Article

কাফাসো'র কৃষিভাবনা (পর্ব-৫)

October 21, 2026

11 views

আসসালামু আলাইকুম সবাইকে। আজকের পর্বে আলোচনা করব মাটি এবং জৈবসার নিয়ে। গাছ কিংবা ফসল চাষের জন্য মাটি অপরিহার্য। যদিও কৃষি বিজ্ঞানীরা মাটির পরিবর্তে পানিতেও ফসল চাষের চেষ্টা করে যাচ্ছেন। পানিতে চাষাবাদ প্রক্রিয়াকে হাইড্রোপনিক কালচার নামে অভিহিত করা হয়। তবুও কথায়াছে না, দুধের স্বাদ কি ঘোলে মেটে?

মাটির চেয়ে খাঁটি জিনিস আর কী হতে পারে? তার উপর বাংলাদেশের মাটি। একটা গান আছে না?

"সোনা সোনা সোনা, লোকে বলে সোনা, সোনা নয় যত খাঁটি

বলো যত খাঁটি তার চেয়ে খাঁটি বাংলাদেশের মাটি।"

আমাদের দেশের মাটিকে খাঁটি হিসেবে অভিহিত করার অন্যতম প্রধান কারণ হলো - এদেশের মাটির উর্বরতা পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এখন আমাদের জানা উচিত কী কী উপাদান থাকলে সেই মাটিকে আমরা উর্বর মাটি বলতে পারি। তার আগে বলে রাখি, বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে মাটিকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে।

১. এঁটেল মাটি

২. দোআঁশ মাটি

৩. বেলে মাটি

সাধারণত পানি ধারণ ক্ষমতা এবং টেক্সচারের পার্থক্য থাকে। বেশিরভাগ ফসলের জন্য সবচেয়ে ভালো মাটি হলো দো আঁশ মাটি। এঁটেল মাটির পানি ধারণ ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি, বেলে মাটির ধারণ ক্ষমতা কম। দো আঁশ মাটি মাঝামাঝি।

আবার পানি শোষণ ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি। এঁটেল মাটির পানি শোষণ ক্ষমতা কম। দো আঁশ মাটি মাঝামাঝি।

বাগান তৈরির ক্ষেত্রে মাটিকেই সবচাইতে একঘেয়েমি টাইপ হিসেবে দেখা হয়। মাটি নিয়ে কাজ করা কখনোই বাগানের গাছ নির্ধারন করার মতো আকর্ষনীয় কাজ হয়ে ওঠে না। কিন্তু মাটি এমন একটি জিনিস যা পুরো বাগানের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।যারা নতুন বাগানের কাজ শুরু করতে যাচ্ছেন তাদেরকে চারা রোপনের আগেই মাটিতে টাকা এবং পরিশ্রম দিতে উৎসাহিত করা হয়ে থাকে। কিন্তু খুব কম মানুষ তা মেনে চলেন এবং চারা লাগানোর পরে চারাটিকে আরো পানি এবং খাবারের জন্য ধুঁকতে দেখা যায়। বাগান তৈরির ক্ষেত্রে মাটির পুষ্টির দিকে নজর রাখলে মাটি নিজেই চারার পুষ্টির দিকে খেয়াল রাখবে। কী, খুব হাস্যকর শোনাচ্ছে?

যাই হোক, বাগানের জন্য ব্যবহৃত মাটিতে সাধারনত ৯০% খনিজ এবং অবশিষ্ট ১০% ক্ষয়প্রাপ্ত জৈব পদার্থ পাওয়া যায়। তারপরও এতে পোকামাকড় ও অণুজীব থাকে। মাটিতে অতিরিক্ত জৈব পদার্থ মেশানো হয় যাতে করে এইসব অণুজীব বেশি করে খাবার পায়, জৈব পদার্থ পঁচাতে সাহায্য করে ও বিভিন্ন প্রকার পুষ্টি উপাদান মাটিতে ত্যাগ করে। কেঁচো ও মাটিতে বসবাসকারী অন্যান্য পোকামাকড় তাদের চলাচলের মাধ্যমে মাটিতে বায়ু প্রবেশে সাহায্য করে এবং তাদের শরীর থেকে নির্গত বর্জ্য মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বাড়াতে সাহায্য করে। এভাবেই ধীরে ধীরে মাটি উদ্ভিদের জন্য উপযোগী হয়ে ওঠে।

চারাগাছে কীটনাশক স্প্রে করা হলে তা মাটিতে পৌঁছে মাটির পোকামাকড় ও অণুজীবদের মেরে ফেলে।মাটিতে ব্যবহৃত সিনথেটিক সারের ভেতর থাকে নানা প্রকার লবন, যা মাটিতে বসবাসকারী পোকা ও অণুজীব মেরে ফেলতে পারে ও গাছের ক্ষতি করতে পারে। সিনথেটিক সার মাটির উর্বরতা বৃ্দ্ধি করতে পারে না।

আসুন জেনে নেই পুষ্টিসমৃদ্ধ মাটি বলতে কী বোঝায়?

