Story

অন্য মা

October 24, 2026

20 views

১

ইদানীং অদ্ভুত সব চিন্তা আসে জামিলার মাথায়।

মাঝে মাঝে মনে হয় সে পাগল হয়ে যাবে।

আগে এমন ছিল না। বিয়ের ছয় মাস পর থেকে প্রথম এইসব শুরু হয়।

অথবা তারও অনেক আগে অল্প অল্প ছিল। যখন তাদের পরিবারে মহা-অশান্তি।

জামিলার বাবা সবার অজান্তে বাজারের নটিকে বিয়ে করে বছর দুয়েক পরিবারের সাথে যোগাযোগ বন্ধ রেখেছিলেন। তার মাথার গন্ডগোলটা সেই সময় শুরু হয়।

পাগলামি বলতে তেমন কিছু না। কে যেন মাথার ভিতর কথা বলতে থাকে। অন্য কেউ শুনতে পায় না। কিন্তু সে ঠিকই পায়। প্রথম দিকে সে তর্ক করত। এখন আর তর্কও করে না। বেশিরভাগ সময় চুপ থাকে।

পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়-স্বজনেরা কেউ বলে তাকে জ্বীনে ধরেছে; কেউ বলে জাদুর আছর।

সে একা হাসে, কথা বলে, রাগ হয়। এসব দেখে শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভয় পেত। পীর-ফকিরের কছে গেছে, কিন্তু লাভ হয়নি। পাগলামি বেড়ে গেলে বাপের বাড়ি ফিরে আসতে হয় তাকে। সাত বছরের সংসার জীবনে ছয় ও চার বছর বয়সের এক মেয়ে ও ছেলে সন্তান আছে তার। যখন সে সুস্থ থাকে, বাচ্চারা বেড়াতে আসে। সারাদিন এ বাড়িতে মায়ের সাথে সময় কাটিয়ে রাতে তারা ফেরত যায়।

আজ স্কুলের সরকারি ছুটির দিন। বাচ্চাদের আসার কথা।। কিন্তু আজকে জামিলার মাথাটা একদম ভালো নেই। সারারাত শয়তানটা তাকে ঘুমাতে দেয়নি। তার চিৎকারে বাড়ির লোকজনও ঘুমাতে পারেনি। শয়তানটা বাচ্চাদের দেখতে পারে না। ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলতে বলে। বেঁচে থাকলে ওরাও নাকি জামিলার মতো পাগল হবে।

ওর খুব ইচ্ছে করে বাচ্চাদের দেখতে। আবার শয়তানটা কে সে বিশ্বাস করে না। কখন কি করে বসে! জামিলা তার ঘর থেকে বিপজ্জনক সব জিনিস সরিয়ে রাখে। নেইল-কাটার, কলম, সুই, সুতা, কাঁচি যা যা ক্ষতিকারক মনে হয়; এমনকি ঢাকা দেয়া পানির গ্লাসটাও।

সকালে মায়ের সাথে রান্নাঘরে বাচ্চাদের জন্য একটু পায়েস আর মুরগির মাংস রেঁধেছে সে। নুডুলসের সবজিটা রেডি করে রেখেছে। মাথায় যন্ত্রণা না করলে জামিলার রান্না খুব সুস্বাদু হয়। তার স্বামী পছন্দ করতো।

ছেলে-মেয়েদের বাবা ফোন করেছিলো, রওনা হয়েছে। শ্বশুরবাড়ি থেকে তাদের বাড়ি বাসে ঘণ্টা দুয়েকের পথ।

জামিলা তৈরি হতে থাকে। শয়তানটা ভারি বিরক্ত করছে আজ। সবকিছু বাদ দিয়ে সে কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থাকে। ভাবে, একদম পাত্তা দেবে না। তাছাড়া বাচ্চারাও ভয় পেয়ে যেতে পারে তার পাগলামি দেখলে।

জামিলা অনেক চেষ্টা করতে থাকে ‘ওর’ কথার উত্তর না দিতে। এমন ভান করে যেন সে কিছুই শুনতে পাচ্ছেনা। ‘ও’ মানে সেই শয়তানটা। এর মধ্যে তার ছোট ভাই এসে একবার জিজ্ঞেস করে গেছে সব ঠিক আছে কিনা।

রাগটা বাড়তে থাকে। রাগের মধ্যেই সে একবার ভাবে মাথার কাছে থাকা কাঁসার গ্লাসটা সরিয়েছে কি না। ভাগ্যিস! সকালেই একটা লাল শাড়ি গায়ে দিয়ে অল্প যে ক’টা শাড়ি-কাপড় ছিল, পাশের ঘরে রেখে এসেছে। গাটা জ্বর-জ্বর লাগছে। ঘেমে-নেয়ে এক শা হয়েছে সে।

২

স্ত্রীকে গতবছর পাঠিয়ে দেয়ার পর আজকে সহ তিনবার হবে শরীফ বাচ্চাদের নিয়ে শ্বশুরবাড়ি যাচ্ছে। এছাড়া প্রায় প্রতিদিনই একবার করে তারা মায়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলে দাদুর অগোচরে। ছেলে-মেয়েদের কারণে পরিবারের হাজার নিষেধ সত্ত্বেও শরীফ জামিলার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করতে পারে না।

এতক্ষণে বাস প্রায় একঘণ্টার পথ এসেছে। সন্তানদের চোখেমুখে মাকে দেখার আকুলতা স্পষ্ট। মেয়েকে শরীফ একটা চিপস কিনে দিয়েছিল যা সে মায়ের জন্য নিয়ে যাচ্ছে। ছোট ছেলে কলায় কামড় দিতে দিতে পঞ্চমবারের মত জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা, আর কতদূর?’

শয়তানটা মাথার ভিতর ড্রাম বাজাচ্ছে। জামিলাকে কিছুতেই স্বস্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। একবার ভাবে বাচ্চাদের আসতে নিষেধ করবে। এদিকে একদমই সময় নেই হাতে। সে চায় না বাচ্চারা মাকে দেখে ভয় পাক।

সে বিছানা থেকে উঠে ঘরের দরজা আটকায়। বালিশের কভার দিয়ে কড়া দুটো শক্ত করে বাঁধে। নিজের হাত বাঁধার জন্য কিছু খুঁজে পায় না। তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে। কি করবে বুঝে উঠতে পারে না।

এলোমেলো কাপড়, চুল, উদ্ভ্রান্ত দৃষ্টি। জামিলাকে পাগলের মতো দেখায়।

কলবেল বাজে। বাচ্চাদের কচি গলার আওয়াজ শোনা যায়। সে শুধু একবার ফ্যানের দিকে তাকায়। বিছানার চাদরটা তোলে। ধীরে কিন্তু দৃঢ়ভাবে চেয়ারের উপর দাঁড়ায়। এরপর শুধু একটা কাজ ছাড়া জামিলার

আর কিছুই করার থাকে না।

পুনশ্চ: এটি আমার লেখা প্রথমদিককার একটি অণুগল্প যা সম্প্রতি সাহিত্যদেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। অবসরে পড়ার অনুরোধ থাকলো।

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+25 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login