১৭. খালি কাপ
সভার শেষে টেবিলে পড়ে থাকে
কয়েকটি কাপ।
কোনোটির তলায় চিনি,
কোনোটির কিনারায় চায়ের শুকনো রেখা।
একটি কাপ প্রায় ভরা—
যিনি বসেছিলেন, তাঁকে মাঝপথে
অন্য কোথাও যেতে হয়েছে।
আমার কাপটি কখন খালি করেছি
মনে পড়ে না।
পর্দায় তখনো একটি ছক জ্বলছে।
কে কী করবেন, কত দিনের মধ্যে,
কোন অর্থ কোন ঘরে বসবে—
সবকিছুর জায়গা আছে।
যে মানুষটি কিছু বলতে গিয়ে
আবার চুপ করে গেলেন,
তাঁর কথার জন্য কোনো সারি রাখা হয়নি।
কাপ তুলতে আসা লোকটি
আমার দিকে হাত বাড়ায়।
আমি একটু সরিয়ে রাখি,
বলি, আরেক কাপ হবে?
সে মাথা নাড়ে।
বাইরে গিয়ে ফিরে আসতে সময় লাগে।
এই প্রথম টেবিলের ওপাশে
বসে থাকা মানুষটিকে জিজ্ঞেস করি,
আপনি কিছু বলছিলেন?
তিনি কাগজ গুটিয়ে ফেলেছিলেন।
আবার খুলতে গিয়ে
চশমাটি একটু নামিয়ে নেন।
তাঁর প্রথম বাক্যের মাঝখানে
আমার সামনে চা এসে পড়ে।
আমি ধন্যবাদ জানাই নিচু গলায়।
বাষ্পের ভেতর দিয়ে
তাঁকে এবার বেশ স্পষ্ট দেখা যায়।
১৮. দরজার মাঝখান দিয়ে
ঘরে লেখার জন্য বসলে
দরজাটা পুরো বন্ধ করি না।
একটু ফাঁক থাকে।
ওইটুকু দিয়ে প্রথমে ম্যাক্সের গোঁফ,
পরে মুখ, তারপর সমস্ত শরীর
ঢুকে আসে।
মিনি বাইরে বসে দেখে
ভেতরে আসার মতো কিছু আছে কি না।
পর্দায় একটি বাক্য আটকে আছে।
তিনবার বদলেছি।
প্রথমবার বেশি সুন্দর,
দ্বিতীয়বার বেশি স্পষ্ট,
তৃতীয়বার পড়ে মনে হলো
এ কথা কোনো মানুষ এভাবে বলে না।
ওপাশ থেকে স্ত্রী জানতে চায়,
চা দেব?
দেব বলেই আবার মুছে ফেলি
বাক্যের শেষ অংশ।
ম্যাক্স চেয়ারের পাশে এসে
লেজ দিয়ে পায়ে ছুঁয়ে যায়।
তাকে আদর করতে নিচু হলে
টেবিলের নিচে একটি কলম দেখি।
কত দিন ধরে খুঁজছিলাম।
কলম তুলে সোজা হয়ে বসার আগেই
মিনি ঢুকে পড়েছে।
দরজার ফাঁক একটু বেড়েছে।
বাইরের আলো মেঝের ওপর
লম্বা হয়ে শুয়ে আছে।
দূরে কারও হাসি শুনি।
কোন কথায় হাসল জানতে ইচ্ছে হয়।
লেখাটি রেখে বাইরে যাই।
ফিরে এসে দেখি
পর্দা নিভে গেছে,
আমার চেয়ারে ঘুমাচ্ছে দুজন।
১৯. বাবার চেয়ার
বাবার কোনো চেয়ার
আমার কাছে নেই।
যেটিতে বসতেন, সেটির হাতল
কাঠের ছিল কি না
এখন নিশ্চিত বলতে পারি না।
মনে পড়ে তাঁর হাত।
কোনো কিছু ধরতে গেলে
একটু সময় লাগত।
তাঁর অসুখের পর বাড়ির জিনিসগুলো
অন্যভাবে রাখতে শিখেছিলাম—
পানির পাত্র কাছে,
হাঁটার জায়গায় কিছু নয়,
ডাকলে যেন শোনা যায়।
এত ছোট বয়সে
ঘরের দূরত্বগুলো বদলে গিয়েছিল।
এখন আমার চেয়ারের উচ্চতা বদলানো যায়।
পিঠ ঠেকালে পেছনে হেলে আসে,
হাতলের নিচে ছোট একটি চাকা।
দীর্ঘক্ষণ বসে থাকার জন্য
কত আয়োজন।
তবু বিকেলের দিকে
শরীর শক্ত হয়ে যায়।
উঠে জানালার কাছে দাঁড়াই।
