
মসজিদের গলি পেরিয়ে পূর্ব দিকে এগিয়ে যাচ্ছে হাসান। সন্ধ্যার আধো আলো, সাথে ঠান্ডা মৃদু বাতাস। হাঁটতে ভালো লাগছে। ২/৩ মিনিট পর মূল রাস্তা। বামের একটা পোলে হাসানের চোখ আটকে গেল। মাঝারি সাইজের বিলবোর্ডে লিখা– ‘এই ভাই কই যান?’ মানে কী? হাসান যাচ্ছে তমিজন বেগমের বাসা। কিন্তু এই উত্তর নিশ্চয়ই বিলবোর্ডকে দিতে হবে না। বিলবোর্ডের কাছে গিয়ে দাড়াল হাসান। ঘটনা বুঝতে হবে। বিলবোর্ডে লিখা– আপনার সন্তান কি ফেসবুক, ইউটিউবে (ফেসবুক, ইউটিউব লিখা নেই, এগুলর বড় বড় আইকন দেয়া) আসক্ত? শুধু জেনারেল শিক্ষা মানে চিইইল! (মটরসাইকেলে এক বালকের ছায়া দেয়া, মনে হচ্ছে মটরসাইকেল উড়ে যাচ্ছে)। এ কে আজাদ ক্যাডেট মাদ্রাসায় থাকছে জেনারেল শিক্ষার পাশাপাশি ইসলামি শিক্ষা, কুরআন হিফজের সুযোগ। আপনার সন্তান হবে সুশিক্ষিত ও সুসন্তান , ইন শা আল্লাহ। ভর্তি চলছে। বিলবোর্ড পড়ে হাসান হকচকিয়ে গেল। চমৎকার মার্কেটিং বলতেই হবে!
বিলবোর্ড ছেড়ে হাসান হাঁটা শুরু করল আবার। ২০ মিনিট খানেক হাঁটতে হবে তাকে। তমিজন বেগমের বাড়ি গলাচিপা মোড় থেকেও ভেতরে, গ্রাম্য এলাকায়। হাসান তাকে খালা ডাকে। খালার বয়স পচাত্তর । দোকানে দোকানে হেঁটে ভিক্ষা করেন । কেউ এক টাকা দেয়, কেউ দুই টাকা। পাঁচ টাকা, দশ টাকা খুব কমই পাওয়া যায়। পেলে খালার চোখ চক চক করে উঠে। অফিস যাওয়ার পথে হাসান একদিন খালাকে দশ টাকা দিল। বৃদ্ধা বলল, বাবা, আমার নাতিটার জন্য একটা সরিষার তেলের বোতল কিনে দিতে পারবা? হাসান কিছু জিজ্ঞেস করল না। সে তাড়া করে অফিসে যাচ্ছিল। পাশের মুদি দোকান থেকে আড়াইশ মিলির একটা তেলের বোতল কিনে মহিলাকে দিল। বৃদ্ধা হাত বুলিয়ে দিল হাসানের মাথায়। ঘটনা এখানেই শেষ হতে পারত। কিন্তু মাসখানেক পর এক শুক্রবার দিনে, হাসান আজাদের দোকানে বসে ছিল। সেখানেই আবার দেখা তমিজন খালার। সরষে তেলের বোতল কিনে দিতে বলেন। হাসান জিজ্ঞেস করল, আপনার নাতি আপনার সাথে থাকে?
‘হ্যাঁ, বাপজান।’
‘আপনার ছেলের ঘরের নাতি, নাকি মেয়ের ঘরের?’
‘আমার পুলা নাই বাবা। একটা মাইয়া। হ্যায় পাগল। মাথা খারাপ।’
‘আহা। আপনার আর কেউ নাই?’
‘না বাজান। তাহেরার বাপ ১০ বছর হইল দুনিয়ায় নাই।’
তমিজন খালার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। তারা মাথায় বড় একটা বস্তা, ভিতরে কী বোঝা যাচ্ছে না। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে। হাসান বলল, খালা বস্তাটা মাথা থেকে নামিয়ে রাখেন। হাসান ভাবল, কিছু না দিয়ে বৃদ্ধাকে এত কিছু জিজ্ঞাসা করা ঠিক হচ্ছে না। ১০০ টাকার একটা নোট বাড়িয়ে দিল বৃদ্ধার উদ্দেশ্যে। বৃদ্ধা নোট হাতে নিয়ে চোখের পানি মুছল। হাসান জিজ্ঞেস করল, আপনার মেয়ের জামাই নাই?
‘মাইয়ারে তালাক দিছে বাবা। নাতিরও কোনো খোঁজ রাখে না ব্যাডায়। নাতিডারে এতিমখানায় দিছি। হ্যার জন্য চিন্তার শ্যাষ নাই? আমি মইরা গেলে দেখব ক্যাডায়। মাইয়া তো পাগল।’
‘আপনার মেয়ে পাগল হল কিভাবে খালা?’
‘হ্যার শ্বশুর বাড়িতে হ্যারে পছন্দ করত না। নানান নির্যাতন করত। মাইয়াও জিদ্দি।’
‘এই নির্যাতনের কারণে কি মানসিক সমস্যা হইছে?
