Story

যখন ভালো হতে চাইলাম তখনি...!

November 2, 2026

14 views

অপরাধী
মাহমুদ আলী খন্দকার

আজই জেল থেকে বের হলাম। আজ থেকে দুই বছর আগের কথা। মুদ্রাস্ফীতির এই দুর্মূল্যের বাজারে সংসারের ঘানি টানতে টানতে যখন নিরুপায় হয়ে গেছি তখন নিজের বউ আর তিন মেয়ে এক ছেলের পেটের ক্ষুধা নিবারনের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরেছি, হাত পেতেছি। মানুষের কলিজায় দয়ামায়া কমে গেছে। কেউ আর দানধ্যান করতে চায় না। সবাই মনে করে এগুলো একধরনের ধান্ধাবাজি। এই দুর্মূল্যের বাজারে পাঁচটি পেট চালানো তো সোজা কথা নয়। একেবারেই নিরুপায় হয়ে মতিভ্রমে এক বস্তা চাউল চুরি করে বসি। শাস্তি স্বরূপ দুই বছরের জেল হয়।আজ সকালে জেলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পেয়েছি। শুন্য হাত, টাকা পয়সা নাই। বউ ছেলে মেয়ের খোঁজখবর কিছুই জানিনা। কি করবো না করবো কিছুই বুঝতে পারছি না।
হঠাৎই জেলখানার সেড রুস্তমের একটা কথা মনে পড়ে গেল। যাবত-জীবন সাজা প্রাপ্ত সেড রুস্তম একদিন বলেছিলো বিনা পয়সায় থাকা খাওয়ার উত্তম জায়গা হলো জেলখানা। কথাটা কানে বাজলো। তাই তো, থাকা খাওয়ার কোনো চিন্তা নাই। রোজগারের চিন্তা নাই। সুখের একটা জীবন। কি আর করবো বাড়ি ফিরে। আমাকে ছাড়াই পরিবার যখন দুই বছর কাটিয়ে দিতে পেরেছে বাকি জীবনও পারবে। তারচেয়ে বরং জেলখানায়ই ফেরত যাই। থাকা খাওয়ার চিন্তা তো করা লাগবে না!
ভাবতে ভাবতে মাথায় বুদ্ধি এলো আবার কিছু একটা চুরি করতে হবে । তাহলে আবার জেলে যেতে পারবো। পাশেই একটা শপিং মল, একজন ভদ্রলোক কিছু কেনাকাটা করছিলো। পাশেই তার ছাতাটা রাখা ছিল। আমি চোখের পলকে ছাতাটা নিয়ে দৌড় দিলাম। দোকানী চিৎকার করে উঠলো-'ভাই আপনার ছাতা নিয়ে গেল'। আমি রাস্তায় দাড়িয়ে থাকা পুলিশটার পাশ দিয়ে ইচ্ছে করে যাচ্ছিলাম যেন সে আমাকে ধরতে পারে। পুলিশটা আমাকে ঠিকই ধরে ফেলল এবং চিৎকার করা দোকানীর নিকট নিয়ে আসলো। আশেপাশে লোক জড়ো হয়ে গেছে। সবাই আমাকে চোর মনে করে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। পুলিশ ব্যাটাও আমাকে ধরে নিয়ে যেতে উৎসাহিত বোধ করছে। এমন সময় যার ছাতা নিয়েছি সেই লোকটি বলল- ভাই, ওকে ছেড়ে দেন। এ ছাতাটা আমার না, এটা আমি গতকাল ভুল করে নিয়ে গেছি, মনে মনে লোক খুঁজছিলাম কার ছাতা নিয়ে গেলাম তাকে ফেরত দেয়ার জন্য । ছাতাটা মনে হয় উনারই, আপনি উনাকে ছেড়ে দেন। অগত্যা পুলিশ বেটা আমাকে ছেড়ে দিয়ে বেকুবের মত রাস্তার দিকে চলে গেল।

মনে মনে ভাবলাম এভাবে ছিঁচকে চুরি করে লাভ নেই ছিনতাই করতে হবে, তাহলে সবাই ধরে যদি পুলিশে দেয় তাহলেই কেল্লাফতে। খেলনার দোকান থেকে একটা খেলনা পিস্তল মেরে দিলাম। শহরের পাশ দিয়ে বহমান লেক পাড় দিয়ে হাঁটছি। মনে মনে বড় পার্টি খুঁজছি। সবার সামনেই ছিনতাই করতে হবে। যেন আশেপাশের সবাই মিলে আমাকে ধরে ফেলতে পারে। হঠাৎ একটা বেঞ্চিতে বসে তিনটা লোক কয়েকটা মানিব্যাগ থেকে টাকা বের করছে মনে হলো। কিছু বোঝার সুযোগ না দিয়ে সোজা পাশে গিয়ে পিস্তলটা বের করে বললাম' যা আছে সব দিয়ে দে, নাহলে গুলি করে দিবো।' ঘটনার আকস্মিকতায় হিতাহিতজ্ঞানশূন্য হয়ে লোক তিনটা সব ফেলে ভো দৌড়। টাকা আর মানিব্যাগ পড়ে আছে।ওগুলো কেবল ধরতে যাবো এমন সময়  সাত আটজন লোক আমার কাছে এগিয়ে এলো।তারমধ্যে দুজন মহিলাও আছে। ভাবলাম যাক,এবার হয়তো এরা আমাকে ধরে পুলিশে দেবে। কাছে এসে একলোক বলল- ভাই, আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। এই ছিনতাইকারীগুলো একটুআগেই এসব আমাদের নিকট থেকে ছিনতাই করে নিয়ে এসেছে। আপনি যে সাহসীকতা দেখালেন! এ-যুগে  আপনার মতো মানুষ পাওয়া দুষ্কর। লোকগুলো টাকা মানিব্যাগ নিয়ে চলে গেল।
আমি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলাম।

