শহরের এই সাতষট্টি নম্বর ফ্ল্যাটের সিলিং ফ্যানটা গ্রীষ্মের পুরোটা সময় ঘড়ির কাঁটার উল্টো দিকে ঘুরে ঘুরে যেন কেবলই হিসাব মেলাচ্ছিল কত ঘণ্টা ফুরোল, কত কিউবিক মিটার অক্সিজেন বিনা মূল্যে ফুসফুসে টেনে নেওয়া হলো।
তপুর বয়স এখন আটত্রিশ। এই বয়সটাকে জীবনের মধ্যাহ্ন বলা চলে না, বরং বলা যায় এক অন্তহীন ধূসর গোধূলি, যেখানে আলোও নেই, ঘুটঘুটে অন্ধকারও নেই।
টেবিলের ওপর জমে থাকা ধুলোর আস্তরণ প্রমাণ করে, তপু গত কয়েক দিন ধরে ঘর পরিষ্কার করার তাগিদ হারিয়ে ফেলেছে। কিংবা বলা ভালো, পরিপাটি রাখার যে সামাজিক ভণ্ডামি, তা থেকে সে ইস্তফা দিয়েছে।
তপু বিছানা ছেড়ে উঠে বসল। ঘরের কোণে আলমারির হাড়কাটা আয়নায় নিজের মুখটার দিকে এক পলক তাকাল। মনে হলো, আয়নায় যে লোকটা দাঁড়িয়ে আছে, সে তপু নয়। তপুরই এক অবিকল ছায়া, যে বহু বছর আগে মরে ভূত হয়ে গেছে। প্রয়োজন ছাড়া যার খোজখবর এই দুনিয়ার কেউ নেয় না। অভ্যাস ও দায়িত্বের চাপে ছায়াটা কেবল হেঁটে বেড়াচ্ছে।
তপু পকেট থেকে একটা পুরোনো নোটবুক বের করল। পাতার পর পাতা জুড়ে কেবল হিসাব কত টাকা লোন শোধ করতে হবে, মায়ের ওষুধের খরচ, ছোট বোনের পড়ার টিউশনের বকেয়া। এই সংখ্যাগুলোর যোগফলই কি মানুষের জীবন? জন্মের সনদ থেকে শুরু করে ডেথ সার্টিফিকেট পর্যন্ত মানুষের পুরো অস্তিত্বটা কি কেবল কয়েকটি নির্দিষ্ট কলামের যোগ-বিয়োগের খাতা ছাড়া আর কিছু নয়?
তপু আর পারছে না। জীবনের ম্যারাথনে দৌড়াতে দৌড়াতে সে এখন ভিষণ ক্লান্ত। তার জীবনের প্রতিটি পশম যেন জানে যে, সে হার মেনে নিয়েছে।
আজ অবশ্য অফিসে যায়নি সে। কোনো ছুটির আবেদনপত্র জমা দেয়নি, এমনকি কাউকে একটা ফোন করেও জানায়নি যে সে আজ অনুপস্থিত। আলসেমি নয়, একটা অদ্ভুত ভ্রান্তি তাকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। গত কয়েক দিন ধরে তার মাথায় একটা সূক্ষ্ম সুতোর মতো চিন্তা ঘুরছিল। সব যদি এক ঝটকায় কেটে ফেলা যায়, কেমন হয়?
