FF.
১ প্রথম মাঠ Book page

Chapter 1

১ প্রথম মাঠ

Oct 19, 2026 7 min read

চিঠিটা আমার টেবিলে এসেছিল অক্টোবরের সাত তারিখে।

এক পাতা, টাইপ করা। উপরে সংস্থার নাম, নিচে আফজাল সাহেবের সই।

লেখা ছিল — আমাকে নেত্রকোনা মাঠ কার্যালয়ে সাত দিনের জন্য পাঠানো হচ্ছে, অভিমুখীকরণের উদ্দেশ্যে।

অভিমুখীকরণ। শব্দটা আমি সেদিন প্রথম দেখলাম।

আমি অভিধান দেখিনি। আমি পাশের টেবিলের লোকটাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, আর সে বলেছিল, “ওরিয়েন্টেশন।”

○

দুই মাস হয়েছিল আমার চাকরির।

দুই মাসে আমি যা শিখেছিলাম তার একটা তালিকা করা যায়।

হাজিরা খাতায় সই করতে হয় নয়টার আগে। পাঁচটার পর সই করে বেরোতে হয়, আর অনেকে সাড়ে পাঁচটা লিখে চারটায় বেরিয়ে যায়। কেউ ধরে না।

চা আসে সাড়ে দশটায় আর সাড়ে তিনটায়, ট্রেতে, আর ট্রে বহন করে যে ছেলেটা তার নাম আলাউদ্দিন।

আর একটা জিনিস — অফিসে দুই রকম কাগজ চলে। এক রকম ভিতরের, বাংলায়। আরেক রকম বাইরের, ইংরেজিতে।

দুই রকম কাগজে একই জিনিস লেখা থাকে না।

○

আমি ঢাকার বাইরে গিয়েছিলাম শেষবার সাতানব্বইয়ের জুনে, মাগুরায়, বাবার শেষ কর্মদিবসের ঠিক আগে — না, ওইবার আমি যাইনি।

তাহলে চুরানব্বইয়ের ঈদে।

তিন বছর।

○

বাস ছাড়ে মহাখালী থেকে, সকাল সাতটায়।

আমি পৌঁছাই ছয়টা চল্লিশে। টিকিট আগেই কাটা, অফিস থেকে।

বাসটা পুরনো। সিটের কভার ছেঁড়া, জানালা আটকে যায় না।

আমার পাশে বসেন এক ভদ্রলোক, বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি, কোলে একটা ব্যাগ। তিনি ময়মনসিংহে নামবেন।

তিনি জিজ্ঞেস করেন, “কই যান?”

আমি বলি, “নেত্রকোনা।”

“বাড়ি?”

“না, কাজে।”

“কী কাজ?”

○

এইখানে আমি থেমে যাই।

দুই মাস আগে আমার পদ ছিল না। ছয় বছর আমি এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারিনি।

এখন আমার উত্তর আছে, আর উত্তরটা আমি এখনো মুখে অভ্যস্ত হইনি।

আমি বলি, “একটা সংস্থায় চাকরি করি। উন্নয়ন সংস্থা।”

তিনি বলেন, “এনজিও?”

আমি বলি, “জি।”

তিনি মাথা নাড়েন।

তারপর বলেন, “ঋণ দেন?”

আমি বলি, “না। আমাদেরটা শিক্ষা আর সচেতনতা নিয়া।”

তিনি বলেন, “ও।”

আর তাঁর গলার স্বরে যেটা আসে সেটা আগ্রহ কমে যাওয়া।

○

বাস চলে ছয় ঘণ্টা।

গাজীপুর পার হওয়ার পর শহর শেষ হয়ে যায়, আর তারপর যা শুরু হয় সেটা আমি ছয় বছর দেখিনি।

ধান কাটা হয়ে গেছে কোথাও, কোথাও হয়নি। জমিতে পানি জমে আছে জায়গায় জায়গায়। বাঁশের সাঁকো। কলাগাছ।

