প্রথম সংস্থা আমি ছেড়েছিলাম এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে। সাড়ে চার বছর।
*
যোগ দিয়েছিলাম চার হাজার টাকায়।
ছাড়ার সময় বেতন আট হাজারের একটু বেশি।
নতুন সংস্থা দেবে সাড়ে এগারো।
*
পার্থক্য তিন হাজারের বেশি। আমি হিসাব করেছিলাম একবার, তারপর নিয়োগপত্রে সই করেছিলাম।
○
আফজাল সাহেব বললেন, “যাচ্ছেন?”
“জি।”
“ভালো জায়গা।”
“শুনেছি।”
“পদও ভালো।”
“জি।”
তিনি মাথা নেড়ে বললেন, “যান।”
আমি অপেক্ষা করছিলাম আর কিছু বলবেন কি না। বললেন না।
○
শেষ দিন আলাউদ্দিন চা দিতে এসে বলল, “ভাই, বড়লোক হইয়া আমাদের ভুলবেন না।”
আমি বললাম, “এই বেতনে বড়লোক?”
সে বলল, “আমার বেতন দিয়া দেখেন।”
আমি আর কিছু বলিনি।
○
নতুন অফিস বড় — লোক বেশি, টেবিল আলাদা, কম্পিউটার নতুন, ফোনে নিজের এক্সটেনশন।
প্রথম সপ্তাহেই আমাকে তিনটা জেলার দায়িত্ব দেওয়া হলো। আমার নিচে সরাসরি চারজন, তার নিচে মাঠকর্মী।
আমি প্রথমবার কারও রিপোর্টে সই করার আগে নিজের নাম লিখলাম — Reviewed by: Suman Haque. নামটার নিচে পদবি।
○
কাজ খুব অপরিচিত না। তালিকা, সংখ্যা, অগ্রগতি, ব্যয়।
কিন্তু এইবার আমি মাঠের খাতা বানাই না। মাঠ থেকে খাতা আসে, আর আমি দেখি।
○
প্রথম মাসে একটা জেলার রিপোর্টে সমস্যা পাই। ব্যয়ের হিসাব ঠিক, মোটও ঠিক, কিন্তু সঞ্চয়ের সংখ্যা আর উপস্থিতির সংখ্যা মিলছে না।
*
এক সপ্তাহে উপস্থিত ১৮২, সঞ্চয় ১৮৮ — ছয়জন বেশি।
পরের সপ্তাহে ১৭৪ আর ১৭৯ — পাঁচজন বেশি।
তৃতীয় সপ্তাহে পার্থক্য সাত।
*
আমি প্রথমে ভেবেছিলাম টাইপের ভুল।
○
আমি মাঠের খাতা চাই, আর তিন দিন পর আসে — হাতে লেখা, পাতা ভাঁজ, কিছু জায়গায় কালি ছড়ানো, কিছু নামের পাশে পেন্সিল।
আমি খাতা খুলে এক এক করে মিলাতে শুরু করি। চার ঘণ্টা লাগে।
○
গরমিল ছোট, আর মোট টাকায় না — নাম ধরে।
কিছু সদস্য বৈঠকে ছিল না, কিন্তু তাদের সঞ্চয় পরে অন্য কেউ দিয়ে গেছে। খাতায় সেই টাকা ঢুকেছে; উপস্থিতিতে নাম নেই, সঞ্চয়ে আছে।
নিয়ম অনুযায়ী এইটা ভুল, কারণ একই দিনে একই তালিকা বন্ধ হওয়ার কথা। পরে টাকা এলে আলাদা এন্ট্রি। ওরা করেনি।
○
আমি মাঠকর্মীকে ডেকে পাঠালাম। নাম রফিক, বয়স তিরিশের কম। হাতে খাতা নিয়ে আমার সামনে বসে।
“এখানে উপস্থিতির চেয়ে সঞ্চয় বেশি কেন?”
“স্যার, পরে দিছে।”
“আলাদা এন্ট্রি নাই কেন?”
সে চুপ।
“নিয়ম জানেন?”
“জানি।”
“তাহলে?”
সে বলল, “সময় পাই না।”
○
আমি বললাম, “সময় না থাকলে ভুল করবেন?”
সে মাথা নেড়ে বলল, “স্যার, ভুল না।”
আমি খাতার দিকে আঙুল দিলাম। “এইটা তাহলে কী?”
সে বলল, “টাকা তো ঠিক আছে।”
আমি বললাম, “টাকা ঠিক থাকলেই হিসাব ঠিক হয় না।”
○
কথাটা বলার পর আমার নিজের গলা পরিচিত লেগেছিল। কোথা থেকে, তখন বুঝিনি।
○
রফিক বলল, “স্যার, আমাদের রুট অনেক।”
“কত?”
