আমার প্রথম রিপোর্টটা আফজাল সাহেব ফেরত দিয়েছিলেন এগারো মিনিটের মধ্যে। সময়টা আমি জানি, কারণ তাঁর ঘরে ঢোকার আগে ঘড়ি দেখেছিলাম — দুপুর বারোটা সাত। বেরিয়ে দেখি বারোটা আঠারো।
রিপোর্ট ছিল সাত পাতা।
○
নেত্রকোনা থেকে ফিরে আমি দুই দিন বসে লিখেছিলাম। শিরোনাম দিয়েছিলাম — নেত্রকোনা মাঠ কার্যালয়ে অভিমুখীকরণ সম্পর্কিত প্রতিবেদন। প্রথম পাতায় সফরের উদ্দেশ্য, দ্বিতীয় পাতায় মাঠ কার্যালয়ের কার্যক্রম, তারপর উঠান বৈঠক, সঞ্চয়, মেয়েদের স্কুলে যাওয়া, মাঠকর্মীদের কাজ, মোটরসাইকেলের তেলের বিল। শেষ পাতায় পর্যবেক্ষণ।
আমি ভেবেছিলাম ভালো হয়েছে। টাইপ পরিষ্কার, একটা বানান ভুলও ছিল না।
○
তিনি প্রথম পাতা পড়লেন, দ্বিতীয় পাতার অর্ধেক পর্যন্ত গেলেন, তারপর লাল কলম খুললেন।
*
মার্জিনে — সংখ্যা কোথায়?
আরেকটু নিচে — কতজন?
তৃতীয় পাতায় — ফল কী?
চতুর্থ পাতায় — প্রমাণ কী?
*
তারপর আর পড়লেন না। রিপোর্টটা আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, “আবার করেন।”
আমি বললাম, “কোন অংশটা?”
“সব।”
○
নিজের টেবিলে ফিরে সাত পাতা আবার পড়লাম। এক জায়গায় লিখেছিলাম — এলাকার নারীরা মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহী হলেও বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিবন্ধকতার কারণে অনেক মেয়ে নিয়মিত বিদ্যালয়ে যেতে পারে না।
বাক্যটা আমার ভালো লেগেছিল। এখনো মনে আছে। আমি ওই বাক্যের দিকে তাকিয়ে দশ মিনিট বসে ছিলাম, তারপর খাতা খুললাম।
*
বারোটা বৈঠক।
উপস্থিত মহিলা দুইশো এগারোজন।
স্কুলে যাওয়ার বয়সের মেয়ে আছে একশো ছত্রিশটি পরিবারে।
নিয়মিত স্কুলে যায় — আমি জানি না।
*
আমি জানতাম না, কারণ আমি প্রশ্নটা করিনি। সেলিমও সব বৈঠকে করেনি। আর যে দুইটা উত্তর আমার মনে ছিল, সেগুলো দিয়ে একশো ছত্রিশটা পরিবারের কথা লেখা যায় না।
আমি বাক্যটা কেটে দিলাম।
○
দ্বিতীয় খসড়া পাঁচ পাতা হলো, আর তিনি এইবার আঠারো মিনিট রাখলেন।
লাল কলমে প্রথম প্রশ্নটা ছিল — এই সংখ্যা কোথা থেকে? আমি লিখেছিলাম বারোটি উঠান বৈঠকে দুইশো এগারোজন নারী উপস্থিত ছিলেন; ওইটা খাতা থেকে, ঠিক আছে। আরেক জায়গায় লিখেছিলাম অধিকাংশ সদস্য নিয়মিত সঞ্চয় করেন, আর তার পাশে তিনি লিখলেন — অধিকাংশ = কত?
*
দুইশো এগারোজনের মধ্যে সেদিন সঞ্চয় দিয়েছিলেন একশো বিরাশি জন।
আমি লিখলাম — ৮৬ দশমিক ৩ শতাংশ।
তারপর নিজেই কেটে দিলাম, কারণ আমাদের রিপোর্টে তখন শতাংশ কম ব্যবহার হতো।
লিখলাম — ২১১ জনের মধ্যে ১৮২ জন।
○
তৃতীয় খসড়ায় আমি বিশেষণ কমিয়ে দিলাম।
সফল। উল্লেখযোগ্য। ব্যাপক। কার্যকর। সন্তোষজনক।
এই শব্দগুলো এক এক করে বাদ গেল। যেখানে বাদ দিতে পারিনি সেখানে সংখ্যা বসালাম, যেখানে সংখ্যা ছিল না সেখানে বাক্য ছোট করলাম, আর যেখানে প্রমাণ ছিল না সেখানে বাক্যটাই তুলে দিলাম।
রিপোর্ট তিন পাতা হলো।
○
তৃতীয়বার তিনি বললেন, “ফল কী?”
আমি বললাম, “কাজ তো হয়েছে।”
“কী কাজ?”
“বৈঠক হয়েছে।”
“বৈঠক হওয়া ফল?”
