FF.
চতুর্থ পর্ব: হাতের মুঠো আলগা করি Book page

Chapter 4

চতুর্থ পর্ব: হাতের মুঠো আলগা করি

Oct 22, 2026 6 min read

২৫. সবকিছু ঠিক করার মানুষ

প্রথমে দেয়ালের ঘড়ি থেমেছিল।
ব্যাটারি বদলে দিলাম।

তারপর কলের মুখে ফোঁটা,
বারান্দার বাতি,
কম্পিউটারে জমে থাকা পুরোনো ভুল—
একটি একটি করে হাত দিলাম সবখানে।

বাড়িতে কিছু নষ্ট হলে
আমাকে ডাকতে সবার সুবিধা হয়।
আমারও ভালো লাগে
স্ক্রু ঠিক জায়গায় বসার শব্দ,
অন্ধকার ঘরে সুইচ টিপে
আলো ফিরে আসার মুহূর্ত।

কিন্তু সেদিন স্ত্রী যখন বলল,
আজ মনটা ভালো নেই,

আমি জানতে চাইলাম, কেন।
তারপর কারণ শোনার আগেই
সম্ভাব্য সমাধানগুলো সাজাতে লাগলাম—
বাইরে যাওয়া যায়,
কয়েক দিন বিশ্রাম,
ওই কথাটি এত গায়ে মাখার কী আছে।

সে চুপ করে গেল।

চা ঠান্ডা হচ্ছিল টেবিলে।
মিনি কাপের কাছে নাক এনে
সরে গেল বিরক্ত মুখে।

আমি তখনো বলছি।

শেষে স্ত্রী বলল,
তুমি একটু শুনবে?

হাতে কোনো যন্ত্র ছিল না,
তবু মনে হলো
কিছু একটা নামিয়ে রাখতে হবে।

কাপটি সরিয়ে
দুই হাত টেবিলে রাখলাম।

সে আবার প্রথম থেকে শুরু করল না।
মাঝখান থেকে বলছিল,
আমি সেখান থেকেই শুনতে থাকলাম।


২৬. মুঠোর মধ্যে পাখি

বারান্দার কাচে ধাক্কা খেয়ে
পাখিটি টবের পেছনে পড়েছিল।

ম্যাক্স শব্দ শুনে ছুটে এল।
তাকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করলাম,
তারপর দুই হাতে তুললাম
ধুলো লেগে থাকা শরীর।

এত দ্রুত স্পন্দন
আগে কখনো হাতে ধরিনি।

আঙুলের একটু চাপেই
পালক বসে যায়।
আরেকটু আলগা করলে
পড়ে যাবে মনে হয়।

রোদসী একটি বাক্স এনে
নিচে নরম কাপড় দিল।
আমরা পাখিটিকে রেখে
ওপরের দিকটা খোলা রাখলাম।

বহুক্ষণ কিছু হলো না।

চোখ মেলে তাকায় কি না
দেখতে গিয়ে বারবার ঝুঁকছিলাম।
রোদসী বলল,
এত কাছে যেয়ো না।

আমি সরে বসলাম।

ঘরের ভেতর থেকে ম্যাক্স
কাচে পা তুলে দাঁড়িয়েছে।
পাখিটির দিকে নয়,
আমাদের দিকে তাকিয়ে।

একসময় বাক্সে খসখস শব্দ হলো।
পাখিটি কিনারায় উঠে
মাথা ঘুরিয়ে চারপাশ দেখল।

তারপর উড়ে গেল
সামনের বাড়ির কার্নিশে।

বাক্সের কাছে আমার হাত
তখনো বাড়ানো ছিল।
ভেতরের কাপড়ে লেগে আছে
ছোট একটি পালক।

বাতাসে সেটি নড়ছিল বলে
বাক্সটি কিছুক্ষণ
সরাতে পারিনি।


২৭. অসমাপ্ত কাজের পাশে দুপুর

খাবার টেবিলে বসেও
পর্দার দিকে চোখ যাচ্ছিল।

একটি ব্যয় মেলেনি।
একই কাজের জন্য দুই জায়গায়
দুটি ভিন্ন অঙ্ক।
পাশাপাশি রাখলে খুব সামান্য পার্থক্য,
কিন্তু তার পেছনে
কারও বিল আটকে থাকতে পারে।

ভাতের পাশে আলুভর্তা।
এক টুকরো লেবু
চাপ দেওয়ার অপেক্ষায়।

আমি আবার উঠে যাই।

পুরোনো বার্তা, সংযুক্তি,
সংশোধিত হিসাব—
খুলতে খুলতে দুপুরের আলো
টেবিল পেরিয়ে মেঝেতে নামে।

যাঁর কাছে জানতে হবে
তাঁর ফোন বন্ধ।

এবার আর কিছু করার নেই,
এই কথাটি মেনে নিতে
আরও কয়েকটি নথি খুলতে হয়।

ফিরে এসে বসলে
ভাতের ওপরের দিকটা শক্ত।

স্ত্রী বলে, গরম করে দিই?

