১. পরিচয়পত্র
ছবিটি তোলার সময় লোকটি বলেছিল,
স্বাভাবিক হন।
আমি কাঁধ নামিয়েছিলাম, ঠোঁটের কাছ থেকে
সামান্য হাসিটুকু সরিয়ে নিয়েছিলাম।
স্বাভাবিক হওয়ার জন্য সেদিন
আমাকে বেশ কিছু নির্দেশ মানতে হয়েছিল।
তারপর থেকে ওই মানুষটি আমার হয়ে
ব্যাংকে যায়, বিমানবন্দরে দাঁড়ায়,
প্রমাণ করে যে আমি এখনো আমি।
তার চুল পাকে না।
কোনো কোনো রাতে আমার ঘুম হয় না,
তবু পরদিন ছবির মানুষটির চোখের নিচে
একটুও কালি পড়ে না।
পরিচয়পত্রে বাবার নাম আছে।
বাবা যেভাবে আমার নাম ধরে ডাকতেন,
সেটুকু রাখার কোনো ঘর ছিল না।
পেছনে জরুরি নির্দেশ—
হারিয়ে গেলে নিকটস্থ থানায় জমা দিন।
যিনি কুড়িয়ে পাবেন, তিনি হয়তো আমাকে
আমার ঠিকানায় ফেরত পাঠাবেন;
খাম খুলে আমি কৃতজ্ঞ হব,
আবার নিশ্চিন্তে বেরিয়ে পড়ব
নিজের পরিচয় সঙ্গে নিয়ে।
অথচ পাড়ার সেই দোকানদার,
যার কাছে একদিন টাকা কম পড়েছিল,
এখনো আমাকে দেখলে বলে,
নিয়ে যান, পরে দেবেন।
তার কাছে আমার কোনো ছবি নেই।
আজ পুরোনো জামার পকেটে কার্ডটি পেয়ে
অনেকক্ষণ দেখলাম।
প্লাস্টিকের এক কোণ উঠে গেছে,
ছবির ওপর পড়েছে সরু আঁচড়।
জানালা দিয়ে আলো আসছিল।
কার্ডটি একটু কাত করতেই
আমার মুখের জায়গায়
বাইরের গাছটি দেখা গেল।
২. আমার নাম ধরে যে ডাকে
ফোনে মা আমার পুরো নাম বলেন না।
প্রথম অংশটুকু উচ্চারণ করে থামেন,
বাকিটুকু যেন আমার এগিয়ে গিয়ে
শুনে নেওয়ার কথা।
তারপর জিজ্ঞেস করেন, খেয়েছিস?
আমি তখন গাড়িতে,
দুই পাশে আটকে থাকা বাসের জানালায়
অচেনা মানুষের মুখ।
আজ কোথায় যাচ্ছি, কার সঙ্গে দেখা হবে,
কী বললে কাজটি এগোবে—
এসবের কোনোটি তাঁর প্রশ্নে নেই।
খেয়েছি বলি।
সকাল থেকে চা ছাড়া কিছু খাওয়া হয়নি,
কিন্তু এখন সেটি জানালে
এত দূর থেকে তিনি কী করবেন?
মা বলেন, গলাটা এমন শোনাচ্ছে কেন?
জানালার কাচ নামাই।
ধুলো ঢোকে, একজন বাদাম বিক্রেতা
মুখের কাছে ঠোঙা এগিয়ে দেয়।
কিছু হয়নি, বলি, রাস্তায় আছি।
মা একটু চুপ করে থাকেন।
ওপাশে বাসনের শব্দ,
কলের মুখে বালতি বসানোর শব্দ পাই।
কথা শেষ হওয়ার আগে আবার
নামের প্রথম অংশটুকু বলেন।
এবার আর কোনো প্রশ্ন নেই।
অনেক বছর আগে মাঠ পেরিয়ে
সন্ধ্যার মধ্যে সেই ডাক এসে পৌঁছাত।
খেলা থামিয়ে তাকালে
দরজার কাছে তাঁকে ছোট দেখাত খুব,
অথচ উঠানে ঢুকতে ঢুকতে
তাঁর শরীর দিয়েই সমস্ত দরজা ভরে যেত।
ফোন রেখে দেখি
গাড়ি এখনো একই জায়গায়।
বাদামওয়ালাকে ডাকি।
সে এগিয়ে এসে জানতে চায়, কত টাকার?
