লেখক - আপনি পড়েন?
বাংলা ভাষায় লেখালেখির পরিসরে একটা সাধারণ হতাশার উচ্চারণ বেশ তীব্র। সেটি হচ্ছে সাহিত্য পাঠাভ্যাস নিয়ে। আমরা তারস্বরে বলতে চাই, পাঠক নেই, পাঠক পড়ছে না, কিংবা নিদেনপক্ষে পাঠকের রুচি আর সাহিত্যাভিমুখী নয়। এর পেছনে কারণ হিসেবে দাঁড় করাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুতগতির কনটেন্ট, সংক্ষিপ্ত পাঠের অভ্যাস এবং বিনোদনের সহজলভ্যতাকে।
কারণ হিসেবে উচ্চারিত বিষয়গুলো হয়তো উড়িয়ে দেয়ার উপায় নেই। মানতে তো হবে, মানুষের মনোযোগের ধরন বদলাচ্ছে, অবসর ব্যবহারের অভ্যাস বদলাচ্ছে, পাঠের প্রতিদ্বন্দ্বীও বেড়েছে। প্রশ্ন হলো, এই পরিবর্তনগুলোকেই কি পাঠকহীনতার একমাত্র কারণ হিসেবে দেখব? পাঠকের রুচি বদলেছে বলেই কি আমাদের সাহিত্য পড়ার মতো থাকছে না, নাকি আমাদের সাহিত্যও পাঠকের সঙ্গে তার সংযোগ হারাচ্ছে? প্রশ্নটি অস্বস্তিকর। কারণ, এর উত্তর খুঁজতে গেলে কেবল পাঠকের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে নিজেদের দায় এড়ানো যায় না।
বাঙালির কিছু চারিত্রিক প্রবণতার মধ্যে অজুহাত একটা। অজুহাতের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, তা বিকাশের পথ রুদ্ধ করে দেয়। নিজের দুর্বলতা, ঘাটতি ও ভুলের মুখোমুখি হওয়ার বদলে অজুহাত সামনে দাঁড় করিয়ে দিলে আত্মসমালোচনার আর প্রয়োজন থাকে না। মানুষ তখন নিজের ভুলের মধ্যেই নিশ্চিন্তে বসবাস করতে শেখে। একই ব্যর্থতা বারবার ঘটতে থাকে, অথচ ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানের দরকার পড়ে না।
পাঠকের পাঠাভ্যাসের দোষও আমাদের কাছে তেমনই এক সুবিধাজনক অজুহাত হয়ে উঠেছে। পাঠক পড়েন না, তাই লেখার মান নিয়ে বেশি ভাবার প্রয়োজন নেই। পাঠক ভালো লেখা বোঝেন না, তাই নতুন কিছু লিখে লাভ কী! পাঠক বাজারি লেখা চান, তাই আমরাও বাজারের চাহিদা মেনে চলছি। যুক্তিগুলো পরিচিত। কিন্তু এর মধ্যে একটি মৌলিক জিজ্ঞাসা অনুপস্থিত: পাঠক যা চাইছেন, আমরা কি তার অভিমুখী প্রতিক্রিয়ায় সাহিত্য সৃষ্টির চেষ্টা করছি?
পাঠক নেই—এই অভিযোগের আড়ালে বাংলা ভাষার লেখকেরা যদি ক্রমাগত মানহীন সাহিত্য রচনা করে যান, আর নিজেদের বিরাট সাহিত্যস্রষ্টা ভেবে আত্মতুষ্টিতে ভোগেন, তাহলে পাঠক তৈরি হবে কীভাবে? পাঠককে দোষ দিয়ে লেখকের দায় শেষ হয় না। বরং পাঠক নেই - এই অভিযোগ যত জোরে উচ্চারিত হয়, লেখকের নিজের দিকে তাকানোর প্রয়োজন ততই বাড়ে।
এর চেয়েও বিপজ্জনক একটি প্রবণতা আছে।
সম্মানিত লেখক সমাজ, আপনারা তো লেখক হবেন। পাঠক চান। পাঠক আপনাদের লেখা পড়বে, প্রত্যাশা করেন। লেখা নিয়ে আলোচনা করবে, সামাজিক মাধ্যমে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করবে, বই বের হলে কিনতে হুমড়ি খেয়ে পড়বে - এমন প্রত্যাশাও করেন। করেন তো?
কখনো প্রশ্ন করেছেন, আপনারা নিজেরা পড়েন?
একজন লেখককে অবশ্যই আগে পাঠক হতে হয়। এই নিয়মের কোনো ব্যত্যয় নেই। ফুলস্টপ!
