টানা ত্রিশ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর উদ্ধার হওয়া চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাকে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে দ্রুত সুস্থ হয়ে আবারও ক্যাম্পাসে ফিরে দায়িত্ব পালনের পরামর্শ দিয়েছে সরকার। বর্তমানে তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় জেলা প্রশাসন ও পুলিশের সহায়তায় উদ্ধার পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তিনি। চমেক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভিআইপি কেবিন থেকে মুঠোফোনে এসব তথ্য নিশ্চিত করেন উপাচার্য।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চুয়েট উপাচার্যকে হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টার নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। তার সঠিক চিকিৎসার জন্য একটি বিশেষজ্ঞ মেডিকেল বোর্ড গঠন করা হয়েছে।
প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষ হওয়ার পর মেডিকেল বোর্ডের পক্ষ থেকে তার শারীরিক অবস্থার সর্বশেষ আপডেট প্রকাশ করা হবে।
অবরুদ্ধ পরিবেশের বর্ণনা দিয়ে উপাচার্য বলেন, "আমরা অত্যন্ত অমানবিক এক পরিস্থিতির শিকার হয়েছিলাম। টানা বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় আমাদের সঙ্গে থাকা এগারো জনের শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি ঘটে। দুজন অ্যালামনাই সদস্য মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে একজনকে রাতেই হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পরবর্তীতে সরকারি চিকিৎসক ও সিভিল সার্জনের পরামর্শে আমাকেও হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়।"
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যমে তার 'পদত্যাগ' এবং 'ভবিষ্যতে চুয়েটে না ফেরার শর্তে মুক্ত হওয়া' সংক্রান্ত সংবাদকে সম্পূর্ণ মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছেন অধ্যাপক শরীফুল আলম। তিনি বলেন, "আমি পদত্যাগ করেছি বা ভবিষ্যতে ক্যাম্পাসে যাব না—এমন কোনো লিখিত বা মৌখিক বক্তব্য বা মুচলেকা দিইনি। যখন আমাকে উদ্ধার করা হচ্ছিল, তখন কথা বলার মতো শারীরিক পরিস্থিতি আমার ছিল না।
যারা এই ধরনের অসত্য তথ্য ছড়াচ্ছেন, তাদের বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের অনুরোধ জানাচ্ছি।"
আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, "তোমরা নিজেদের মূল্যবান শিক্ষাজীবন নষ্ট করো না। আমার বিশ্বাস তোমরা কোনো স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর প্ররোচনায় পড়ে ব্যবহৃত হবে না।" তিনি আরও স্পষ্ট করেন, অর্পিত রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করতেই তিনি চট্টগ্রামে এসেছেন, ব্যক্তিগত বা কোনো দলীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নয়।
ঘটনার পেছনের ইতিহাস:
উল্লেখ্য, সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে দায়িত্ব নেওয়ার ৫৬ দিনের মাথায় সরিয়ে দিয়ে অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে চুয়েটের উপাচার্য নিয়োগ দেয় সরকার। এর প্রতিবাদে গত ২১ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরা সর্বাত্মক শাটডাউন ও সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলন শুরু করেন।
গত সোমবার সকাল পৌনে ৯টার দিকে বহিরাগতদের সঙ্গে নিয়ে প্রশাসনিক ভবনের তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন নতুন উপাচার্য। শিক্ষার্থীরা তাকে দুপুর ১২টার মধ্যে কার্যালয় ছাড়ার সময় বেঁধে দেন। তিনি কার্যালয় না ছাড়ায় দুপুর সাড়ে ১২টায় ভবনে ফের তালা ঝুলিয়ে তাকে অবরুদ্ধ করা হয়। দীর্ঘ ৩০ ঘণ্টা অবরুদ্ধ থাকার পর মঙ্গলবার বিকেল ৫টায় চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা ও জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম ক্যাম্পাসে যান এবং আলোচনার পর সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় জরুরি পকেট দরজা দিয়ে উপাচার্যসহ ১১ জনকে উদ্ধার করে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান।
শিক্ষার্থীদের দাবি, সাবেক উপাচার্য ড. সায়েমকে পুনর্বহাল না করা পর্যন্ত এবং বর্তমান ভিসিকে অপসারণ না করা পর্যন্ত তাদের শাটডাউন আন্দোলন অব্যাহত থাকবে। অন্যদিকে মুক্ত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়েছেন। যার সারমর্ম উপাচার্যের মুচলেকা দেওয়ার বিষয়টি অসত্য বলে দাবি করেছেন এবং একজন ভিসির সাথে এমন আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন।
©কাফাসো