শাপলা, দাঁড়িপাল্লা আর হারানো নৌকার গল্প

October 22, 2026

41 views

গল্পটা শুরু করি একটা নদী দিয়ে। সাড়ে চার দশক ধরে এই নদীতে দুটো নৌকা বৈঠা চালিয়ে আসছে। একটার নাম নৌকা, অন্যটার ধানের শীষ। দুই মাঝির টানাটানি দেখতে দেখতে ঘাটের মানুষ ক্লান্ত হয়েছে, ভয় পেয়েছে, আবার আশাও করেছে। ইদানীং নদীতে দুটো নতুন পাল দেখা যাচ্ছে, দাঁড়িপাল্লা আর শাপলা কলি। লোকে ফিসফিস করছে, এরা কি এবার নদীটাই নিয়ে নেবে?

মজার কথা হলো, এই নতুনদের ভাগ্য ঝুলে আছে এমন একজনের হাতে, যে এখন নদীতেই নেই। সে নৌকা।

নৌকা যদি জলে নামে, যাত্রী তার দশ-পনেরো জনই হোক, তবু তার ছায়া এত লম্বা যে পুরো নদীর হিসাব পাল্টে যায়। তখন যে মানুষ দাঁড়িপাল্লার ভক্ত, সে-ও ঘাটে নৌকা দেখে ধানের শীষের দিকে হাল ঘোরায়। শাপলার সমর্থক হলেও তাই। কারণ তার ভেতরে জমে আছে অনেক বছরের মার খাওয়ার স্মৃতি। সে ভাবে, নৌকার ঝড় থেকে বাঁচাতে পারে কেবল ধান।

কিন্তু নৌকাকে যদি ঘাটে বেঁধে রাখা হয়, তখন কী হয়?

তখন ভয়ের পাহারাটা যেন সরে যায়। যে ভোটার সারা জীবন ধানের শীষে সিল মেরেছে, সে হঠাৎ একটু ভাবতে শুরু করে। একটু অন্যদিকে গেলে কেমন হয়? এই সামান্য ভাবনা থেকেই এবার দাঁড়িপাল্লা-শাপলার ঘরে উঠেছে ৩৭.৫ শতাংশ ভোট। সংখ্যাটা ছোট নয়। ১৯৯১ সালে ৩০.৮ শতাংশ নিয়ে বিএনপি সরকার গড়েছিল, ১৯৯৬ সালে ৩৭ শতাংশ নিয়ে আওয়ামী লীগ।

তবে হিসাবটায় একটা খটকা আছে। নৌকা যদি ঘাটে বাঁধা না থাকত, এই ৩৭.৫ কি ঘরে উঠত? অনেক বিশ্লেষকের ধারণা, উঠত না। কারণ ভোটারদের একটা অংশ শুধু নতুন স্বাদের লোভে বা পুরনো দলের ওপর রাগ করে ভোট দেয়নি। তারা ভোট দিতে সাহস পেয়েছে, কারণ এবার হাসিনার ভয়টা ছিল না।

আবার ভয়ের একটা উল্টো পিঠও আছে। হাসিনার ভয় ফুরোনোয় বিএনপির পুরনো ভোটারদের কেউ কেউ মুখ ফিরিয়েছে, ঠিক। কিন্তু অন্য পিঠে কাজ করেছে জামায়াতের ভয়। সেই ভয়ে আওয়ামী ঘরানার ভোটার আর সংখ্যালঘুরা এসে দাঁড়িয়েছে ধানের শীষের ছায়ায়। এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় বিএনপি পেয়েছে প্রায় ৭৯ শতাংশ ভোট, আর যেসব আসনে হেরেছে সেখানেও ৭০ শতাংশের কাছাকাছি। ভয় এবার দুই দিকেই ভোট টেনেছে।

মানচিত্রটা খুলে দেখলে আরও মজা। দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, টাঙ্গাইল, জামালপুর, হবিগঞ্জ, ফরিদপুর আর উত্তর চট্টগ্রাম ছিল আওয়ামী লীগের পুরনো ঘাঁটি। এবার সেখানে বিএনপি জিতেছে বিশাল ব্যবধানে। জামায়াত শুধু হারেনি, দাঁড়াতেই পারেনি। ঠাকুরগাঁও-২, দিনাজপুর-৬ আর দিনাজপুর-১ আসনে একসময় লড়াই হতো আওয়ামী লীগ বনাম জামায়াতের। এবার নৌকার ভোট গড়িয়ে গেছে ধানের শীষে, আর সেখানেও জামায়াত হেরেছে।