না বলে লেবুতে চাপ দিই।
একটি বিচি পড়ে ভাতের মধ্যে।
চামচ দিয়ে তুলতে গিয়ে
ভেতরের উষ্ণতা টের পাই।

বাইরে ফেরিওয়ালা হাঁকছে।
পাশের বাড়িতে কিছু ভাজা হচ্ছে,
পেঁয়াজের গন্ধ আসছে জানালা দিয়ে।

ধীরে খেতে শুরু করি।

অমিল অঙ্ক দুটি
অন্য ঘরে পাশাপাশি আছে।
ফোন খুললে খবর পাব।
আপাতত হাতের আঙুলে
লেবুর গন্ধ।


২৮. দক্ষ হাতের বিরতি

পুরোনো ল্যাপটপটি খুলে
ছেলেটি ছোট ছোট প্যাঁচ
সাদা কাগজের ওপর সাজাল।

আমি পাশ থেকে বলছিলাম,
আমার ধারণা সমস্যাটা—

সে মাথা নেড়ে শুনল,
কিছু বলল না।

পেছনের ঢাকনা সরাতেই
ধুলোর আস্তরণ দেখা গেল।
এত দিনের লেখা, সভা, হিসাব
এই উষ্ণ অন্ধকারের ওপর বসে
আমি করেছি।

ছেলেটি তুলো পেঁচিয়ে
একটি সরু জায়গা পরিষ্কার করল।
তারপর হাত থামিয়ে
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল।

আমি ভাবলাম, বুঝতে পারছে না।

বললাম, দরকার হলে—

সে আঙুল তুলে
আমাকে একটু অপেক্ষা করতে বলল।

দোকানের পাখা ঘুরছিল।
বাইরে মোটরসাইকেল থামল,
কেউ এসে দাম জিজ্ঞেস করল
একটি পুরোনো চার্জারের।

ছেলেটি উত্তর দিয়ে আবার ঝুঁকল।
একটি তার সামান্য সরিয়ে
চাপ দিল খুব আস্তে।

ঢাকনা লাগানোর আগে
সে আমাকে ডেকে দেখাল
কোথায় ঘষা খাচ্ছিল তারটি।

এবার আমি চুপ করে
কাছে গিয়ে দেখলাম।

তার নখের গোড়ায় কালো ময়লা,
কবজিতে ঘড়ির ফিতের সাদা দাগ।
পর্দা জ্বলে উঠলে
আমার চেয়ে আগে সে হাসল না।

আরও একবার বন্ধ করে
আবার চালু করল।


২৯. সন্তান দরজা বন্ধ করলে

আগে দরজা খোলাই থাকত।
ভেতরে ঢুকে বই সরিয়ে দিতাম,
পাখা কমাতাম,
জানতে চাইতাম কী করছে।

এখন কড়া নাড়তে হয়।

প্রথম কয়েক দিন
হাত উঠিয়ে আবার নামিয়েছি।
নিজের বাড়ির একটি দরজার সামনে
কী বলব ভেবে দাঁড়িয়ে থাকা
আমার অভ্যাসে ছিল না।

ওপাশে কখনো গান,
কখনো একটানা চুপ।
আমি সেই চুপের মধ্যে
অকারণে অনেক কিছু শুনে ফেলি।

ফোন নিয়ে বসে আছে কি না,
খারাপ কোনো খবর,
কেউ কিছু বলেছে কি না—

কড়া নাড়লে উত্তর আসে,
কী হয়েছে?

কিছু হয়নি বলা যায় না।
তাহলে ডাকলাম কেন?

সেদিন হাতে পেয়ারা ছিল।
কেটে একটি বাটিতে নিয়েছি,
লবণ আলাদা।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বললাম,
পেয়ারা রাখব কোথায়?

ওপাশ থেকে বলল, আসো।

ঘরটি আগের চেয়ে ছোট মনে হলো।
চেয়ারে জামা, টেবিলে খাতা,
পর্দায় অচেনা কয়েকটি মুখ।
আমাকে দেখে কথা থামল।

বাটি রেখে বেরিয়ে আসছিলাম।
পেছন থেকে ডাকল,
তুমি খেয়েছ?

এক টুকরো তুলে নিলাম।

দরজাটি বন্ধ হওয়ার আগে
ভেতরে আবার হাসির শব্দ উঠল।
আমি রান্নাঘরে ফিরে
অবশিষ্ট পেয়ারাটি কাটতে লাগলাম।


৩০. ভালোবাসার ব্যবস্থাপনা

আমরা ছুটির দিনের জন্য
একটি তালিকা করেছিলাম।

বাজার, ওষুধ,
একজন আত্মীয়কে দেখতে যাওয়া,
বিকেলে কোথাও বসা—
অনেক দিন বাইরে বসা হয় না।

সকাল দশটার মধ্যে বেরোলে
সবই সম্ভব।

দশটা বেজে গেল
একটি ফোনে কথা বলতে বলতে।
তারপর গাড়ি পাওয়া গেল না।
রাস্তায় আটকে থাকতে থাকতে
আমি সময়ের হিসাব বদলাতে লাগলাম।

