ভাঙা ঘর থেকে স্বপ্নের শুরু
সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে এক প্রত্যন্ত জনপদে আমার জন্ম। নদী, নোনা পানি, কাদামাটি আর অভাবের মধ্যেই আমার শৈশব কেটেছে। আমাদের ঘর ছিল ভাঙাচোরা। দারিদ্র্য আমাদের জীবনে মাঝে মাঝে আসেনি, বরং ছোটবেলা থেকেই সেটাই ছিল আমাদের বাস্তবতা।
আমরা চার ভাই, দুই বোন। বড় ভাই, মেজ ভাই, তারপর আমি - আমাদের গ্রামের ভাষায় সেজ। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে পড়াশোনার সুযোগ পেয়েছিলাম মূলত আমি। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ট্যালেন্টপুল বৃত্তি পেয়েছিলাম। পুরো এলাকায় আমিই একমাত্র বৃত্তিপ্রাপ্ত ছাত্র ছিলাম। মানুষ বলত, আমি একদিন বড় হব। কথাগুলো শুনে ভালো লাগত, আবার কষ্টও হতো। মনে হতো, আমি যে সুযোগটা পেয়েছি, আমার ভাই-বোনেরা কেন সেই সুযোগ পেল না?
আমাদের সংসারে অভাব ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। অনেক সময় ঘরে চাল থাকত না, তরকারিও থাকত না। মা অন্যের বাড়ি থেকে চাল ধার করে আনতেন। সেই চালেই আমাদের ভাত হতো। স্কুলের বেতন দেওয়ার সামর্থ্য ছিল না, তাই বিনা বেতনে পড়েছি। বাবা পড়াশোনার ব্যাপারে খুব যত্নবান ছিলেন, আবার বেশ কঠোরও ছিলেন। তখন তাঁর কঠোরতা বুঝতাম না, এখন মনে হয়, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁরও হয়তো অনেক স্বপ্ন ছিল।
পঞ্চম শ্রেণি পাস করে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উঠলাম। কিন্তু নতুন ক্লাসের পড়া আমার কাছে কঠিন মনে হতে লাগল। বই কেনার টাকা ছিল না। অন্যের কাছ থেকে ধার করে বই এনে পড়তাম। পড়াশোনায় ফল খারাপ হতে শুরু করল। ছোট বয়সেই একসময় মনে হয়েছিল, হয়তো আমার পড়াশোনা আর এগোবে না।
২. মায়ের কান্নায় ভেজা শৈশব
আমার শৈশবের সবচেয়ে কষ্টের স্মৃতি দারিদ্র্য নয়, আমার মা।
ছোটবেলা থেকেই দেখেছি, বাবার হাতে মা নির্যাতিত হচ্ছেন। ঘরে ঝগড়া, অশান্তি আর মায়ের কান্না আমার শৈশবের পরিচিত বিষয় হয়ে উঠেছিল। আমি তখন খুব ছোট। মাকে রক্ষা করার মতো শক্তি ছিল না, বাবার সামনে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সাহসও ছিল না। তাই শুধু দেখতাম। অনেক সময় ভয়ে চুপ করে থাকতাম, কখনো একা একা কাঁদতাম।
একজন শিশুর কাছে তার ঘরই সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হওয়ার কথা। কিন্তু আমার ঘরেই আমি দেখেছি একজন মায়ের অসহায়ত্ব। এই দৃশ্যগুলো আমার মনে এত গভীরভাবে দাগ কেটেছে যে আজও সেগুলো ভুলতে পারিনি।
দীর্ঘদিনের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের কারণে একসময় মা মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেন। বাবাও অসুস্থ হয়ে পড়লেন। যে মা অন্যের বাড়ি থেকে চাল ধার করে এনে আমাদের খাওয়াতেন, সেই মা একসময় নিজের মনটাই হারিয়ে ফেললেন। ছোটবেলার এই কষ্ট আজও আমার জীবনের সবচেয়ে ভারী স্মৃতিগুলোর একটি।
বড় হতে হতে আমি বুঝতে শুরু করি, শুধু পারিবারিক সমস্যা নয়, সমাজের কিছু ভুল ধারণাও নারীদের অনেক কিছু সহ্য করতে বাধ্য করে। কখনো সামাজিক নিয়মের কথা বলা হয়, কখনো পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, আবার কখনো ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা ব্যবহার করা হয়। এসব দেখে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছে - একজন নারী কেন অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারবে না?