সীমান্তের ওপারে পশ্চিমবঙ্গে এই গল্প আগেই লেখা হয়ে গেছে। যেসব আসনে তৃণমূল আর বামের টক্কর ছিল, সেগুলো গত দুইবার গেছে বিজেপির ঝুলিতে। লোকে তাকে বলে, বামের ভোট রামে গেছে।

উল্টো দিকে আরেক ছবি। যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ছিল বিএনপির একচেটিয়া জমিদারি। এবার সেখানে নিশান উড়িয়েছে জামায়াত। শহরের ভোটেও ভাগ বসিয়েছে, কিছুটা সরকারবিরোধী মনোভাবের জোরে।

এখন দুই প্রধান খেলোয়াড়ের মাথায় কী চলছে, সেটা ভাবুন।

জামায়াত, শোনা যায়, কিছুতেই চায় না আওয়ামী লীগ ফিরে আসুক। ২০২৫ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়ার পর তারা সোজা নির্বাচনের মঞ্চে উঠে পড়ে। তাদের হিসাব নাকি ২০৩১ পর্যন্ত এই পরিস্থিতি টিকিয়ে রাখা। কারণ তারা জানে, ভোটের পথে ক্ষমতা বদলালে আওয়ামী লীগের ফেরার পথ বন্ধ। শেখ হাসিনা ফিরতে পারেন শুধু তখনই, যখন নির্বাচন ছাড়াই সরকার পড়ে যাবে। তাই সরকার না পড়ুক, এটাই জামায়াতের স্বার্থ।

বিএনপিও জানে, ভোটের অঙ্ক হাসিনাকে ফেরার জায়গা দেয় না। বলা হয়, নেতৃত্ব বদলে ক্ষমা চেয়ে ফিরলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মীমাংসায় বসতে বিএনপি রাজি ছিল। কিন্তু হাসিনা ক্ষমা চাইতে নারাজ, তিনি চান তারেক রহমানকে সরিয়ে নিজে তাড়াতাড়ি ক্ষমতায় বসতে। সে দাবিতে বিএনপির কাছ থেকে এক ইঞ্চি জায়গাও মিলবে না।

জামায়াতের বেলায় বিএনপির চালটা আরও সূক্ষ্ম। রাজপথে বাধা নেই, কিন্তু প্রতিষ্ঠান, এস্টাব্লিশমেন্ট আর ব্যবসায় জামায়াতের শিকড় গজাতে দেওয়া হবে না। ধর্ম আর মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে খোঁচা চলবে, যাতে আওয়ামী সমর্থক আর সংখ্যালঘুদের জামায়াত-ভীতি জিইয়ে থাকে এবং তারা ধানের শীষেই ভোট দেয়। অঙ্কটা সোজা। এই দুই দল থেকে ১২-১৩ শতাংশ এলেই চলে, কারণ ঝড় যতই উঠুক, বিএনপির নিজের অনুগত ভোট প্রায় ৩৫ শতাংশ।

তবু মঞ্চে দাঁড়ালে বিএনপি আওয়ামী লীগকে গাল দেবেই, হাসিনার ভয় দেখিয়ে নিজের সমর্থকদের গরম রাখবে। বলবে, জামায়াতের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আঁতাত। জামায়াতও ঠিক একই কথা শোনাবে বিএনপিকে। দুই দলের মুখে একই সংলাপ।

এর নাম ডেমোগ্রাফির রাজনীতি, ভোটারের মনের মানচিত্র দেখে চাল দেওয়া। এতে নিয়ম ভাঙার কিছু নেই, এটাই খেলার নিয়ম। জামায়াত যে বিএনপির কড়া সমালোচনা করেও আওয়ামীবিরোধী ভোটারের মন রাখতে জিয়াউর রহমান আর খালেদা জিয়াকে নেতা মেনে চলে, সেটাও এই খেলারই অংশ। এনসিপিও একই পথে হাঁটছে। তাদের বাড়তি পুঁজি একটাই শব্দ, জুলাই।

শেষ হাসি কে হাসবে, জানি না। ঘাটে বাঁধা সেই নৌকার দড়ি কে খুলবে, আর কে তাতে আরেকটা গিঁট দেবে, তা-ও জানি না। শুধু জানি, নদীতে জোয়ার আসে, ভাটাও আসে। আর নদী সব মনে রাখে, কে কবে কোন ঘাটে নেমেছিল, কার পালে কখন হাওয়া লেগেছিল।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+20 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login