Story

আনমনা ভালোবাসা

October 8, 2026

45 views

মিতাকে ফোন করা দরকার। কল করেই টের পেলো, মোবাইলে ব্যালেন্স কয়েক পয়সা। রফিকের মনটা খারাপ হয়ে গেল। এমনিতেও তার মোবাইলে টাকা থাকে না ওর। সাধারণত মিতাকে সে মিসকলই দেয়। কখন যে মোবাইলে ব্যালেন্স শূন্যের কোঠায় এসেছে, টেরই পায়নি। পকেটও খালী। মোবাইল রিচার্জের উপায়ও নাই। আনমনে হাঁটতে হাঁটতে কখন যে দোয়েল চত্বরের কাছে চলে এসেছে, নিজেই খেয়াল করে নি। ইদানীং তার খুব আনমনে হাঁটার বাতিক শুরু হয়েছে। ঝাঁ ঝাঁ রোদে মাথাটা ঘুরছে মনে হলো।
রাস্তার পাশে ফুটপাতে বসে পড়ল। একটু জিরিয়ে নেয়া দরকার। বসেই এক পা সোজা করে প্যান্টের পকেট হতে একটা সিগ্রেটের প্যাকেট বের করল। প্যাকেটটা খুলে দেখে মাত্র একটা সিগারেট আছে। সিগারেটটা মুখে দিয়ে প্যাকেটটা ছুঁড়ে ফেলতে গিয়েও কি মনে করে ফেললো না। সিগ্রেটটা অর্ধেক খাবে বলে ঠিক করলো, বাকী অর্ধেক রেখে দেয়ার জন্য প্যাকেটটা লাগবে।

সিগ্রেটটায় প্রথম টানটা দিয়ে ধোঁয়াগুলো উপর দিকে মারলো রফিক। তারপর থুতনীটা একটু উঁচু করে ধোঁয়াগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল। অনেক দিন মিতা ফোন করেনা। প্রতিদিন মিতাকে মিসকল দেয়। মিতা আজকাল তার কল দেখেও কল ব্যাক করে না। ভাবতেই মনটা বিষাদে ভরে গেলো। মিতা কেমন আছে, কে জানে! কতোদিন মিতাকে দেখে না। মিতা ওকে না দেখে কেমন করে থাকছে, নিশ্চয়ই ওর অনেক কষ্ট হচ্ছে! ভাবতে ভাবতে ওর চোখদুটো ভিজে এলো। মনে হলো, কান্না আসবে। এরকম রাস্তায় কান্না করা কি ঠিক হবে- ভাবতে গিয়ে ভাবনাটা আর এগোলো না। ফুটপাতে বসে বসে রফিক কাঁদতে লাগলো।
কান্নার বেগ বাড়তেই দু হাঁটুতে মুখ গুঁজে কাঁদতে লাগলো। উসকো খুশকো চুল নিয়ে অগোছালো ময়লা কাপড় পরে যুবক রাস্তার ধারে ফুটপাতে বসে কান্নার দৃশ্যটা দেখার কোন দর্শক নেই। চারপাশে চলমান সভ্যতায় কারো কোন সময় নেই, যুবককে জিজ্ঞেস করার!
পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া লোকদের মাঝে কেউ কেউ একটু উৎসুক চোখে তাকিয়েছে কেবল।
বেশ কিছুক্ষণ পর রফিকের সামনে দুজন লোক এসে দাঁড়ালো। একজন বলে উঠলো, জ্বী স্যার, পেয়েছি।
শুনেই রফিক মাথা উঁচু করে দেখে দুজন পুলিশ। তাদেরই একজন মোবাইলে কথা বলছেন তখনো- জ্বী জ্বী স্যার। আপনি আসেন, স্যার। আমরা আছি। তিন নেতার মাজারের সামনেই পেয়েছি ভাইয়াকে।
কান্না ভেজা চোখে রফিক ওদের দিকে তাকিয়ে রইল। ফোনে কথা শেষ করেই পুলিশ সদস্যটা বলল, ভাইয়া, আপনি কাউকে না বলে বের হয়েছেন কেন?
রফিক কিছু বলল না। চুপ করে রইল। দুইজন পুলিশ তার দুপাশে ফুটপাতে বসে পড়ল। যিনি ফোনে কথা বলছিলেন, সেই পুলিশটা পকেট হতে সিগ্রেট বের করে রফিকের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ভাইয়া সিগ্রেট নেন।
রফিক সিগারেট ধরিয়ে বসে বসে সিগারেট টানতে লাগলো।
মিনিট দশেক পর একটা গাড়ি এসে দাঁড়ালো। পুলিশ বিভাগের গাড়ি। দুই পুলিশ দাঁড়িয়ে স্যালুট ঠুকলো। গাড়ি হতে অফিসার নেমে এসে রফিকের সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন, রফিক, বাসায় চল।
তুমি এসেছ কেন, ভাইয়া? রফিক বলল।
কোন কথা না বলে গাড়িতে উঠ।
রফিক কিছু না বলে গাড়িতে উঠে বসলো। দুই পুলিশের মধ্যে যিনি ফোন করেছিলেন, তার দিকে ফিরে অফিসারটি বললেন,
রফিক বাসা হতে বেরোবার পর সবাই খুব টেনশনে পড়ে গিয়েছিল, তুমিতো সবই জানো মনির। ও যে কি করছে, সেটা বোঝার মতো অবস্থায় তো সে আর নাই। ওকে খোঁজার জন্য অন্য যে কাউকে বললেই হতো, কিন্তু তুমি তো জানোই এ কাজটার জন্যে তোমাকেই আমি বারবার বলি। দিন দিন অবস্থা আরো খারাপ হয়ে যাচ্ছে। এটুকু বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,  বাসায় এসো। রফিক তোমাকে খুব পছন্দ করে, সেটা তো তুমি জানো।
জ্বী স্যার। আপনি চিন্তা করবেন না। আমি আসব। এখন ভাইয়াকে নিয়ে আপনি মুভ করতে পারেন স্যার। লম্বা সময় রোদে রোদে হেঁটেছে।
হ্যাঁ, যাচ্ছি। থ্যাংক ইউ মনির। বলে গাড়িতে উঠে বসলেন তিনি।
গাড়িটা চোখের আড়াল হতেই ইন্সপেক্টর মনির ফুটপাতে যেখানটায় রফিক বসেছিল, সেখানটায় বসে পড়ল। হঠাৎ যেন রাজ্যের হতাশা আর দুঃখ এসে তাকে ঘিরে ধরল।
কি মনে করে সেও রফিকের মতো হাঁটুতে মুখ গুঁজে রইল। সাথের কনস্টেবলটা কিছুক্ষন পাশে দাঁড়িয়ে রইল। একটু পর সে ইন্সপেক্টর মনিরকে উদ্যেশ্য করে বলল, স্যার চলেন। সবাই একসাথে ভেংগে পড়লে চলবে? চলেন স্যার। জীবনে মানুষের অনেক কিছু দেখেছি। বউ এর জন্য এরকম পাগল হয়ে যেতে কাউকে দেখিনি, স্যার।
মনির আস্তে মাথা উঁচু করল। তার চোখ দুটো ভিজে আছে। কান্না ভেজা কন্ঠে বলল, হ্যাঁ চলো।
রফিকের স্ত্রী মিতার কথা মনে পড়ছে এখন তারও। মাস দুয়েক হয় মারা গেছে। তারই ছোট বোন।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login