“দিনে ত্রিশ-চল্লিশ কিলোমিটার।”
“তারপর?”
“ফিরতে ফিরতে রাত।”
“তবু খাতা তো লিখতে হবে।”
“লিখি।”
“ঠিকমতো?”
সে চুপ।
○
আমি বললাম, “এইটা প্রথমবার?”
“জি।”
আমি খাতা উল্টালাম। গত তিন মাসে একই ধরনের এন্ট্রি আরও এগারোটা।
আমি বললাম, “প্রথমবার না।”
সে মাথা নিচু করল।
○
এরপর যা করার, নিয়মে লেখা ছিল। ব্যাখ্যা চাইতে হবে, লিখিত; সুপারভাইজার মন্তব্য করবে; তারপর প্রশাসন।
আমি ব্যাখ্যা চাইলাম। রফিক লিখল, দুই পাতা।
○
তার ব্যাখ্যায় ছিল —
*
দূরত্ব। মোটরসাইকেলের তেল। মাস শেষে বিল আসে দেরিতে।
অনেক সময় নিজের টাকা। রাতে বাড়ি পৌঁছানো, পরদিন আবার বের হওয়া।
সদস্যরা পরে টাকা দিলে ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। তাই একই খাতায় ঢুকিয়েছে।
*
আমি পড়লাম, তারপর আরেকবার পড়লাম।
○
সাতানব্বই সালে সেলিম বলেছিল — মোটরসাইকেলের তেলের বিল দুই মাস পর আসে, মাঝখানে নিজের টাকায় চলতে হয়।
আমি ওই কথাটা রিপোর্টে দুই লাইন লিখেছিলাম। তিন মাস পর নিয়ম বদলেছিল।
○
রফিকের ক্ষেত্রে নিয়ম বদলানোর কিছু ছিল না। এই সংস্থার তেলের বিল মাসে আসে।
সমস্যা অন্য। রুট বড়, লোক কম, খাতা বেশি।
○
আমি তার ব্যাখ্যার নিচে লিখলাম — Procedural non-compliance confirmed. Corrective action recommended.
তারপর সই করলাম।
○
এক সপ্তাহ পর শুনলাম তাকে শোকজ করা হয়েছে। আরেক সপ্তাহ পর ইনক্রিমেন্ট তিন মাস স্থগিত।
আমি সিদ্ধান্ত নিইনি। কিন্তু আমার রিপোর্ট ছাড়া সিদ্ধান্ত হতো না।
○
রফিক এরপরও অফিসে এসেছে। একদিন করিডরে দেখা।
সে বলল, “স্যার।”
আমি বললাম, “কেমন আছেন?”
সে বলল, “জি।”
তারপর চলে গেল।
○
আমি চাইলে বলতে পারতাম — কিছু মনে করবেন না, নিয়ম, আমার কিছু করার ছিল না।
আমি বলিনি। এইসব কথা বললে মানুষ নিজের কাজটা ছোট করে। আমি যা করেছি, করেছি।
○
রাতে বাসায় শায়লা জিজ্ঞেস করল, “আজ এত চুপ কেন?”
“কাজ।”
“খারাপ কিছু?”
“একজনের হিসাব ভুল ছিল।”
“বড় ভুল?”
“টাকা চুরি না।”
“তাহলে?”
আমি বললাম, “প্রক্রিয়া।”
শায়লা বলল, “তোমাদের সবকিছুতেই এই শব্দ আছে।”
আমি বললাম, “থাকতে হয়।”
○
তূর্য তখন মেঝেতে বসে একটা প্লাস্টিকের গাড়ি ঠেলছিল — দেয়ালে ধাক্কা দিচ্ছে, পিছিয়ে নিচ্ছে, আবার ধাক্কা।
○
রাতে সবাই ঘুমানোর পর আমি একটা পুরনো খাতা বের করেছিলাম। নেত্রকোনার না; সেই খাতা আমার কাছে নেই। নিজের নোটবুক, সাতানব্বইয়ের কিছু লেখা আছে।
এক পাতায় হাফিজ ভাইয়ের কথা। আমি হুবহু লিখে রেখেছিলাম —
যেই সংখ্যাটা আপনি দেখতেছেন, ওইটা কেউ একজন এই উঠানে বইসা লিখছে।
*
আমি বাক্যটা পড়লাম। তারপর রফিকের খাতার কথা ভাবলাম। উপস্থিত একশো বিরাশি, সঞ্চয় একশো আটাশি, ছয়জন।
○
হাফিজ ভাইয়ের কথাটা তখনো ঠিক।
এইবার শুধু আমি উঠানের পাশে ছিলাম না। আমি টেবিলের অন্য পাশে বসেছিলাম।
খাতা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে দিয়েছিলাম।