FF.
পঞ্চম পর্ব: অকাজের গাছের ছায়া Book page

Chapter 5

পঞ্চম পর্ব: অকাজের গাছের ছায়া

Oct 22, 2026 6 min read

৩৩. অকাজের গাছ

কাঠমিস্ত্রি গাছটি দেখে বলেছিল,
এতে ভালো কাঠ হবে না।

কাণ্ড বাঁকা,
ভেতরে কোথাও ফাঁপা থাকতে পারে;
দুটি ডাল এমনভাবে বেরিয়েছে
সোজা তক্তা পাওয়া কঠিন।

বাগানের লোক বলেছিল,
ফলও ধরে না।

বাড়ির পেছনে দাঁড়িয়ে
গাছটি এসব কথা শুনেছে কি না
জানার উপায় নেই।

ছোটবেলায় তার নিচে বসে
আমি প্রথম একটি গল্প লিখেছিলাম।
লেখার মাঝখানে পিঁপড়া উঠে
খাতার ভাঁজে ঢুকে যেত,
ছায়া সরে গেলে
আমিও একটু সরে বসতাম।

গল্পটি কোথায় আছে জানি না।

অনেক দিন পর ফিরে গিয়ে দেখি
গাছের নিচে একটি ভ্যান।
চালক গামছা বিছিয়ে ঘুমাচ্ছে,
প্যাডেলের কাছে রাখা স্যান্ডেল।

ডালের ফাঁকে
পলিথিন আটকে আছে বহুদিন।
হাওয়ায় ফুলে ওঠে,
আবার চুপসে যায়।

গাছটি সুন্দরও নয় তেমন।

আমি মোবাইল তুলে ছবি নিতে গিয়ে
মানুষটির ঘুম ভাঙবে ভেবে
একটু দূরে সরে দাঁড়াই।

দুপুরের রোদে
আমার পায়ের অর্ধেক পুড়ছিল।
আরও কাছে এলে
গাছের ছায়ায় ঢোকা যেত।

সেখানে দাঁড়ানোর মতো
জায়গা তখনো ছিল।


৩৪. জীবনবৃত্তান্তের বাইরে

জীবনবৃত্তান্ত ছোট করতে বলা হয়েছে।

প্রথম চাকরির দুটো লাইন বাদ দিই,
পুরোনো প্রশিক্ষণ,
অনেক আগে পাওয়া একটি সনদ।
তবু নির্ধারিত দুই পাতায়
নিজেকে রাখা যাচ্ছে না।

কোন কাজটি গুরুত্বপূর্ণ
ঠিক করতে করতে
একটি সন্ধ্যা মনে পড়ে।

জাহাজে প্রথম দূরের বন্দরে গিয়ে
তীরে নামার আগে
জুতা পরিষ্কার করছিলাম।
কোথায় যাব জানতাম না,
পকেটের টাকা গুনে
আবার ভেতরে রেখেছিলাম।

সেই সন্ধ্যার কোনো ফলাফল নেই।

একসময় সাংবাদিকতা করেছি—
এক লাইনে লেখা যায়।
কিন্তু ছাপাখানার গন্ধ,
ভোরে নিজের নাম খুঁজে পাওয়া,
পারিশ্রমিকের অপেক্ষায়
একই সিঁড়ি বারবার ওঠা—

এসবের জন্য পাতা চাইলে
অনেক পাতা লাগে।

নতুন সংস্করণটি খুলে দেখি
বাক্যগুলো বেশ দক্ষ।
উন্নয়ন, বাস্তবায়ন, সমন্বয়—
প্রতিটি ক্রিয়াপদ আমাকে
একটু করে লম্বা করেছে।

রাতে মেয়ে এসে জিজ্ঞেস করে,
একটা কথা শোনো তো।

আমি বলি, বলো।

সে যা বলে
এই নথিতে কখনো লাগবে না।
চেয়ার ঘুরিয়ে তার দিকে বসি,
দুই পাতার মানুষটিকে রেখে
পর্দার মধ্যে।


