Article

ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ জিকির ও দোয়া

October 13, 2026

48 views

মুহাম্মদ শফিকুর রহমান

দোয়া ইবাদতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বান্দা যখন আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে দোয়া করে, নিজের প্রয়োজন ও অসহায়ত্ব তাঁর কাছে তুলে ধরে, তখন সে মূলত আল্লাহর ওপর নিজের নির্ভরতা প্রকাশ করে। আল্লাহ তাআলা বলেন—“তোমরা আমাকে ডাকো, আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব।”—সূরা গাফির, ৪০:৬০

সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে এবং প্রয়োজনের সময় আল্লাহর কাছেই সাহায্য চাওয়া একজন মুমিনের বৈশিষ্ট্য। তবে দোয়া কবুলের ক্ষেত্রে হালাল উপার্জন ও পবিত্র জীবনের গুরুত্ব রয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সাঃ) এমন ব্যক্তির কথা বলেছেন, যে দীর্ঘ সফর করে আল্লাহর কাছে দোয়া করে, কিন্তু তার খাদ্য, পানীয় ও পোশাক হারাম—এ অবস্থায় তার দোয়া কীভাবে কবুল হবে? —সহিহ মুসলিম, ১০১৫। তাই কোরআন ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত জিকির ও দোয়া আমল করাই উত্তম। নিচে ছয়টি গুরুত্বপূর্ণ জিকির ও দোয়া সংক্ষেপে আলোচনা করা হলো।

 দরুদ পাঠ

দরুদ বলতে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাঃ) -এর ওপর সালাত ও সালাম পাঠ করাকে বোঝায়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—“নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা নবীর প্রতি সালাত প্রেরণ করেন। হে মুমিনগণ! তোমরাও তাঁর ওপর সালাত পাঠ করো এবং যথাযথভাবে সালাম প্রদান করো।”—সূরা আল-আহযাব, ৩৩:৫৬

রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেন—“যে ব্যক্তি আমার ওপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার ওপর দশবার রহমত নাজিল করেন, তার দশটি গুনাহ মুছে দেন এবং তার মর্যাদা দশ ধাপ বৃদ্ধি করেন।”—সুনান আন-নাসাঈ, ১২৯৭

তাই বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ আমল। তবে প্রচলিত একটি বক্তব্য—“দরুদ না পড়লে দোয়া আসমান ও জমিনের মাঝখানে আটকে থাকে”—হজরত উমর (রা.)-এর বক্তব্য হিসেবে তিরমিজিতে বর্ণিত হলেও সংশ্লিষ্ট হাদিসটিকে সেখানে দুর্বল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। —জামে আত-তিরমিজি, ৪৮৬।

 

 

ইস্তিগফার

ইস্তিগফার অর্থ আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করা। আল্লাহ তাআলা বলেন—“তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর; নিশ্চয়ই তিনি মহাক্ষমাশীল।”—সূরা নূহ, ৭১:১০

রাসুলুল্লাহ (সাঃ)  নিজেও নিয়মিত ইস্তিগফার করতেন। তিনি বলেছেন—“আমি দিনে একশবার আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করি।”—সহিহ মুসলিম, ২৭০২। তাই ইস্তিগফার শুধু গুনাহ মাফের জন্য নয়; বরং আল্লাহর কাছে ফিরে আসা, তাঁর ক্ষমা ও রহমত কামনা এবং নিজের ভুলের জন্য অনুতপ্ত হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ আমল।

‘ইয়া যাল-জালালি ওয়াল-ইকরাম’

“ইয়া যাল-জালালি ওয়াল-ইকরাম” অর্থ—“হে মহিমা ও সম্মানের অধিকারী।”কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—“বরকতময় তোমার রবের নাম, যিনি মহিমা ও সম্মানের অধিকারী।”
—সূরা আর-রহমান, ৫৫:৭৮।জামে আত-তিরমিজি, ৩৫২৫-এ আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ (সাঃ)  বলেছেন—“ইয়া যাল-জালালি ওয়াল-ইকরাম” বেশি বেশি বলো।
—জামে আত-তিরমিজি, ৩৫২৫।তাই আল্লাহর মহিমা ও সম্মান স্মরণ করে এই জিকির করা যেতে পারে।

‘লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’

“লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ” অর্থ—“আল্লাহ ছাড়া কোনো শক্তি ও সামর্থ্য নেই।” রাসুলুল্লাহ (সাঃ)  এটিকে বলেছেন—“জান্নাতের একটি গুপ্তধন।”—সহিহ আল-বুখারি, ৬৪০৯

এই জিকিরের মাধ্যমে বান্দা স্বীকার করে যে প্রকৃত শক্তি ও সামর্থ্য আল্লাহর কাছ থেকেই আসে। তাই আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে নিয়মিত এই জিকির করা উত্তম।

দোয়া ইউনুস (আ.)

দোয়া ইউনুস (আ.) হলো—“লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ-জালিমিন।”

অর্থ—“আপনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই; আপনি পবিত্র ও মহিমান্বিত। নিশ্চয়ই আমি জালিমদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম।”—সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৮৭

এরপর আল্লাহ বলেন—

“অতঃপর আমি তার ডাকে সাড়া দিলাম এবং তাকে দুশ্চিন্তা থেকে উদ্ধার করলাম; আর এভাবেই আমি মুমিনদের উদ্ধার করি।”—সূরা আল-আম্বিয়া, ২১:৮৮

জামে আত-তিরমিজি, ৩৫০৫-এ রাসুলুল্লাহ (সাঃ)  থেকে বর্ণিত হয়েছে, কোনো মুসলিম এই দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে আল্লাহ তার ডাকে সাড়া দেন। তাই বিপদ, দুশ্চিন্তা ও সংকটের সময়ে এই দোয়া পড়া অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

‘সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার’

এই চারটি মহান জিকিরের বিশেষ ফজিলত রয়েছে। হজরত সামুরা ইবনু জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সাঃ)  বলেছেন—“আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কথাগুলো চারটি—সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ এবং আল্লাহু আকবার।”
—সহিহ মুসলিম, হাদিস ২১৩৭a; কিতাবুল আদাব, হাদিস ১৬

‘সুবহানাল্লাহ’ অর্থ আল্লাহ পবিত্র ও মহিমাময়, ‘আলহামদুলিল্লাহ’ অর্থ সব প্রশংসা আল্লাহর, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ অর্থ আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্য উপাস্য নেই এবং ‘আল্লাহু আকবার’ অর্থ আল্লাহ সর্বশ্রেষ্ঠ। তাই নিয়মিত এই জিকিরগুলো পাঠ করা আল্লাহর স্মরণ ও তাঁর মহিমা প্রকাশের একটি উত্তম আমল।

জিকির ও দোয়া আল্লাহর নৈকট্য লাভের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। তাই কোরআন ও সহিহ হাদিসে বর্ণিত জিকির-দোয়া নিয়মিত আমল করা, হালাল-হারাম মেনে চলা এবং সবসময় আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই আমাদের করণীয়। আসুন, আজ থেকেই জিকির ও দোয়াকে আমাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ করে নিই এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের পথে এগিয়ে চলি।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+40 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login

  • Borhan Mahmud 1 week ago

    ফিচারটা শিক্ষণীয়।