উত্তর দিতে গিয়ে হঠাৎ টের পাই,
এতক্ষণ ধরে আমি
মায়ের ডাকে ফিরে বসে আছি।
৩. পদবির নিচে মানুষটি
পুরোনো নামফলকটি খুলতে
লোকটির পাঁচ মিনিটও লাগেনি।
দুটি প্যাঁচ খুলে
সে আমার নাম উল্টো করে রাখল টেবিলে।
পেছনে জমে থাকা ধুলোর মধ্যে
দেয়ালের রঙের ছোট একটি টুকরো লেগে ছিল।
নতুন নামফলক আসবে দুপুরে।
তার আগে ঘরটি
শুধু একটি নম্বর দিয়ে চেনা যাবে।
হস্তান্তরের তালিকায় লিখলাম—
একটি টেবিল, ছয়টি চেয়ার,
তালা দেওয়া আলমারি,
দুটি চাবি।
লিখলাম না, কোন চেয়ারে বসে
সহকর্মীটি প্রথম তাঁর অসুখের কথা বলেছিলেন;
কোন দুপুরে দরজা বন্ধ করে
বাড়িতে টাকা পাঠানোর হিসাব মেলাতে পারিনি।
আলমারির নিচের তাকে
এক জোড়া পুরোনো জুতা পাওয়া গেল।
বর্ষার দিনে বদলে পরতাম।
চামড়া শক্ত হয়ে গেছে,
তবু ফেলে দেওয়ার সময়
জুতার ফিতাগুলো খুলে নিতে ইচ্ছে হলো।
লোকটি জিজ্ঞেস করল, এগুলোও যাবে?
বললাম, হ্যাঁ।
ঠিক কোথায় যাবে জানতাম না।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে
চা নিয়ে ওঠা ছেলেটির সঙ্গে দেখা।
সে থেমে বলল, আজ এত সকালে?
খবরটি তাকে জানানো হয়নি।
আমার হাতে নামফলক,
বগলের নিচে জুতার বাক্স।
বললাম, আজ একটু কাজ আছে বাইরে।
সে সরে দাঁড়াল।
আমি নিচে নেমে যাওয়ার পরও শুনলাম
কাপের সঙ্গে চামচের ঠোকাঠুকি—
চা নিয়ে সে যথারীতি
আমার ঘরের দিকেই উঠছে।
৪. আয়নার অতিরিক্ত কাজ
সকালে আয়নাকে দিয়ে
অনেক কাজ করাই।
কলারের ভাঁজ, চুলের ফাঁক,
ঘুম কম হওয়ার চিহ্ন—
সবই তার দেখার কথা।
বেরোনোর আগে একবার ফিরে এসে
দেখি, অন্যদের কাছে কেমন দেখাব।
আয়না যথাসাধ্য সাহায্য করে।
আমি বাম হাত তুললে
সে ডান হাত তোলে;
এই সামান্য অমিল নিয়েই
দীর্ঘদিন আমাদের সংসার।
ইদানীং মুখের কাছে ঝুঁকলে
বাবার ভ্রু দেখতে পাই।
তাঁর বয়সে পৌঁছানোর আগেই
ভ্রু দুটি আমার মুখে এসে
নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে।
বাবা এতক্ষণ আয়না দেখতেন না।
দাড়ি কাটার পর আঙুল বুলিয়ে
চিবুক পরীক্ষা করতেন,
তারপর বেরিয়ে যেতেন।
তাঁর চলে যাওয়ার বহু বছর পরে
আমার গালে হাত রাখলে
কোথাও কোথাও সেই খসখসে ভাব পাই।
আজ গোসলের পর কাচ ঝাপসা ছিল।
তোয়ালে দিয়ে মুছতে গিয়ে থামলাম।
অস্পষ্ট মুখটি
আমার দিকে ঝুঁকে আছে।
চোখের নিচের দাগ বোঝা যাচ্ছে না,
চুল কতটা কমেছে তাও নয়;
শুধু একটি মানুষের মাথা, কাঁধ,
শ্বাসের কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকা।
পাশের ঘর থেকে কেউ ডাকল,
দেরি হয়ে যাচ্ছে।
আমি সাড়া দিলাম।
বেসিনের ধারে পড়ে থাকা
একটি চুল তুলে ফেললাম জলের সঙ্গে।
কাচ শুকিয়ে উঠলে
সেখানে আমাকে পাওয়া যায়নি।
৫. সফল মানুষের ঘুম
রাত তিনটায় ফ্রিজের শব্দ
হঠাৎ খুব স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এত বড় ঘরে
একটি যন্ত্র কী মনোযোগ দিয়ে
নিজের কাজ করে যাচ্ছে।
বিছানায় শুয়ে আগামীকালের কথাগুলো
আরেকবার সাজাই।
একটি বাক্য সামান্য বদলালে
হয়তো আপত্তি কম হবে,
একটি সংখ্যা আগে বললে
পেছনের সংখ্যাগুলো বিশ্বাসযোগ্য শোনাবে।
পাশে স্ত্রী ঘুমাচ্ছে।
চাদরের বাইরে বেরিয়ে আছে তার হাত।
সেটি ঢেকে দিতে গিয়ে
আমার কনুইয়ে ভর পড়ে, বিছানা নড়ে ওঠে।
সে চোখ না খুলেই বলে, ঘুমাও।
কথাটি পালন করার উপায় খুঁজতে
ফোন হাতে নিই।
ঘুম ভালো হওয়ার পাঁচটি নিয়ম পড়ি,
তারপর আরেকটি লেখা—
কম ঘুমিয়েও যাঁরা অনেক দূর গেছেন।
পর্দার আলোয় নিজের আঙুল
অসুস্থ দেখায়।
দিনের বেলায় পাওয়া সম্মাননাটি
এখনো বসার ঘরে।
মঞ্চে দাঁড়িয়ে যিনি আমাকে দিয়েছিলেন
তিনি বলেছিলেন, অক্লান্ত পরিশ্রম।
বাড়ি ফিরে স্ত্রী জিজ্ঞেস করেছিল,
খিদে পেয়েছে?
