ে আমরা একটা রূপই দেখতে পাই।
ঘটনাগুলো এভাবে কোনো বাঁধাধরা নিয়ম না মেনে খণ্ড খণ্ড হয়ে জমা হচ্ছিল আকরাম সাহেবের মনে। কোনো অতীত নেই, কোনো ভবিষ্যৎ নেই, সব যেন এক পরম অলৌকিক বর্তমান মুহূর্তে এসে থমকে গেছে।
আরেক রাতে দুজনে বসেছিলেন টিলার পেছনের পুরোনো একটা ঝাউগাছের তলায়, যেখানে বাতাসের শিশির ছোঁ মেরে যাচ্ছিল তাদের শরীরে। বাতাসে এক অজানা বুনো ফুলের তীব্র গন্ধ ভেসে আসছিল। ভারতে সীমান্ত পাহারা দেওয়া বিএসএফের শক্তিশালী লাইট মাঝে মাঝে পাহাড়ি জঙ্গলের ওপর দিয়ে ঘুরে যাচ্ছিল, কিন্তু সেই আলো যেন এই মাটির ঘর আর তাদের দুজনকে কোনোভাবেই স্পর্শ করতে পারছিল না। মনে হচ্ছিল এক পরম অদৃশ্য দেয়াল দিয়ে রমেশ এই জায়গাটাকে বাইরের পুরো বিশ্ব থেকে আলাদা করে রেখেছে।
রমেশ, তুমি কুষ্টিয়ার জীবনটা আসলে ছাড়লে কেন? সেখানে তো বাউলদের আখড়া ছিল, গান ছিল, আকরাম সাহেব প্রশ্ন করলেন।
রমেশ বিড়িতে টান দিল, বিঁড়ির লালচে আগুনের আলোয় তার মুখটা ক্ষণিকের জন্য ভীষণ প্রাচীন ও রহস্যময় দেখালো।
ছাড়া কি সহজ কাকা? ছাড়তে হয় নাই, জায়গাটাই আমাকে ঠেলে বের করে দিল। একদিন সকালে গড়াই নদীতে নাইতে হঠাৎ দেখি, আমার ছায়াটা নদী থেকে আমার সাথে ডাঙায় উঠছে না। সে নদীর ভেতরেই আমার দিকে হাত নাড়িয়ে রয়ে গেল।
আকরাম সাহেব চোখ বড় বড় করে রমেশের দিকে তাকালেন, তার মনে হলো রমেশ হয়তো কোনো রূপকথা শোনাচ্ছে।
বিশ্বাস হচ্ছে না তো? ছায়া ছাড়া মানুষ কেমনে হাঁটে, তা-ই ভাবছেন? এই পাহাড়ে আসার পর ওই যে প্রতিদিন সন্ধ্যায় একটা কালো হরিণ টিলার ওপর এসে দাঁড়িয়ে থাকে, খেয়াল করছেন? রমেশ রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল।
আকরাম সাহেবের হঠাৎ মনে পড়ল, সত্যিই তো! গত কয়েক দিন ধরে তিনি লক্ষ্য করেছেন, সূর্যাস্তের ঠিক পর মুহূর্তেই টিলার ওপর এক বিশাল কৃষ্ণসার হরিণ এসে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকে, যার চোখ দুটো মানুষের মতো ব্যাকুল আর তৃষ্ণার্ত।
ওটাই আমার সেই হারিয়ে যাওয়া ছায়া, রমেশ ফিসফিস করে বলল। ও কুষ্টিয়ার নদী থিকা সাঁতরাইয়া, গ্রাম-শহর আর পাহাড় ডিঙাইয়া এইখানে চইলা আইছে। ও এখন আমার সাথে থেকেও মুক্ত।
আকরাম সাহেবের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। তিনি খেয়াল করলেন, কুপি বাতির আলো পাশে জ্বললেও মাটির মেঝেতে রমেশের বসার কোনো ছায়া পড়েনি।
তুমি আসলে কে? তুমি কি মানুষ না অন্য কিছু রমেশ? আকরাম সাহেব থরথর করে কাঁপতে থাকা গলায় বিড়বিড় করলেন।
