আমার ভিতরে কী কয়েকজন বাস করে।
একজন প্রতিরাতে চাবি গিলে ফেলে,
যাতে সকালে কেউ আর খুঁজে না পায় নিজেকে।
একজন ঘুমোয় আলো নিভিয়ে,
তার কানের কাছে রাতভর আরেকজন বলে,
তুই ঘুমাবি না, আজ রাতে ঘরে আগুন লাগবে।
আরেকজন শুধু আয়নার ভেতর থাকে,
সেখান থেকে বের হয় না কখনো।
তার একটা চোখ বন্ধ থাকে, সে চোখটা মনে হয় অন্ধ।
একটা ফাঁকা দোলনা, যেখানে শৈশব নয়,
অপরাধের ফিরিস্তিগুলো দোল খায়।
ভিতরে কেউ একজন রাতদিন কাঁদে,
গহীন অতলে, শব্দ ছাড়াই।
পাতালে যেমন চিৎকারের শব্দ যায় না,
তেমনি তার কান্না গায়ে লাগে না কারো।
তাকে আমি, কখনোই আমি বলি না।
আমি কেবল তার ছায়া কুড়িয়ে রাখি, মাঝে মাঝে দেখি।
একটা পুরনো বাক্সে সে কাঁথামুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকে।
যার ঢাকনা খুললে বেরিয়ে আসে
চড়ুই পাখির ঠোঁটের চাঞ্চল্য আর এক ঝড়ো উন্মাদনা।
ভিতরে একজন সব ভুলে যায়,
তার চারপাশে শুধু মুছে ফেলা মুখের রেখা।
যেন কেউ পেন্সিলে তাকে একটা জীবন এঁকে দিয়েছিল,
এখন রাবার ঘষছে নিঃশব্দে সেখানে।
কখনোই তারা একে অপরকে বোঝে না,
শুধু মাঝরাতে কেউ দরজা খুলে দাঁড়িয়ে থাকে,
যেন তারা সবাই বাইরে বেরোতে চায়।
অথচ তারা কেউই জানে না, দরজার বাহিরে রাস্তা নাই।
সেটি আসলে আরেকটি ঘর।
ভিতরে আরো একজন আছে,
যে আমার নাম জানে না।
সে প্রতিদিন নতুন নামে ডাকে আমাকে,
নতুন ভাষায়,
নতুন শব্দে,
তাকে আমি শুধরে দেইনা কোনোদিন।
প্রতিদিন এক নতুন নামেই আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি।
তারা কেউই আমাকেই চেনে না,
তবু আমার হাত ধরে হাঁটে,
আমার চোখ দিয়ে দেখে,
আমার বুক থেকে ছেঁড়া স্বপ্ন নিয়ে
পাখির মত উড়ে যায় অচেনা কোনো জগতে,
কিছুক্ষণ পর ফিরে আসে।
ফিরে এসেই বলে, ঘুরে এলাম। সারা জগত একই।
আমি কেবল দরজা গুনে রাখি।
এক, দুই, তিন, অসংখ্য দরজা।
কোনো দরজার ওপাশে মুক্তি নেই,
তবু প্রতিটি কাঠের গায়ে ভিন্ন ভিন্ন ঠিকানা।
সেখানে নিঃশব্দ কান্নার দাগ,
একটি চিবুকের রেখাচিত্র,
মাঝে মাঝে শুকিয়ে যাওয়া রক্তের দাগ।
আমার ভেতরের একজন
প্রতিদিন ঘুমিয়ে পড়ে আলোয় মুখ রেখে,
রাতভর জেগে থেকে আমাকে উপদেশ দেয়।
আমি কেন এই বাস্তুজগতে পড়ে আছি, এই প্রশ্ন করে।
আর শেষজন,
অন্ধকারে বসে বসে সময়কে তসবিহ বানিয়ে গুনতে থাকে।
কোন প্রহরে আমাকে যমদূত এসে আমার সাথে সাক্ষাৎ করবে।
যেন মৃত্যুই তার একমাত্র চিন্তার বিষয়।
আমি জানি না কে জেগে ওঠে সকালে,
কে পড়ে থাকে বিছানার নিচে কাপড়ের স্তূপের ভেতর।
তবে জানি,
প্রতিটি ভোরে একটি করে আত্মা নিঃশব্দে ঝরে পড়ে,
যেমন পাখির পালক।
আর অন্য এক আমি,
প্রতিদিন নদীর তলার পাঁক থেকে উঠে আসি ধীরে,
নতুন এক ব্যথার ছায়া নিয়ে,
যা দিনের আলোয় ধরা পড়ে না,
রাত্রির ঘরে শব্দহীন পদক্ষেপে আলো জ্বালিয়ে বসি।
আর অপেক্ষা করি,
আজ আবার আমার ভেতর নতুন কেউ আসবে!
Comments
Be this story’s first reader
+40 XPNobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.
Sign in to claimFirst reader
You were first.
+0 XP
Yours is the first word this story has heard. Its writer will see it.
You also earned the First Reader honour.