ঘরটা ছিমছাম। দেয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটার পাতা এখনো গত মাসের শেষ দিনে আটকে আছে। টেবিলের ওপর একটা ঠান্ডা চায়ের কাপ পড়ে আছে, চায়ে মাছি বসেছে কি বসেনি, তাতে তপুর আর কোনো আগ্রহ নেই। ড্রয়ারের ভেতর বহু যত্নে লুকিয়ে রাখা নাইলনের ভারী রশিটা আজ আর লুকিয়ে রাখার প্রয়োজন পড়ছে না। ওটা টেবিলের ওপর দিব্যি কুঁকড়ে শুয়ে আছে, যেন একটি পোষা অজগর সাপ।
তপু জানলার ধারে গিয়ে দাঁড়াল। বিকেল গড়িয়ে আসছে। পশ্চিমের আকাশে মেঘের আড়ালে সূর্যটা আজ কেমন যেন অদ্ভুত সুন্দর হয়ে উঠেছে। নিচের রাস্তায় একটা ফেরিওয়ালা যাচ্ছে বেলুন বিক্রি করতে। ছোট একটা বাচ্চা মায়ের হাত ধরে বেলুনের জন্য বায়না ধরেছে। দৃশ্যটা বড় চেনা। ঠিক এই দৃশ্যটা তপু তার শৈশবে বহুবার দেখেছে। তখন পৃথিবীর প্রতিটি জিনিস তার কাছে রঙিন মনে হতো। অথচ আজ এই চেনা শহরের ইট-কাঠ-পাথরের জঙ্গলটা তার কাছে একটা দমবন্ধ করা কারাগার ছাড়া আর কিছু নয়।
তার মৃত্যুর পর কে কী বলবে এই চিন্তাটা একবার মাথায় এসেছিল। মা হয়তো দু ফোঁটা চোখের জল ফেলবেন, বোনটা হয়তো একটু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলবে, "ভাইয়ার মাথাটা আসলেই আউরে গিয়েছিল।" আর অফিস? পরদিন ঠিকই অন্য কাউকে তার ডেস্কে বসিয়ে দেওয়া হবে। পৃথিবী এতটুকুও থামবে না। ঘড়ির কাঁটা ঠিক নিয়মমতো টিকটিক করে চলবে। বন্ধুরা জানাযায় আসবে। নামায শেষে সবার চোখের আড়ালে গিয়ে বিড়ি ফুকবে। তার নামে দু একটা সুনাম করবে কিংবা বদনাম। তপু এইসব দেখবে, শুনবে। এই উপলব্ধিটাই তপুকে সবচেয়ে বেশি মুক্তি দিচ্ছিল। মানুষ বড় একা। জন্মানোর সময় সে একা আসে, যাওয়ার সময়ও তাকে একাই যেতে হয়। মাঝখানের এই ভিড়টুকু কেবলই মায়ার একটা অভিনয়।
তপু টেবিলের কাছে ফিরে এলো। রশিটার দিকে তাকিয়ে তার ঠোঁটে একটা ম্লান হাসি ফুটল। আত্মহত্যার সিদ্ধান্তটা হুট করে নেওয়া নয়, এটি দীর্ঘদিন ধরে তিলে তিলে জমানো অভিমানের ফল। জীবনের সাথে কোনো আপস না করার এক অদ্ভুত জেদ।
সে যখন টেবিলের ওপর রাখা টুলটার ওপর উঠে দাঁড়াল এবং গলার কাছে রশির ফাঁদটা মেলাতে গেল, ঠিক সেই মুহূর্তেই কলিংবেলটা বেজে উঠল।
রিংটোনটা দুবার বেজে থেমে গেল। তপু চমকে উঠল। এই বিকেলে কে আসবে? ল্যান্ডলর্ড কি ভাড়ার তাগাদা দিতে এল?
বেলটা আবার বাজল। এবার একটু দীর্ঘ এবং বিরক্তিকর শব্দে।
তপুর হাতটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। ফাঁদটা আলগা হয়ে কাঁধে ঝুলে পড়ল। সে টুল থেকে নেমে এসে দরজার দিকে এগোলো। ভেতর থেকে একটা তীব্র রাগ হচ্ছিল তার ওপর মরার সময়টুকুও কি এই দুনিয়াটা শান্তিতে দেবে না মানুষের?
