Story

রাতুলের সুপার পাওয়ার

October 11, 2026

71 views

রাতুলের ধারণা তার একটা সুপারপাওয়ার আছে। সবাই জানে না। শুধু মায়ের সাথে তার এ বিষয়ে কথা হয়।

মাঝেমাঝে রাতুলকে কেউ দেখতে পায়না। স্কুলে বেশিরভাগ সময় সে অদৃশ্য থাকে। এই যেমন, বিজ্ঞান ক্লাসে কুইজে অংশগ্রহণের জন্য বারবার সে হাত তুলে, কিন্তু রুবিনা মিস তাকে দেখতেই পাননা। মিস অবশ্য বেশিরভাগ সময় সামনে বসা ছেলে-মেয়েদের ছাড়া আর কাউকেই তেমন দেখতে পাননা। অন্যান্য বিষয়ের ক্লাসেও কাছাকাছি ঘটনা ঘটে।

রাতুলের সবচেয়ে প্রিয় ক্লাস ‘খেলাধুলা’ যা সপ্তাহে একবারই হয়, বৃহস্পতিবার। খুবই দুঃখজনকভাবে গতমাসে সে একবারের জন্যেও খেলায় অংশগ্রহণ করতে পারেনি।

খেলার পিরিয়ডে পিটি স্যার ক্লাসের সব ছেলেদের মাথায় হাত রাখেন। স্যারের আঙুলের উপরে যাদের চুল বড় পাওয়া যায় তাদেরকে খেলায় নেওয়া হয় না। বিগত তিনটি গেইম ক্লাসে সে খেলতে যেতে পারেনি বড় চুল থাকার কারণে। মাসের শেষ বৃহস্পতিবারের আগে বাবাকে অনেক অনুরোধ করে সে চুল কেটে আসে সেলুন থেকে। কিন্তু হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার কারণে স্যার তাকে দেখতেই পাননি। তাই খেলাও হয়নি।

মা অবশ্য বলেছে, অদৃশ্য হয়ে যাওয়াটা খুব খারাপ না। সবাই চাইলেও পারে না। তাই এ অবস্থায় সবসময় ভালো কাজ করে যেতে হবে। যখন সে ভালো কিছু করে তখন অনেক সময় দৃশ্যমান হয়। তবে মায়ের মতে, দৃশ্যমান হওয়া জরুরি না ভালো কাজ করাটা জরুরি। তাই দৃশ্যমান হওয়ার জন্য ভালো কাজ করার প্রয়োজন নেই।

যতবড় শক্তিই হোক, অদৃশ্য থাকা খুব একটা আনন্দের বিষয় না। কারণ সে তো শুধু শিক্ষকদের কাছে না, ক্লাসের বন্ধুদের কাছেও অদৃশ্য থাকে। সকালে যখন সে স্কুলে যায় তখন কেউ তার জন্য জায়গা রাখে না, এমনকি সরেও বসে না। টিফিন পিরিয়ডে সে একা একা বসে টিফিন খায়। তারপর বন্ধুরা যেখানে মোরগ লড়াই খেলে, সেখানে অদৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়ে খেলা দেখে।

এরমধ্যে একদিন টিফিন পিরিয়ডে ছেলে-মেয়েরা বাইরে দাঁড়িয়ে গল্প করছিল। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে স্কুলের মাঠের হাঁটা-পথটা থকথকে কাদায় পিচ্ছিল হয়ে ছিল। ঠিক যেরকম পিচ্ছিল কাদায় খেলতে রাতুলের ভালো লাগে। যদিও বয়স্কদের জন্য এই খেলা একটুও আনন্দের না বরং লজ্জার।

তাদের অংক টিচার, রাশেদ স্যার, ভীষণ রাগী। ক্লাসে তাঁর ভয়ে কেউ টু-শব্দটি পর্যন্ত করতে পারে না। সেই স্যার যখন ক্লাসে আসছিলেন এই পথ ধরে, আচমকা পিছলে পড়ে যান। স্যারের প্যান্ট আর হাতে থাকা বই দুটোই কাদায় মাখামাখি হয়ে যায়। বারান্দায় দাঁড়ানো ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা হাসি চেপে রাখতে চেয়েও পারে না। তাই সবাই মিলে হেসে কুটি কুটি।

রাতুলের এমন একটা ঘটনায় মোটেও হাসি পায় না বরং স্যারের জন্য মায়া লাগে। সে স্যার কে খুব ভয় পেলেও কাছে এসে ছোট্ট হাতটা বাড়িয়ে দেয়। এতে একটা ভালো জিনিস হয়েছে। এখন সে অদৃশ্য থাকলেও স্যার তাকে দেখতে পান। প্রতিদিন পড়া জিজ্ঞেস করেন, বোর্ডে অংক করতে ডাকেন। তাই ভালো করে বাসা থেকে পড়া শিখে আসতে হয়।

রাতুল ভেবে দেখেছে এই সুপারপাওয়ারটা খুব একটা খারাপ জিনিস না। কিন্তু মনে হয়, তার সাত বছর বয়স হিসেবে ক্ষমতাটা একটু বেশি ভারী। এ ধরনের ক্ষমতা থাকলে বন্ধু পাওয়া যায় না। যাকে দেখা যায় না তার সাথে কেউ কিভাবে বন্ধুত্ব করবে? এছাড়া, মাঝেমাঝে একা লাগে, বুুক ভার হয়ে থাকে, যেমনটা মা বাড়িতে না থাকলে হয়, তেমন।

তারপরও সে মায়ের কথামতো ভালো কাজ করে চলেছে প্রতিনিয়ত। আর যোগাযোগের জন্য সে নতুন একটা পথ বের করেছে। এতে তাকে দেখতে না পেলেও বন্ধুরা তার লেখা পড়তে পারবে। স্কুলের দেয়াল পত্রিকায় সে নিয়মিত লিখছে। শুধু তাই না, সে ঠিক করেছে এ বছর স্কুলের ম্যাগাজিনে সুন্দর একটা ছড়া পাঠাবে।

পুনশ্চ: গল্পটি গত ১০ ই অক্টোবর ২০২৬ তারিখে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার শিশুদের পাতা আগডুম বাগডুমে প্রকাশিত হয়েছে।

Picked up where you left off

Comments