আমি চুপ করলাম।
তিনি বললেন, “বৈঠক কার্যক্রম। ফল না।”
“তাহলে ফল কী?”
তিনি এবার আমার দিকে তাকালেন। বললেন, “এইটাই আপনাকে বের করতে হবে।”
○
সেদিন আমি সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত অফিসে ছিলাম। আলাউদ্দিন পাঁচটার পর এসে বলল, “ভাই, চা লাগব?” আমি বললাম লাগবে।
অফিসে তখন সাতজন ছিল, সাড়ে ছয়টায় চারজন, সাতটায় আমি আর হিসাব বিভাগের মতিন ভাই। আমি প্রথমবার বুঝলাম অফিসে দেরি করে থাকলে শব্দ কমে যায় — টাইপরাইটার থেমে যায়, টেলিফোন কম বাজে, আর কেউ এসে বলে না, “এক মিনিট সময় হবে?”
○
সেলিমের তেলের বিলের কথাটা আমি আবার লিখলাম।
আগের খসড়ায় ছিল — মাঠপর্যায়ে পরিবহন-সংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক সমস্যা রয়েছে, যা নিয়মিত কার্যক্রমে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে।
বাক্যটা দেখে আমি নিজেই বিরক্ত হলাম, আর নতুন করে লিখলাম — মাঠকর্মীদের মোটরসাইকেলের জ্বালানি বিল দুই মাস অন্তর পরিশোধ হওয়ায় মাঝের সময়ে তাঁদের নিজস্ব অর্থ ব্যয় করতে হয়। নেত্রকোনা কার্যালয়ের ১৪ জন মাঠকর্মীর মধ্যে ৯ জন এ সমস্যার কথা বলেছেন।
নয়জন কথাটা নিয়ে আমি নিশ্চিত ছিলাম না। আমি খাতা দেখলাম।
*
আমি কথা বলেছিলাম সাতজনের সঙ্গে।
তিনজন নিজেরা বলেছে। চারজনকে আমি জিজ্ঞেস করেছি।
সাতজনই একই কথা বলেছে।
*
আমি ৯ কেটে ৭ লিখলাম।
○
চতুর্থ খসড়া ফেরত এল পরদিন, আর এইবার মাত্র দুইটা লাল দাগ — একটার পাশে কত দিন দেরি?, আরেকটার পাশে টাকার পরিমাণ?
আমি নেত্রকোনায় ফোন করলাম। অফিসে একটাই ফোন, তিনবার চেষ্টা করে পেলাম। হাফিজ ভাই ধরলেন।
“তেলের বিল সাধারণত কত দিনের হয়?”
“এক মাসের বিল একসঙ্গে।”
“টাকা কত?”
“লোকভেদে।”
“গড়ে?”
ওপাশে একটু চুপ। তারপর, “বারোশো-তেরোশো ধরেন।”
আমি লিখলাম না। বললাম, “খাতা দেখে বলা যাবে?”
তিনি হাসলেন। বললেন, “আপনি খাতা ছাড়বেন না বুঝতেছি।”
দশ মিনিট পর ফোন করলেন। গত তিন মাসে চৌদ্দজনের গড় মাসিক জ্বালানি ব্যয় ছিল এক হাজার একশো ছিয়াত্তর টাকা।
আমি এক হাজার একশো ছিয়াত্তরই লিখলাম। বারোশো করিনি।
○
পঞ্চম খসড়া তিনি প্রায় পুরোটা পড়লেন, আর শেষ পাতায় এসে বললেন, “ভাষা ঠিক আছে।”
তারপর প্রথম পাতায় ফিরে গিয়ে একটা বাক্যের নিচে দাগ দিলেন। আমি লিখেছিলাম — মাঠ কার্যালয়ের কর্মীরা সীমিত সম্পদের মধ্যেও আন্তরিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তিনি বললেন, “এইটা আপনি কীভাবে জানেন?”
“দেখেছি।”
“কী দেখেছেন?”
আমি উত্তর দিলাম না।
তিনি বললেন, “আপনি সাত দিন ছিলেন। আন্তরিকতা মাপার যন্ত্র আপনার আছে?”
“না।”
“তাহলে?”
আমি বাক্যটা কেটে দিলাম।
○
ষষ্ঠ খসড়া অনুমোদন হলো ডিসেম্বরের দুই তারিখে — নেত্রকোনা থেকে ফেরার তেতাল্লিশ দিন পর। সাত পাতার রিপোর্ট শেষ পর্যন্ত আড়াই পাতা।
আফজাল সাহেব নিচে সই করলেন, তারপর বললেন, “এবার ইংরেজি করেন।”
আমি বললাম, “অনুবাদ?”
“না। ইংরেজি রিপোর্ট।”
○
আমি তখনো বুঝিনি দুইটার পার্থক্য কী। বাংলা রিপোর্টের প্রথম অনুচ্ছেদ ইংরেজি করলাম, তারপর দ্বিতীয়টা। এক ঘণ্টা পর পাশের টেবিলের শওকত ভাই এসে আমার মনিটরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “এইভাবে হবে না।”
“কেন?”