পাঠক হওয়া মানে অন্যের লেখা মন দিয়ে পড়া, তার ভেতরে প্রবেশ করা, লেখকের নির্মাণকৌশল বোঝার চেষ্টা করা, তার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা শনাক্ত করা। কোনো লেখা ভালো লাগলেই তার সবকিছু ভালো, কিংবা ভালো লাগল না বলেই তা মূল্যহীন - পাঠের অভিজ্ঞতা এর চেয়ে অনেক গভীর। প্রকৃত পাঠ মানুষকে নিজের রুচি সম্পর্কে সচেতন করে, নিজের সীমাবদ্ধতা চিনতে শেখায়, এমনকি নিজের পছন্দের বিরুদ্ধেও দাঁড় করায়।
সাহিত্য পাঠের এই শ্রমটুকু ছাড়া লেখালেখি অনেক সময় আত্মপ্রকাশের সহজ অভ্যাসে পরিণত হয়। মানুষ লিখতে পারে, নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে, কিছু সুন্দর বাক্যও তৈরি করতে পারে। কিন্তু এসবের সমষ্টিকেই সাহিত্য বলে ভুল করা অনুচিত। সাহিত্য রচনার জন্য নিজের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি প্রয়োজন অন্যের অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচয়, ভাষা ও আঙ্গিক সম্পর্কে সচেতনতা এবং নিজের লেখাকে বৃহত্তর সাহিত্যিক পরিসরের মধ্যে স্থাপন করার ক্ষমতা। পাঠ ছাড়া এই বোধ তৈরি হবে কীভাবে?
ব্যক্তিগতভাবে আমি মূলত একজন পাঠক। বাংলা কিংবা বিশ্বসাহিত্যের এমন কোনো বিষয় নেই, যার প্রতি আমার পাঠের আগ্রহ অনুপস্থিত। পাঠের পরিসরকে আমি যতটা সম্ভব বিস্তৃত রাখার চেষ্টা করি। আমার লেখালেখি মূলত সেই পাঠেরই প্রতিক্রিয়া। পড়তে পড়তে কোথাও প্রশ্ন জাগে, কোথাও দ্বিমত তৈরি হয়, কোথাও কোনো ভাবনা দীর্ঘদিন ধরে মনের মধ্যে ঘুরপাক খায়। সেই ভাবনারাই লেখায় রূপ নেয় - সবসময় না হলেও মাঝে মাঝে।
লেখক হওয়ার উদগ্র বাসনা নিয়ে কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা সাহিত্যের মুরুব্বির পেছনে ছোটার ধৈর্য আমার মধ্যে আশা করা যাবে না। লেখক হিসেবে পরিচিতি অর্জন, প্রতিষ্ঠা পাওয়া কিংবা কোনো গোষ্ঠীর স্বীকৃতি লাভের চেয়ে আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ নিজের পাঠ ও উপলব্ধির জগৎকে সচল রাখা। লিখি বলেই নিজেকে পাঠক থেকে আলাদা কোনো উচ্চাসনে বসাতে চাই না। বরং পাঠক পরিচয়টিই আমার কাছে মুখ্য।
এই পাঠক-পরিচয় আমাকে বাংলা সাহিত্যের হালহকিকত সম্পর্কে সচেতন রাখে। এই প্ল্যাটফর্মটির কথাই ধরা যাক। শুরুর পর থেকেই পড়ছি। একসময় কিছু উচ্চাশা ছিল। এখন আর তেমন নেই। তবু ক্ষীণ আশাটুকুও নিভতে দিইনি। ভেবেছিলাম, এখানে যাঁরা লেখেন, তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই এমন অনেকে থাকবেন, যারা পাঠের পরিধি বিস্তৃত করতে চেষ্টা করবেন, যারা বাংলা সাহিত্যের দুর্দিন উপলব্ধি করতে পারবেন, প্রচলিত রীতির বাইরে তাকাবেন, বিশ্বসাহিত্যের নতুন প্রবণতা সম্পর্কে আগ্রহী হবেন এবং নিজেদের লেখাকে আরও উন্নত করার তাগিদ অনুভব করেন।
পরে একসময় নিজেও লিখতে শুরু করেছি। নিজের লেখাকে সামনে আনার জন্য যতটা, তার চেয়ে বেশি এই আশায় যে, এখানকার লেখকদের দৃষ্টির প্রসার ঘটাতে যদি সামান্য ভূমিকা রাখা যায়। আমার একটি অনুমান ছিল - এখানকার লেখকেরা পড়েন। তাঁদের লেখা পড়ে যেমন তাঁদের চিনতে পারব, তেমনি তাঁদের পাঠের পরিধি সম্পর্কেও কিছু ধারণা পাব।
আমার ধারণা, কিংবা বিশ্বাস - যা-ই বলি, আবারও ভুল প্রমাণিত হয়েছে। লেখকদের মান নিয়ে যে ক্ষীণ আশা এখানে পূরণ হতে পারে ভেবেছিলাম, তারও যথেষ্ট প্রমাণ পেলাম না। দীর্ঘদিনের পাঠ-অভিজ্ঞতার সঙ্গে যখন নতুন অভিজ্ঞতা মিলে ব্যক্তিগত হতাশাকে বুঝি আরো গভীরই করলো।
এবার মূল প্রসঙ্গে ফিরি: লেখকের পাঠক-চরিত্র।
একজন লেখক নিজে যদি না পড়েন, তাহলে পাঠক তাঁর লেখা পড়বেন - এই প্রত্যাশা করেন কেন? এর মনস্তত্ত্ব কী?
আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় এর পেছনে কয়েকটি প্রবণতা কাজ করতে পারে।
প্রথমত, লেখার ইচ্ছাকে আমরা অনেক সময় লেখক হওয়ার যোগ্যতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলি। নিজের কিছু বলার আছে, মনে করছি তা লেখার মতো; লিখেছি, অতএব তা সাহিত্যের অংশ; সাহিত্য লিখেছি, অতএব পাঠকের তা পড়া উচিত। এই ধারাবাহিক অনুমানের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটিই অনুপস্থিত - লেখাটি আদৌ কতটা পাঠযোগ্য, কতটা শিল্পসম্মত, কতটা নতুন? নিজের অনুভূতি নিজের কাছে মূল্যবান হতে পারে। কিন্তু সেই অনুভূতি অন্যের কাছে অর্থহীন হতে পারে না? তবে সেই অনুভূতি অর্থবহ হতে হলে তাকে শিল্পে রূপ দিতে হয়।
দ্বিতীয়ত, লেখালেখিকে আমরা কখনো কখনো আত্মপ্রকাশের অধিকার হিসেবে দেখি, শিল্পসাধনার দায় হিসেবে নয়। প্রত্যেকেরই লেখার অধিকার আছে। কিন্তু লেখার অধিকার আর লেখাটির সাহিত্যিক মূল্য এক বিষয় নয়। কেউ লিখবেন, তাঁর লেখা প্রকাশিত হবে। কিন্তু প্রকাশিত হলেই লেখাটি প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য, কিংবা পাঠকের সময় দাবি করার অধিকার অর্জন করে ফেললো - এমন ভাবার কারণ নেই। পাঠকেরও তো নিজের সময়, মনোযোগ ও রুচি ব্যবহারের স্বাধীনতা রয়েছে।
তৃতীয়ত, পাঠকের স্বীকৃতিকে আমরা অনেক সময় চাই, কিন্তু পাঠকের শ্রমটুকু স্বীকার করতে চাই না। পাঠক একটি লেখা পড়তে সময় দেন, মনোযোগ দেন, নিজের অভিজ্ঞতা ও বোধের সঙ্গে তার তুলনা করেন। লেখক যদি এই শ্রমের মর্যাদা বোঝেন, তাহলে তাঁর নিজের লেখার প্রতিও দায়িত্ববোধ তৈরি হওয়ার কথা। পাঠকের কাছে প্রত্যাশা করার আগে লেখকের নিজের কাছে প্রশ্ন করা উচিত - আমি কি পাঠকের সময়ের উপযুক্ত কিছু দিতে পেরেছি?
চতুর্থত, লেখকের মধ্যে এমন আত্মপ্রবঞ্চনা কাজ করতে পারে, যেখানে নিজের লেখা সম্পর্কে তাঁর ধারণা তৈরি হয় মূলত নিজের অনুভূতি, ঘনিষ্ঠজনের প্রশংসা এবং পরিচিত মহলের স্বীকৃতি থেকে। সেখানে অন্যের সাহিত্য পড়ার প্রয়োজন কমে যায়। কারণ, অন্যের লেখা মন দিয়ে পড়তে গেলে তুলনা অনিবার্য হয়ে ওঠে। তখন নিজের সীমাবদ্ধতা চোখে পড়তে পারে, নিজের বহুল ব্যবহৃত বাক্য বা পুরোনো কৌশলের পুনরাবৃত্তি ধরা পড়তে পারে। পাঠক হিসেবে অন্যের শক্তি স্বীকার করা মানে লেখক হিসেবে নিজের সীমাও স্বীকার করার ঝুঁকি নেওয়া।
অথচ এই ঝুঁকি এড়িয়েই কি লেখক হওয়া যায়?
