আসসালামু আলাইকুম সবাইকে। আজকের পর্বে আলোচনা করব কচু নিয়ে। আরেহ ভুল বুঝবেন না। অনেক সময় আমরা রেগে গেলে কচু বলি অথচ কচুর মতো গুণসম্পন্ন শাক খুব কম আছে। সবুজ এবং কমলা জাতীয় শাক সবজিতে প্রচুর পরিমাণ ভিটামিন এ থাকে। কিন্তু কচুতে ভিটামিন এ এর পাশাপাশি ভিটামিন বি, ভিটামিন সি, ক্যালসিয়াম ও লৌহ আছে। কমবেশি সবাই জানি ভিটামিন এ রাতকানা প্রতিরোধ করে, ভিটামিন সি ক্ষত সারাতে সাহায্য করে।
ছোটবেলা থেকেই এই কচু খাওয়ানোর উপকারিতা অনেক। তাছাড়া আয়রন বা লৌহ শরীরের রক্তশূন্যতা প্রতিরোধ করে। গর্ভবতী নারীর জন্য কচু ভীষণ উপকারী।
কচুর ডাঁটায় প্রচুর পরিমাণ পানি ও আঁশ থাকে যা হজমে সহায়তা করে। জ্বরের সময় কচু খেলে দ্রুত জ্বর কমে যায়। এছাড়াও আছে ফোলেট ও থায়ামিন নামক গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কচু রক্তের কোলেস্টেরল লেভেল কমায়। ওল কচুর রস উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য বেশ উপকারী। নিয়মিত কচু খেলে কোলন ক্যান্সার ও ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি কমে। কান ও গলার রুক্ষতা কমে।
এত এত গুণ! এখন আপনারাই বলেন কথায় কথায় কচু বলে যারা কচুকে অপমান করেন সেটা কি ঠিক? সে যাগগে, এইদেশে কচুর দাম না থাকলেও দেশের বাইরে কিন্তু কচুর বিচরণ বেশ লক্ষণীয়। বিশ্বে কচু উৎপাদনে শীর্ষ দেশ হচ্ছে নাইজেরিয়া। প্রতি বছর প্রায় ৩৩ লক্ষ মেট্রিক টন কচু উৎপাদন করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় কচুর পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে লতি উৎপাদন করা হয়। লতি উৎপাদনে বিখ্যাত বাংলাদেশের জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলা। দেশের চাহিদা পূরণ করে বিদেশেও রপ্তানি হয় এই লতি। বিগত কয়েকটা বছর গ্রেট ব্রিটেন, সৌদি আরব, কুয়েত, কাতারসহ বেশ কয়েকটা দেশে এই লতি রপ্তানি করা হচ্ছে।কৃষিতে কচুর ভূমিকা একেবারেই কিন্তু ফেলনা নয়।
আসুন জেনে নেই কিভাবে বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কচু চাষ করা হয়। যদিও দেশের বিভিন্ন জায়গায় জঙ্গলের আনাচে কানাচে কচুর বাস তবুও জমিতে কচু চাষ প্রণালীর কিছু অংশ তুলে ধরছি।
কচু চাষের জন্য মাটির ধরন পলি দো আঁশ অথবা দো আঁশ হলে ভালো হয়। অপেক্ষাকৃত নিচু জমি কচু চাষের উপযোগী। কার্তিক মাস অর্থাৎ মধ্য অক্টোবর থেকে মধ্য নভেম্বর মাসে কচু লাগানো যায়। দক্ষিণাঞ্চলে অবশ্য সারাবছর কচু চাষ করা যায়।
প্রতি শতকে ১৫০ টি লতা প্রয়োজন। জমি ভালোভাবে তৈরি করে লাইন থেকে লাইনের দূরত্ব ২ ফুট, আর দুটো গাছের মধ্যবর্তী দূরত্ব ১.৫ ফুট রাখতে হয়।
সার ব্যবস্থাপনা:
সাধারণত ইউরিয়া, টিএসসি, এম ও পি এবং জৈব সার ব্যবহৃত হয়। ইউরিয়া সার ২-৩ কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হয়। প্রথম প্রয়োগের ২০-২৫ দিন পর দ্বিতীয় প্রয়োগ দরকার হয়।
সেচ এবং আগাছা ব্যবস্থাপনা:
সচরাচর অন্যান্য শাকসবজি চাষে গাছের গোড়ায় দীর্ঘদিন পানি জমলে পচন ধরে। কিন্তু কচুর ক্ষেত্রে জমিতে পানি জমা রাখতে হয়। লতিরাজ কচু চাষে দাঁড়ানো পানির গভীরতা ৮-১০ সে. মি. হয়। অনেকেই ভাবতে পারেন দাঁড়ানো পানি আবার কী জিনিস রে ভাই? স্টাগন্যান্ট ওয়াটার বা দাঁড়ানো পানি হলো জমিতে পানি জলাবদ্ধ অবস্থায় থাকা।
রোগ ব্যবস্থাপনা:
কচুপাতার মড়ক রোগ খুব কমন একটা রোগ। কিন্তু কিভাবে বুঝবেন এটাই মড়ক রোগ! কচুর পাতায় প্রথমে গোলাকার বেগুনি থেকে বাদামী দাগ হয়। ক্রমান্বয়ে সেই দাগ বড় হতে হতে পাতা ঝলসে যাওয়ার মতো দেখায়। উচ্চ তাপমাত্রা, আর্দ্র আবহাওয়া, টানা ৩-৪ দিন বৃষ্টি হলে এ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এর প্রতিকার খুব কঠিন কিছু না।
প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম রিডোমিল এম জেড ৭২ ডব্লিউ অথবা ডায়াথেন ৪৫ মিশিয়ে ১৫ দিন পর পর ৩-৪ বার এপ্লাই করতে হবে।
লতিরাজ কচু থেকে ২ থেকে ৭ মাস লতি সংগ্রহ করা যায়।
এবার আসি কচুর ফুল প্রসঙ্গে। জীবনে কে কে কচুর ফুল দেখেছেন? সাধারণত বর্ষাকালে কচুর ফুল দেয়া যায়। ফুল ফোটার সময় হচ্ছে সন্ধ্যাবেলা। রাত যত গভীর হয়, ফুল থেকে দুর্গন্ধ ছড়ার মাত্রা তত বাড়ে। তাও আবার মাংস পঁচা গন্ধ! ইন্টারেস্টিং না?
আজ এ পর্যন্তই.....
শুভ রাত্রি।।