দূরের ছাদে এক বালক
শুকোতে দেওয়া কাপড়ের ফাঁক দিয়ে
কারও সঙ্গে কথা বলছে।
তার বয়স অনুমান করতে গিয়ে
নিজের সেই বয়সে পৌঁছে যাই—
যখন বাবাকে ডাকতে গিয়ে
মনে পড়ত, ডেকে লাভ নেই।
পেছনে চেয়ারটি
সামান্য ঘুরে থেমে আছে।
বসে পড়ার আগে
হাতলের ওপর হাত রাখি।
নিজের আঙুলের কাছে
বাবার হাতের শিরাগুলো
আজকাল প্রায়ই দেখা যায়।
২০. না-পাঠানো চিঠি
প্রিয়—
এরপর নাম লিখে
অনেকক্ষণ বসেছিলাম।
দুপুরের সভায় তোমার কথার ওপর
আমি কথা বলেছি।
তুমি আর বাক্যটি শেষ করোনি।
পরে কার্যবিবরণীতে দেখি
সিদ্ধান্তটি লেখা হয়েছে আমার ভাষায়।
চিঠিতে লিখলাম,
সময় কম ছিল।
তার নিচে লিখলাম,
আমার উদ্দেশ্য ছিল না—
এই পর্যন্ত এসে বুঝলাম
দুটি বাক্যেই আমি
নিজের জন্য চেয়ার টেনে বসছি।
মুছে দিলাম।
সন্ধ্যায় ঢাকার রাস্তা থেকে
বাসের হর্ন উঠে আসছিল।
জানালার কাচ বন্ধ করেও
অল্প অল্প শোনা যাচ্ছিল।
আবার লিখলাম,
আজ তোমাকে থামিয়ে দিয়েছিলাম।
বাক্যটির পরে কিছু যোগ করতে গিয়ে
বারবার আঙুল থামল।
কারণ লিখলে ছোট হয়ে আসে ঘটনাটি,
ক্ষমা চাইলে উত্তর দেওয়ার ভার
তোমার দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।
ফোনে নামটি খুঁজলাম।
সবুজ চিহ্ন জ্বলছিল পাশে।
কিছুই পাঠালাম না সেদিন।
পরদিন দেখা হওয়ার আগে
চিঠিটি আরেকবার পড়ি।
একটি বাক্যই আছে।
পর্দা বন্ধ করে
তোমার টেবিলের দিকে হাঁটি।
২১. আলমারির একটি তাক
বই রাখার জায়গা নেই বলে
একটি তাক খালি করতে বসেছি।
প্রথমে পুরোনো নির্দেশিকা,
অচল সফটওয়্যারের মোটা বই,
যেসব পাতায় এত মন দিয়ে দাগ দিয়েছিলাম
যেন ওই জ্ঞান আর বদলাবে না।
একটি বই খুলতেই
নিজের তরুণ হাতের লেখা পাই—
খুব জরুরি।
কোন অংশটি জরুরি ছিল
আজ আর বোঝার উপায় নেই।
বাক্যটির নিচে দুটি দাগ,
পাশে একটি বিস্ময়চিহ্ন।
বইয়ের পেছনে আটকে আছে
প্রথম প্রকাশিত গল্পের পুরোনো কপি।
পাতা খুলতে সাবধান হতে হয়।
ছাপা নামটির ওপর আঙুল রাখি,
তখনকার আমির বয়সের চেয়ে
কালির বয়স এখন বেশি।
ওটি সরিয়ে রাখি।
তারপর একটি তার,
যার যন্ত্রটি বহু আগেই নষ্ট;
একটি খাম,
যার ঠিকানায় আর কেউ থাকে না।
মেঝেতে বইয়ের স্তূপ বাড়ে।
তাকের পেছনের কাঠ দেখা যায় অবশেষে—
ধুলো মুছলে মাঝখানে
হালকা রঙের একটি আয়তক্ষেত্র।
মিনি এসে উঠে বসে।
তাকে নামানোর আগে ছবি তুলি।
তারপর ভাবি, একটু থাক।
বইগুলো মেঝেতেই পড়ে আছে।
তাকের অন্ধকারে চোখ বুজে
সে নিজের শরীরের চারদিকে
লেজটি গুটিয়ে নেয়।
২২. হলুদ মাখা ভাত
চালের জন্য মা
কোন বাড়িতে গিয়েছিলেন
মনে নেই।
ফিরে আসার মুখটিও
ঠিকমতো মনে করতে পারি না।
শুধু ভাতের হলুদ রং
এত বছরেও ফিকে হয়নি।
থালায় আর কী ছিল?