মানুষ আর অমানুষের তফাত খুব সামান্য কাকা। ঢাকার কোলাহলে যারা ভাবতাছে তারা খুব স্বাভাবিক জীবনে আছে, তারা আসলে সবচেয়ে বড় ঘোরের মধ্যে আছে। তারা ভাবতাছে যা দেখা যায় তাই সত্য। অথচ আসল সত্য জিনিসটা লুকাইয়া থাকে ছায়ায়, মাটির গন্ধে আর বাতাসের বাঁশিতে।
রমেশ আকাশের দিকে তাকাল, যেখানে ছায়াপথটা নদীর মতো দেখাচ্ছিল। আকরাম সাহেবের এই প্রথম মনে হলো, এখানে আসাটা ঠিক হয়নি। তবু কী মনে করে ভাবলেন, রমেশকে আরো জানতে হবে। তার সম্পর্কে না জানলে মনের ভেতর সারাজীবন একটা কাঁটা রয়ে যাবে। ।
সাতদিন পরের একটা ঘটনা। সেদিন সকালে আকরাম সাহেব ঘুম থেকে উঠে দেখেন রমেশ ঘরে নেই, উনুনটাও ঠান্ডা। মাটির দাওয়ায় একটা পুরোনো কাঁসার থালায় কিছু পাহাড়ি বুনো ফল আর এক ঘটি বরফের মতো ঠান্ডা জল রাখা। আকরাম সাহেব মাথাটা কেমন যেন হালকা লাগছে অনুভব করে ঘর থেকে বের হয়ে টিলার দিকে হাঁটতে লাগলেন।
হাঁটতে হাঁটতে তিনি হঠাৎ লক্ষ্য করলেন, তার পায়ের নিচের ভিজে মাটি কেমন যেন নরম আর তুলতুলে, যেন তিনি কোনো মেঘের ওপর দিয়ে হাঁটছেন। মাটিতে দুইবার পা ঠুকলেন। কোনো শব্দ হলো না। চারপাশের গাছগুলোর পাতা প্রচণ্ড বাতাসে এলোমেলো দুলছে, কিন্তু কোনো পাতার মড়মড় বা বাতাসের হু-হু শব্দ নেই, সব যেন মূক চলচ্চিত্রের মতো।
হাঁটতে হাঁটতে তিনি সীমান্তে ভারতের কাঁটাতারের কাছাকাছি চলে এলেন। সেখানে একটা পুরোনো বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল ফজলুল মেম্বার, তার হাতে একটা ছেঁড়া খাতা।
আরে আকরাম কাকা! সকাল সকাল এইদিকে কই যান? মেম্বার ডেকে উঠল। কিন্তু তার গলার আওয়াজ আসছিল যেন অনেক দূর থেকে, কোন গভীর শুকনো অন্ধকূপের ভেতর থেকে ভেসে আসা বোবা আওয়াজ।
মেম্বার সাহেব, রমেশ কই? ওনাকে সকালে ঘরে দেখলাম না তো, আকরাম সাহেব হাঁপাতে হাঁপাতে জিজ্ঞেস করলেন।
ফজলুল মেম্বার তার দিকে তাকিয়ে এক অদ্ভুত, করুন চোখে হাসল। রমেশ? কোন রমেশ কাকা? কুষ্টিয়া থিকা এক বাউল লোক আইছিল বটে, তবে সে তো এই পাহাড়ে হারিয়ে গেছে পাঁচ বছর আগে! নদী পার হইতে গিয়া তলাইয়া গেছিল।
আকরাম সাহেবের মাথায় যেন একটা প্রচণ্ড বাজ পড়ল। বলেন কী আপনি! আমি তো গত দশ দিন ধরে ওনার ওই মাটির ঘরেই আছি! ওর সাথেই রোজ রাতে খাই, তামাক টানি, কথা বলি! আমাকে তো তার কাছে আপনিই পাঠিয়েছিলেন।
মেম্বার খাতাটা বন্ধ করে পকেটে পুরল আর ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। আপনে কার সাথে আছেন কাকা? গাবড়াকুড়ির ওই টিলায় তো কোনো বাড়িই আছিল না কোনোদিন। পাঁচ বছর আগে ঝড় হওয়ার পর থিকা ওই জায়গা পুরো খালি। আপনে প্রতিদিন কার লগে কথা কন? আমি কেন পাঠামু আপনেরে? আপনের সাথে আমার দেখাই হয় নাই। আপনে এইখানে কবে আইলেন?
