মোকসেদ আলি সপ্তাহে তিনদিন বাজারে যান, আর প্রতিবারই একটু বেশি কেনেন। দুটো ইলিশ, এক কেজি আলু, আধা কেজি মুরগির মাংস, কখনো আবার মিষ্টির দোকান থেকে এক বাক্স রসমালাই। বাজারের থলেটা তাঁর হাতে সবসময় একটু বেশিই ভারী থাকে। সেই ভারটা তিনি পছন্দ করেন। হাতে ভার থাকলে মনে হয়, কারও জন্য কিছু বয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
পুরান ঢাকার রায়সা বাজারের ঘিঞ্জি গলির তিনতলা বাড়ির দোতলার ফ্ল্যাটে তিনি একা থাকেন। সকালে নিচের রাস্তায় ফেরিওয়ালার হাঁক, রিকশার টুংটাং আর পাশের বাড়ির কলের পানির শব্দে ঘুম ভাঙে। অথচ ফ্ল্যাটের ভেতরটা সারাদিন এমন চুপচাপ থাকে যে নিজের হাঁটার আওয়াজও কানে বাজে। সরকারি অফিস থেকে কেরানি হিসেবে অবসর নিয়েছেন সাত বছর আগে। চাকরির শেষ দিনে সহকর্মীরা একটা ফুলের তোড়া আর একটা ঘড়ি দিয়েছিল। ঘড়িটা এখনো দেয়ালে ঝুলছে, তার টিকটিক শব্দই এখন ঘরের একমাত্র সঙ্গী।
স্ত্রী মারা গেছেন তার দু'বছর পর। মরিয়ম বেগম ছিলেন সেই মানুষ, যিনি এই ফ্ল্যাটটাকে ঘর বানিয়েছিলেন। তাঁর শাড়ির আঁচলের গন্ধ, পানের বাটার খুটখাট, সন্ধ্যায় রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা ভাজা মশলার ঘ্রাণ। এগুলো একে একে সব মিলিয়ে গেছে। আলমারিতে তাঁর শাড়িগুলো এখনো ভাঁজ করা আছে। মোকসেদ আলি সেগুলো ছুঁয়েও দেখেননি, ফেলেও দেননি।
ছেলে থাকে কানাডায়, মেয়ে অস্ট্রেলিয়ায়। দুজনেই নিয়মিত ফোন করে, শুক্রবারে, ঠিক সন্ধ্যা সাতটায়, পাঁচ থেকে সাত মিনিট ধরে। "আব্বু, ভালো আছ? ওষুধ খেয়েছ? টাকা লাগলে বলো।" শেষ কথাটা সবসময়ই থাকে। মোকসেদ আলি প্রতি শুক্রবার ছয়টা থেকেই ফোনের পাশে বসে থাকেন। সাতটা বাজার আগেই ফোনটা হাতে তুলে রাখেন, যেন রিং হওয়ার আগেই ধরা যায়। কথা শেষ হলে ফোনটা অনেকক্ষণ কানের কাছে ধরে রাখেন। লাইন কেটে গেলেও।
তিনি জানেন, ছেলেমেয়েরা খারাপ নয়। ওদের নিজেদের জীবন আছে, সময়ের টানাটানি আছে। তবু মাঝে মাঝে মনে হয়, টাকা লাগলে বলো; কথাটার বদলে যদি একবার শুনতে পেতেন, আব্বু, তোমার কি আজ একা লাগছে? তাহলে হয়তো তিনি সত্যিই বলে ফেলতেন, হ্যাঁ।
বাজারের মুদি দোকানদার করিম একদিন জিজ্ঞেস করেছিল, চাচা, এত বাজার কার জন্য?