একজন লেখক যখন অন্যের লেখা পড়েন না, তখন তিনি শুধু সাহিত্যিক জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হন না; নিজের লেখাকে যাচাই করার গুরুত্বপূর্ণ সুযোগটাও হারান। তাঁর ভাষা কোথায় পুরোনো হয়ে যাচ্ছে, তাঁর চরিত্র কোথায় একমাত্রিক, তাঁর ভাবনা কোথায় বহুলচর্চিত, তাঁর আঙ্গিক কোথায় পুনরাবৃত্ত - এসব বোঝার জন্য নিজের লেখার বাইরে তাকানো জরুরি। অন্যের সাহিত্য সেই আয়নাগুলোর একটি।
এখানে বিশ্বসাহিত্যের প্রসঙ্গও আসে। বিশ্বসাহিত্য পড়ার অর্থ বিদেশি লেখকদের নাম মুখস্থ করা নয়, কিংবা তাঁদের বইয়ের উদ্ধৃতি দিয়ে নিজের লেখাকে ভারী করে তোলা নয়। পড়ার অর্থ হলো, মানুষের অভিজ্ঞতা প্রকাশের কত রকম পথ আছে তা আবিষ্কার করা। একই বিষয়কে কত ভিন্ন আঙ্গিকে নির্মাণ করা যায়, একই চরিত্রের মধ্যে কত বিপরীত সত্য সহাবস্থান করতে পারে, পরিচিত বাস্তবতাকে কীভাবে অপরিচিত করে তোলা যায়—এসব উপলব্ধি পাঠের মধ্য দিয়েই আসে। যে লেখক এই সম্ভাবনাগুলোর সঙ্গে পরিচিত নন, তাঁর লেখায় পরিচিত ছকের পুনরাবৃত্তি ঘটার আশঙ্কা বেশি।
সরলীকরণের ঝুঁকি থেকে এও জানাতে চাই যে, পাঠ নিজে কোনো নিশ্চয়তা নয়। পড়েও কেউ দুর্বল লিখতে পারেন; আবার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ না পেয়েও কেউ অসামান্য সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারেন। কিন্তু ব্যতিক্রমকে নিয়ম ধরে নেওয়ার কারণ নেই। একজন লেখকের মধ্যে সহজাত প্রতিভা থাকলে পাঠ ও অনুশীলন সেই প্রতিভাকে আরও গভীর ও পরিণত করতে পারে। আর প্রতিভা না থাকলেও পাঠ মানুষকে ভালো পাঠক করে তুলতে পারে - সেটিও তো কম অর্জন নয়।
আসলে লেখকের পাঠক-পরিচয়টি কোনো আনুষ্ঠানিক পরিচয় নয়। কত বই পড়েছেন, কত লেখকের নাম জানেন, কত সাহিত্যিক তত্ত্ব আয়ত্ত করেছেন - এসবের হিসাব দিয়েই তা নির্ধারিত হয় না। একজন লেখক সত্যিকার অর্থে পাঠক কি না, তা বোঝা যায় তাঁর কৌতূহলে, নিজের বাইরে তাকানোর ক্ষমতায়, অন্যের সৃষ্টিকে মন দিয়ে গ্রহণ করার মানসিকতায় এবং নিজের লেখাকে প্রশ্ন করার সাহসে।
তাই পাঠক নেই - এই অভিযোগের আগে লেখকদের নিজেদের মধ্যে পাঠক কতজন, সেই প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। পাঠক কেন পড়ছেন না, তা নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি লেখকেরা কী পড়ছেন, কীভাবে পড়ছেন, পাঠ থেকে কী শিখছেন - সেসব নিয়েও আলোচনা দরকার। পাঠকের রুচি নিয়ে অভিযোগ করার আগে নিজেদের লেখার রুচি ও মান নিয়ে প্রশ্ন করা দরকার।
লেখকেরা যদি নিজেদের মধ্যে পরস্পরের লেখা নিয়ে আলোচনা না করেন, তর্ক-বিতর্কে না জড়ান, ইতিবাচক কিংবা নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় সাহিত্যজগৎকে সরগরম না রাখেন, তাহলে পাঠক সাহিত্যের দিকে মনোযোগ দেবেন কীভাবে? পাঠকের কাছে নতুন বই, নতুন লেখক কিংবা নতুন সাহিত্যচিন্তা পৌঁছানোর একটি পথ তো লেখকদের নিজেদের পারস্পরিক আলোচনা। একজন লেখক আরেকজনের বই নিয়ে লিখবেন, প্রশংসা করবেন, আপত্তি তুলবেন, কখনো বা কঠোর সমালোচনা করবেন। সেই আলোচনা থেকে পাঠকের কৌতূহল তৈরি হবে, বইটি পড়ার আগ্রহ জন্মাবে। সাহিত্য নিয়ে মতভেদও সাহিত্যের প্রচার ও পাঠক তৈরির একটি উপায়।
আমরা যে আলোচনা - যা-টুকু - দেখছি, তা কি সত্যিই সাহিত্য নিয়ে? নাকি লেখককে ঘিরে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, গোষ্ঠীগত আনুগত্য, পারস্পরিক প্রশংসা কিংবা বিরোধের প্রকাশ মাত্র?
