FF.
৩ সাবলেট Book page

Chapter 3

৩ সাবলেট

Oct 19, 2026 5 min read

মেস ছাড়ার সিদ্ধান্তটা আমি নিয়েছিলাম মার্চের শেষ সপ্তাহে, আর সিদ্ধান্তটা ভাড়ার জন্য ছিল না। মেসে আমার অংশ ছিল মাসে চারশো পঞ্চাশ, নতুন ঘরের ভাড়া হবে নয়শো — দ্বিগুণ। তবু আমি রাজি হয়েছিলাম, কারণ ওই ঘরের দরজায় তালা দেওয়া যায়।

○

বাসাটা আমাকে দেখিয়েছিল আলাউদ্দিন, অফিসের পিয়ন। তার এক মামাতো ভাই ওই বাড়ির নিচতলায় থাকে, আর উপরতলার একটা পরিবার একটা ঘর সাবলেট দেবে।

আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম, “বাথরুম আলাদা?”

“না।”

“রান্না?”

“ওদের রান্নাঘর। চাইলে খাইতে পারবেন।”

“কত?”

“ঘর নয়শো। খাওয়া আলাদা।”

আমি বলেছিলাম, “দেখি।”

○

তেজগাঁওয়ের ভিতরে, প্রধান রাস্তা থেকে হেঁটে সাত মিনিট। দুইতলা বাড়ি, নিচে বাড়িওয়ালা, উপরে ওই পরিবার — তিনটা ঘরের একটাতে স্বামী-স্ত্রী, একটাতে দুই মেয়ে, আর তৃতীয়টা আমাকে দেবে।

ঘরটা আট ফুট বাই দশ। একটা জানালা, গ্রিলে মরিচা। ছাদে একটা পাখা, যেটা চললে শব্দ করে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “ফার্নিচার?”

ভদ্রলোক বললেন, “নিজের।” তারপর বললেন, “আগে এক ছাত্র থাকত। চাকরি পাইছে, চলে গেছে।”

“আগাম?”

“এক মাস।”

○

আমি সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে হিসাব করলাম।

আগাম নয়শো। চলতি মাস নয়শো।

খাট লাগবে। বালিশ। তোশক।

একটা চেয়ার থাকলে ভালো। টেবিল পরে।

*

হাতে ছিল তিন হাজার সাতশো। জানুয়ারিতে স্থায়ী হওয়ার পর বেতন হয়েছে চার হাজার আটশো, আর মেসে খরচ কম — কিন্তু মাগুরায় টাকা পাঠাতে হয়, কখনো আটশো, কখনো এক হাজার। বাবার পেনশন তখনো নিয়মিত হয়নি; ফাইল কোথায় আছে, কে সই করবে, কবে হবে — এইসব নিয়ে চিঠি আসে, টাকা আসে না।

আমি মাসে দুইবার হিসাব করতাম। একবার বেতনের দিন, আরেকবার কুড়ি তারিখের পর।

○

বাদলকে বললাম। সে বলল, “তুই যা।”

“তুই যাবি না?”

“আমার লাগবে না।”

আমরা তখনো ছয়জন এক ঘরে, তিনটা খাটে দুইজন করে। বাদল কারও সঙ্গে খাটে ঘুমায় না, মেঝেতে বিছানা পাতে — নিজের ইচ্ছায়, কারণ তার নাক ডাকে বলে অন্যরা অভিযোগ করে।

সে বলল, “আমার চারশো গেলেই চলে। নয়শো দিলে বাড়িতে কম পাঠাতে হবে।”

আমি বললাম, “তোর বেতন তো আমার চেয়ে বেশি।”

সে আগের বছর ব্যাংকে ঢুকেছে, ক্লারিক্যাল পদ, বেতন পাঁচ হাজারের একটু উপরে।

সে বলল, “বেশি হলেই বেশি থাকে নাকি?”

তারপর সে ট্রাংক খুলে তার খাতাটা বের করল।

*

মা। দুই বোন।

বড় বোনের বিয়ের জন্য আলাদা সঞ্চয়।

ছোটটার কলেজের ফি।

মাস শেষে থাকে একশো চল্লিশ টাকা।

কোনো কোনো মাসে থাকে না।

*

আমি খাতাটা ফেরত দিলাম আর কিছু বললাম না।

○

খাট কিনেছিলাম এপ্রিলের তিন তারিখে, তেজগাঁওয়ের পুরনো ফার্নিচারের দোকান থেকে। কাঠের, দুই হাজার তিনশো। দোকানদার বলেছিল সেগুন; আমি বিশ্বাস করিনি, তবু কিনেছিলাম, কারণ অন্যটার দাম ছিল আঠারোশো আর তার একটা পায়া নড়ছিল।

দুইজন লোক ঠেলাগাড়িতে করে নিয়ে এল। ভাড়া একশো বিশ, সিঁড়ি দিয়ে তুলতে আরও ত্রিশ।

আমি দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলাম খাটটা ঘরে ঢুকছে, আর মনে মনে একটা কথা বললাম।

আমার নিজের খাট।

○

খাটের সঙ্গে একটা গর্ব আসে যেটা চেয়ারের সঙ্গে আসে না। টেবিলের সঙ্গে হয়তো আসে, খাটের সঙ্গে আসে — কারণ খাট মানে রাত কাটানোর অধিকার।

○

মেস ছাড়ার দিন মোসলেম মিয়া খাতা বের করলেন। তিনি আমাদের সব হিসাব রাখতেন — কে কত দিল, কার কত বাকি, কোন মাসে কে গ্যাসের টাকা দেয়নি।

আমার নামের সামনে দুইটা পুরনো দাগ ছিল, একটা জানুয়ারির, একটা ফেব্রুয়ারির। দুটোই শোধ। তিনি কলম দিয়ে দাগ কেটে বললেন, “হইল।”

আমি বললাম, “কিছু বাকি নাই তো?”