প্রশ্নটা শুনে মোকসেদ আলি এক মুহূর্ত থমকে গিয়েছিলেন। সত্যিটা বলার কথা ভাবতেই তাঁর ভেতরে কেমন একটা লজ্জা জেগে উঠল। এ বয়সের একজন মানুষ নিজের একাকীত্ব অন্যকে দেখাতে চায় না, বিশেষ করে এই বয়সে। তিনি একটু সোজা হয়ে বসে বলেছিলেন, ছেলে আসছে। পরশু। কানাডা থেকে। অনেকদিন পর তো, ভালো করে খাওয়াতে হবে।
কথাটা বলার সময় তাঁর নিজের কাছেই কথাটা সত্যি মনে হয়েছিল। কেমন যেন একটা আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছিল বুকে। করিম মাথা নেড়েছিল। ছেলে যে ছয় বছর ধরে আসেনি, এ কথা পুরো মহল্লা জানে, কিন্তু কেউ তা মুখে আনেনি।
সেই থেকে প্রতি সপ্তাহে একই কথা চলছে। কখনো মেয়ে আসছে, কখনো নাতি, কখনো পুরোনো এক বন্ধু। এই মিথ্যাগুলো বলে তিনি কাউকে ঠকাতে চান না। বরং নিজেকে একটু ঠকাতে চান। মিথ্যা বলার সময় ঘণ্টা দুয়েকের জন্য ঘরটা সত্যিই ভরে ওঠে। কল্পনায় তিনি দরজার বেল শোনেন, ছেলের গলা শোনেন, আব্বু, এত রান্না করেছ কেন?
বাজার থেকে ফিরে তিনি রান্না করেন, কিন্তু খান সামান্যই। বাকি খাবার ফ্রিজে রাখেন। সপ্তাহ শেষে সবটা ফেলে দেন, যাতে কেউ বুঝতে না পারে। ডাস্টবিনের কাছে গিয়ে আধপচা ইলিশের টুকরোগুলো ফেলার সময় তাঁর হাত কাঁপে। খাবার নষ্ট করা তাঁর কাছে পাপ। ছোটবেলায় মা বলতেন, পাতের ভাত ফেললে আল্লাহ রাগ করেন। কিন্তু এই পাপটা না করলে যে আরেকটা সত্য ধরা পড়ে যায়, সেটাই তাঁকে বেশি ভয় দেখায়।
গত বৃহস্পতিবার বাজার শেষে করিম দোকান থেকে ডাকল। চাচা, একটু বসেন।
চেয়ারে বসিয়ে সে চা বানাল। দোকানের সামনে তখন লোকজনের ভিড়, কিন্তু করিম যেন ভিড়ের মধ্যেই আলাদা করে তাঁর সঙ্গে কথা বলছে। কিছুটা আমতা আমতা করে বলল,
আজ রাতে আমার বাসায় একটু খাবেন? বউ বলল, বেশি রান্না হয়েছে। আপনি আসলে খুশি হব।
মোকসেদ আলি একবার করিমের মুখের দিকে তাকালেন। ছেলেটার চোখে একটা সাবধানী ভদ্রতা। এই দৃষ্টি তিনি চেনেন। অফিসে একসময় সবাই তাঁকে এভাবে দেখত, যখন তাঁর স্ত্রী মারা গেল। করুণার দৃষ্টি, যা সহানুভূতির ছদ্মবেশে আসে। তিনি জানতেন, করিমের বউ কিছু বলেনি। বেশি রান্নাও হয়নি। এ নিমন্ত্রণ করিম নিজে থেকে বানিয়েছে, একজন বুড়ো মানুষকে সম্মান বাঁচিয়ে একবেলা খাওয়ানোর জন্য। আর সেই কারণেই নিমন্ত্রণটা নিতে পারলেন না। নিলে স্বীকার করে নিতে হয়, তাঁর ছেলে আসছে না, কেউ আসছে না।
গলার ভেতর কিছু একটা আটকে গেল। কিন্তু তিনি হাসলেন, নিজের স্বাভাবিক, পরিপাটি হাসিটা।
না রে করিম, আজ আর হবে না। ছেলে আজ পৌঁছেছে। এয়ারপোর্ট থেকে সোজা বাসায় এসেছে। ওর জন্য রান্না করতে হবে।
করিম আর কিছু বলল না। কেবল চায়ের কাপটা তাঁর হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
আচ্ছা চাচা। আরেকদিন।
তার গলায় এমন একটা নরমতা ছিল যে মোকসেদ আলির ইচ্ছে হলো, এক্ষুনি সব স্বীকার করে ফেলেন। কিন্তু তিনি চা শেষ করে উঠে পড়লেন, থলেটা হাতে নিয়ে।
সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে উঠতে তাঁর হাঁটু ব্যথা করছিল। আজ থলেটা অন্যদিনের চেয়েও ভারী লাগছে। ফ্ল্যাটের তালা খুললেন। ঘরটা অন্ধকার। বাতি জ্বেলে তিনি রান্নাঘরে গেলেন, ইলিশটা কাটলেন, ভাত চড়ালেন। সরষে বাটলেন, ঠিক যেমন মরিয়ম করতেন। মশলার ঘ্রাণ উঠল। এক মুহূর্তের জন্য তাঁর মনে হলো, পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। তিনি ফিরে তাকালেন না। তাকালে যদি কেউ না থাকে?