ওষুধ আগে নিলে সুবিধা,
আত্মীয়ের বাসায় বেশি সময় নয়,
খাওয়া পথে কোথাও—

স্ত্রী জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল।

আমি বললাম,
তোমার পছন্দের জায়গাটাতেই তো যাব।

সে বলল, জানি।

তারপরও মুখ ফিরিয়ে নিল না।

বিকেলে সত্যিই সেখানে পৌঁছালাম।
বসার জায়গা পাওয়া গেল,
খাবার এল যথাসময়ে।
ছবি তোলার মতো আলোও ছিল।

আমি ফোন তুললে সে বলল,
আজ থাক।

ফোন নামিয়ে রাখি।

সামনের টেবিলে একটি শিশু
বারবার চামচ ফেলে দিচ্ছে।
তার বাবা প্রতিবার কুড়িয়ে এনে
নতুন চামচ চাইছে বিরক্ত মুখে।

আমাদের হাসি পেয়ে গেল।

স্ত্রী চা ঢালতে গিয়ে
আমার কাপেও অল্প দিল।
তালিকায় চা ছিল না।
আমরা কোথাও যাওয়ার কথা
আর তুললাম না কিছুক্ষণ।


৩১. আজ উত্তর দেব না

রাতে বার্তাটি পড়লাম তিনবার।

শেষ বাক্যে আমার নাম,
তার আগে এমন কয়েকটি কথা
যার উত্তর এখনই দেওয়া যায়।

আমি লিখতেও শুরু করলাম।
তারিখ, আগের সিদ্ধান্ত,
কার উপস্থিতিতে কী বলা হয়েছিল—
স্মৃতি আশ্চর্য পরিষ্কার।

একটি শব্দ বদলে
আরও ধারালো শব্দ বসালাম।

মিনি টেবিলে উঠতে গিয়ে
ফোনে গা ঘষে গেল।
লেখার মাঝখানে
কয়েকটি অর্থহীন অক্ষর।

তাকে নামিয়ে
সেগুলো মুছলাম।
তারপর নিজের বাক্যগুলোও
নতুন করে পড়লাম।

ঘড়িতে বারোটা পেরিয়েছে।

বার্তাটি রেখে উঠে
বারান্দায় দাঁড়াই।
নিচে পাহারাদার চেয়ার সরিয়ে
পা দুটি ছড়িয়ে বসেছে।
দূরে কারও রান্নাঘরের আলো জ্বলছে।

আমার শরীর এখনো
উত্তর লিখছে ভেতরে ভেতরে—
চোয়াল শক্ত, কাঁধ উঁচু।

অনেকক্ষণ পরে
ঘরে ফিরে খসড়াটি বন্ধ করি।

সকালে আবার পড়লে
একটি প্রশ্ন দেখতে পেলাম,
রাতে যার চারদিকে
এত কথা জমিয়ে তুলেছিলাম।

শুধু সেটির উত্তর দিলাম।
তারপর চা খেতে গিয়ে দেখি
ঠোঁটের ভেতর কামড়ের দাগ।


৩২. ছেড়ে দেওয়ার পরও দায়িত্ব থাকে

নতুন লোকটি কাজ ধরার পর
প্রথম সপ্তাহে আমি
প্রতিদিন খবর নিয়েছি।

দ্বিতীয় সপ্তাহে
সরাসরি নথি খুলে দেখতে শুরু করলাম।
একটি ছকের রং বদলেছে,
কয়েকটি ঘরের ক্রমও অন্য রকম।

আমার হাত নিজে থেকেই
পুরোনো বিন্যাস ফিরিয়ে দিতে চাইছিল।

সে বলল,
এভাবে পড়তে আমার সুবিধা হয়।

আমি পর্দার দিকে তাকিয়ে থাকলাম।
যে অস্বস্তি হচ্ছিল
তার সবটুকু কাজের কারণে কি না
তখন বলতে পারিনি।

একদিন সত্যিই ভুল হলো।
একটি সূত্র নিচের সারিতে নামেনি,
মোট অঙ্ক কম দেখাচ্ছে।

তাকে ডাকলাম।
সে বসে দেখল,
কোথা থেকে বাদ গেছে খুঁজে পেল,
নিজেই ঠিক করল।

আমি পাশে বসে ছিলাম।

কাজ শেষে সে জিজ্ঞেস করল,
আর কিছু?

প্রশ্নটি ছোট।
উত্তর দিতে গিয়ে দেখলাম
আমার বলার মতো
আরও অনেক কথা রয়ে গেছে—
কোন পথে সহজ,
কাকে আগে জানাতে হয়,
কোন জায়গায় একবার আটকে গিয়েছিলাম।

আজ শুধু প্রয়োজনীয়টুকু বললাম।

বিকেলে তার পাঠানো নথি এল।
নিজের মন্তব্য লিখে ফেরত দিলাম,
তার নামে থাকা ঘরটি
তার নামেই রাখলাম।

তারপর চেয়ার থেকে উঠে
জানালার কাছে গেলাম।
পেছনে কাজ চলার শব্দ—
আমি ঘুরে না তাকালেও
কিছুক্ষণ ধরে চলতে থাকল।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.