৩৫. অবসরপ্রাপ্ত ঘড়ি

পুরোনো হাতঘড়িটির ব্যাটারি
শেষবার কবে বদলেছি মনে নেই।

সাতটা কুড়িতে থেমে আছে।
সকাল না সন্ধ্যা
তার মুখ দেখে বোঝা যায় না।

কখনো কবজিতে বেঁধে দেখি।
ফিতার পুরোনো ছিদ্রে
এখন আর আটকায় না,
একটি ঘর এগিয়ে নিতে হয়।

জাহাজে থাকতে ঘড়ি দেখার
আলাদা ভঙ্গি ছিল—
হাত সামান্য কাত,
কাজ থেকে চোখ যত কম সরানো যায়।

ঢাকায় এসে
যানজটে বসে দেখেছি বেশি।

ঘড়িটির পেছনে আঁচড়,
কাচের ধারে ছোট ফাটল।
একজন বলেছিল,
মেরামত করে লাভ কী,
এই দামে নতুন পাবেন।

ড্রয়ারে রেখে দিয়েছি।

আজ অন্য কিছু খুঁজতে গিয়ে
আবার পেলাম তাকে।
কানের কাছে নিই,
অভ্যাসে।

কোনো শব্দ নেই।

ফিরিয়ে রাখার আগে
সময়টি ঠিক করে দিতে ইচ্ছে হলো।
তারপর সাতটা কুড়িতেই রাখলাম।

ড্রয়ার বন্ধ করে
রান্নাঘরে যাই।

কেটলির মুখে বাষ্প উঠছে।
স্ত্রী বলে,
এই তো, চা হয়ে গেছে।


৩৬. বিড়ালের কোনো অর্জন নেই

ম্যাক্স আজও কিছু অর্জন করেনি।

সকাল থেকে দুবার ঘুমিয়েছে,
একটি কাগজের বাক্স পরীক্ষা করে
আয়তন সম্পর্কে সন্তুষ্ট হয়েছে,
তারপর সেখানে শরীরের চেয়ে
সামান্য বেশি জায়গা নিয়ে শুয়েছে।

আমার সকালটি কাজে কেটেছে।
তিনটি সভার পর আরেকটি সভা কেন দরকার
সেটি বুঝিয়ে একটি বার্তা লিখেছি।
দুপুরের খাবার ঠান্ডা হয়েছে,
উত্তর এসেছে—আলোচনা করা যেতে পারে।

মিনি এসে বসল কাগজের ওপর।

তাকে সরাতে গিয়ে দেখলাম,
আমার আগামী ছয় মাসের পরিকল্পনার নিচে
তার সামনের পা দুটি ঢাকা পড়েছে।

রোদ সরে যাচ্ছিল।
সে উঠে আরেকটু এগিয়ে শুল।

এত সহজে জায়গা বদলাতে পারলে
আমার জীবন কেমন হতো—ভাবলাম;
তারপর চেয়ার ছাড়লাম না,
কারণ পর্দায় কেউ একজন লিখছিল
এবং আমার জানা দরকার ছিল সে কী লিখবে।

বিকেলে রোদসী ডাকতেই
দুজনেই ছুটে গেল।

আমি নাম ধরে ডাকলে
মাঝে মাঝে কান নাড়ায়।
আমার কণ্ঠের সব কথা তারা বোঝে—
এই বিশ্বাস নিয়ে তাদের কাছে
অনেক অসমাপ্ত কথা বলি।

আজ বললাম, খুব ক্লান্ত লাগছে।

ম্যাক্স পিঠ উঁচু করে আড়মোড়া ভাঙল।
মিনি আমার হাতের কাছে এসে
মাথা নিচু করে অপেক্ষা করল।

কিছুক্ষণ তার কানের পেছনে হাত বোলালাম।
কাজের কথাগুলো বলতে বলতে
কখন থেমে গেছি মনে নেই।