মাটির উল্লেখযোগ্য ৪টি দিক রয়েছে।

মাটির উপাদানের আকার এবং গঠন,

পি এইচ,

জৈব পদার্থ ও

উর্বরতা।

মাটির উপাদানের আকার ও গঠনঃ

আকারের দিক বিবেচনা করলে বেলে মাটি আকারে সবচেয়ে বড়, দো আঁশ মাটি মাঝামাঝি এবং এঁটেল মাটি সবচেয়ে মসৃণ। আর

মাটির গঠন বলতে মাটি কিভাবে লেগে থাকে তা বুঝায়। এটি নিজে পরীক্ষা করেই যাচাই করা যায়। কিছুটা ভেজা মাটি হাতে নিয়ে বলের আকারের মতো করুন। এখন এতে আঙ্গুল দিয়ে সামান্য চাপ দিতেই যদি ভেঙ্গে যায় তবে এটি বেলেমাটি। এটি যদি আরো চাপ নিতে পারে তাহলে এটি দো আঁশ মাটি আর যদি চাপ দেয়ার পরও না ভাঙ্গে তাহলে এটি এঁটেলমাটি। এভাবে সহজেই মাটির প্রকারভেদ আপনি জানতে পারবেন।

বাগানের জন্য ভালো মাটি সাধারনত ভঙ্গুর হয়। এতে করে গাছের মূল, বাতাস ও পানি সহজেই প্রবেশ করতে পারে।

দুই ভাবে মাটির গঠন আরও উন্নত করা যায়ঃ

প্রথমত, মাটিতে বসবাসকারী পোকামাকড়। এরা মাটির ভেতরে চলাচল করে এবং বাতাস ও পানির প্রবেশ্যতা বৃদ্ধি করে।

দ্বিতীয়ত, জৈব পদার্থ। এরা যে কোনো রকমের মাটির জন্য ভালো।গাছের পাতা, সার এগুলো মাটির জৈব পদার্থ বাড়াতে সাহায্য করে।

আপনি মাটি চাষ করার মাধ্যমেও মাটি চারার জন্য উপযোগী করে তুলতে পারেন। কিন্তু চাষ করার কুফল হল এতে মাটি ভেঙ্গে যেতে পারে ও মাটির পোকামাকড় মারা যেতে পারে। তাই বাগানের মাটি নিয়মিত চাষ করা উচিত না।

মাটির পি. এইচ. : পি. এইচ. হল মাটির অম্লতা (৭ এর নিচে) অথবা ক্ষারতার (৭ এর বেশি) পরিমাপক। বেশিরভাগ বাগানের গাছই মাঝামাঝি মানের পি. এইচ. এর জন্য উপযোগী। আবার কিছু কিছু গাছের জন্য নির্দিষ্ট মানের পি. এইচ. দরকার। যেমন বেগুন গাছের জন্য পি. এইচ. এর মান ৭ এর বেশি হলে ভালো হয়। আবার পি. এইচ. এর মান ৭ এর কম হলে সেখানে ব্লুবেরী ভালো হয়। আপনি বাগানের বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন মানের পি. এইচ. এর মাটি ব্যবহার করতে পারবেন।

সাধারনত আপনার বাগানের গাছগুলো যদি স্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকে তাহলে আপনার বাগানের মাটির পি. এইচ. ঠিক আছে বলে ধরে নিতে পারেন। আর যদি স্বাভাবিকভাবে বাড়তে না থাকে তাহলে মাটির পি. এইচ. এর জন্য পরীক্ষা করানো উচিত। মাটির পি. এইচ. এর মান যদি উপযুক্ত সীমার মাঝে না থাকে তাহলে আপনি মাটিতে যতই সার বা জৈব পদার্থ দিন না কেন, গাছ কখনই মাটি থেকে তার দরকারী পুষ্টি পাবে না।

বাজারে নানা রকমের পি. এইচ. পরিমাপক যন্ত্র পাওয়া যায়। আপনি বাগানের কিছু মাটি নিয়ে আশেপাশের কোনো মাটি পরীক্ষার অফিসেও পি. এইচ. এর পরীক্ষা করাতে পারেন। মাটির পি. এইচ. এর মান জানতে পারলে এরপর সহজেই তা প্রয়োজন মতো পরিবর্তন করতে পারবেন। পি. এইচ. এর মান বাড়াতে চাইলে চুন এবং কমাতে চাইলে সালফার যোগ করা হয়ে থাকে। কতটুকু কমাতে বা বাড়াতে হবে তা আপনি মাটি পরীক্ষা করেই জানতে পারবেন।

