FF.
১২ নোট Book page

Chapter 12

১২ নোট

Oct 19, 2026 5 min read

নোটগুলো প্রথমে কার ছিল, কেউ জানত না।

নাজমুল বলেছিল, আগের ব্যাচের।

আগের ব্যাচের একজন বলেছিল, তারও আগের ব্যাচের।

আমি একদিন জিজ্ঞেস করেছিলাম, “মূলটা কোথায়?”

নাজমুল বলল, “মূল লাগবে কেন?”

আমি বললাম, “দেখতাম।”

সে বলল, “এইটাই তো আছে।”

○

নোট ছিল মোট সাতটা।

প্রতিটা আলাদা কোর্সের।

কোনোটার পঞ্চাশ পাতা।

কোনোটার আশি।

সব ফটোকপি।

সামনের পাতায় হাতে লেখা কোর্সের নাম।

কিছু পাতায় কারও নাম।

তার ওপর কলম দিয়ে দাগ।

তার নিচে আরেকজনের নাম।

○

আমি নীলক্ষেত থেকে কপি করিয়েছিলাম।

পাতাপ্রতি পঞ্চাশ পয়সা।

দুই পাশে করলে কম।

আমি দুই পাশে করিয়েছিলাম।

সব মিলিয়ে তিনশোর একটু বেশি টাকা।

নাজমুল বলল, “বই কিনলে তিন হাজার লাগত।”

আমি বললাম, “সব বই লাগত?”

সে বলল, “পরীক্ষায়?”

আমি বললাম, “না।”

সে বলল, “তাহলে?”

○

নোটে অনেক জায়গায় অক্ষর ঝাপসা।

বিশেষ করে যেসব পাতা বারবার কপি হয়েছে।

ইংরেজি ছোট অক্ষর একসঙ্গে লেগে যায়।

কখনও “management” থেকে মাঝের তিনটা অক্ষর নেই।

কখনও পুরো বাক্যের ডান পাশ কাটা।

কখনও একটা টেবিলের নিচের সারি পড়া যায় না।

○

আমি প্রথমে ঠিক করার চেষ্টা করতাম।

লাইব্রেরিতে যেতাম।

বই খুঁজতাম।

পৃষ্ঠা মিলাতাম।

দুই সপ্তাহ করেছি।

তারপর সময় হিসাব করলাম।

একটা ঝাপসা প্যারাগ্রাফ ঠিক করতে কখনও চল্লিশ মিনিট।

কখনও এক ঘণ্টা।

সপ্তাহে তিন দিন ক্লাস।

অফিস।

বাসা।

মাস্টার্সের বাকি পরীক্ষা।

আমি নোটের পাশে প্রশ্নচিহ্ন দিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে শিখলাম।