দরজা খুলে তপু দেখল, দাঁড়িয়ে আছে পাশের ফ্ল্যাটের সেই আট-নয় বছরের ছোট্ট মেয়েটা। রিমঝিম। বৃষ্টির দৃশ্যের মতো সুন্দর সে। সবসময় যেন মেয়েটার চোখে ময়ূর নাচে।
রিমঝিমের হাতে একটা কাচের ছোট বাটি। মেয়েটা মিষ্টি হেসে বলল, "ভাইয়া আম্মা পায়েস রান্না করেছে। আমার তো কোনো ভাই নাই, তাই আম্মাকে অনুরোধ করেছিলাম আপনাকে একটু পাঠাতে। আপনিও তো আমাকে মাঝেমধ্যে চকলেট কিনে দেন, বেলুন কিনে দেন। তাই আমিও এইটা আপনাকে রিটার্ন গিফট দিলাম। গরম গরম খেয়ে দেখুন তো কেমন হয়েছে?"
তপু কিছুক্ষণ পলকহীন তাকিয়ে রইল মেয়েটার মুখের দিকে। রিঝিমের চোখ যেন দুঃখহীন কোনো অরন্য ঘেরা পাহাড়। যেখানে একরাশ শিশুর সরলতা আর অফুরন্ত কৌতূহলে উড়ে যাচ্ছে গুচ্ছিত মেঘ....
তপু হাত বাড়িয়ে বাটিটা নিল। কাচের বাটিটা এখনো বেশ গরম। হাতের তালুতে সেই উষ্ণতাটুকু ছড়িয়ে পড়ল।
"ভাইয়া, আপনার শরীর খারাপ নাকি? মুখ এমন ফ্যাকাশে লাগছে কেন? জ্বর উঠেছে? রিমঝিম অবাক হয়ে জানতে চাইল।
তপু এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। সে শুকনো গলায় হাসার চেষ্টা করে বলল, "না রে, একটু ঠান্ডা লেগেছে বোধহয়। ঠিক হয়ে যাবে...
"আচ্ছা তাহলে তাড়াতাড়ি খেয়ে নেবেন। আম্মা বলেছে বাটিটা যেন কাল সকালে ফেরত দিই।" বলে মেয়েটা খিলখিল করে হাসতে হাসতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
তপু দরজা বন্ধ করে ফিরে এলো ঘরের ভেতর। টেবিলের ওপর সেই রশিটা পড়ে আছে, আর তার পাশেই রাখা আছে ধোঁয়া ওঠা পায়েসের বাটি। রশির ওপরে তির্যক আলো পড়েছে পড়ন্ত বিকেলের।
সে টুলের ওপর আর উঠল না। ধীর পায়ে চেয়ারে বসে চামচ দিয়ে এক চামচ পায়েস মুখে তুলল। দুধ, চাল আর চিনির নিখুঁত একটা স্বাদ জিভে ছড়িয়ে পড়ল। তার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। চোখ দিয়ে অঝরে ঝড়তে লাগলো বৃষ্টি। অদ্ভুত এক ভালোলাগায় তার বুকটা ভারী হয়ে এল। জীবনটা হয়তো সত্যিই বড় অর্থহীন এবং নিষ্ঠুর, কিন্তু ওই সামান্য পায়েসের বাটি আর একটা ছোট্ট মেয়ের সরল মুখের হাসির কাছে ওই মুহূর্তে সমস্ত মৃত্যুচিন্তা কেমন যেন ফিকে হয়ে গেল।
জানলার বাইরে অন্ধকার নেমে আসছে। শহরটা তার হাজারটা নিয়ন আলো জ্বালিয়ে প্রস্তুত হচ্ছে রাতের অভিনয়ের জন্য। তপু রশিটাকে টেনে ড্রয়ারের একেবারে কোণায় ঢুকিয়ে দিল। আজ আর নয়। হয়তো কাল দেখা যাবে।
এরপর হাতের কাছে গিটারটা কাছে টেনে নিল সে। গুনগুনিয়ে গাইতে লাগলো—
I see trees of green, red roses too
I see them bloom for me and you
And I think to myself
What a wonderful world..