FF.
ষষ্ঠ পর্ব: ফিরে যাওয়ার কোনো ঠিকানা নেই Book page

Chapter 6

ষষ্ঠ পর্ব: ফিরে যাওয়ার কোনো ঠিকানা নেই

Oct 22, 2026 6 min read

৪১. শরীর আগে জানতে পারে

সিঁড়ির মাঝখানে এসে
শরীর আমাকে থামাল।

আমি থামতে চাইনি।
ওপরে ওঠার তাড়া ছিল,
ফোনও বাজছিল পকেটে।

রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে
প্রথমবার খেয়াল করলাম
দুটি তলার মাঝখানে
ছোট একটি জানালা আছে।

কাচের কোণে মাকড়সার জাল,
বাইরে পাশের বাড়ির দেয়াল।
সেখানেও একটি ফাটল দিয়ে
পাতা বেরিয়েছে।

কতবার এই সিঁড়ি দিয়ে উঠেছি।

ফোন থেমে গেল।
বুকের ভেতরের শব্দ
ধীরে ধীরে আলাদা হয়ে এল
কানের কাছের শব্দ থেকে।

আমি নিজের কবজি ধরলাম।
ঘড়ির ঠিক নিচে
আঙুলের সঙ্গে তাল মেলাচ্ছে
একটি পুরোনো কাজ।

আমার কিছু বলার আগেই
এ কাজ শুরু হয়েছিল।

আজ সকালেও তাকে না জানিয়ে
অনেক পরিকল্পনা করেছি—
কোথায় যাব, কতক্ষণ বসব,
রাতে কী শেষ করব।

জানালার নিচে
রোদ এসে পড়েছে এক চিলতে।

সেখানে দাঁড়িয়ে
আরেকবার শ্বাস নিই।
ওপর থেকে কেউ নামছে দেখে
একটু সরে জায়গা দিই।


৪২. আয়নায় বাবার বয়স

বাবার যে মুখ মনে আছে
তার বয়স আর বাড়ে না।

আমি ক্রমে তার চেয়ে
বেশি দিন বেঁচে ফেলেছি কি না
হিসাব করতে বসে থেমে যাই।
তাঁর জন্মের সাল নিয়ে
বাড়িতে একাধিক কথা ছিল।

কিন্তু আমার নিজের বয়স
সনদে স্পষ্ট।

সকালে দাড়ি কাটতে গিয়ে
চিবুক একটু উঁচু করলে
আয়নার মধ্যে বাবার মুখ আসে।
সোজা হলে আবার সরে যায়।

তাঁকে কখনো পাকা চুলে দেখিনি।
এই কাজটি আমাকে
একা করে যেতে হচ্ছে।

কানের পাশের সাদা অংশে
সাবান লেগে আছে।
আঙুল দিয়ে মুছতে গিয়ে ভাবি,
বেঁচে থাকলে এখন
আমার কথা কেমন করে শুনতেন।

তাঁর পাশে বসে
চাকরির খবর বলতে পারতাম,
বইয়ের কথা, ছেলেমেয়ের কথা।
তিনি মাঝখানে হয়তো জানতে চাইতেন
জমির ওই সীমানাটা
এখন কার দখলে।

আমাদের কথাবার্তা
একেবারেই মিলত না সব বিষয়ে।

এই সামান্য বিরোধের জন্যও
আজকাল মন খারাপ হয়।

বেসিনে জল ছাড়ি।
গালের এক পাশে
অল্প দাড়ি রয়ে গেছে।

আবার সাবান লাগিয়ে
আয়নার কাছে ঝুঁকি।
মুখটি এবার
পুরো আমার।


৪৩. শুকনো পাতার সিদ্ধান্ত

পাতাটি কখন ডাল ছেড়েছে
দেখিনি।

সকালে বারান্দায় এসে পাই
চেয়ারের ওপর।
বাদামি, মাঝখানে সবুজের
সরু একটি অবশেষ।

আঙুলে তুললে
ভাঁজের কাছে মচমচ শব্দ।

ইচ্ছে হলো লিখি—
সময় বুঝে সরে যাওয়ার কথা,
সহজে ছেড়ে দেওয়ার কথা।

কিন্তু ডালের সঙ্গে তার শেষ রাতটি
আমি দেখিনি।

হয়তো বাতাস ছিল,
হয়তো অনেকক্ষণ
একটি আঁশ ধরে ঝুলেছিল।

পাতাটিকে খাতার মধ্যে রাখি।

দিনের শেষে লিখতে বসে
পাতা উল্টাতেই
মাঝখান দিয়ে ভেঙে যায়।
শিরাটি একদিকে,
দুটি অসমান অংশ অন্যদিকে।

