Critic

মাদ্রাসাশিক্ষা, আধুনিকতা ও শিক্ষার একীকরণ

October 23, 2026

153 views

  • ​ঔপনিবেশিক পরাজিত মনস্তত্ত্ব ও ঐতিহাসিক উদ্ভব: কওমি ও আলিয়া—উভয় মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থাই ১৮৫৭ পরবর্তী ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক আমলের এক গভীর পরাজিত ও পলায়নপর মনস্তত্ত্ব থেকে উদ্ভূত। ঔপনিবেশিক শক্তির মুখোমুখি হয়ে কওমিরা আধুনিক বিজ্ঞান, আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামো ও বিশ্বব্যবস্থাকে সম্পূর্ণ বর্জন করে অতীতের গণ্ডিতে আত্মগোপন করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের এই বর্জনের নীতি দীর্ঘমেয়াদে টেকেনি; পরবর্তীতে তাদেরও সরকারি স্বীকৃতি ও সনদের পেছনে ছুটতে হয়েছে। অন্যদিকে, আলিয়ারা আধুনিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার মাঝে একটি আপস বা আধা-গ্রহণ ও আধা-বর্জনের মধ্যপন্থী ভ্রম বেছে নেয়। এই দ্বৈত নীতি কোনো পূর্ণাঙ্গ আধুনিক নাগরিক তৈরি করতে পারেনি, আবার খাঁটি সনাতন গবেষণার ধারাকেও রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছে।

  • ​আলিয়া শিক্ষার সাফল্য বনাম মূলধারার প্রভাব: আলিয়া মাদ্রাসা থেকে পাস করা শিক্ষার্থীরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য অর্জন করছেন—যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম স্থান অধিকার করা, অক্সফোর্ডে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ, গবেষণায় অবদান রাখা বা বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক আন্দোলনের মাস্টারমাইন্ড হওয়া। তবে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই শিক্ষার্থীরা এসব সফলতা অর্জন করেছেন আলিয়া মাদ্রাসার নিজস্ব কাঠামোর কারণে নয়, বরং তারা মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে মূলধারার উন্মুক্ত, যুক্তিনির্ভর ও আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ার পর।

  • ​স্কুল-কলেজ পাঠ্যক্রমে সমন্বয়ের সুযোগ: যদি সাফল্য অর্জনের মূল চাবিকাঠি মূলধারার আধুনিক শিক্ষাই হয়, তবে শৈশব থেকেই ‘মাদ্রাসা’ নামক পৃথক শিক্ষাকাঠামোর কোনো উপযোগিতা থাকে না। সাধারণ স্কুল ও কলেজের পাঠ্যক্রমে ১-২টি ধর্মীয় বিষয় ঐচ্ছিক হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করলেই একজন শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয় ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার চাহিদা পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব। প্রান্তিক বা গ্রামের স্কুলগুলোতেও এই একই মডেল বাস্তবায়ন করা যায়, যার ফলে পৃথক প্রশাসনিক ব্যয় ও সামাজিক বিভাজনমূলক মাদ্রাসা কাঠামোর আর কোনো যৌক্তিকতা থাকে না।

  • ​বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েটদের তুলনামূলক দক্ষতা: প্রথাগত ফাজিল ও কামিল পাস করা ডিগ্রিধারীদের তুলনায় মূলধারার পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ, ইসলামিক হিস্ট্রি অ্যান্ড কালচার, আরবি, ফার্সি বা উর্দু বিভাগ থেকে পাস করা গ্রাজুয়েটরা সমাজে অনেক বেশি মানসম্মত ভূমিকা রাখতে পারেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কেবল ধর্মীয় গ্রন্থই পড়েন না, তারা আধুনিক সামাজিক বিজ্ঞান, লিবারেল আর্টস ও গবেষণাপদ্ধতির সংস্পর্শে আসেন। ফলে ধর্মীয় ও সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে তারা যে সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে বিশ্লেষণ করতে পারেন, প্রথাগত ফাজিল-কামিল পাস মোল্লাদের পক্ষে তা সম্ভব হয় না।