তারপর টেবিলে দুটো থালা সাজালেন। একটা নিজের, একটা ছেলের। ছেলের থালায় সবচেয়ে বড় ইলিশের টুকরোটা তুলে দিলেন, যেমন ছোটবেলায় দিতেন। পাশে পানির গ্লাস রাখলেন, তারপর আরেকটা। কেন রাখলেন, নিজেও জানেন না।
রাত দশটায় তিনি খেতে বসলেন। অন্য থালাটার সামনে কেউ নেই। কিন্তু তিনি মাঝে মাঝে সেদিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ছিলেন, যেন কেউ কিছু বলছে আর তিনি সায় দিচ্ছেন।
হ্যাঁ বাবা, ভালো আছি। না না, ওষুধ ঠিকই খাই। তুই খা, ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
কথাগুলো মুখে এল না, শুধু ঠোঁট দুটো নড়ল।
বাইরে বৃষ্টি নামল। জানালার কাচে ফোঁটা পড়ার শব্দ হতে লাগল, ঠিক যেন কেউ দরজায় আস্তে আস্তে কড়া নাড়ছে।
মোকসেদ আলি খাওয়া থামালেন। কান খাড়া করে বসে রইলেন। বুকের ভেতর একটা ক্ষীণ আশা জেগে উঠল, যা সাত বছরেও মরেনি। দেয়ালঘড়ির টিকটিক আর বৃষ্টির শব্দ ছাড়া আর কিছু শোনা গেল না। তবু তিনি অনেকক্ষণ সেভাবেই বসে রইলেন, দরজার দিকে তাকিয়ে, ছেলের থালার ইলিশটা ঠান্ডা হতে হতে। কান খাড়া করে বসে রইলেন, দরজায় সত্যিই কেউ কড়া নাড়ে কীনা!
Comments
First reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.
-
-
Ayesha akter Shilpi
5 days ago
বৃদ্ধ বাবার একাকীত্বের একটা গল্প আমারো আছে। লেখাটা খুব কাছাকাছি লাগলো। অনুভূতিটা একই। ভেতর ভেতর কেমন একটা ব্যথা বোধ হলো।
-
probash khobor 5 days ago
ক্লাসিক একটা ছোট গল্প। ভালো লিখেছেন। শুভেচ্ছা রইল।
-
robin ahmed 5 days ago
বার্ধক্যের একাকীত্বে একজন মানুষ! দারুণ লিখেছেন।
-
sayed Hossain 5 days ago
একাকীত্বের জীবন। সন্তানদেরকে উচ্চ শিক্ষার্থে বিদেশ পাঠিয়ে, নিজের সমস্ত আয় সন্তানদের জন্য খরচ করে শেষ বয়সে এই একাকীত্বে আসলে প্রাপ্তি কী, সেটা আমার বোধগম্য নয়। খুবই বাস্তবধর্মী একটা গল্প। ভালো লিখেছেন। শুভেচ্ছা।
-
দারুণ একটা গল্প। একজন বৃদ্ধের একাকী জীবন, সন্তানদের জন্য অপেক্ষা, কাল্পনিক আতিথেয়তা, একা একা সংলাপ সব মিলিয়ে দারুণ লাগল। বাজারের দোকানদারটা তাঁর একাকীত্বটা অনুধাবন করতে পেরেছিল। ভালো লিখেছেন।