জীবন এখন অস্তাকাশে। অপেক্ষা শুধু ডুবে যাওয়ার। জীবনকে দীর্ঘ বলতেই হয়। নইলে সৃষ্টিকর্তার প্রতি অকৃতজ্ঞতা হবে। এতটা পথ পেরিয়ে এসেছি, কত রকম অভিজ্ঞতা, কত মানুষের সান্নিধ্য, কত প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, কত আনন্দ-বেদনা, কত উত্থান-পতন—সব মিলিয়ে জীবনকে ছোট বলার উপায় নেই। জীবনের কাছে আমার চাওয়া খুব বেশি ছিল না। তবু জীবনই আমাকে তার নিজের মতো করে অনেক কিছু দিয়েছে।
এই দীর্ঘ জীবনে বহুমাত্রিক বিষয় নিয়ে অধ্যয়ন করতে হয়েছে। স্কুল-কলেজের বিজ্ঞান, বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি, তারপর কর্মজীবনে প্রশাসন, অর্থ, ব্যবস্থাপনা—কত কী! জীবিকার প্রয়োজনে, দায়িত্বের তাগিদে, কখনো সময়ের দাবিতে, কখনো পরিস্থিতির চাপে কত বিষয় যে জানতে হয়েছে, বুঝতে হয়েছে, আত্মস্থ করতে হয়েছে।
কিন্তু এত সব বিষয়ের ভিড়ে একটি বিষয় ছিল, যা কোনো কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত না হয়েও সব সময় আমার সঙ্গে থেকেছে। অক্ষর থেকে শব্দ, শব্দ থেকে বাক্য, আর বাক্য থেকে অর্থ অনুধাবন করতে শেখার পর থেকেই সে আমার সঙ্গী। জীবনের নানা ব্যস্ততা, পড়াশোনার চাপ, পেশাগত দায়িত্ব, সংসারের হিসাব-নিকাশ—কোনো কিছুই তাকে আমার জীবন থেকে পুরোপুরি সরিয়ে দিতে পারেনি।
সে ছিল সাহিত্য। আমার একান্ত নিজস্ব এক জগৎ।
সেখানে আমি যেমন পাঠক, তেমনি কখনো কখনো লেখার চেষ্টা করা একজন মানুষ। এই জগৎ আমাকে কী দিয়েছে, তার বিবরণ অবান্তর। শুধু এটুকু বলতে পারি, জীবনের অন্য সব পরিচয়ের আড়ালে যে মানুষটি নিভৃতে বেঁচে থেকেছে, সাহিত্যই তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে। সাহিত্যের কাছে এই বেঁচে থাকার ঋণ স্বীকার করছি।
হ্যাঁ, সাহিত্য ছাড়া ছিলাম না কখনোই। এখনও আছি সাহিত্যের সঙ্গে, অথবা বলা যায়, সাহিত্যই আছে আমার সঙ্গে।
লিখেছি। সেই ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র অবস্থায় লেখার শুরু। তারপর পুরো ছাত্রজীবনজুড়েই লেখালেখি অব্যাহত ছিল। কখনো কবিতা, কখনো গল্প, কখনো মনের মধ্যে জমে থাকা কিছু কথা, যা অন্য কোনোভাবে প্রকাশ করতে পারতাম না। লিখেছি, কিন্তু লেখক হব—এমন কোনো আকাঙ্ক্ষা নিয়ে নয়। লিখেছি মূলত লেখার আনন্দে, পড়তে পড়তে, সাহিত্যকে ভালোবাসতে ভালোবাসতে। কখনো মনে হয়েছে, কিছু একটা না লিখলে ভেতরে জমে থাকা কথাগুলো কোথাও আটকে থাকবে। আবার কখনো লিখেছি নিছকই ভালো লাগা থেকে।
সাহিত্যের সঙ্গে থাকতে থাকতে লেখার অভ্যাসটিকে একধরনের সংক্রমণই বলা যায়, অনেকটা রোগের মতো। নাম দেওয়া যেতে পারে—লেখারোগ। আমার জন্য রোগটা অবশ্য কখনোই এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি যে নিজেকে সাহিত্যিক তো দূরের কথা, লেখক বলেও দাবি করতে পারি।
বোধের উন্মেষের পর থেকেই যদি আমার জন্মকে ধরি, তবে সেই জন্মের সঙ্গে সাহিত্য জড়িয়ে আছে। যে মানুষ সাহিত্য নিয়ে থাকে, সাহিত্য নিয়ে বাঁচে, সাহিত্য নিয়েই যাপন করে তার জীবন, সাহিত্যের জন্য তার দরদ কতটা হতে পারে, তা নিশ্চয়ই আলাদা করে বলার অপেক্ষা রাখে না।
পূর্ণ নিঃস্বার্থ কোনো ভালোবাসা, যার বিনিময়ে কিছুই প্রত্যাশা নেই, সেই ভালোবাসার বিষয়টিকেই যদি একদিন নিজের ভাবনার সম্পূর্ণ বিপরীত কোনো রূপে দেখতে হয়, কেমন লাগে তখন?
আমি আমার ভালোবাসার সাহিত্যজগতের কথা বলছি। বলছি বাংলা সাহিত্যের কথা। আজ এই বাংলা সাহিত্যের কিম্ভুত রূপ দেখে আমি মর্মাহত। বেদনায় ক্লিষ্ট ও ক্লান্ত।