শফিক সাহেবের তেমন কোনো বন্ধু নেই। থাকলেও সবার সাথে যোগাযোগ হয়ে ওঠে না। রাহেলা বেগম তার ত্রিশ বছরের বিবাহিত জীবনে স্বামীর দুইজন মাত্র বন্ধুকে নিয়মিত আসতে দেখেছেন। কখনো তাঁরা একসাথে বাইরে খেতে যান; কখনো বাড়ির সামনের টং দোকানে বসে চা খান। মাঝেমধ্যে বাসায় বসে দাবা খেলেন।
এমনিতে শফিক সাহেব তেমন কথা বলেন না বাসায়। রাহেলা বেগম একা তিন ছেলে-মেয়ে মানুষ করেছেন; শফিক সাহেবকে কোনো বাক্য খরচ করতে হয়নি। কিন্তু বন্ধুরা আসলে অনেক হাসির শব্দ, হৈচৈ শোনা যায়। মাঝেমধ্যে রাহেলা চা-পানি দেয়ার ফাঁকে ফাঁকে দরজার এপাশ থেকে শোনেন।
তার খুব মন খারাপ হয়। তিনি সারাদিন একা বসে থাকেন, স্বামী তার সাথে দুটো কথাও বলেন না! গত বছর রিটায়ারমেন্টের পর থেকে শফিক সাহেব আরও চুপচাপ হয়ে গেছেন।
রাহেলা তেমন পড়াশোনা করেননি। তাই কথার প্রসঙ্গ খুঁজে বের করতে তার কষ্ট হয়। তিনি প্রতিদিন ভাবেন, বিকেলে চা দেয়ার সময় কি নিয়ে কথা বলবেন। কোনো মানানসই কথা, গল্প তিনি খুঁজে পান না।
এই তো সেদিন বাড়িতে স্যানিটারি মিস্ত্রী এসেছিল। তার কাছে থেকে একটা নতুন বিষয় জানতে পেরেছেন। পানির আয়রনের উপর নির্ভর করে, ঘরের মোজাইকের রং ঠিক ভাবে বসবে কি না।
রাহেলা বেগমের মনে হয় এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা আলোচনা হতে পারে। তাই তিনি পরশু সন্ধ্যায় গল্প শুরু করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু শফিক সাহেবের ফোন আসায় কথাটা আর বলা হয়নি।
অবশ্য কোন কিছু না শুনলেও ছেলে-মেয়েদের বিষয়ে বললে তিনি শোনেন। তাই বলার কিছু না থাকলে রাহেলা বেগম তাদের ছোটবেলার কথা, জন্মের সময়কার কথা বলতে থাকেন। শফিক সাহেব উত্তর না দিলেও, চুপচাপ শোনেন।
মাঝেমধ্যে রাহেলা বেগমের জানতে ইচ্ছে করে শফিক সাহেব কি অসুখি? প্রশ্নটা অনেক কঠিন। উত্তরটা আরও কঠিন হতে পারে ভেবে তিনি জিজ্ঞেস করেন না।
পুনশ্চ: অণুগল্পটি শব্দবাড়ি,র অক্টোবর-ডিসেম্বর' ২৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।