আঠা দিয়ে জোড়া দেওয়ার মতো
কিছু ছিল না সেখানে।

ছোট টুকরোগুলো হাতে নিয়ে
টবের মাটিতে রেখে আসি।
একটি টুকরো আঙুলে লেগে থাকে।

হালকা ফুঁ দিলে
সেটিও নেমে যায়।


৪৪. মাটির কাছে ফেরত

টব বদলানোর সময়
ভাঙা পাত্রটি কাত করতেই
শিকড়ের আকার দেখা গেল।

গোল হয়ে ঘুরেছে,
নিজের ওপর দিয়ে আবার গেছে,
যেদিকে মাটি শেষ
সেদিকেও খুঁজেছে পথ।

এত দিন ওপরের পাতা দেখে
গাছটির অবস্থা বুঝতে চেয়েছি।

এখন নিচের এই জট
হাতে ধরে আছি।

নতুন পাত্রে কিছু মাটি দিই,
শিকড় আলগা করতে গিয়ে
কয়েকটি ছিঁড়ে যায়।
সাবধানে করার পরও।

মাটির গন্ধ হাতে লাগে।

একসময় জাহাজের ধাতব সিঁড়ি ধরে
নিচে নামতাম।
কানে একটানা যন্ত্রের শব্দ,
পায়ের নিচে কাঁপন;
দূরে কোনো তীর আছে
মনে রাখতে হতো।

এখন বারান্দার মেঝেতে বসে
আঙুল দিয়ে মাটি সরাই।
নখের নিচে ঢুকে থাকে
কালো, সামান্য ভেজা।

ভাঙা টবের টুকরোগুলো
আলাদা করে রাখি।
ছোট টুকরোটি নতুন পাত্রের
জল নামার মুখে বসিয়ে দিই।

তারপর গাছটিকে ধরি
যতক্ষণ চারপাশের মাটি
তার গোড়া ঘিরে দাঁড়ায়।

হাত ছাড়লে
সামান্য দুলে ওঠে।

আমি এবারও হাত বাড়াই,
কিন্তু ছুঁই না।


৪৫. বিদায়ের অনুশীলন

বাড়ি থেকে বেরোতে বেরোতে
কতবার ফিরে আসি।

চাবি, চশমা,
ফোনের চার্জার,
কোনো দিন শুধু মনে হয়
কিছু একটা ফেলে যাচ্ছি।

দরজা খুললে স্ত্রী জিজ্ঞেস করে,
আবার কী?

আমি জিনিসটির নাম বলি।
কখনো খুঁজে পাই,
কখনো টেবিলে হাত দিয়ে
কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি।

দীর্ঘ সফরে গেলে
ব্যাগ আগের রাতে গোছানো থাকে।
তবু সকালে দরজার কাছে এসে
ঘরটিকে অন্য রকম লাগে—
কাপের পাশে চায়ের দাগ,
সোফায় গুটিয়ে থাকা মিনি,
জানালার কাছে শুকোতে দেওয়া গামছা।

জাহাজে ওঠার সময়
বন্দরকে পেছনে সরে যেতে দেখেছি।
কারও হাত আর চেনা যায় না
একটু দূর হলেই।
তবু মানুষ হাত নাড়ে
আরও কিছুক্ষণ।

এখন অল্প দিনের জন্য গেলেও
বেরোনোর আগে জানতে চাই,
সব আছে তো?

প্রশ্নটি ব্যাগের দিকে ছুড়ে দিই,
উত্তর আসে ঘরের ভেতর থেকে।

সেদিন গাড়ি নিচে অপেক্ষা করছিল।
লিফটে উঠে মনে হলো
আবার কিছু ফেলে এসেছি।

ফিরে এসে দরজায় চাপ দিতেই
ভেতর থেকে খুলে গেল।

বললাম, কিছু না।
তোমাদের একটু দেখে গেলাম।

স্ত্রী হেসে বলল,
আচ্ছা, এবার যাও।

ম্যাক্স দরজার ফাঁকে
নাক বাড়িয়ে গন্ধ নিচ্ছিল
বাইরের বাতাসের।


৪৬. যে আমাকে মনে রাখবে না

এখন যে পাঠক জন্মায়নি
তার জন্যও কি
একটি বাক্য রেখে যেতে চাই?

নতুন বইয়ের প্রথম কপিতে
নিজের নাম দেখে
এই প্রশ্ন মনে হয় না।

তখন কাগজের গন্ধ নিই,
মলাটে হাত বোলাই,
ভুল রয়ে গেল কি না দেখতে
শেষ পাতাটি খুলি।

পরে কোনো পুরোনো বইয়ের দোকানে
কারও নাম লেখা বই পেলে
প্রশ্নটি ফিরে আসে।

সস্নেহে—
তারপর একটি স্বাক্ষর,
তারিখ।

যাঁকে দেওয়া হয়েছিল
তিনি বইটি কত দূর পড়েছিলেন
জানা যায় না।
মাঝখানে একটি বাসের টিকিট,
এক জায়গায় নীল দাগ,
কয়েকটি পাতা জোড়া লেগে আছে।