আকরাম সাহেবের মাথার ভেতরে যেন শত শত কাঁচের পাত্র একসাথে ভেঙে চৌচির হয়ে গেল। এক তীব্র ভীতি আর শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। তিনি নিজের সব শক্তি দিয়ে পেছনের দিকে দৌড়াতে লাগলেন। কিন্তু দৌড়াতে দৌড়াতে তিনি আবার এক অবিশ্বাস্য, অলৌকিক ঘোরের মুখোমুখি হলেন।
ঘোরটা কাটতেই তিনি দেখলেন, তিনি কোনো পাহাড়ি টিলায় দৌড়াচ্ছেন না। তিনি বসে আছেন ঢাকার বাসাবোর সেই তিন তলার ছোট ঘরে, যেখানে দেওয়াল জুড়ে স্যাঁতসেঁতে ছাতা ধরে আছে। তার সামনের কাঠের টেবিলে চায়ের কাপ থেকে হালকা ধোঁয়া উঠছে, আর বাইরে ঢাকার প্রচণ্ড জ্যাম, গাড়ির হর্ন আর ফেরিওয়ালার কর্কশ হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে।
তাহলে কি ময়মনসিংহ? সেই সীমান্ত? মেঘালয়ের পাহাড় আর রমেশ... সব কি তবে আমার একাকী মস্তিষ্কের কল্পনা? তিনি নিজের দুই হাতের দিকে তাকালেন, হাত দুটো বয়সের ভারে থরথর করে কাঁপছে।
কিন্তু পর মুহূর্তেই, তিনি নিজের হাতের তালুর দিকে তাকিয়ে স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তার হাতের তালুতে লেগে আছে ভেজা লাল পাহাড়ি মাটি, আর একটা তাজা তুলসী পাতা। আর ঘরের বিষণ্ণ কোণ থেকে ভেসে আসছে ভেজা মাটির তীব্র গন্ধ আর পাহাড়ি ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে সুর।
ঠিক সেসময়েই হঠাৎ ঘরের কাঠের দরজাটা নিজে থেকেই ধীরে ধীরে খুলে গেল। দরজার চৌকাঠের বাইরে তখন আর বাসাবোর গলি বা নোংরা সিঁড়ির ঘর দেখা যাচ্ছিল না; সেখানে ঘন হয়ে জমে আছে রাতের শান্ত পাহাড়ি কুয়াশা। সেই ধোঁয়াটে কুয়াশার স্তর ভেদ করে রমেশ কুপি বাতি হাতে অতি শান্ত পায়ে ভেতরে হেঁটে এলো। তার পায়ে কোনো জুতো নেই, ভেজা মাটির গন্ধমাখা খালি পা। হাতের পিতলের কুপিটায় জ্বলতে থাকা ছোট্ট শিখাটা বাতাস না থাকা সত্ত্বেও অদ্ভুতভাবে এক পাশে হেলে জ্বলছে, যেন তা অন্য কোনো অদৃশ্য দিগন্তের দিক নির্দেশ করছে।
কাকা, কোথায় আর দৌড়াবেন? কিসের থেকে পালাবেন? এই ঢাকা আর ওই হালুয়াঘাট, আপনার ফেলে আসা অতীত আর অচেনা ভবিষ্যৎ; সবই তো একই ঘরের বিভিন্ন কোণ মাত্র। আপনি বাসাবোর এই স্যাঁতসেঁতে ঘরে বসে থেকেও ওই মেঘালয়ের শেষ পাহাড়ে হারিয়ে যেতে পারেন, আবার ওই পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে থেকেও এই চারদেয়ালের নির্জন একাকীত্বে আটকে থাকতে পারেন। স্থান আর সময় বলে আসলে আলাদা কিছু নাই কাকা, এগুলো সব মানুষের বানিয়ে নেওয়া মনের মায়া আর ছায়াবাজি।
রমেশের গলা ছিল গভীর, যা ঝড়ের শেষে থমে যাওয়া বাতাসের মতো শোনায়।
আকরাম সাহেব ধীর পায়ে পাশের কালচে হয়ে যাওয়া পুরনো চেয়ারটায় বসে পড়লেন। তার মনে হলো, চোখের সামনে থেকে বাসাবোর ঘরের চারপাশের শক্ত ইট-পাথরের দেয়ালগুলো আস্তে আস্তে ধোঁয়ার মতো পাতলা হয়ে গলে মিলিয়ে যাচ্ছে। স্যাঁতসেঁতে ছাতা ধরা সিলিংটা সরে গিয়ে সেখানে ফুটে উঠেছে হালুয়াঘাটের ওপর ঝুলে থাকা মেঘালয়ের সেই তারায় ভরা বিশাল, অনন্ত আকাশ। তিনি চারপাশটাতে আরো গভীর ভাবে তাকালেন। চারপাশ থেকে ভেসে আসছে বাঁশঝাড়ের পাতার খসখস শব্দ, ভেজা মাটির চিরন্তন সুবাস আর দূর পাহাড় থেকে বয়ে আসা হিমেল হাওয়া। আর ঘরের ঠিক যে কোণটায় অন্ধকার সবচেয়ে ঘন, সেই আলো-ছায়ার সীমানায় মাথা উঁচু করে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে সেই অলৌকিক কৃষ্ণসার হরিণটা। হরিণটির গভীর, কালো দুটি চোখে কোনো ভয় নেই, সেখানে খেলা করছে বহু পুরোনো এক চেনা ব্যাকুলতা আর এক অপার নীরবতার আশ্রয়। ঘাড় ফিরিয়ে একবার রমেশের দিকে তাকালেন। যেন তিনি জানতেন, তাই অবাক হলেন না। রমেশ একটু আগেও এখানে ছিল, এখন নেই।