রাতে বাতি নেভানোর আগে দেখি
ওদের পানির পাত্র প্রায় খালি।

রান্নাঘর থেকে জল এনে দিলাম।
মিনি উঠে ধীরে ধীরে খেল,
ম্যাক্স ঘুমের মধ্যে পা গুটিয়ে নিল।

পাত্রটি ধুয়ে রাখতে গিয়ে
খেয়াল হলো, আমারও তেষ্টা পেয়েছে।


৩৭. আগাছার পক্ষে বক্তব্য

সকালে টব পরিষ্কার করতে গিয়ে
চারাটিকে তুলে ফেলেছিলাম।

মাটি খুব শক্ত ছিল না।
শিকড়সহ উঠে এল,
পাতা দুটি তখনো
আলোর দিকে খোলা।

কী গাছ জানি না।
যেটি লাগিয়েছি
তার পাশে নিজে থেকে উঠেছে বলে
চেনার প্রয়োজন হয়নি।

শুকনো পাতার সঙ্গে
ফেলে দিলাম পলিথিনে।

দুপুরে ময়লা নামাতে গিয়ে দেখি
ব্যাগের গায়ে ঠেস দিয়ে
চারাটি দাঁড়িয়ে আছে।
শিকড়ের কাছে অল্প মাটি,
একটি পাতা ভাঁজ হয়ে গেছে।

আমি সেটি তুলে নিই।

বারান্দায় ছোট একটি ভাঙা পাত্র ছিল।
তলায় মাটি দিয়ে
চারাটিকে বসাতে গিয়ে
পাতার নিচে পিঁপড়ের ডিমের মতো
কয়েকটি বিন্দু দেখি।

পোকা কি না ভাবি।
তারপর পাতাটি ছেড়ে
অল্প জল দিই।

বিকেলে অন্য টবগুলো দেখি—
কোনটির পাতা হলুদ,
কোনটিতে ফুল আসছে না।

ভাঙা পাত্রটির কাছে এসে
কিছুক্ষণ নাম খুঁজি মনে মনে।
তারপর মাটিতে আঙুল ঢুকিয়ে
দেখি, ভেজা আছে কি না।


৩৮. যে দিন কিছুই হলো না

রাতে জানতে চাইলে বলতাম,
আজ কিছুই হলো না।

দুটি নথি শেষ করার কথা ছিল,
একটি কবিতাও।
নথির প্রথম পাতায় তারিখ বদলেছি,
কবিতার শিরোনামটি ভালো লাগেনি।

সকালে অনেকক্ষণ মেঘ ছিল।
শুকোতে দেওয়া কাপড়
বারান্দা থেকে ঘরে,
ঘর থেকে বারান্দায় নিয়েছি দুবার।

দুপুরে ভাত একটু বেশি খাওয়া হয়ে গেল।
বই হাতে নিয়ে শুয়েছিলাম,
চশমা খুলে রাখতে মনে ছিল না।
ঘুম ভাঙলে কানের পাশে
ফ্রেমের চাপ।

বিকেলে ছেলে একটি ভিডিও দেখাল।
আমি প্রথমবার বুঝিনি কেন মজার,
সে আবার চালাল।
দ্বিতীয়বার ওর হাসি দেখে
আমারও হাসি পেল।

মিনি বমি করেছিল মেঝেতে।
পরিষ্কার করতে গিয়ে
সোফার নিচে একটি বোতাম পেলাম,
কোন জামার জানি না।

সন্ধ্যায় স্ত্রী বলল,
আজ একটু হাঁটবে?