আমি ধর্মের বিরুদ্ধে নই। আমি ধর্মের অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে। আমার এই অবস্থান কোনো বই পড়ে তৈরি হয়নি। এর শুরু আমার নিজের ঘর থেকে, আমার মায়ের কষ্ট থেকে।
৩. আইলার ঢেউ ও ১৯০০ টাকার আলো
২০০৯ সালে আইলা আমাদের এলাকার জীবনকে অনেকটাই বদলে দিয়েছিল। জলোচ্ছ্বাসে ঘরবাড়ি, রাস্তা, স্কুলসহ অনেক কিছু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চারপাশে ছিল ধ্বংসের চিহ্ন। তারপরও পড়াশোনা চালিয়ে যেতে হয়েছে। ভাঙা রাস্তা দিয়ে স্কুলে গেছি, ভাঙা পরিবেশের মধ্যেই পড়েছি। স্বাভাবিকভাবে পড়াশোনায় তার প্রভাব পড়েছিল এবং ফলও ভালো হয়নি।
এরপর নবম শ্রেণিতে উঠলাম। সামনে এল রেজিস্ট্রেশনের সময়। প্রয়োজন ছিল ১৯০০ টাকা। আমাদের পরিবারের আর্থিক অবস্থা এমন ছিল যে এই টাকা জোগাড় করাও কঠিন হয়ে গেল। বাবার পক্ষে টাকা দেওয়া সম্ভব ছিল না। আমার নিজেরও কোনো উপার্জনের পথ ছিল না। মনে হচ্ছিল, টাকার অভাবে এবার হয়তো পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে।
ঠিক তখনই আমাদের গ্রামের বড় ভাই, শিক্ষক আবু ইসহাক শেখ আমাকে সাহায্য করলেন। তিনি আমার হাতে ১৯০০ টাকা তুলে দিলেন।
আজকের হিসেবে টাকার অঙ্কটি হয়তো খুব বড় নয়। কিন্তু আমার জীবনের সেই সময়ে ১৯০০ টাকা ছিল আমার পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ। তিনি সেদিন শুধু আমাকে টাকা দেননি, আমার স্বপ্নটাকেও বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন।
আজ তিনি পদ্মপুর শান্তিময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক। তাঁর প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা কোনোদিন শেষ হবে না। আমি সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আবু ইসহাক শেখ ভাইকে সুস্থ রাখেন, ভালো রাখেন এবং দীর্ঘ জীবন দেন।
৪. অচেনা শহরে একা পথচলা
২০১১ সালে এসএসসি পরীক্ষায় পাস করলাম। এত অভাব, পারিবারিক সমস্যা আর প্রতিকূলতার মধ্যে এসএসসি পাস করাটাই আমার কাছে বড় একটি অর্জন ছিল।
পাস করার পর কয়েকজন বড় ভাইয়ের কাছ থেকে খুলনার কথা শুনে সেখানে চলে এলাম। শহরটি আমার কাছে একেবারেই অচেনা ছিল। কী পড়ব, ভবিষ্যতে কী করব, কোন পথে গেলে জীবন বদলাবে - এসব কিছুই পরিষ্কার ছিল না।
আমার আপন চাচাতো ভাই আজিজুলের সহযোগিতায় একটি লজিংয়ের ব্যবস্থা হলো। দুই বেলা খাবারের বিনিময়ে দুই বেলা পড়াতাম। এভাবেই চলতে লাগল জীবন।
পরে কয়েকজন বড় ভাইয়ের সহযোগিতায় পলিটেকনিকে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করি। ফল প্রকাশের পর দেখি, সরকারি পলিটেকনিকে ইলেকট্রনিক্সে আমার সুযোগ হয়েছে। খুব আনন্দ হয়েছিল। কিন্তু আশপাশের সবাই বলল, ইলেকট্রনিক্সে চাকরির সুযোগ কম, সিভিলে পড়লে ভবিষ্যৎ ভালো। তাদের কথায় বিশ্বাস করে আমি সিভিল বেছে নিলাম।
গ্রামের একজনের সহযোগিতায় একটি প্রাইভেট পলিটেকনিকে ভর্তি হলাম। পরে বুঝলাম, এটি আমার জীবনের একটি ভুল সিদ্ধান্ত ছিল। প্রতিষ্ঠানটিতে পড়াশোনার পরিবেশ খুব ভালো ছিল না।
পলিটেকনিকের সময়টা কেটেছে টিউশনি আর লজিংয়ের ওপর নির্ভর করে। বাড়ি থেকে কোনো টাকা আসত না। দূরে থেকে পড়াশোনা করা একজন ছেলের জন্য পরিবারের খোঁজখবরও অনেক বড় বিষয়। কিন্তু আমার জীবনে সেই যোগাযোগ খুব কম ছিল।
চার বছরের কোর্স শেষ করতে ২০১৮ সাল হয়ে গেল। কয়েকটি বিষয় আটকে থাকায় শেষ করতে আরও দুই বছর লেগে গেল। চার বছরের কোর্স শেষ করতে ছয় বছর সময় লেগেছিল। সময়টা আমার জন্য কষ্টের ছিল, কিন্তু আমি থামিনি। নিজের নামে কোনো ঋণও নিইনি।
৫. বিশ্বাসভঙ্গ থেকে নতুন স্বপ্ন
পড়াশোনা শেষ করার পর কয়েকটি কোম্পানিতে চাকরির চেষ্টা করলাম। পরে বাড়ি ফিরে গেলাম। তখন এক বন্ধু ভালো কাজের আশ্বাস দিয়ে আমাকে ঢাকায় নিয়ে এল।