চুন অথবা সালফার যোগ করে পি. এইচ. এর মান পরিবর্তন করা একটি দীর্ঘমেয়াদী কাজ। খু্ব তাড়াতাড়ি এর ফলাফল পাওয়া যায় না। তাই কিছু দিন পর পর মাটি পরীক্ষা করাতে হয় যাতে পি. এইচ. এর মান খুব বেশি পরিবর্তন হয়ে না যায়।

সবশেষে আলোচনা করব জৈব সার নিয়ে। তার আগে একটা কথা বলে রাখি। জৈব পদার্থ বাগানের জন্য এত বেশি উপকারি যে, এর উপকার না নেয়াটা-ই একরকমের বোকামী। জৈব পদার্থ ছাড়া কোনো বাগানই সম্ভব না। পচাঁনো জৈব পদার্থ থেকে পাওয়া উপাদান গাছপালা খেয়ে থাকে। দূর্ভাগ্যজনকভাবে অনেকেই সচরাচর বাগানে কোনো মরা গাছ দেখলে তা সরিয়ে ফেলেন, যা উচিত না। বরং এগুলোকে বাগানের মাটিতে পরে থাকতে দিলে সেটা বাগানের মাটিকে পুষ্টি দেয়ার পাশাপাশি মাটির ক্ষয় রোধ করতে ও আর্দ্রতা রক্ষা করতে সাহায্য করবে।

বাগানের মাটিতে জৈব পদার্থ প্রয়োগ করলে তা মাটির গঠনের উন্নতি ঘটায় ও পোকামাকড়ের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মাটিতে যত বেশি মাটির জন্য উপকারী অণুজীব থাকবে, ততই কম ক্ষতিকর পদার্থ থাকবে। মাটির জন্য উপকারী অণুজীবগুলো ক্ষতিকর পদার্থগুলো খেয়ে ফেলে। তারা মারা যাবার পর তাদের মৃতদেহ হতে মাটি পুষ্টি পায়। কিছু কিছু জৈব পদার্থের ভেতর এমন কিছু অম্ল থাকে যা গাছের মূলকে পানি শোষন করার জন্য আরো বেশি উপযোগী করে তোলে। এই অম্ল খনিজ পদার্থগুলোকে মাটিতে দ্রবীভূত করে গাছের খাবার হিসেবেও উপযোগী করে তোলে।

জৈব পদার্থের প্রকারভেদঃ

কম্পোস্টঃ

কম্পোস্ট হল জৈব পদার্থের সবচাইতে সহজ রূপ। যে কোনো জৈবিক পদার্থ পঁচে গেলে তা থেকে কম্পোস্ট পাওয়া যায়। আপনি নিজেই এটি বানাতে পারেন অথবা দোকান থেকে কিনতে পারেন। এটি দেখতে অনেকটা মাটির মতই। এটি যে কোনো সময় বাগানে প্রয়োগ করা যাবে। এছাড়াও ঘাস, লতাপাতা, সবজির ফেলে দেয়া অংশ কম্পোস্ট হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

সারঃ

পশুপাখির বর্জ্য সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে যে সারটি যেন কমপক্ষে ৬ মাস থেকে ১ বছর পুরনো না হয়। নয়তো এটি গাছের ক্ষতি করতে পারে।

সবুজ সারঃ

সবুজ সার মানে কিন্তু সবুজ রঙের সার নয়। এগুলো হলো গাছের সেই অংশ যা পরবর্তীতে জমিতে সার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এটি সবজি বাগানের জন্য বেশি উপযোগী। যেমন- ধৈঞ্চা।

মোট কথা, ভালো মাটির জন্য পুষ্টি হল আবশ্যিক উপাদান। মানুষের মতই গাছেরও বেড়ে উঠতে ও বিভিন্ন রোগ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পুষ্টির প্রয়োজন। মাটি থেকে যে পুষ্টি নিয়ে নেয়া হয়, মাটিতে জৈব সার প্রয়োগ করে তা আবার ফিরিয়ে দেয়া হয়। জৈবিক সার খুব ধীরে ধীরে কাজ করে। এতে করে মাটিতে কোন আকষ্মিক পরিবর্তন হয় না।

স্বাস্থ্যকর, উপযোগী মাটি তৈরি করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। মাটি ভালো হলে খুব সহজেই একটি ভালো বাগানের আশা করা যায়। তাই গাছ রোপণ কিংবা বীজ বপন করার পূর্বে সবার আগে যার দিকে নজর দেয়া উচিত তা হলো মাটি।

আজ এ পর্যন্তই.......

শুভরাত্রি।।

©কাফাসো

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login