Kids

মৌরি

October 8, 2026

77 views

আজকের দিনটা আর দশটা দিন থেকে আলাদা। আজ হয়তো দীর্ঘক্ষণ মায়ের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। এমনকি ক্ষুধাও লাগতে পারে। তবুও এরকম দিনগুলো মৌরির ভালো লাগে।

আমাদের গল্পের ভাবুক ও কৌতুহলী মৌরি বুনোফুল কিন্ডারগার্টেনের কেজি ক্লাসের শিক্ষার্থী। অনিবার্য কারণে আজ তার শেষ পিরিয়ডে ক্লাস নেই। সকল অভিভাবকের কাছে তাই ‘সময়ের আগে ছুটির নোটিস’ পৌঁছে গেছে।

প্রায় আধা ঘণ্টা হলো স্কুলগেটে দাঁড়িয়ে আছে সে। এক এক করে সব বন্ধুরা চলে যাচ্ছে। শুধু তার ক্লাসের দুটো ছেলে স্লিপারে খেলছে। বড়দের ছুটি দেরিতে। তাই স্কুলের ছোট্ট উঠানে আপাতত দারোয়ান মামা সহ তারা চারজন।

গেটের ফুটোতে চোখ রেখে সে অনেকক্ষণ ধরে মনোযোগ দিয়ে আইসক্রিমওয়ালাকে দেখছে। আজকে খুবই লেমন ললিপপ খেতে ইচ্ছে করছে তার। ‘মা আসতে আসতে যদি না থাকে লোকটা, তাহলে?’ আপাতত এইসব ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে তার মাথায়।

দারোয়ান মামা ভেতরে ছায়ায় বসতে বলেন মৌরিকে। সে গেট থেকে সরে গিয়ে একতলার বারান্দার সিঁড়িতে বসে। তারপর ব্যাগ খুলে টিফিন বক্সটা বের করে ঝাঁকায়। টক্ টক্ করে শব্দ হলে একটু হাসে। বক্স খুলে দুই টুকরো পেয়ারা পায়। তাই খেয়ে নেয়।

অন্যদিন মা তাকে রাইস, ফ্রায়েড চিকেন, নুডুলস এসব দেয়। আজকে মেজো বোন বিশাখার বড় পরীক্ষা। তাই আপেল, কমলা আর পেয়ারা ছিল টিফিনে। অন্য বন্ধুদের তুলনায় তার মা একটু বুড়ো। তাতে একদম খারাপ লাগে না মৌরির। বরং মনে হয় তার বুড়ো মায়ের গায়ের গন্ধটা খুব মিষ্টি।

মৌরির বাবা কাজের সুবাদে অন্য শহরে থাকেন। সপ্তাহান্তে আসলে তাকে সাথে করে সুপারমার্কেটে যান। তখন মাঝেমাঝে খেলনা কিনে দেন।

ভাইবোনের পড়ালেখা সে খুব একটা বোঝে না। শুধু বোঝে তারা অনেক বড় ক্লাসে পড়ে। অপ্রয়োজনে বড় ভাইয়ের ঘরে তার ঢোকা নিষেধ। আর, কোনো ধরনের আহ্লাদ ভীষণ অপছন্দ তাঁর। সন্ধ্যায় পড়ার সময় মৌরি ঘরে ঢুকে দু-চারটা প্রশ্ন করলেই ভাই রাগ হয়ে যায়। আস্তে করে তাকে ঠেলে বাইরে বের করে দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দেয়।

মেজো বোন বিশাখার সাথে তার খানিকটা ভাব আছে। বিশাখার বান্ধবীদের বাসায় সে প্রায়ই যায় জন্মদিনের দাওয়াতে। কেক খেয়ে আসে। ছোট বলে কোনোদিন দুইটা কেকও পায়।

মৌরির মনে হয় মায়ের মতো আর কেউ তাকে ভালোবাসে না। তবে বিশাখা হয়তো একটু একটু বাসে।