“এইটা তো বাংলা রিপোর্টের ইংরেজি।”
“ইংরেজি রিপোর্ট আর কী?”
তিনি চেয়ার টেনে বসলেন, আমার ফাইলটা খুললেন, তারপর আগের বছরের একটা রিপোর্ট বের করে বললেন, “দেখেন।”
○
আমি দেখলাম।
*
বাংলায় — তিনটি ইউনিয়নে মোট ছয়টি উঠান বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।
ইংরেজিতে — Community-level awareness activities continued in three unions.
বাংলায় — একশো সাতচল্লিশজন নারী অংশগ্রহণ করেন।
ইংরেজিতে সংখ্যাটা নেই।
বাংলায় — বারোজন সদস্য নির্ধারিত সঞ্চয় জমা দিতে পারেননি।
ইংরেজিতে সঞ্চয়ের কথা নেই।
আর ইংরেজিতে একটা বাক্য আছে — The activities contributed to strengthening community participation.
বাংলায় ওই বাক্য নেই।
*
আমি শওকত ভাইকে বললাম, “দুইটাতে একই কথা নাই কেন?”
তিনি বললেন, “পাঠক আলাদা।”
“ঘটনা তো একই।”
“ঘটনা একই। রিপোর্ট আলাদা।”
তারপর উঠে গেলেন।
○
ওই দিন থেকে আমি অফিসের পুরনো রিপোর্ট পড়তে শুরু করি — বাংলা আর ইংরেজি, একই মাস, একই জেলা, একই প্রকল্প, দুইটা ফাইল পাশাপাশি রেখে। একটা খাতা বানাই, বাঁ পাশে বাংলা রিপোর্টের শব্দ, ডান পাশে ইংরেজি।
*
সমস্যা — challenge.
ব্যর্থ — could not be completed as planned.
টাকা আসেনি — fund release was delayed.
লোক পাওয়া যায়নি — staffing constraints.
লক্ষ্য পূরণ হয়নি — progress remained below target.
*
সব মিথ্যা ছিল না; এইটা বলা ঠিক হবে না। বেশিরভাগ বাক্য সত্যি ছিল। শুধু সত্যিটা কোন দিক থেকে দেখা হবে, সেইটা বদলে যেত — বাংলায় মাঠের দিকে মুখ করা, ইংরেজিতে উপরের দিকে।
আমি এই নিয়মটা কাউকে জিজ্ঞেস করে শিখিনি। কেউ আমাকে শেখায়ওনি। আমি ফাইল পাশাপাশি রেখে শিখেছিলাম।
○
জানুয়ারিতে আমার ইংরেজি রিপোর্ট প্রথমবার কোনো সংশোধন ছাড়া গেল। ফেব্রুয়ারিতে আমাকে মাসিক প্রতিবেদনের দুইটা অংশ লিখতে দেওয়া হলো। মার্চে শওকত ভাই ছুটিতে গেলে আফজাল সাহেব বললেন, “বার্ষিক রিপোর্টের মাঠের অংশটা আপনি করেন।”
আমি বললাম, “পুরাটা?”
তিনি বললেন, “ড্রাফট।”
এই কথাটার মানে তখন আমি জানতাম। ড্রাফট মানে কাজটা আমার, শেষ কথাটা অন্য কারও।
○
আমি তিন দিন ধরে লিখলাম।
*
সতেরোটা জেলা। একশো ছিয়াশি জন মাঠকর্মী।
কত বৈঠক হয়েছে। কতজন এসেছে। কতজন প্রশিক্ষণ পেয়েছে।
কত টাকা খরচ হয়েছে। কত টাকা খরচ হয়নি।
*
যেখানে সংখ্যা মেলেনি, ফোন করেছি। যেখানে দুই রিপোর্টে দুই সংখ্যা, নিচের খাতা চেয়েছি। একটা জেলার সংখ্যা ঠিক করতে আমার পুরো এক বিকাল গেছে, আর শেষে মোট সংখ্যাটা বদলেছে উনিশ জন।
○
বার্ষিক প্রতিবেদন ছাপা হয়ে এল মার্চের শেষ সপ্তাহে। চকচকে কাগজ, ইংরেজিতে, প্রচ্ছদে তিনজন শিশুর ছবি।
আমি নিজের কপি পাইনি। অফিসের কপি হাতে নিয়ে সূচি দেখে পাতা বের করলাম। আমার লেখা অংশটা ছিল মাঝামাঝি, দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ, চুরাশি শব্দ। হুবহু — একটা কমাও বদলায়নি।
আমি প্রথমবার পড়লাম দাঁড়িয়ে, তারপর চেয়ারে বসে আবার, তারপর তৃতীয়বার।
নিচে আমার নাম ছিল না।