Story

গল্প হারানোর গল্প

October 17, 2026

8 views

সৌরভ একটি গল্প লিখেছে সম্প্রতি। ফিকশন, নন-ফিকশন সে প্রায়শই লেখে। পত্র-পত্রিকায় ছাপাও হয়। কিন্তু এবার একটা অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে। সৌরভের মা খাতাটা হাতে নিয়ে বলেছেন, তিনি কিছু দেখতে পাচ্ছেন না। প্রথমে সে ভেবেছিল, মায়ের চশমার পাওয়ার হয়ত বেড়েছে। ডাক্তার দেখাতে হবে।

তারপর ছোটবেলার বন্ধু তমালকে পড়তে দিয়েছে। কিন্তু সেও পড়তে পারেনি। তার ভাষ্যমতে, খাতার কাগজটা ফাঁকা ছিল। সেখানে কোনো গল্প ছিল না।

সেটা কিভাবে সম্ভব! গত সপ্তাহে ড্রাফট লেখার পর থেকে সে অন্তত সাত-আট বার বিভিন্ন শব্দ পরিবর্তন করেছে, বানান ঠিক করেছে। তাছাড়া সে নিজেতো গল্পটা দেখতে পাচ্ছে।

মায়ের না হয় চোখ খারাপ কিন্তু তমালের? গল্পটা সবার চোখে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার আগেই সে গুগল ডকে তুলে ফেলে। তড়িঘড়ি করে লেখা তোলা শেষে ফাইল এটাচ্ করে একটা মাসিক পত্রিকায় পাঠিয়ে দেয়। পত্রিকার সম্পাদক কবির ভাই এর আগেও তার চার-পাঁচটি লেখা প্রকাশ করেছেন। প্রশংসাও করেছেন। তারপর নিশ্চিন্ত হয়ে গভীর একটা ঘুম দেয়। যেন বহুদিন ঘুম অপেক্ষা করে ছিল কবে তার লেখা শেষ হবে।

এরপর প্রায় দুই মাস পার হয়ে গেছে। আরও কয়েকটি গল্প, ফিচার লেখা হয়েছে। একইসাথে সমকালীন লেখকদের লেখাও পড়া চলছে। মাকে চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। পাওয়ার সামান্য বেড়েছে, কিন্তু একেবারেই দেখতে পান না তা নয়। ডাক্তার মাকে চোখের ওপর কম প্রেশার দিতে বলেছেন।

কবির ভাইয়ের সাথে অনেকদিন কথা হয়নি। লেখাও ছাপা হয়নি। লেখার বিষয়ে কথা বলার জন্য সৌরভ ফোন করে।

খুবই আশ্চর্যের বিষয়-তিনি জানান, প্রায় দুই মাস আগে একটি ইমেইল পেয়েছিলেন, কিন্তু গল্পের কোনো অ্যাটাচমেন্ট ফাইল পাননি । এসব শুনে সৌরভ গভীর দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। ভাবে, সেই গল্পটিসহ সাম্প্রতিক আরও যা কিছু লেখা হয়েছে, তা কাছের দুয়েকজনকে দেখাবে। ছোটবেলা থেকে অল্প-বিস্তর লেখালেখি করতো সে। কিন্তু গল্প তার কাছে আসতে শুরু করে, খুব বেশিদিন হয়নি। বছর তিনেক হবে। এরমধ্যে খানিকটা অপ্রত্যাশিতভাবে অল্পদিনের ব্যবধানে পত্র-পত্রিকায় তার লেখা ছাপা হতে শুরু করেছে।

ঘটনার শুরু হয়েছিল প্রতিশ্রুতির মধ্য দিয়ে। যদিও কেউ বিশ্বাস করবে না। সে স্বপ্নে একজনকে কথা দিয়েছিল, লেখার ব্যাপারে আজীবন সৎ থাকবে, চেষ্টাও করেছিল। কিন্তু হয়ে যায় এসব।

প্রথমে ছোট দুটো ঘটনা ঘটে। একজন সম্পূর্ণ নতুন লেখক একটা লেখা দেখতে দেয় তাকে। দেখার মতো তেমন কিছু ছিল না। খুব নতুন হলে যেমন হয় আর কি। ভাষাটা স্রোতস্বিনী নদীর মতো নয়। বরং স্রোত বারবার বাঁধা পেলে যেমন হয়, অনেকটা সেরকম।

কিন্তু গল্প ইউনিক ছিল। সৌরভ জানতো এই গল্প ছেলেটা তুলতে পারবে না, ওয়েস্ট হবে। গান যেমন নিজের গলায় তোলার ব্যাপার থাকে, গল্পের ক্ষেত্রেও ঠিক তাই। অনেক দিন লেখাটা সে ফেলে রাখে। তারপর জানায়, এরকম গল্প আর ভাষা আজকাল চলে না, বরং এ ধরনের প্লট অনেকেই লিখে গেছেন।

পরে একদিন সে নিজেই সেই প্লটের ওপর চমৎকার ভাষা শৈলী ব্যবহার করে, অপূর্ব একটা গল্প লিখেছে। তার সেই লেখা ভাগ্যক্রমে খুব নামী, স্টাইলিশ একটি মাসিক পত্রিকার বিশেষ সংখ্যায় স্থান পেয়েছে। তারপর এরকম আরও দুয়েকটি ঘটনা ঘটেছে।