আমি বইটি কিনে আনি।

বাড়িতে এসে
স্বাক্ষরের মানুষটিকে খুঁজতে বসি।
একই নামে অনেকের খবর আসে,
তাঁরটি আসে না।

তবু রাতে পড়তে গিয়ে
একটি বাক্যে থামি।
অনেক বছর আগে
অচেনা কারও হাত
এই শব্দগুলো সাজিয়েছিল।

আমার ঘরে তখন সবাই ঘুমাচ্ছে।

টিকিটটি যে পাতায় ছিল
সেখানেই ফিরিয়ে রাখি।
কাল পড়া হবে কি না জানি না,
আপাতত বাতি নেভানোর আগে
আরেক পাতা উল্টাই।


৪৭. আরেকবার সকাল

রাতে মনে হয়েছিল
সকালে উঠেই লিখব।

সকাল এসে দেখে
আমি ঘুমাচ্ছি।

প্রথমে জানালার পর্দা উজ্জ্বল হয়,
তারপর বাইরে ঝাড়ু দেওয়ার শব্দ।
কেউ নিচে গাড়ি ধুচ্ছে,
বালতির গায়ে মগ ঠুকে উঠছে
একই শব্দ বারবার।

ম্যাক্স বিছানায় উঠে
আমার হাঁটুর পাশে বসে।
এতক্ষণে চোখ খুলি।

কী করতে হবে
মনে পড়ার আগে
কয়েক মুহূর্ত শুধু ঘরটিকে দেখি।

চেয়ারে গত রাতের জামা,
টেবিলে চশমা,
খোলা বইয়ের ওপর
উল্টো করে রাখা আরেকটি বই।

পায়ের পাতায় ঠান্ডা মেঝে লাগে।

রান্নাঘরে গিয়ে জল খাই।
ফিরে দেখি মিনি
আমার ছেড়ে ওঠা জায়গায় শুয়েছে।

তাকে সরাই না।

জানালার কাচ খুলতে
একটু জোর লাগে।
রাতের বৃষ্টিতে কাঠ ফুলেছে।
খুলে গেলে ভেতরে আসে
ভেজা বাতাস, দূরের হর্ন,
নিচে কারও দরদাম করার গলা।

খাতার প্রথম পাতায়
তারিখ লিখতে গিয়ে
গতকালের তারিখ বসিয়ে ফেলি।

কেটে পাশে আজকেরটি লিখি।
পুরোনো সংখ্যার ওপর
কালি এখনো ভেজা।


৪৮. পথ চলছে

আজ কোনো নতুন সিদ্ধান্ত নিইনি।

সকাল থেকে
আগের দিনের কাজগুলোই—
চা, খবর,
দুটি অসমাপ্ত বার্তা,
পানির পাত্রের পাশে
বিড়ালের পড়ে থাকা খাবার।

হাঁটু ভাঁজ করে বসে
দানাগুলো কুড়িয়ে রাখি।
উঠতে গিয়ে টেবিল ধরি,
কিছুক্ষণ লাগে।

বাইরে যাওয়ার আগে
গাছগুলোতে জল দিতে হবে।

একটি টবের মাটি ভেজা,
অন্যটির ওপর শুকনো খোসা।
একই পাত্র থেকে
সমান জল ঢালতে গিয়ে থামি।

আঙুল দিয়ে দেখি।

পাশের বাড়ির ছাদে
একজন কাপড় মেলছে।
ভেজা চাদরটি ঝাড়া দিতেই
কয়েকটি ফোঁটা উড়ে আসে এদিকে।

তিনি হাত তুলে কিছু বলেন।
শব্দ পৌঁছায় না।
আমি মাথা নাড়ি।

শেষ টবটিতে জল দিতে দিতে
নিচের রাস্তাটি দেখা যায়।
একটি রিকশা দাঁড়িয়ে,
যাত্রী নামার আগে
ব্যাগের ভেতর ভাড়া খুঁজছে।

রিকশাওয়ালা অপেক্ষা করছে
হ্যান্ডেলে দুই হাত রেখে।

আমারও বেরোতে হবে।

খালি পাত্রটি রেখে
স্যান্ডেল খুঁজতে যাই।
ম্যাক্স একটির ওপর শুয়ে আছে।
পেটের নিচ থেকে টেনে নিতে গেলে
সে লম্বা হয়ে শরীর ছাড়ে।

দরজার কাছে এসে
স্ত্রীকে বলি, যাচ্ছি।

ভেতর থেকে উত্তর আসে।

সিঁড়ির জানালায় সকালের আলো।
রেলিংয়ে হাত রেখে নামি,
মাঝের বাঁকে একজন উঠছেন—
আমি একটু পাশে দাঁড়াই।

তার হাতে বাজারের ব্যাগ।
খোলা মুখ দিয়ে
লাউয়ের ডগা বেরিয়ে আছে।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.