৯. জলের কোনো তাড়া নেই
রাতে কলের মুখে পাত্র বসিয়ে
অন্য ঘরে চলে গিয়েছিলাম।
ফিরে এসে দেখি উপচে পড়ছে জল,
মেঝেতে রাখা জুতার ভেতরেও
অল্প অল্প ঢুকেছে।
আমার জন্য অপেক্ষা করেনি।
অথচ সারাদিন কত মানুষকে বলেছি—
একটু সময় দিন,
এই কাজটি শেষ হলেই দেখছি।
হাঁটু গেড়ে মেঝে মুছতে বসি।
কাপড়ের এক প্রান্ত ভিজে ভারী হয়,
চিপে দিলে বালতির নিচে
ছোট একটি শব্দ ওঠে বারবার।
পায়ের কাছে জমে থাকা জলে
বাতির প্রতিচ্ছবি কেঁপে যায়।
কাপড় টেনে নিলে ভেঙে পড়ে,
হাত থামালেই আবার জোড়া লাগে।
সারাদিনের কোনো কথাই
এই মুহূর্তে পুরো মনে পড়ছে না।
কার কাছে কী প্রমাণ করার ছিল,
কোন উত্তরের জন্য ফোনটি
এখনো টেবিলে উল্টো করে রাখা—
ভাবতে ভাবতে হাত চালাই।
শেষে বালতিটা নিয়ে বারান্দায় যাই।
টবের মাটি শুকিয়ে ফেটে আছে।
অল্প করে জল ঢালি,
প্রথমে মাটি নেয় না,
কিনারা বেয়ে বেরিয়ে আসে।
এবার থামি।
কিছুক্ষণ পরে আবার ঢাললে
ভেতরে নামতে থাকে জল।
মাটির রং বদলানো পর্যন্ত
সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকি।
১০. নদীকে নির্দেশ দেওয়া যায় না
প্রথমে মানচিত্রে একটি রেখা টানা হয়েছিল।
তারপর মাটি ফেলে সেই রেখাটিকে
মানুষের হাঁটার উপযোগী করা হয়।
উদ্বোধনের ছবিতে
সবাই শুকনো জায়গায় দাঁড়িয়ে।
বর্ষার আগে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম।
বাঁধের গায়ে সদ্য লাগানো ঘাস,
খুঁটির সঙ্গে বাঁধা ছোট গাছগুলো
একদিকে হেলে আছে।
একজন বৃদ্ধ নিচের দিকে আঙুল তুলে
বললেন, এখানে আগে মুখ ছিল।
আমরা মানচিত্রে খুঁজলাম।
সরু নীল দাগটি এসে
রাস্তার কাছে শেষ হয়ে গেছে।
এখন মুখ নেই, বললেন আরেকজন।
বৃদ্ধ আর কিছু বললেন না।
জুলাইয়ে জল উঠলে
পাশের গ্রামের উঠানে
তিন দিন মাছ ধরেছিল শিশুরা।
চতুর্থ দিনে তাদের স্কুলের বেঞ্চ
উঁচু বাড়ির বারান্দায় নেওয়া হয়।
তখন আবার লোক আসে।
মাপ নেয়, ছবি তোলে,
জল নামলে কোথায় কী করা হবে
তার তালিকা তৈরি করে।