○

শিক্ষকের বয়স পঁয়ষট্টির কাছাকাছি।

সাদা চুল।

পাতলা ফ্রেমের চশমা।

তিনি ধীরে হাঁটতেন।

ক্লাসে ঢুকে প্রথমে ব্যাগ টেবিলে রাখতেন।

তারপর উপস্থিতি।

তারপর নোট খুলতেন।

○

তিনি নিজের নোট থেকে পড়াতেন না।

আমাদের যে নোট ছিল, প্রায় একই কপি তাঁর হাতেও।

কেউ তাঁকে দিয়েছিল।

হয়তো বিভাগ থেকে।

হয়তো কোনো ছাত্র।

আমি জানি না।

○

সেদিন ক্লাসে চল্লিশজন ছিল।

পরীক্ষা সামনে।

তাই উপস্থিতি বেশি।

পেছনের বেঞ্চ পর্যন্ত ভর্তি।

ফ্যান চলছিল তিনটা।

একটার শব্দ।

বাইরে করিডরে আরেকটা ক্লাসের লোকজন কথা বলছিল।

○

শিক্ষক একটা তত্ত্ব বোঝাচ্ছিলেন।

বোর্ডে তিনটা শব্দ লিখলেন।

তারপর নোটের একটা পাতা খুললেন।

পৃষ্ঠা সাতাশ।

আমারও সাতাশ।

আমি কলম ধরলাম।

○

তিনি প্রথম দুই লাইন পড়লেন।

তারপর থামলেন।

কাগজটা চোখের কাছে আনলেন।

আবার দূরে নিলেন।

চশমা খুললেন।

কাপড় দিয়ে মুছলেন।

আবার পরলেন।

○

ঘরে কেউ কথা বলছিল না।

○

তিনি আবার পড়ার চেষ্টা করলেন।

একটা শব্দ বললেন।

তারপর থামলেন।

কাগজ আলোর দিকে তুললেন।

টিউবলাইটের নিচে।

পাতার মাঝখানের অংশটা ধূসর।

অক্ষর আছে।

কিন্তু একটার সঙ্গে আরেকটা মিশে গেছে।

○

তিনি পাশের টেবিল থেকে আরেকটা কপি নিলেন।

সেটাও একই।

তিনি কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে থাকলেন।

তারপর বললেন,

“পরের অংশটা তোমরা বইয়ে দেইখা নিও।”

○

কেউ হাসেনি।

এইটা আমার সবচেয়ে পরিষ্কার মনে আছে।

চল্লিশজন মানুষ।

কেউ হাসেনি।

○

তিনি পাতা উল্টে আটাশে গেলেন।

আবার পড়াতে শুরু করলেন।

যেন কিছু হয়নি।

আমরাও লিখতে শুরু করলাম।

○

আমার কলম কিছুক্ষণ চলে না।

আমি সাতাশ নম্বর পাতার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

একটা নোট।

তার কপি।

তার কপি থেকে আরেক কপি।

তারপর আমার কপি।

কতবার?

তিন?

পাঁচ?

সাত?

জানি না।

প্রতিবার একটু অক্ষর গেছে।

একটু রেখা।

একটু অর্থ।

শেষে শিক্ষক নিজেই পড়তে পারছেন না।

○

আমি শিক্ষকের দিকে তাকালাম।

তিনি তখন বোর্ডে লিখছেন।

হাতের লেখা পরিষ্কার।

বড় বড় অক্ষর।

আমি সব পড়তে পারছি।

○

আমার মাথায় তিতুমীর কলেজের কথা আসে।

তারপর বিএর মার্কশিট।

তৃতীয় বিভাগ।

কেরানির দুইবার তাকানো।

ভর্তি ফরমের সেই ঘর।

চাকরির অভিজ্ঞতার নম্বর।

সব একসঙ্গে না।

একটার পর একটা।

○

আমি বহু বছর ধরে ধরে নিয়েছিলাম, অন্য কোথাও একটা আসল জায়গা আছে।

সেখানে বই পুরো পড়া হয়।

শিক্ষক সব জানেন।

ছাত্ররা প্রশ্ন করে।

নোট পরিষ্কার।

লাইব্রেরিতে বই থাকে।

মানুষ শুধু পাস করার জন্য পড়ে না।

আমি ওই জায়গার বাইরে ছিলাম।

এইটাই ছিল হিসাব।

○

সেদিন প্রথমবার হিসাবটা মিলল না।

○

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা ঘর।

চল্লিশজন ছাত্র।

একজন প্রবীণ শিক্ষক।

একটা নোট।

আর নোটের একটা অংশ কেউ পড়তে পারছে না।

○

এই দৃশ্য থেকে আমি কোনো আনন্দ পাইনি।

এই কথাটা পরিষ্কার।

আমি ভাবিনি—

দেখো, এখানেও একই।

আমি ভাবিনি—

তাহলে আমার কোনো ক্ষতি হয়নি।

আমি ভাবিনি—

তৃতীয় বিভাগ কিছু না।

○

বরং অন্য কিছু হয়েছিল।

যে জিনিসটার বিরুদ্ধে আমি এতদিন ভিতরে ভিতরে দাঁড়িয়ে ছিলাম, সেটা যেন হঠাৎ জায়গা বদলাল।

কিন্তু কোথায় গেল বুঝলাম না।

○

ক্লাস শেষে নাজমুল বলল, “চলেন, নোটটা বই থেইকা মিলাই।”

আমি বললাম, “আজ?”

সে বলল, “পরীক্ষায় আসতে পারে।”

আমি ঘড়ি দেখলাম।

আটটা পঁয়তাল্লিশ।

বললাম, “কাল করি।”

○

পরদিন দুপুরে অফিসের লাইব্রেরিতে বই খুঁজলাম।

ছিল না।

বিকালে নীলক্ষেতে গেলাম।

দুইটা দোকান।

তৃতীয় দোকানে বই পেলাম।

বিদেশি সংস্করণ।

দাম সাতশো আশি টাকা।

আমি কিনিনি।

দোকানদার বলল, “ফটোকপি আছে।”

আমি বললাম, “কত?”