মনে করতে গেলে
এখনকার রান্নাঘর এসে পড়ে—
তেলের বোতল, লবণের কৌটো,
ফ্রিজ খুললে জ্বলে ওঠা আলো।
সেই দুপুরে এত কিছু ছিল না।
মা ভাত মেখে দিচ্ছিলেন।
আমার খিদে পেয়েছিল খুব।
তাঁর আঙুলের ফাঁক দিয়ে
হলুদ লেগে থাকা দানাগুলো
থালায় নেমে আসছিল।
আমি খাচ্ছিলাম।
এখন দুপুরে খাবার সামনে নিয়ে
কখনো ফোন দেখি,
কখনো অসমাপ্ত কাজের কথা ভাবি।
কত ক্যালরি হলো
সেটিও হিসাব করি মাঝে মাঝে।
সেই ভাতের হিসাব
মায়ের কাছে ছিল।
কার কাছ থেকে চাল আনলেন,
কবে ফেরত দেবেন,
সন্ধ্যায় আবার কী হবে—
খেতে বসে জানতে চাইনি।
স্বাদটির কথা বলতে গেলে আজও
তাঁর ভাগে কতটুকু পড়েছিল
সেই প্রশ্নটি এসে বসে।
আমার মনে আছে
থালা প্রায় চেটে খেয়েছিলাম।
মা সামনে বসে ছিলেন।
আমি মুখ তুললেই
তিনি আরেকটু মেখে দিচ্ছিলেন।
২৩. নীরবতার ভাড়াবাড়ি
কথাটি শেষ হলে
অপর প্রান্তে কোনো শব্দ হলো না।
শ্রমিকটির অভিযোগ
আমি পর্দায় পড়ছিলাম;
ফোনে তিনি বারবার বলছিলেন
নামটা যেন বাইরে না যায়।
পাশের ঘরে সভা চলছে।
কাচের দেয়ালের ওপারে
কারও হাত উঠছে,
কেউ একটি লেখার দিকে ইঙ্গিত করছে।
আমি জানতে চাইলাম,
এখন কথা বলা নিরাপদ?
তিনি সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিলেন না।
দূরে ধাতুর ওপর ধাতু পড়ার শব্দ।
কারও কাশি।
তারপর নিচু গলায় বললেন,
একটু দাঁড়ান।
আমি অপেক্ষা করি।
পর্দা নিভে গেলে মাউস নাড়াই,
আবার তাঁর তথ্য জ্বলে ওঠে।
কয়েকটি ঘর পূরণ করা,
কয়েকটি ফাঁকা।
ঠিকানার জায়গায়
কারখানার পাশের এলাকার নাম।
সেখানে তাঁর ঘরটি কেমন
আমি জানি না।
দরজা বন্ধ করলে কতখানি শব্দ আটকায়,
রাতে কারা পাশ দিয়ে যায়,
ফোনে কথা বলার জন্য তাঁকে
বাইরে বেরোতে হয় কি না।
তিনি ফিরে এসে বলেন,
এখন বলেন।
এবার আমি প্রশ্ন করার আগে
নিজের ঘরের দরজাটি
উঠে গিয়ে বন্ধ করি।
২৪. ঘরে জায়গা হচ্ছে
কিছু ফাইল মুছে দিয়ে
যন্ত্রটি জানাল
কতখানি জায়গা পাওয়া গেছে।
পুরোনো সংস্করণ,
একই ছবির কয়েকটি কপি,
যে নথির নামের শেষে
তিনবার ‘চূড়ান্ত’ লেখা।
সব মুছতে পারিনি।
একটি ফোল্ডারে বাবার
একমাত্র স্ক্যান করা ছবি।
আরেকটিতে ছেলেমেয়ের ছোটবেলার মুখ,
ঝাপসা বলে যেগুলো
কোনো দিন ছাপানো হয়নি।
সেগুলো রেখে
টেবিলের দিকে তাকাই।
বইয়ের নিচে বিল,
বিলের নিচে খাতা,
খাতার ভেতর একটি শুকনো পাতা—
কখন কোথা থেকে এনেছি
কোনো নোট নেই।
স্ত্রী দরজায় দাঁড়িয়ে বলে,
এগুলো একটু সরালে বসা যায়।
আমি প্রথমে আরেকটি চেয়ার খুঁজি।
তারপর নিজের কাগজগুলো
কোলের ওপর তুলে নিই।
সে বসে।
কোনো বিশেষ কথা ছিল না।
বাজার থেকে ফেরার পথে
কাকে দেখেছে,
বারান্দার গাছটিতে নতুন পাতা এসেছে,
কাল একটু তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।
কাগজের কোণ
আমার হাতে চাপ দিচ্ছে।
টেবিলে ফিরিয়ে রাখতে ইচ্ছে করে,
তবু কথার মাঝখানে উঠি না।
ম্যাক্স এসে পায়ের কাছে শোয়।
ঘরটি আগের মতোই ভর্তি।
আমরা বসে আছি,
কথা ফুরিয়ে যাওয়ার পরও
কিছুক্ষণ।