বৃদ্ধ এবারও দাঁড়িয়ে ছিলেন।
তাঁর লুঙ্গির ভেজা প্রান্ত থেকে
কাদার ওপর ফোঁটা পড়ছিল।
সন্ধ্যায় বাঁধের এক জায়গায়
খুব সামান্য ধস নামল।
সেখানে দাঁড়িয়ে কেউ চিৎকার করছিল,
আরও বস্তা আনো।
আমি বস্তার মুখ ধরে ছিলাম।
ভেতরে বালি পড়ছিল,
আমার জুতার পাশ দিয়ে
চাপা জল বেরিয়ে আসছিল শিস দিয়ে।
১১. নিচু জায়গার জীবনী
বাড়ির পেছনে জায়গাটুকু নিচু ছিল।
বাবা বলতেন, একদিন মাটি ফেলব।
ততদিনে সেখানে
কচুর পাতা বড় হয়েছে,
বর্ষার প্রথম ব্যাঙ ডেকেছে,
পাশের বাড়ির হাঁস এসে
দুপুর কাটিয়ে গেছে।
শুকনো মৌসুমে আমরা ক্রিকেট খেলতাম।
ওদিকে বল গেলে
কারও নাম ধরে পাঠাতে হতো না;
যার ব্যাটে লেগেছে
সে-ই কাদা মাড়িয়ে নামত।
বছর কয়েক পর সত্যিই মাটি এল।
ভাঙা ইট, পুরোনো পলেস্তারা,
বালুর সঙ্গে কাচের টুকরো।
প্রথমে জায়গাটি উঁচু হলো,
পরে সেখানে ঘর উঠল।
গৃহপ্রবেশের দিন সবাই বলল,
অবশেষে কাজে লাগল।
নতুন ঘরের জানালা দিয়ে
আমাদের উঠান দেখা যেত।
সেই বর্ষায় মা দরজার কাছে
ইট সাজিয়ে রাখলেন।
রাতে জল উঠলে
একটি একটি করে পা ফেলে
রান্নাঘরে যেতেন।
আমি তখন বাইরে থাকি।
ফোনে জিজ্ঞেস করেছিলাম,
এবার এত জল কেন?
মা বলেছিলেন, নামতে পারছে না।
কথাটি শুনে পুরোনো জায়গাটার কথা
অনেক দিন পর মনে পড়ল—
বল কুড়োতে নেমে পায়ের নিচে
ঠান্ডা কাদা পাওয়া,
আর হাঁসগুলো সরে গেলে
জলের ওপর থেকে যাওয়া
ধীরে মিলিয়ে আসা পথ।
১২. দাঁড় থামানোর মুহূর্ত
নৌকায় উঠেই জিজ্ঞেস করলাম,
কতক্ষণ লাগবে?
মাঝি দড়ি খুলছিল।
দাঁতে চেপে রাখা গিঁট ছেড়ে
বলল, যাই, তারপর বোঝা যাবে।
উত্তরটি আমার পছন্দ হয়নি।
ওপারে পৌঁছে ফোন করতে হবে,
সেখান থেকে গাড়ি,
তারপর আরেকটি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে
নিজেকে হাজির করা।
নৌকা ছাড়তেই
ঘাটের শব্দগুলো পেছনে পড়ে গেল।
শুধু দাঁড় তোলার সময়
জল গড়িয়ে পড়ছিল
কাঠের গা বেয়ে।
মাঝনদীতে মাঝি থামল।
আমি বললাম, কী হয়েছে?