আমি জানালার দিকে মুখ করে বসে থাকি।

আর একটা কথা আমার মনে হয় যেটা মনে হওয়া উচিত না।

আমার মনে হয় — আমি এইসব ভুলে গেছি।

○

আমি গ্রামের ছেলে না। আমার বাড়ি মাগুরা শহরে, বাজারের কাছে, পাকা রাস্তার উপরে।

কিন্তু আমাদের বাড়ি থেকে দশ মিনিট হাঁটলে জমি শুরু হত, আর আমি ইশকুল পালিয়ে ওইদিকে যেতাম।

ছয় বছরে আমি একবারও ধানখেত দেখিনি।

ছয় বছরে আমি দুইশো গজের ভিতরে ছিলাম।

○

মাঠ কার্যালয়টা শহরের বাইরে, একটা ভাড়া বাড়ি।

একতলা, চারটা ঘর। সামনে উঠান, উঠানে দুইটা মোটরসাইকেল আর একটা সাইকেল।

দেয়ালে সংস্থার সাইনবোর্ড, টিনের, রঙ চটা।

আমাকে যিনি রিসিভ করেন তাঁর নাম হাফিজ ভাই — মাঠ ব্যবস্থাপক, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, রোগা, গায়ে হাফ শার্ট।

তিনি আমাকে দেখে বলেন, “আপনি ঢাকা থেকে?”

আমি বলি, “জি।”

তিনি বলেন, “নতুন?”

আমি বলি, “দুই মাস।”

তিনি বলেন, “ও, নতুন।”

○

সেই রাতে আমি থাকি অফিসেরই একটা ঘরে, যেখানে দুইটা চৌকি।

আরেকটা চৌকিতে একজন মাঠকর্মী থাকেন, নাম সেলিম, বয়স সাতাশ-আটাশ।

রাতে খাওয়ার পর সে বলে, “ভাই, আপনে ঢাকায় কী করেন?”

আমি বলি, “অফিসে।”

সে বলে, “অফিসে কী করেন?”

আমি বলি, “রিপোর্ট দেখি। মাঠের রিপোর্ট।”

সে অনেকক্ষণ চুপ করে থাকে।

তারপর বলে, “আচ্ছা।”

○

পরদিন সকাল আটটায় আমরা বেরোই।

মোটরসাইকেলে, সেলিমের পিছনে। রাস্তা ভাঙা, তারপর কাঁচা, তারপর মাটির আল।

আল ধরে হাঁটতে হয় দশ মিনিট।

আমার জুতা চামড়ার, অফিসের জন্য কেনা, তিনশো দশ টাকা।

সেলিম স্যান্ডেল পরা।

○

উঠান বৈঠক বসে দশটায়।

একটা বাড়ির উঠানে চাটাই পাতা। মহিলারা বসেন — আঠারো-বিশজন, কোলে বাচ্চা কারও কারও।

সেলিম বসে খাতা খোলে।

আমি এক পাশে বসি, চাটাইয়ের কোণায়, কারণ আমার বসার নির্দিষ্ট জায়গা নেই।

○

বৈঠকে যা হয়, সেটা আমি বর্ণনা করব।

প্রথমে হাজিরা। সেলিম নাম ডাকে, একজন একজন করে, আর তাঁরা “জি” বলেন।

তারপর সঞ্চয়। প্রত্যেকে সপ্তাহে দশ টাকা করে জমা দেন। কেউ কেউ দেন না — তাঁদের নামের পাশে সেলিম কিছু লেখে।

তারপর আলোচনা। সেদিনের বিষয় ছিল মেয়েদের স্কুলে ভর্তি।

সেলিম কথা বলে সাত-আট মিনিট। তারপর প্রশ্ন করে — কার মেয়ে স্কুলে যায় না, আর কেন যায় না।

○

উত্তরগুলো আমি লিখে রাখিনি।

আমার তখন খাতা ছিল না — এইটাই আমার প্রথম ভুল, আর হাফিজ ভাই বিকালে সেইটা ধরিয়ে দিয়েছিলেন।

কিন্তু দুইটা উত্তর আমার মনে আছে।

*

একজন মহিলা বললেন, স্কুল তিন কিলোমিটার। মেয়ের বয়স এগারো।

সেলিম বলল, “সাইকেল?”