বেশ খানিকটা রাত হয়ে গেছে। পেটে দানাপানি পড়েনি। ভগ্নমনোরথে লেক পাড় দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি, নাহ্ এভাবে হবেনা। আরো বড় কোনো অকারেন্স করতে হবে। কিন্তু কি করবো? আচ্ছা, খুন করলে কেমন হয়। বেশিদিন জেলে থাকা যাবে। কিন্তু যদি ফাঁসি হয়? আচ্ছা,  এমনভাবে খুন করা যা না যাতে জেল হবে কিন্তু ফাঁসি হবে না? ভাবতে ভাবতে লেকের পশ্চিম প্রান্তে চলে এসেছি যেখানটা বেশ নির্জন আর অন্ধকার। নারী কন্ঠের মৃদু চিৎকার কানে এলো। গোঙানির শব্দ। বোঝার চেষ্টা করলাম। দুজনে মিলে একটা মেয়েকে ধর্ষণের চেষ্টা করছে। আমার মেয়েদের কথা মনে পড়ে গেল। না জানি কেমন আছে তারা। কতোবড় হয়েছে!  মাথায় বিদ্যুৎ খেলে গেল। শক্ত মোটা রড জাতীয় কিছু একটা হাতে তুলে নিলাম। হঠাৎই ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে একজনের মাথায় বাড়ি ছাড়লাম। জাগায় পড়ে গেল। অন্যজন চিৎকার দিয়ে ভয়ে দৌড় দিলো। যাকে মেরেছি তার মাথা ফেটে রক্ত বের হচ্ছে। ছটফট করছে। টহল পুলিশের গাড়ী এসে উপস্থিত হলো। যাক, এবার জেল নিশ্চিত।

পুলিশের এস আই মনির ( নেমপ্লেটে লেখা)আমার দিকে এগিয়ে এলো। কাঁধে হাত রেখে বলল, একি করেছেন আপনি! বেটা ফাঁসির আসামি। জেল থেকে পালিয়ে বিভিন্ন অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। অনেক চেষ্টা করেও ধরতে পারিনি। অসংখ্য ধন্যবাদ আপনাকে ধরিয়ে দেয়ার জন্য। বাঁচলে ভালো, না বাঁচলেও সমস্যা নাই। এবার প্রোমোশনটা হয়েই যাবে ইনশাআল্লাহ। সব আপনার জন্য।

রাত বারোটা। হাটছি বাড়ির পথে। নাহ্, আর জেলে যাওয়ার চেষ্টা করে লাভ নেই। অনেক তো হলো। কেউ তো জেলে দিলো না। তারচেয়ে বাড়ি ফিরে যাই। না জানি বউ ছেলেমেয়েরা কেমন আছে, কি করছে। মনটা বড় উচাটন। আর কোনো অপরাধ নয়। এখন থেকে সততার সাথে পরিশ্রম করে উপার্জন করবো। খেয়ে থাকি আর না খেয়ে থাকি কোনো দুনম্বরী কাজ আর করবো না। প্রয়োজনে কামলা খাটবো,রিকশা চালাবো তবু্ও আর কোনো খারাপ কাজ করবো না। পরিবারের সাথে বাকি জীবন কাটাতে চাই। ইস কতদিন পর বাড়িতে যাচ্ছি। না জানি ছেলে মেয়ে বৌ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে।  ভাবতে ভাবতে মহাসড়কের পাশ দিয়ে হাঁটছি। সারাদিন কি ঘটলো আমার সাথে তাও ভাবছি। কতো চেষ্টা করলাম জেলে যাওয়ার! আর না, এখন থেকে আমি একজন পরিপূর্ণ ভালো মানুষ এবং মহান আল্লাহর অনুগত বান্দা হতে চেষ্টা করবো। নিয়মিত নামাজ পড়বো, ইবাদত করবো। হে আল্লাহ আপনি আমাকে আপনার খাঁটি ইমানদার বান্দা হওয়ার সুযোগদান করেন, আমিন। মনে মনে বলছি আর হাটছি। একটা পুলিশের গাড়ী আমার সামনে এসে দাড়ালো। কয়েকজন কনস্টেবল আর একজন অফিসার আমাকে ঘিরে ধরলো। হ্যান্ডসআপ! পালানোর চেষ্টা করবে না। দৌড় দিলেই গুলি করবো। দাড়িয়ে পড়লাম। অফিসারটি কনস্টেবলকে আদেশ দিলো, 'ডাকাতটাকে গাড়ীতে তোলো। বাকিগুলোর খোঁজ করতে হবে, আশেপাশেই আছে বেশিদূর যেতে পারেনি, কুইক কুইক ।'

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+30 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login