কিছু হয়নি বলে
সে দাঁড়টি নৌকার ওপর রাখল।
আমরা তবু এগোতে থাকলাম—
একটি বাঁশের খুঁটি পেছনে গেল,
দূরের বালুচর একটু ঘুরে
অন্য রকম দেখাল।
মাঝি হাতের তালুতে জল নিয়ে
মুখে দিল, ঘাড়ে মাখল।
আমি ব্যাগ থেকে ফোন বের করে
আবার রেখে দিলাম।
পাড়ের কাছে এসে
সে হঠাৎ দ্রুত দাঁড় টানতে লাগল।
নৌকার মুখ সোজা হলো,
কাদায় ঠেকে থামল।
নামার সময় হাত বাড়িয়ে দিল।
আমার পায়ের নিচে মাটি পাওয়া পর্যন্ত
হাতটি ছাড়েনি।
১৩. পাথরের দীর্ঘ পরাজয়
পাথরটি মসৃণ ছিল না প্রথমে।
তার গায়ে যে খাঁজে এখন
আমার বৃদ্ধাঙ্গুলি বসে,
সেখানে একসময় ধার ছিল হয়তো।
নদী থেকে তুলে এনে
টেবিলে রেখেছি।
কাগজ উড়ে গেলে চাপা দিই,
কখনো অকারণে হাতে নিই
কথা বলতে বলতে।
এই পর্যন্ত তার ইতিহাস
আমি নিজের চোখে দেখেছি।
বাকিটুকু ভাবতে ভালো লাগে—
দীর্ঘ জল, ঋতুর পর ঋতু,
অবিরাম ঘর্ষণে
কঠিনের কোমল হয়ে আসা।
কিন্তু পাথরের গায়ে
আরও ছোট পাথরের আঘাত আছে,
ভেঙে যাওয়া পাশ আছে,
কোনো এক প্রচণ্ড স্রোতে
দূরে ছিটকে পড়ার দাগও হয়তো।
তার গোল হয়ে ওঠার গল্পে
সেই শব্দগুলো রাখতে ভুলে যাই।
আজ পাথরটি জানালার ধারে সরিয়ে
নিচের কাগজ তুললাম।
বহুদিন আগের একটি চিঠি।
কাগজ হলদে হয়েছে,
ভাঁজের কাছে প্রায় ছিঁড়ে এসেছে।
যে মানুষটিকে উত্তর দিইনি
তার হাতের লেখা
এখনো ঠিক ততটাই জোরে
আমার নাম ধরে রেখেছে।
পাথরটি হাতে নিয়ে বসি।
তালুর মধ্যে ধীরে উষ্ণ হয়,
কোন দিকটায় প্রথমে ধার ছিল
আর খুঁজে পাই না।
১৪. বৃষ্টির কাছে ঠিকানা
শহরের এই প্রান্তে বৃষ্টি হলে
আমার শৈশবের বাড়িতে
কেউ কাপড় তুলতে যায়।
মাকে ফোন করে জানি
ওখানে রোদ।
অথচ এখানে বারান্দায় দাঁড়ালেই
ভেজা মাটির সঙ্গে মিশে
পুরোনো ঘরের গন্ধ পাই—
চালের কিনারা দিয়ে পড়া জল,
পাটের বস্তা সরানোর শব্দ,
বইয়ের নিচে ইট রেখে দেওয়ার
অতিসতর্ক আয়োজন।
বিছানার একটি কোণ বাঁচিয়ে
আমরা সেদিকে সরে বসতাম।
বাবা বালতিটা একটু এগিয়ে দিলে
টুপটাপ শব্দের সুর বদলে যেত।
সেই বাড়িতে এখন
অন্য ছাদ, অন্য মেঝে।
কোন জায়গায় জল পড়ত
যিনি থাকেন তাঁকে দেখাতে গেলে
ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে
সঠিক জায়গাটি পাই না।
আজ অফিস থেকে ফেরার পথে
বৃষ্টি আমাকে দোকানের নিচে দাঁড় করাল।
পাশে এক যুবক জুতা খুলে
পলিথিনে ঢোকাচ্ছে।
তার মোজা ভেজা,
ফোনে কাউকে বলছে, আসছি।
আমিও বাড়িতে খবর দিই।
তারপর দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে
রাস্তার জল বাড়তে দেখি।
যুবকটি একটু সরে
আমাকে শুকনো জায়গা দেয়।
বৃষ্টির ছাট সেখানেও পৌঁছায়।
আমরা আবার সরে দাঁড়াই,
যতটুকু ছাদের নিচে থাকা যায়।
১৫. যে জল ঘর নিয়ে যায়
নদীর কাছে বসে আমি লিখছিলাম—
জলের কোনো তাড়া নেই।
ওপারে তখন একটি ঘর সরানো হচ্ছিল।
চারজন মানুষ টিনের চাল তুলে ধরেছে,
একজন নারী উঠানের দড়ি থেকে
ভেজা কাপড় নামিয়ে নিচ্ছে দ্রুত।
বাক্যটির নিচে দাগ দেওয়ার সময়
পাড়ের খানিকটা মাটি ধসে পড়ল।
শব্দ খুব বেশি হলো না।
একটি কলাগাছ কাত হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে
শিকড়সহ নেমে গেল জলে;
পাতার ওপর রোদ তখনো
আগের মতোই উজ্জ্বল।
লোকটি বলল, ভাই, একটু ধরবেন?