তিনি বললেন, “সাইকেল কেনার টাকা নাই, আর থাকলেও দিতাম না।”

সেলিম বলল, “কেন?”

তিনি বললেন, “তিন কিলোমিটার রাস্তায় মেয়ে একলা যাইব?”

*

আরেকজন বললেন, তাঁর মেয়ে যায়। সপ্তাহে চার দিন।

সেলিম বলল, “পাঁচ দিন যায় না কেন?”

তিনি বললেন, “একদিন আমি বাজারে যাই। ওইদিন ছোটটারে দেখব কে?”

○

আমি ওই দুইটা উত্তর নিয়ে ফেরার পথে ভাবছিলাম।

আর ভাবতে ভাবতে আমার একটা জিনিস মনে পড়ল, আর সেই জিনিসটা মনে পড়ায় আমার লজ্জা লাগল।

*

তিরানব্বই সালে আমরা একটা লিফলেট বিলি করেছিলাম, মেয়েশিক্ষা নিয়ে।

লিফলেটটা আমি নিজে ফটোকপি করিয়েছিলাম, নীলক্ষেত থেকে, পাঁচশো কপি।

তাতে লেখা ছিল — কন্যাশিশুকে বিদ্যালয়ে পাঠান।

*

পাঁচশো কপি। আমরা বিলি করেছিলাম শাহবাগে, বইমেলায়, আর টিএসসিতে।

কাদের হাতে দিয়েছিলাম?

ওইখানে যারা ছিল তাদের হাতে।

○

সাত দিনে আমি বারোটা বৈঠকে বসি।

তৃতীয় দিন থেকে আমার হাতে খাতা থাকে।

আমি লিখি — কতজন এল, কতজন এল না, কে সঞ্চয় দিল না, কী কারণ বলল।

চতুর্থ দিন সন্ধ্যায় হাফিজ ভাই আমার খাতা দেখতে চান।

○

তিনি পাতা উল্টান, ধীরে।

তারপর বলেন, “আপনি হিসাব রাখতে পারেন।”

আমি বলি, “একটু পারি।”

তিনি বলেন, “একটু না। ভালো পারেন।”

*

তিনি একটা পাতায় আঙুল রাখেন।

তিনি বলেন, “এইখানে আপনি লিখছেন — সাতজন সঞ্চয় দেয় নাই, তার মধ্যে চারজন গত মাসেও দেয় নাই।”

আমি বলি, “জি।”

তিনি বলেন, “এইটা আপনি কেমনে জানলেন? আপনি তো গত মাসে ছিলেন না।”

আমি বলি, “খাতা দেখছি। গত মাসের খাতা অফিসে আছে।”

○

তিনি খাতাটা বন্ধ করেন।

তিনি বলেন, “আমার এইখানে চৌদ্দজন মাঠকর্মী। এর মধ্যে তিনজন পুরান খাতা দেখে।”

আমি কিছু বলি না।

তিনি বলেন, “আপনি ঢাকায় গিয়া কী করবেন?”

আমি বলি, “রিপোর্ট।”

তিনি বলেন, “রিপোর্ট লেখার সময় এই কথাটা মনে রাইখেন — যেই সংখ্যাটা আপনি দেখতেছেন, ওইটা কেউ একজন এই উঠানে বইসা লিখছে।”

○

শেষ দিন সন্ধ্যায় সেলিম আমাকে জিজ্ঞেস করে, “ভাই, ঢাকায় বেতন কত?”

আমি বলি না।

সে বলে, “না, না, খারাপ অর্থে না।”

আমি বলি, “চার হাজার।”

*

সে মাথা নাড়ে।

তারপর বলে, “আমার তিন হাজার দুইশো।”

আমি বলি, “তোমার কত দিন হইল?”