লেখকদের পরস্পরের লেখা নিয়ে কথা বলতেই হবে। সেই কথার কেন্দ্রে থাকতে হবে লেখা - তার ভাষা, নির্মাণ, চিন্তা, সীমাবদ্ধতা ও সম্ভাবনা। প্রশংসা যুক্তিসংগত হতে হবে, সমালোচনাও হতে হবে নির্দিষ্ট ও সৎ। নেতিবাচক আলোচনা মানেই বিদ্বেষ নয়; ইতিবাচক আলোচনা মানেই তোষামোদ নয়। সমস্যা হয় তখন, যখন প্রশংসা হয়ে ওঠে পারস্পরিক সুবিধা বিনিময়ের মাধ্যম, আর সমালোচনা ব্যক্তিগত আক্রমণের অস্ত্র।
পাঠককে আকৃষ্ট করার জন্য সাহিত্য নিয়ে সরব হওয়া দরকার। কিন্তু পাঠকের মনোযোগ ধরে রাখতে হলে সেই সরবতার পেছনে সাহিত্যিক কারণ থাকতে হবে। লেখকেরা যদি পরস্পরের বই পড়েন, যুক্তি দিয়ে মত প্রকাশ করেন, ভিন্নমতকে জায়গা দেন, তাহলে পাঠকও বুঝবেন - এই বই নিয়ে কথা বলার মতো কিছু আছে। আর লেখকেরাই যদি অন্যের লেখা না পড়েন, পড়লেও তা নিয়ে সৎভাবে কথা না বলেন, তাহলে তাঁদের নিজেদের লেখার প্রতি পাঠকের আগ্রহ তৈরি অসম্ভব।
অতএব, সবার আগে প্রয়োজন লেখকদের পাঠক হয়ে ওঠা। না পড়েই আলোচনা, না বুঝেই প্রশংসা, না মেনেই বিরোধিতা - এসব দিয়ে সাময়িক শোরগোল তৈরি হতে পারে, সাহিত্যিক পরিবেশ তৈরি হয় না। পাঠককে সাহিত্যের কাছে টানতে হলে লেখকদের আগে সাহিত্যের কাছাকাছি আসতে হবে।
সাহিত্য একতরফা সম্পর্ক নয়। লেখক লিখবেন আর পাঠক পড়বেন - এমন কোনো অলিখিত চুক্তি নেই। লেখক তাঁর শ্রম দিয়ে একটি রচনা নির্মাণ করবেন; পাঠক নিজের সময় ও মনোযোগ দিয়ে তার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করবেন। সেই সম্পর্কের মধ্যে লেখকের যেমন অধিকার আছে, তেমনি পাঠকেরও স্বাধীনতা আছে। পাঠককে পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ করার আগে লেখককে ভাবতে হবে, তিনি পাঠকের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক তৈরি করছেন।
আমি শেষ পর্যন্ত লেখকের কাছে পাঠক হওয়ার প্রত্যাশাই রাখি। কারণ, পাঠক হওয়া মানে নিজের বাইরের জগৎকে স্বীকার করা। নিজের চেয়ে ভালো লেখা আছে, নিজের চেয়ে গভীর চিন্তা আছে, নিজের পরিচিত পথের বাইরে আরও অসংখ্য পথ আছে - এই বোধের মধ্যে বিনয় যেমন থাকে, তেমনি থাকে সৃষ্টির সম্ভাবনা।
যে লেখক পড়েন না, তিনি লিখতে হয়তো পারেন। কিন্তু তার লেখার জগৎ বিস্তৃত, নতুন, বা কলোত্তীর্ণ হবে না।
আর তাই পাঠক নাই এমনতরো অভিযোগ শুনলে আমার অবধারিত প্রতি-জিজ্ঞাসা:
লেখক - আপনি পড়েন?