তবে সবচেয়ে খারাপ কাজ হয়েছে অন্য একভাবে। সে ঘটনায় পরে আসছি। আপাতত সৌরভ তার সাম্প্রতিক লেখাগুলো নিয়ে কি করছে, সেখানে ফেরত যাই। আচ্ছা, যা বলছিলাম।

সৌরভের ক্লাসমেট নিশাত। নিশাতের সাথে তার ঠিক প্রেমের সম্পর্ক নেই আবার আছেও। ক্লাস ছাড়া দুজনের খুব একটা দেখা হয় না। তাছাড়া সৌরভ জানে ওদের পরিবার খুব রক্ষণশীল। তাই ভালো লাগার কথাটা কখনোই বলা হয়ে ওঠেনি। নিশাতের সাথে সে এই সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চায় দুটি কারণে।

এক, নিশাত নিজে লেখালেখি করে না।

দুই, সে নির্ভরযোগ্য। অতএব মিথ্যা বলবে না।

পরের সপ্তাহে দুজনের টিএসসিতে নিরিবিলি বসার সুযোগ হয়। অবশ্য খুব বেশিক্ষণ কথাবার্তা হবার আগেই অন্য বন্ধু-বান্ধবরাও একজন দুজন করে আসতে থাকে। তবে যে উদ্দেশ্যে তারা বসেছিল, সে বিষয়ে কথা হয়েছে। খুব বেশিক্ষণ বলার কিছু ছিল না। কারণ সৌরভের সেইভ করা লেখার ফোল্ডারগুলো সব ফাঁকা। গল্পের নাম ছাড়া আর কিছুই নেই সেখানে।

এরপর থেকে সৌরভ আর কিছুই লিখতে পারছে না। তার মনে হচ্ছে, সে লিখলেও কেউ দেখতে পাবে না। এসব ভাবনা থেকে দূরে থাকার জন্য নিজেকে পড়াশোনায় ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করে সে।

দিনে মোটামুটি ব্যস্ত থাকলেও রাত নির্ঘুম কাটে। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভেবে এর কারণ খুঁজে পায় না। গুগলে তার সমস্যা নিয়ে সার্চ করতে থাকে। কোনো কিছু খুঁজে পায়না। অবশেষে, এ আইকে প্রশ্ন করে।

উত্তর আসে-এ রকম হতে পারে। কিন্তু কেন, তার উত্তর আসে না। সে খানিকটা কিউ ধরিয়ে দিলে আবার উত্তর আসে। একসময় সে খেয়াল করে তার দেয়া তথ্য থেকেই এ আই উত্তর দিচ্ছে। অতঃপর এসব বাদ দেয়। এভাবে প্রায় সাত-আট মাস চলে গেছে। একটি বর্ণও লেখা হয়নি। কিন্তু দুর্বোধ্য, অসম্পূর্ণ স্বপ্ন দেখা থেমে নেই।

এরমধ্যে এক রাতের স্বপ্ন খুব স্পষ্ট ছিল। স্বপ্নে সে দাঁড়িয়েছিল একটা সুনসান নদীর তীরে। দুই হাতের তালুতে ছিল কলিজা। এরপর জাগ্রত অবস্থায় অনেকদিন এর অর্থ খোঁজার চেষ্টা করেছে সে।

নদীর তীরে সৌরভ একা ছিল। হ্যাঁ, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যে ভঙ্গিতে দুহাতের তালুর মধ্যে কলিজা ধরে ছিল, তাতে মনে একটা শব্দ আসে। অফারিং।

এ পর্যন্ত ভেবে গা ঘিন ঘিন করে ওঠে ওর।

তাই এসব নিয়ে ভাবা বন্ধ করে দেয়। হঠাৎ একদিন তার মাথায় আসে, কলিজা কেন? এত কিছু থাকতে কলিজা কেন ছিল তার হাতে? স্বপ্নটা একেবারে অবান্তর মনে হয়। তারপর ভাবে, ওটা কলিজা না হয়ে আত্মাও তো হতে পারে।

কিছুদিন পরের ঘটনা।

খুব গরম পড়েছিল সেদিন, স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি। সেরকম এক দিনে ফুলের দোকানে এক বড় ভাইয়ের সাথে দেখা হয়। দেখা মাত্র প্রথম যে কথাটা তার মাথায় আসে তা হলো, ফুল আপনাকে মানায় না।

অল্প কুশল বিনিময় শেষে ভদ্রলোক চলে যান। যাওয়ার আগে বলেন, 'তোমার কাজটা খুব ভালো হয়েছিল। এরকম কাজ আরো করতে চাইলে এসো আমাদের অফিসে। ভালো পেমেন্ট আছে।'

কাজটা তেমন কিছু ছিল না। অতীতের ওপর একটা ফ্রেম বসাতে হবে। বসাতে হবে এমনভাবে যেন ছবির মধ্যকার এক বিশেষ জনকে খুব ভালো মনে হয়। ও সেভাবেই করেছিল। দারুণ ফিডব্যাক পাওয়া গিয়েছিল লেখা প্রকাশের পর। কিন্তু ও নিজে জানতো ফ্রেমটা একটু এদিক বা ওদিকে বসালে গল্প অন্যরকম হতে পারতো।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login