ঢাকায় আসার মতো টাকা আমার হাতে ছিল না। আমার মেজ ভাই কামরুল অন্যের কাছ থেকে ধার করে আমাকে ২৫ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। তাঁর নিজেরও অভাব ছিল, তবু আমার ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি সেই টাকা জোগাড় করেছিলেন।
কিন্তু ঢাকায় এসে সেই বন্ধুর কাছ থেকেই প্রতারণার শিকার হলাম। প্রায় এক বছর কোনো কাজ পেলাম না। হাতে টাকা ছিল না, তার ওপর ভাইয়ের কাছ থেকে নেওয়া টাকার দায় ছিল। পরিস্থিতি এত কঠিন হয়ে গেল যে শেষ পর্যন্ত বাড়িতে ফিরে যেতে হলো।
তবে আমি আবার চেষ্টা শুরু করলাম। একটি কোম্পানিতে যোগ দিয়ে প্রায় দুই বছর সাইট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেছি। মাঠে কাজ করতে গিয়ে রোদ, ধুলো, চাপ এবং বাস্তব প্রকৌশল কাজের অনেক কিছু শিখেছি।
কিন্তু চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, আমার অনেক বন্ধু একে একে স্থায়ী জীবনে এগিয়ে যাচ্ছে। তখন নিজের ভেতরে একটা জেদ তৈরি হলো। মনে হলো, আমাকেও চেষ্টা করতে হবে।
২০২১ সাল থেকে সরকারি চাকরির প্রস্তুতি শুরু করলাম। লক্ষ্য ছিল দশম গ্রেডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী পদ। এরপর শুরু হলো আমার জীবনের আরেকটি দীর্ঘ অধ্যায়।
৬. চৌদ্দবারের ব্যর্থতা, অটুট স্বপ্ন
এক পরীক্ষা থেকে আরেক পরীক্ষা, এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তর - এভাবেই চলতে লাগল আমার পথচলা। অনেক পরীক্ষায় প্রিলিমিনারি পাস করেছি, লিখিত পাস করেছি। কিন্তু মৌখিক পরীক্ষার শেষ ধাপে গিয়ে বারবার থেমে গেছি। এমন হয়েছে ১৪টি পরীক্ষায়।
প্রতিবার মনে হয়েছে, এবার হয়তো হবে। আবার ফল প্রকাশের পর হতাশ হয়েছি। তারপরও কিছুদিন পর আবার বই খুলেছি, আবার প্রস্তুতি নিয়েছি। ব্যর্থতা আমাকে কষ্ট দিয়েছে, কিন্তু পুরোপুরি থামাতে পারেনি।
১৭ এপ্রিল ২০২৪। সকাল প্রায় এগারোটা। পরীক্ষা দিতে টঙ্গীর পথে যাচ্ছিলাম। সেই পথেই আমার ডান পায়ের গোড়ালি ভেঙে গেল। পরীক্ষার হলে যাওয়া আর সম্ভব হলো না। পায়ের ব্যথার সঙ্গে মিশে গেল আরও একটি ব্যর্থতার কষ্ট। কিন্তু সেদিনও আমার স্বপ্নটা ভাঙেনি।
জীবনের এই দীর্ঘ পথ আমাকে একটি প্রশ্নের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে - কেন একজন নারী নিজের ঘরের মধ্যেই নির্যাতনের শিকার হবে? কেন তাকে অন্যায় সহ্য করে যেতে হবে?
এই প্রশ্নের শুরু আমার মাকে দেখে। তাই নারীর প্রতি অন্যায়, সামাজিক বৈষম্য এবং ধর্মের অপব্যাখ্যার বিরুদ্ধে আমার যে ভাবনা, তার পেছনে রয়েছে আমার নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা।
ঢাকার ব্যস্ত জীবনে নিজের ভেতরের কথা বলার মতো মানুষ সবসময় পাশে পাইনি। তাই লেখালেখি শুরু করেছি। আমার কষ্ট, অভিজ্ঞতা, প্রশ্ন আর স্বপ্নগুলো এখন লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করতে চাই।
আমি চাই, আমার জীবনের গল্প শুধু আমার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকুক। কোনো দরিদ্র শিশু যেন অর্থের অভাবে তার স্বপ্ন হারিয়ে না ফেলে। কোনো নারী যেন নির্যাতনকে নিজের ভাগ্য বলে মেনে নিতে বাধ্য না হন। আর ধর্মের নামে কোনো অন্যায় যেন প্রশ্নের ঊর্ধ্বে না থাকে।
আমার সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি। সামনে কী আছে জানি না। হয়তো আরও ব্যর্থতা আসবে, হয়তো কোনো একদিন সাফল্যও আসবে। কিন্তু আমি জানি, আমার জীবনের প্রতিটি কষ্ট আমাকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে।
আমি এখনো পথে আছি।
আমার গল্প এখনো শেষ হয়নি।
আমি হারিনি। আমি শুধু পথ পেরিয়েছি।