তিনি কি সত্যি এখনও বাসাবোর সেই নির্জন ঘরে বসে আছেন, নাকি ময়মনসিংহের সীমান্ত ঘেঁষা কোনো এক অদেখা, কাল্পনিক পাহাড়ে বিলীন হয়ে গেছেন? না কি তিনি কুষ্টিয়ার গড়াই নদীর ঠান্ডা জলে হারিয়ে যাওয়া রমেশের সেই বহুবছরের পুরোনো ছায়ার ভেতরেই চিরকালের জন্য আশ্রয় খুঁজে পেয়েছেন? আকরাম সাহেব আর কোনো হিসাব মেলাতে চাইলেন না। প্রশ্নের সব উত্তর খোঁজার তাড়না ছেড়ে দিয়ে তিনি ধীরে ধীরে চোখ বুজলেন। তার কান থেকে ঢাকার সমস্ত যান্ত্রিক কোলাহল, গাড়ির বিকট হর্ন আর একাকীত্বের বোবা হাহাকার এক নিমেষে মিলিয়ে গেল। রয়ে গেল কেবল সীমান্ত পেরিয়ে ভেসে আসা পাহাড়ি বাতাসের এক সুগভীর, অলৌকিক সুর; যা এই অনন্ত মহাকালের মাঝে তাকে আর কোনোদিন একা হতে দেবে না।
Comments
First reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.
-
-
protivu publications 6 days ago
একটা ইস্যু মাথা থেকে যাচ্ছেই না। পুরো ঘটনা হ্যালুসিনেশন নাকি স্বপ্ন? আকরাম সাহেব কি পাহাড়ে যাননি? না গেলে শেষে রমেশকে চিনলেন কী করে? নাকি শেষ অংশটুকুও হ্যালুসিনেশন! আপনি ভালো লিখেছেন, কিন্তু মাথায় প্রশ্নগুলো থেকেই গেল।
-
Eponon Bd
6 days ago
আশ্চর্য রহস্যময়তা নিয়ে এনেছেন আপনার এ গল্পে। ভালো লিখেছেন। শুভেচ্ছা রইল।
-
protivu publications 6 days ago
দারুণ লিখেছেন। ভালো লাগল। শুভেচ্ছা রইল।
-
sayed mahmud 6 days ago
ভালো লিখেছেন। গল্পটির কাহিনির আংগিক ভিন্ন মাত্রার। ভালো লাগলো।
-
R Masud 6 days ago
আশ্চর্য রহস্যময়তা এবং একজন মানুষের একাকীত্ব, দারুণ লিখেছেন।
-
shoyeb 6 days ago
গল্পটি ভালো লেগেছে। পাহাড়ের রহস্যময়তা, রমেশ এর সাথে সংলাপ, দুটোই দারুন লাগল।
-
probash khobor 6 days ago
গল্পে সীমান্ত, ছায়াহীন মানুষ আর শহরের একাকীত্বের দুর্দান্ত দৃশ্য, আকরাম সাহেবের একাকীত্ব; শেষ পর্যন্ত পাঠককে বাস্তবতা আর কল্পনার দ্বিধায় দাঁড় করিয়ে দিল। ভালো লিখেছেন। @borhan_mahmud দারুণ হয়েছে গল্পটি।
-
robin ahmed 6 days ago
অতুলনীয় বর্ণনা ও সংলাপের সূক্ষ্ম জালে বোনা এক রহস্যময় গল্প, যা শেষ হওয়ার পরও মনে অদ্ভুত রেশ রেখে গেল। দারুণ লিখেছেন। গল্পের প্লটটা ভালো লেগেছে।
-
mamun abdulla 6 days ago
ঢাকার একাকীত্ব থেকে মেঘালয়ের অলৌকিক পাহাড়ে পলায়ন, গল্পের প্রতিটি বাক্যে এক অপার্থিব ও গভীর জীবনের দর্শন ফুটে উঠেছে। আকরাম সাহেব এবং রমেশ দুজনের চরিত্রই দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। ভালো লেগেছে গল্পটি।
-
মানুষ-অমানুষের তফাৎ খুব কম। রমেশের চরিত্রটা মিস্টিক এবং আকরাম সাহেবের ভাবনা, অভিজ্ঞতা আমাদেরকে অন্য ভুবন দেখাল। সময়ের বুনন এবং রহস্যময় পাহাড়ি পারিপার্শ্বিকতা গল্পটিকে গভীর এক মনস্তাত্ত্বিক রূপ দিয়েছে। ভালো লিখেছেন।