আমরা নিচে নেমে
বাড়ির সামনের পথটুকু ঘুরলাম।
ফেরার সময় ডিম কিনলাম,
দোকানদার একটি বাড়তি কাগজে
মুড়ে দিল সাবধানে।

রাতে দিনের হিসাব লিখতে বসে
প্রথমে সত্যিই লিখেছিলাম—
কিছুই হয়নি।

তারপর বাক্যটির নিচে
দীর্ঘ সময় কলম ধরে ছিলাম।
পাশের ঘরে হাসির শব্দ উঠলে
খাতাটি খোলাই রেখে চলে যাই।


৩৯. বাগানের অননুমোদিত অংশ

বারান্দার জন্য পরিকল্পনা ছিল—
এদিকে ফুল,
ওদিকে রান্নায় লাগবে এমন গাছ,
মাঝখানে হাঁটার জায়গা।

প্রথম মাসে বেশ মেনেও চলেছি।

তারপর একটি লতা
নিজের টব ছেড়ে
অন্য গাছের কঞ্চি ধরে উঠল।
আমি নামিয়ে দিলাম।

কয়েক দিন পর দেখি
আবার সেখানে।

এবার সুতো বেঁধে
অন্যদিকে নিতে চাইলাম।
পাতাগুলো উল্টো হয়ে রইল
সারাটা দুপুর।

সন্ধ্যায় সুতো আলগা করতে হলো।

ওদিকে পুদিনার কাছে
নাম না জানা কয়েকটি পাতা।
মাটি ফেলব বলে রাখা বালতিতে
বৃষ্টির জল জমে
সবুজ একটি আস্তরণ ধরেছে।

পরিকল্পনার ছবিটি ফোনে আছে।
চাইলে এখনো মিলিয়ে দেখা যায়
কোন জায়গায় কী হওয়ার কথা।

কিন্তু আজ সকালে
লতার আড়ালে একটি ছোট পাখি বসেছিল।
আমি কাছে যেতেই
ভেতরে আরেকটু সরে গেল।

কঞ্চিগুলো সরালে
জায়গাটি পরিপাটি হবে।

জলের পাত্র হাতে দাঁড়িয়ে
আমি টবের অন্য পাশ দিয়ে
ধীরে ধীরে জল দিলাম।

পাতার নিচে ছায়া নড়ল।
পাখিটি তখনো যায়নি।


৪০. ছায়ার কোনো মালিকানা নেই

হাসপাতালের বাইরে
গাড়িটি ছায়ায় রেখেছিল চালক।

ফিরে আসতে দেরি হলো।
রোদ ততক্ষণে সরে
সামনের আসনে এসে পড়েছে,
ছায়াটি রাস্তার অন্য পাশে।

গাড়িতে ওঠার আগে
গাছের নিচে দাঁড়াই।

একজন নারী শিশুকে কোলে নিয়ে বসে।
পাশে ওষুধের ব্যাগ,
পরীক্ষার কাগজ ভাঁজ করে
পাখা করছেন।

আরেকজন দেয়ালে হেলান দিয়ে
ফোনে টাকা চাইছে।
কথা শেষ হওয়ার পরও
ফোন কানে ধরে থাকে কিছুক্ষণ।

গাছের গায়ে সাইনবোর্ড,
দুটি বিজ্ঞাপন,
লোহার একটি পুরোনো তার
বাকলের মধ্যে ঢুকে গেছে।

হাত রেখে দেখি
তারটির দুই পাশে
কাণ্ড ফুলে উঠেছে।

ওপরে পাতার ফাঁক দিয়ে
রোদ পড়ে আমার জুতায়।
একটু সরলে
বসে থাকা নারীর গায়ে পড়বে বলে
সেখানেই থাকি।

চালক দরজা খুলে
আমার দিকে তাকিয়ে আছে।
আমি হাত তুলে জানাই, আসছি।

নারীটি শিশুর মাথা
অন্য কাঁধে নেয়।
তার কপালের ঘাম মুছতে গিয়ে
কাগজটি মাটিতে পড়ে।

তুলে দিতে নিচু হই।
আমার সরে যাওয়া জায়গায়
আরেকজন এসে দাঁড়ায়।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.