  • ​হাফেজি সেকশন ছাড়া শিক্ষার আধুনিকায়ন: ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে একমাত্র পবিত্র কোরআন মুখস্থকরণের (হাফেজি) ক্ষেত্রটি একটি নির্দিষ্ট ও বিশেষায়িত দক্ষতাভিত্তিক চর্চা। হাফেজি সেকশন ছাড়া হাদিস, তাফসির, ফিকহ বা ধর্মীয় কাঠামোর বাকি সব পড়াশোনাই সাধারণ স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর ভেতরে খুব সহজে বিন্যস্ত করা সম্ভব।

  • ​উচ্চতর বিশেষায়ন ও গবেষণার বিন্যাস: হাদিস বা তাফসিরের মতো বিষয়ের গভীর গবেষণার জন্য আন্ডারগ্রাজুয়েট বা মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই পৃথক মাদ্রাসা থাকার কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ নেই। বিশ্বজুড়ে জ্ঞানের প্রতিটি বিশেষায়িত শাখা যেভাবে পরিচালিত হয়—অর্থাৎ মূলধারা শেষে স্নাতকোত্তর বা পিএইচডি পর্যায়ে—ঠিক একইভাবে হাদিস বা তাফসিরের মতো বিষয়েও উচ্চতর গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোর অধীনেই হওয়া উচিত।

  • ​মোড়ে মোড়ে জামেয়া ও মুফতি তৈরির সামাজিক প্রভাব: প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় বা মোড়ে মোড়ে তথাকথিত ‘জামেয়া’ (বিশ্ববিদ্যালয়) প্রতিষ্ঠা করা এবং ঘরে ঘরে প্রাতিষ্ঠানিক ‘মুফতি’ বানানোর সংস্কৃতি জ্ঞানচর্চার কোনো মান বৃদ্ধি করে না। বরং এটি নিম্নমানের সনদধারী একটি বিশাল বেকার গোষ্ঠী তৈরি করছে, যা সমাজে উগ্রতা, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং মনস্তাত্ত্বিক বিভাজন বৃদ্ধিতে ইন্ধন জোগাচ্ছে।

  • ​রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক প্রভাব: টঙ্গীর সাম্প্রতিক ঘটনা সহ বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে দেখা যায়, হাফেজি বা সাধারণ ধর্মীয় শিক্ষার আড়ালে অনেক মাদ্রাসার অভ্যন্তরে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ও চরমপন্থী মতাদর্শিক (যেমন—জামায়াত সংশ্লিষ্ট) নেটওয়ার্ক কাজ করে। সাধারণ মানুষ বাহ্যিক দ্বীনি পরিবেশ দেখে এটি অনুধাবন করতে পারে না এবং অনেক সময় অন্ধ ধর্মীয় সংহতির জায়গা থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষপাতিত্ব করে বসে, যা রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় ঝুঁকি।

  • ​একীভূত শিক্ষাকাঠামোর ঐতিহাসিক কোর্স কারেকশন: ঔপনিবেশিক আমলের ভুল ও দ্বৈত শিক্ষাব্যবস্থা পেছনে ফেলে একটি একীভূত মূলধারার শিক্ষাকাঠামো চালু করাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। বিচ্ছিন্ন মাদ্রাসা ব্যবস্থার বিলোপ ঘটিয়ে, সাধারণ স্কুলে প্রয়োজনীয় ঐচ্ছিক ধর্মীয় বিষয় যুক্ত করা এবং উচ্চতর ধর্মীয় গবেষণাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পিএইচডি লেভেলে নিয়ে আসাই হলো একমাত্র সমাধান। দুনিয়াকে পূর্ণাঙ্গভাবে গ্রহণ করে এই পলায়নপর শিক্ষানীতিকে বিদায় জানানোই ঐতিহাসিক ভুল সংশোধনের একমাত্র পথ।

Picked up where you left off

Comments

Habib Rahman was this story’s first reader

+40 XP

    Please login to post comment. Login

  • Habib Rahman 6 days ago First reader

    বিভিন্ন ধারার শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা ভালো ছিল। বেশ বিস্তারিতভাবে ভালো খারাপ ও ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।

    • তাহসিন আরিফ হিমেল (INNOVA JOURNAL) 5 hours ago

      MR Habib Rahman, আপনাকে ধন্যবাদ,,আপনাদের উৎসাহ পেলে সামনে এগিয়ে যেতে চাই