তিনি খাতা দেখে বললেন, “না।” তারপর বললেন, “ভালো থাইকো।”

চোখ তুললেন না।

○

মালপত্র বেশি ছিল না — একটা ট্রাংক, দুইটা ব্যাগ, কাপড়, কিছু কাগজ, কিছু বই। বই বলতে তখনো তেমন কিছু না, আর যা ছিল তার বেশিরভাগ পুরনো, কিছু লিটলম্যাগ। ধার করা যেগুলো ছিল, সেগুলো আগেই ফেরত দেওয়া হয়ে গেছে।

ট্রাংকের নিচে দুইটা খাম ছিল।

ওগুলো আমি খুলিনি।

○

বাদল তেজগাঁও পর্যন্ত এল, রিকশায়। ভাড়া বত্রিশ টাকা।

মাঝপথে সে বলল, “একা লাগব।”

“অফিস তো আছে।”

“অফিস রাইতে থাকবে?”

“ঘুমাইতে তো হবে।”

সে বলল, “দেখিস।”

○

ঘরে পৌঁছে সে খাটে বসে পায়া নড়ে কি না দেখল, তারপর জানালা খুলল, বন্ধ করল, পাখা চালাল।

পাখা ঘুরে তিনবার শব্দ করল — টক, টক, টক — তারপর ঠিক হয়ে গেল।

বাদল বলল, “চলব।”

“কী?”

“ফ্যান।”

আমি বললাম, “এইটাই দরকার।”

সে হেসে ফেলল।

○

ওই পরিবারটার সঙ্গে প্রথম মাসে আমার খুব কম কথা হয়। ভদ্রলোকের নাম মাহবুব সাহেব, সরকারি অফিসে চাকরি করেন। তাঁর স্ত্রী আমাকে রাতে ভাত দেন, মাসে সাতশো টাকায়। সকালের নাস্তা নিজের, দুপুরে অফিস।

*

নয়শো ঘর। সাতশো খাওয়া।

বিদ্যুৎ আলাদা একশো।

যাতায়াত বেড়েছে প্রায় আড়াইশো।

বাড়তি খরচ সাতশো থেকে আটশো।

*

আমি ওই অঙ্কটার বদলে দরজার চাবিটার দিকে তাকালাম।

চাবি একটা, ছোট, পিতলের। আমি ওইটা অফিসে নিয়ে যেতাম, পকেটে রাখতাম, কখনো টেবিলে বের করে রাখতাম না। কেন রাখতাম না, জানি না। সম্ভবত হারানোর ভয়। সম্ভবত অন্য কিছু।

○

জুনে যমুনা সেতু উদ্বোধন হলো, আর পরদিন অফিসে কাগজে বড় ছবি। সবাই দেখছিল। কেউ বলছিল দেশের চেহারা বদলে যাবে, কেউ বলছিল কত টাকা লাগল।

আমি ছবিটার দিকে তাকিয়ে প্রথমে যা ভেবেছিলাম, সেটা নদী নিয়ে না।

*

এই কাজের প্রকল্প পরিকল্পনা কেমন ছিল?

কত বছর? কত লোক?

কত বাজেট? কতবার সংশোধন?

*

আমি এই প্রশ্নগুলো আগে ভাবতাম না। সেতুর ছবি দেখে আমি আগে হয়তো অন্য কিছু ভাবতাম — দেশ, সময়, ইতিহাস। এখন আমি সময়সীমা ভাবি, খরচ ভাবি, অগ্রগতি ভাবি।

আমি এই বদলটা তখন আলাদা করে লক্ষ করিনি। আমি শুধু কাগজটা ভাঁজ করে রেখে দিয়েছিলাম।

○

প্রথম রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি।

শব্দ ছিল — পাখা ঘুরছিল, বাইরে কুকুর ডাকছিল, দূরে ট্রাক যাচ্ছিল, উপরের ছাদে কে যেন হাঁটছিল। তবু শব্দ কম। অস্বাভাবিক কম।

আমি বাতি নিভিয়ে শুয়ে ছিলাম, আর পাশে কেউ ছিল না। মেঝেতে কেউ কাশছিল না, কেউ বিছানা বদলাচ্ছিল না, কেউ রাতে উঠে পানি খাচ্ছিল না, কেউ নাক ডাকছিল না।

সাত বছর আমি অন্য মানুষের নিঃশ্বাস শুনে ঘুমিয়েছি — মেসে, ছাত্রাবাসে, বন্ধুর ঘরে, কারও মেঝেতে, কারও খাটের অর্ধেকে। সাত বছরে এই প্রথম একটা ঘরে রাতে আমার নিজের ছাড়া আর কারও নিঃশ্বাস ছিল না।

আমি রাত একটা পর্যন্ত জেগে ছিলাম। তারপর দুইটা। তারপর কখন ঘুমিয়েছি জানি না।

সকালে ঘড়িতে ছয়টা বেয়াল্লিশ। পাখাটা তখনো ঘুরছিল।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.