তখন উত্তর দেওয়ার আগে
একটি ছবি পাঠাতে হয়েছিল কয়েকজনকে।
ভোরের দিকে মশারির গায়ে
একটি মশা বসে।
হাত বাড়ালেই মারা যায়,
কিন্তু উঠে বসতে ইচ্ছে করে না।
ফ্রিজ থেমে গেছে কখন।
এবার দূরে একটি গাড়ি চালু হওয়ার শব্দ।
সকালের প্রথম আলোয়
স্ত্রীর হাতটি আবার বেরিয়ে আসে।
আমি নিজের হাত রাখি তার পাশে।
কোনো কাজের কথা মনে পড়ে না কিছুক্ষণ।
যখন ঘুম আসে,
বাইরের গাছটিতে পাখিরা
ইতিমধ্যে জায়গা বদলাচ্ছে।
৬. মানচিত্রে অনুপস্থিত গলি
ফোন বলল, আপনি পৌঁছে গেছেন।
আমি তখন একটি বন্ধ ফটকের সামনে,
ভেতরে বালির স্তূপ,
দেয়ালে নতুন বাড়ির রঙিন ছবি।
যে ঠিকানায় যাচ্ছিলাম
সেটি আরও ভেতরে থাকার কথা।
চায়ের দোকানে জিজ্ঞেস করতেই
লোকটি বলল, এই পাশ দিয়ে হবে না,
পেছনের গলিটা ধরেন।
ফোনে গলিটি নেই।
দুটি বাড়ির মাঝখানে ঢুকতেই
পথ এত সরু হয়ে এল যে
ছাতা বন্ধ করতে হলো।
ওপর থেকে একটি তার নেমে এসেছে,
নিচে বৃষ্টির জল।
একটি শিশু দরজায় বসে খাতার ওপর
হাতের ছায়া ফেলে মাছ বানাচ্ছিল।
আমাকে দেখে পা গুটিয়ে নিল।
আরেকটু গিয়ে এক বৃদ্ধাকে পেলাম।
ঠিকানা শুনে তিনি বাড়ির নম্বর বললেন না,
বললেন, যার ছেলে বিদেশে থাকে?
