“আমরা কি সত্যিই খাবার খাচ্ছি… নাকি ধীরে ধীরে বিষ খেয়ে বেঁচে আছি?”
ইভান:
তুমি খবর দেখেছ? নেসলের কিটক্যাট আর মেঘনা গ্রুপের ‘ফ্রেশ’ চিনিতে সালফার ডাই অক্সাইড পাওয়া গেছে। আদালত গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছে।
আশ্চর্য হচ্ছি না—কারণ মনে মনে জানতাম, এটাই তো স্বাভাবিক। বাংলাদেশে ব্র্যান্ড মানে "প্যাকেট", ভেতরে কি আছে কেউ জানে না।
এস্তেজা:
হ্যা, রিপোর্টটা দেখলাম। কিন্তু আমার প্রশ্ন—
এটা কি শুধু এই দুটো কোম্পানির সমস্যা?
না পুরো সাপ্লাই চেইনই পচে গেছে?
কারণ তুমি চাইলে আজই অন্যসব চিনি ব্র্যান্ড পরীক্ষা করো, গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি—সলফার ডাই অক্সাইড, artificial whitening agent, এমনকি অ্যান্টি–মোল্ড কেমিক্যালও বের হবে।
ইভান:
অদ্ভুত ব্যাপার হলো—
মান পরীক্ষাতেই যত গন্ডগোল ধরা পড়ে, নিরাপত্তা পরীক্ষা করলে তো দেশটাই অবাক হয়ে পড়বে!
আর ভেজাল শুধু ফ্যাক্টরিতে নয়—
রাস্তার পাশে দেখি ভ্যানওয়ালা নালার পানি দিয়ে শাক ধুচ্ছে।
ভাল লাগল? না।
রাগ লাগল? না।
আমরা তো অভ্যস্ত।
এস্তেজা:
আর শীত মানে গুড়ের মৌসুম।
কিন্তু আসল আখের রস তো এখন বিলাসিতা।
তার বদলে রঙ, ঘনকারক, কেমিক্যাল—যা দিয়ে সুন্দর দেখানো গুড় বানানো হয়।
তারপর দুধ—
রাস্তার পাশে জার ভরে “ফরমালিন-মুক্ত দুধ” লিখে রাখে। কিন্তু ল্যাবে পাঠালে দেখা যায় স্কিম পাউডার + ফ্যাট + কেমিক্যাল মিক্স।
একটা জাতি পুরো কেমিক্যালে ডুবে আছে।
ইভান:
এটা শুধু খাবারের সমস্যা নয়। পানির কথাই ধরো— ঢাকা ওয়াসার পানিতে PFAS, কীটনাশকের রেসিডিউ, এমনকি ফার্মাসিউটিক্যাল ড্রাগও পাওয়া গেছে।
বিশ্বে PFAS কে বলে "forever chemical"—
শরীর থেকে বের হয় না, ক্যান্সার থেকে হরমোন সমস্যা সবকিছু করে।
কিন্তু রিসার্চটা যখন প্রকাশ হলো, তখনই ওয়াসার কর্মকর্তারা অনুরোধ করল—
“এটা যেন প্রকাশ না হয়।” কি চমৎকার!! মাথার কাছে বিষের বোতল ধরে বলছে— “দয়া করে কাউকে বলবেন না।”
এস্তেজা:
আরো ভয়ংকর তথ্য আছে—
চা পাতায় রেডিও–এক্টিভ এলিমেন্ট: ইউরেনিয়াম, থোরিয়াম, রেডিয়াম পাওয়া গেছে। এগুলো সাধারণত মাটির খনিজ, কিন্তু এতো মাত্রায় পাওয়া মানেই অতিরিক্ত সার, কীটনাশক, অথবা দূষিত মাটি ব্যবহার।
কিন্তু সরকার নড়ল? কোনো ব্র্যান্ড রিকল হলো? কোনো জরিমানা?
—কিছুই না।
ইভান:
সয়াবিন তেলের কথা শুনো—
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে প্রকাশিত রিসার্চে দেখা গেছে— বেশিরভাগ সয়াবিন তেলে অনুমোদিত মাত্রার চেয়ে বহুগুণ বেশি heavy metal আছে। কপার, লেড, নিকেল, আর্সেনিক—যা কিডনি–লিভারে ধীরে ধীরে আঘাত করে।
কিন্তু বাজারে কি কোনো ব্র্যান্ড তুলে নেওয়া হলো? না। কারণ এখানে খাবার মানে "ব্যবসা", মানুষের জীবন নয়।
এস্তেজা:
মুরগি, ডিম, মাছ—এগুলো নিয়ে তো অসংখ্য রিসার্চ হয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক রেসিডিউ, ফরমালিন, হরমোন—সবই পাওয়া গেছে।
কিন্তু ফুড সেইফটি অথরিটি কি করছে?
বছরভর সেমিনার–সিম্পোজিয়াম:
—চিনির আয়োডিন
—তেলে ভিটামিন–এ
—টেবিল সাজানোর নিয়ম
—সচেতনতামূলক পোস্টার
দেশে যখন বিষ ঢুকে যাচ্ছে প্রতিদিনের খাবারে, তখন তারা ব্যস্ত "ভিটামিন–এ ফোর্টিফিকেশন ডে" পালন করতে।
ইভান:
মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হয়— এটা কোনো দেশ না, এক বিশাল এক্সপেরিমেন্ট ল্যাব। যেখানে মানুষকে পরীক্ষা করা হয়— "কতদিনে বিষ খেয়ে মারা যায়?"
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার— মানুষ এখন আর প্রতিবাদও করে না। যেন মেনে নিয়েছে— "বাংলাদেশে ভালো কিছু পাওয়া যায় না।"
এস্তেজা:
আসলে আমাদের সমস্যাটা টেকনিক্যাল না, ক্যালচারাল। অনেক দেশে খাবারের মান নিয়ে এক ড্রপও সন্দেহ হলে পণ্য–রিকল হয়, কোটি কোটি ডলার জরিমানা হয়, কোম্পানি দেউলিয়া হয়ে যায়। আমাদের দেশে?
"চলে না?"
"এইটাই খাইতো।"
"কিছু হবে না।"
এই মানসিকতা সমাজকে ধ্বংস করছে।
ইভান:
এক কথায়— আমরা খাবারে বিষ, পানিতে দূষণ, বাজারে কেমিক্যাল—সবকিছুকে "স্বাভাবিক" করে ফেলেছি। এবং সবচেয়ে দুঃখের বিষয়— এটা নিয়ে কারো মাথা ব্যথা নেই।
এস্তেজা:
এটাই সবচেয়ে বড় মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি। এক জাতি যখন অন্যায়কে অন্যায় বলে মনে করাই বন্ধ করে দেয়, তখন তার অগ্রগতি থেমে যায়।
আমাদের সোনার বাংলাদেশ— হয়তো স্বপ্নের দেশ হওয়ার কথা ছিল… কিন্তু এখন মনে হয়—
একটা বিশাল কেমিক্যাল ল্যাব, যার পরীক্ষার পশু—আমরাই।
Comments
Be this story’s first reader
+35 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.