আমি খাতা বন্ধ করলাম।
দরজার পাল্লা ভেবেছিলাম,
কাছে গিয়ে দেখি জানালার কাঠামো—
একদিকে কবজা ঝুলছে,
কাঠে পেনসিলের কয়েকটি দাগ।
প্রতি বছর ছেলেটির উচ্চতা মেপেছিল কেউ।
আমরা সেটি নিয়ে উঁচু রাস্তার দিকে হাঁটলাম।
আমার আঙুলে কাঠের ছিলকা ঢুকল,
লোকটি বারবার পেছনে তাকাচ্ছিল।
তার হাঁটার সঙ্গে তাল মেলাতে গিয়ে
বুঝলাম, ভারটা শুধু সামনে ধরে রাখলে হয় না।
রাস্তায় নামিয়ে সে জিজ্ঞেস করল,
আপনার কাছে পানি আছে?
ব্যাগ থেকে বোতল বের করে দিলাম।
সে অল্প খেল, বাকিটুকু এগিয়ে দিল স্ত্রীর দিকে।
ছোট মেয়েটি তখন মায়ের আঁচল ধরে
কিছু একটা খুঁজছিল ফেলে আসা উঠানে।
বিকেলে আর খাতা খুলিনি।
রাস্তার পাশে জানালাটি রাখা ছিল।
তার ভেতর দিয়ে দেখা যাচ্ছিল নদী,
আলাদা করে চেনা যাচ্ছিল না
কোনখানে রান্নাঘর ছিল,
কোথায় মানুষটি ঘুমাত।
ফেরার সময় নৌকার মাঝি
দাঁড় একটু থামিয়ে জল দেখল,
তারপর পাড় থেকে দূরে সরিয়ে নিল আমাদের।
১৬. কল বন্ধ করার পর
কল বন্ধ করার পরও
কিছুক্ষণ জল পড়ে।
প্রথমে সরু একটি ধারা,
তারপর আলাদা ফোঁটা।
শেষ ফোঁটাটি মুখে ঝুলে থাকে
বেশিক্ষণ।
আমি হাত বাড়িয়ে ছুঁয়ে দিলে
আঙুল ভিজে যায়।
যে কথাটি আজ বলা শেষ করেছি
সেটিও এখনো শেষ হয়নি।
অন্য ঘরে মানুষটি চুপ করে আছে,
এদিকে আমি ধোয়া থালার ওপর
অকারণে আরেকবার হাত বোলাই।
সাবানের গন্ধ ওঠে।
বলেছিলাম, থাক, আর কথা বাড়িও না।
কথা সেখানেই থেমেছে বলে
আমার বিশ্বাস করতে সুবিধা হয়েছিল।
কলের মাথা আরও শক্ত করে ঘোরাই।
একটি ছোট শব্দ হয় ভেতরে।
তারপরও মুখের কাছে
স্বচ্ছ গোলকটি বড় হতে থাকে।
মিস্ত্রি ডাকতে হবে।
সকালে হয়তো ডাকব।
এখন হাত মুছে
অন্য ঘরের দরজায় দাঁড়াই।
মানুষটি মুখ তোলে না,
আমি চেয়ার টেনে বসি।
রান্নাঘর থেকে
অনিয়মিত শব্দ আসছে।
সে অনেকক্ষণ পরে বলে,
আমি কথাটা শেষ করিনি।
আমি হাত দুটি
হাঁটুর ওপর রেখে শুনি।