আমি জানতাম না।
যাঁর কাছে যাচ্ছি, তাঁর সম্পর্কে
আমার জানা ছিল পদবি, ফোন নম্বর
এবং দেখা করার উপযুক্ত সময়।
বৃদ্ধা দরজায় টোকা দিলেন।
ভেতর থেকে যে মানুষটি বেরিয়ে এলেন
তাঁকে আগে কখনো খালি পায়ে দেখিনি।
হাসতে হাসতে বললেন, খুঁজে পেলেন তাহলে।
ফেরার পথে শিশুটি আর দরজায় নেই।
তার খাতা পড়ে আছে,
খোলা পাতায় কয়েকটি যোগের অঙ্ক।
গলির মুখে এসে ফোন দেখি।
নীল বিন্দুটি কিছুক্ষণ দুলে
আমাকে বড় রাস্তায় তুলে দিল।
পেছনে তখন কেউ
এক বালতি জল ঢেলে দিচ্ছে।
জল আমার আসার পথ ধরে
ধীরে ধীরে বাইরে বেরিয়ে আসে।
৭. একটি গাছকে সংজ্ঞা দিতে গিয়ে
ছেলেটি জানতে চেয়েছিল, গাছটার নাম কী।
বলেছিলাম, দাঁড়াও।
ফোন তুলে পাতার ছবি নিলাম।
পর্দায় তিনটি সম্ভাবনা এল,
প্রতিটির পাশে ছোট করে লেখা
কতখানি নিশ্চিত হওয়া যায়।
পাতা আরেকটু কাছে টেনে
দ্বিতীয় ছবি তুলতে গিয়ে দেখি
ডালের কাটামুখে আঠা জমেছে।
আঙুলে লেগে গেল,
রুমালে মুছেও উঠল না পুরোটা।
ছেলেটি ততক্ষণে নিচু হয়ে
শিকড়ের কাছে কী দেখছে।
ওখানে একটি পিঁপড়ের পথ।
কাণ্ডের গা বেয়ে উঠে গেছে,
একটি ফাটলের কাছে এসে
আবার নিচে নেমেছে কয়েকটি।
ওরা কোথায় যায়? সে জিজ্ঞেস করল।
আমি এবার দাঁড়াও বললাম না।
পাশে বসে দেখলাম।
গাছের ওপাশে একটি দোকান।
দোকানদার দুপুরের ভাত খাচ্ছিল
টুলে বসে, থালা কোলে।
আমাদের দেখে বলল, রোদ লাগবে ওখানে,
আরেকটু এদিকে আসেন।
আমরা ছায়ার ভেতরে সরলাম।
গাছটির নাম তখনো জানা হয়নি।
তবু তার পাশে বসার জায়গা
তিনজন মিলে ঠিক করে নিলাম।
বাড়ি ফেরার পর ছেলেটি বলল,
যে গাছটার নিচে পিঁপড়া দেখেছি—
আমি বুঝলাম কোন গাছ।
পরে ছবিটি বড় করে দেখেছিলাম।
পাতার শিরা স্পষ্ট,
পেছনে ছেলেটির হাত ঝাপসা।
গাছ শনাক্ত করার ঘরটি খোলা রেখেই
অনেকক্ষণ ছবিটির দিকে তাকিয়ে ছিলাম।
৮. পথ নিজের নাম জানে না
রাস্তার নতুন নামের ফলক বসেছে সকালে।
দুজন লোক মই ধরে ছিল,
আরেকজন ওপরে উঠে
পুরোনো নাম ঢেকে দিল নীল পাত দিয়ে।
দুপুরে রিকশাওয়ালাকে নতুন নাম বলতেই
সে চিনল না।
পুরোনো নাম বলায় মাথা নাড়ল,
তারপর জানতে চাইল, কোন দিক দিয়ে যাব?
এই প্রশ্নটির জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।
বললাম, যেদিকে সুবিধা।
সে একটু ঘুরে নিল।
একটি স্কুলের সামনে ছুটি হয়েছে,
গাড়ির দরজা খুলছে,
শিশুদের পিঠে ব্যাগ তুলে দিচ্ছে মানুষ।
রিকশা থামিয়ে সে অপেক্ষা করল
একটি মেয়ে জুতার ফিতা বাঁধা পর্যন্ত।
আমার দেরি হচ্ছিল।
কবজির দিকে তাকিয়ে মনে পড়ল,
ঘড়িটি আজ বাড়িতে রেখে এসেছি।
বড় রাস্তা ছেড়ে আমরা
নিচু একটি পথে ঢুকলাম।
এখানে রোদ কম,
বারান্দা থেকে ঝুলছে কাপড়,
দেয়ালের ফাটলে গজানো চারাটি
বৃষ্টির পর বেশ বড় হয়েছে।
রিকশাওয়ালা বলল, সামনে নামতে হবে,
বাকিটা হেঁটে যেতে পারবেন?
নেমে ভাড়া দিলাম।
সে পেছন ঘুরিয়ে রিকশা বের করতে লাগল,
আমি দেয়াল ঘেঁষে এগোলাম
যাতে তার চাকার জায়গা হয়।
বাঁকের কাছে এসে
কোন দিকে যাব বুঝতে পারছিলাম না।
একজনের পিছু পিছু কিছুটা গিয়ে
জানতে চাইলাম, এদিকে বেরোনো যায়?
তিনি বললেন, আসেন।
মানুষটির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে
ছোট একটি সাঁকো পার হলাম।
নিচে জমে থাকা জলে
একখানা পাতা ঘুরছিল,
স্রোতের মুখ খুঁজে পেতে তারও সময় লাগছিল।
ওপারে উঠে মানুষটি ডানে গেলেন।
আমি তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে বাঁয়ে।
নতুন নামের রাস্তাটি সামনে দেখা যাচ্ছিল।
পেছনে তাকিয়ে গলির মুখ খুঁজলাম—
দুই বাড়ির ছায়া এসে
সেটুকুও নিজেদের মধ্যে নিয়ে নিয়েছে।