২

এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন আজ। ফেরদৌসি বেগম মেজো মেয়েকে পরীক্ষার হলে পৌঁছে দিতে এসেছেন। বাসায় ফেরার পুরো পথ জুড়ে ভয়াবহ যানজট। সময়মতো মৌরির স্কুলে পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব বলে মনে হচ্ছে তার কাছে।

তিনি স্কুলে একটা ফোন করেন আর বড় ছেলেকে ক্ষুদে বার্তা পাঠান। মনে মনে দোয়া করতে থাকেন, ক্লাসশেষে রাফিন যেন সেটা দেখে।

পেয়ারা খাওয়া শেষ হতেই খালা আসেন। তাকে রেহানা আপার সাথে দেখা করতে বলেন। মৌরি ভারী ব্যাগটা কাঁধে তুলে দোতলায় টিচার্স রুমে যায়। সেখানে কয়েকজন শিক্ষক খাতা দেখছেন আর গল্প করছেন। টেবিলের মাঝখানে প্লেটে রাখা গরম সিঙারার ঘ্রাণ ঘর জুড়ে।

রেহানা আপা টিস্যুতে মুড়ে একটা সিঙারা তার হাতে দেন। এরপর রুমের একপ্রান্তে থাকা বেঞ্চে বসে শেষ করতে বলেন গতকালের অসমাপ্ত বাড়ির কাজ। ছুটির পর পড়তে মৌরির একদম ভালো লাগে না। তবুও হাতের সিঙারাটা ফুঁ দিয়ে সে এককামড় খায় তারপর খুশিমনে খাতা বের করে।

রাফিনের দুটো ক্লাস বাকি থাকতেই সে কাঁধে ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে পড়ে। যানজট এড়াতে ওঠে মেট্রোরেলে। ভীড়ে শ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম। এরমধ্যে দুইবার মোবাইল বের করে সময় দেখে সে। বাড়ির কাছাকাছি স্টেশনে এসে নামে। এখানে শহর রীতিমতো স্থবির । কোনোদিকে না তাকিয়ে সে মৌরির স্কুলের পথে জোরে হাঁটা শুরু করে।

আরও আধঘণ্টা পর মৌরি বড় ভাই রাফিনের সাথে রিকশায় বাড়ি ফিরছে। হাতে একটা সাদা রঙের হাওয়াই মিঠাই। নীল আকাশের টুকরো টুকরো মেঘের দিকে তাকিয়ে সে হাওয়াই মিঠাইয়ের সাথে মিল খুঁজে পায়।

যানজট এখনো আছে তবে খানিকটা কম। এর মধ্য দিয়ে হালকা চালে রিকশা ছুুটে চলেছে। বাতাসের ঝাপটায় মাঝে মাঝে মৌরির চোখ বন্ধ হয়ে আসছে আরামে। হুডখোলা রিকশার আনন্দটা সে শতভাগ উপভোগ করার চেষ্টা করে। আর ভাবে শুধু ‘মা’ই যে তাকে ভালোবাসে একথাটা মনে হয় ঠিক না।

পুনশ্চ: গল্পটি ২২ আগস্ট, ২০২৬ দৈনিক নয়াদিগন্তে প্রকাশিত হয়েছে।

Picked up where you left off

Comments

তারিক হোসেন was this story’s first reader

+40 XP

    Please login to post comment. Login

  • তারিক হোসেন 2 weeks ago First reader

    মায়ের মত কেউ কোনদিন কাউকে ভালবাসতেও পারে না। মায়ের ভালোবাসার সাথে পৃথিবীর আর কোন ভালোবাসার তুলনাও হয় না। অনেক সুন্দর লিখেছেন। অনেক অনেক শুভকামনা।

    • Shahzadi Nasrin 2 weeks ago

      আন্তরিক ধন্যবাদ।