“দুইশো দশ।”

আমি বললাম, “পুরা?”

সে বলল, “পুরা।”

○

আমি ফটোকপি কিনলাম।

বাসায় নিয়ে গিয়ে সাতাশ নম্বর পাতার বিষয়টা খুঁজলাম।

পৃষ্ঠা মিলল না।

সূচি দেখে অধ্যায় বের করলাম।

তারপর উপশিরোনাম।

তারপর প্যারাগ্রাফ।

○

নোটে যে অংশ ঝাপসা ছিল, বইয়ে সেটা ছয় লাইন।

আমি পড়লাম।

কঠিন কিছু না।

পরীক্ষায় লিখলে তিন নম্বরের বেশি পাওয়ার মতোও না।

আমি ছয় লাইন নিজের খাতায় লিখে নিলাম।

○

শায়লা তখন পাশে বসে পরীক্ষার খাতা দেখছিল।

সে বলল, “কী লিখছ?”

আমি বললাম, “নোটে ছিল না।”

সে বলল, “বইয়ে পেয়েছ?”

“হ।”

সে মাথা নেড়ে আবার নিজের খাতায় গেল।

○

আমি নতুন ফটোকপি বইটার দিকে তাকালাম।

পুরো বই।

মলাট নেই।

প্রথম পাতায় দোকানের সিল।

ভেতরে কিছু জায়গায় কালো দাগ।

একটা পৃষ্ঠা বাঁকা।

তবু পড়া যায়।

○

আমি হিসাব করলাম।

মূল বই সাতশো আশি।

ফটোকপি দুইশো দশ।

পার্থক্য পাঁচশো সত্তর।

আমার মাসিক বেতনের প্রায় নয় শতাংশ।

আমি ফটোকপিটাই রাখলাম।

○

কয়েক সপ্তাহ পর পরীক্ষা।

সেই অংশ থেকে প্রশ্ন আসেনি।

আমার লেখা ছয় লাইন কোনো কাজে লাগেনি।

নাজমুল পরীক্ষার পর বলল, “ফালতু সময় নষ্ট।”

আমি বললাম, “হ।”

○

কিন্তু আমি কাগজটা ফেলিনি।

নিজের নোটের সাতাশ নম্বর পাতার সঙ্গে ছয় লাইন স্ট্যাপল করে দিয়েছিলাম।

○

সেই সময় থেকে তৃতীয় বিভাগের কথা উঠলে আমি আগের মতো প্রস্তুত হয়ে বসতাম না।

আগে কেউ ফল জিজ্ঞেস করলে উত্তর দেওয়ার আগে আমার মাথায় আরেকটা বাক্য তৈরি হতো—

কেন হয়েছিল।

কী হয়েছিল।

কীভাবে হয়েছিল।

আমি বলতাম না সবসময়।

কিন্তু বাক্যটা তৈরি হতো।

○

এখন আর হতো না।

কেউ জিজ্ঞেস করলে বলতাম,

“তৃতীয় বিভাগ।”

তারপর অপেক্ষা করতাম পরের প্রশ্নের।

○

এই পরিবর্তনের জন্য আমি শিক্ষককে কোনো কৃতিত্ব দিইনি।

নোটকেও না।

ফটোকপির দোকানকেও না।

কিছুই ঘটেনি যা কৃতিত্ব পাওয়ার মতো।

একজন মানুষ শুধু একটা ঝাপসা পাতা পড়তে পারেননি।

○

বাসায় সেদিন রাতে আমার পড়া ছিল।

পরদিন একটা উপস্থাপনা।

আমি টেবিলে বই, নোট আর খাতা সাজিয়ে বসেছিলাম।

তৃতীয় বিভাগের মার্কশিটটা একই ফাইলে ছিল।

আমি সেটা বের করিনি।

অনেক দিন পর আমার মনে হয়েছিল, কাগজটার সঙ্গে আর কোনো কথা বাকি নেই।

তারপরই জায়গাটা ফাঁকা লাগল।

Picked up where you left off

Conversation

(0)

Log in to join the conversation.

No comments on this chapter yet.