সে বলে, “তিন বছর।”

○

আমি সেই রাতে চৌকিতে শুয়ে হিসাব করি।

আট শ টাকা।

তিন বছরের অভিজ্ঞতা, প্রতিদিন মোটরসাইকেলে চল্লিশ কিলোমিটার, বারোটা সমিতি, চারশো সদস্য — এইসবের দাম আমার চেয়ে আট শ টাকা কম।

আর আমার কাজ হবে তার লেখা সংখ্যাগুলো ঢাকায় বসে যাচাই করা।

*

আমি এইটা নিয়ে রাগ করিনি।

এইটা আমি স্পষ্ট করে লিখব, কারণ পরে আমি নিজেকে বলেছি যে আমি রাগ করেছিলাম।

আমি রাগ করিনি। আমি হিসাবটা করেছিলাম, আর তারপর ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

○

ফেরার বাস ছাড়ে সকাল আটটায়।

হাফিজ ভাই এসে হাত মেলান। বলেন, “আবার আইসেন।”

সেলিম মোটরসাইকেলে করে বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত পৌঁছে দেয়।

নামার সময় সে বলে, “ভাই, ঢাকায় একটা কথা কইয়েন।”

আমি বলি, “কী?”

সে বলে, “মোটরসাইকেলের তেলের বিল যে দেয়, ওইটা দুই মাস পর পর আসে। মাঝখানে আমাদের নিজের টাকায় চলতে হয়।”

আমি বলি, “বলব।”

সে বলে, “বলবেন তো?”

আমি বলি, “বলব।”

○

আমি বলেছিলাম।

ঢাকায় ফিরে আমি ওইটা রিপোর্টে লিখেছিলাম, দুই লাইন, “পর্যবেক্ষণ” অংশে।

তিন মাস পর নিয়ম বদলেছিল — বিল মাসে মাসে আসতে শুরু করেছিল।

আমি জানি না ওইটা আমার দুই লাইনের জন্য হয়েছিল কি না। সম্ভবত না। সম্ভবত অন্য চারটা কার্যালয় থেকেও একই কথা এসেছিল।

কিন্তু ওইটাই আমার জীবনের প্রথম কাজ যেটার একটা ফল আমি চোখে দেখেছি।

*

ছয় বছর আমি পোস্টার সেঁটেছি, চাঁদা তুলেছি, সই জোগাড় করেছি, মিছিলে হেঁটেছি।

ছয় বছরে একটা জিনিসও বদলাতে দেখিনি।

আর এইখানে দুই লাইন লিখে তিন মাস পর একটা নিয়ম বদলেছে।

○

বাস মহাখালী পৌঁছায় বিকাল তিনটায়।

আমি নামি।

*

মহাখালী থেকে আগারগাঁও গাড়ি আছে। মহাখালী থেকে শাহবাগও গাড়ি আছে।

আমি ফুটপাতে দাঁড়িয়ে থাকি, কাঁধে ব্যাগ।

*

আমার মাথায় একবার আসে — আজিজে যাই। সাত দিন হয়ে গেছে। মজনুর কাছে খাতায় দাগ আছে কি না দেখি।

আমি ওইটা ভাবি, আর তারপর ভাবি বাড়ি গিয়ে গোসল করা দরকার।

*

আমার শার্টে সাত দিনের ধুলা। জুতার চামড়া নষ্ট হয়ে গেছে, কাদায়।

আমার পিঠ ব্যথা করছিল।

*

আমি আগারগাঁওয়ের বাসে উঠি।

○

আমি ওই বিকালে সিদ্ধান্ত নিইনি।

আমি কিছু ঠিক করিনি, কাউকে কিছু বলিনি, নিজেকেও না।

আমি শুধু ক্লান্ত ছিলাম, আর একটা বাস আগে এসেছিল।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.