‘ক্যামনে কমু বাবা? হ্যারা নানারকম তাবিজ করছে। তাহেরারে তালাক দিয়া আরেক ছেড়িরে বিয়া করছে হ্যার স্বামী।’
‘আপনার নাতির জন্য খরচ দেয় না তারা বাবা?’
‘হ্যারা এই এলাকা ছাইড়া গ্যাছে, কই গ্যাছে কইতাম পারি না।’
হাসান ভাবে, এই তমিজন খালার মত আর কত বৃদ্ধা এই ঢাকা শহরে আছে, যাদের দেখার মত আত্মীয়-পরিজন নেই? সেদিন দেখল অতি বৃদ্ধা একজন ভিখারিনীকে। হাড্ডিসার, নড়াচড়ার শক্তি নেই। দুপুরের তীব্র রোদে বসে আছে মৌচাক এলাকার ফুটপাতে। বৃদ্ধা দেখতে প্রায় হুবহু হাসানের নানির মত। শারীরিক অবস্থাও একই রকম, বয়সও মনে হয় কাছাকাছি হবে । হাসানের পাঁচ মামা-মামি, তিন খালার কেউ না কেউ সার্বক্ষনিক তার নানীর সেবায় সময় দেয়। সময়ে সময়ে সব ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি সবাই ঘিরে বসে থাকে তার চারপাশে। যত্নের কমতি নেই। অথচ একই অবস্থার আরেকজন বৃদ্ধা মহিলা ফ্যাকাশে নিভু নিভু চোখে রাস্তায় ভিক্ষা করছে। বৃদ্ধা নিজের যত্ন নিতে অপারগ। ঠিক মত চোখও ফেরাতে পারে না। হাসানের চোখে পানি চলে আসে। কী করতে পারে সে? কিছু টাকা দেয়া ছাড়া কিছুই করে নি । সবার মত সেও টাকা দিয়ে কেটে পড়েছে। হাসান ভাবে কেটে পড়ার পেছনে যে জড়তা, দ্বিধা এটার উৎপত্তি কোথা থেকে? এই জড়তা থেকে বের হওয়ার উপায় কী? হাসান অনেকদিন ভেবেছে। সে চেষ্টা করছে নিজের চারপাশের জড়তার বেড়াজাল ছিন্ন করতে। পুরোপুরি পারে নি। আজ সে এক ভিখারিনীর বাড়িতে যাচ্ছে। তার মধ্যে কোনো জড়তা বা দ্বিধা নেই।
হাসান একডজন ডিম, ১ কেজি পেঁয়াজ, ২ কেজি আলু, ১ লিটার তেল, ৫ কেজি চাউল কিনল। বৃদ্ধার বাড়ি আর কিছুদূর। জায়গাটা কেমন অন্ধকার। কুকুর বেশি। একা যেতে ভয় লাগে। গতবার অন্ধকারে সে যখন হাঁটছিল, তখন হঠাৎ সামনে একটা কুকুর পড়ল। আধো আলো। সে থমকে দাঁড়িয়ে কুকুরের চোখের দিকে তাকিয়ে পাশ কাটিয়ে যেতে লাগল। কুকুরটা গর্জন করে উঠল কয়েকবার। সাথে সাথে আশপাশের সব কুকুর একসাথে ঘেউ ঘেউ করে উঠল। কুকুরবাহিনীর সম্মিলিত আওয়াজে হাসানের মেরুদন্ডে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে যায়। হাসান দ্রুত কুকুরটির চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিল। নিরীহ ভঙ্গিতে হেঁটে এগিয়ে গেল। কুকুরগুলো আর কিছুক্ষন ঘেউ ঘেউ করে থেমে গেল। হিংস্র পশুদের চোখের দিকে তাকালে তারা ভাবে যে, তারা আক্রমনের স্বীকার হবে। এই তথ্য হাসান ভুলে গিয়েছিল। অল্পের জন্য আল্লাহ তাকে বাঁচিয়েছিলেন সেদিন। এলাকাটায় মানুষও কম। স্ট্রিট লাইটও বন্ধ। আজও অনেকগুলো কুকুর ঘোরাঘুরি করছে। কয়েকটা কুকুর খুবই বলশালী। হাসান মোবাইলের লাইট জ্বালালো। তাকে প্রমাণ করতে হবে, সে একজন নীরিহ মানুষ। চুরি, ডাকাতি বা খারাপ উদ্দেশ্য তার নেই। শুধু লাইট জ্বালালেই হবে না মনে হয়। স্বাভাবিক ভঙ্গিতে কথা বার্তা বললে ভালো হত। কিন্তু কার সাথে কথা বলবে? একা চলার এই এক বিপদ। হাসান মধ্যম স্বরে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ বলতে বলতে এগোতে লাগল।
তমিজন খালা জেগেই ছিলেন। চুলায় ভাত বসিয়েছেন। হাসানকে দেখে তিনি খুশি হলেন। হাসান সালাম দিয়ে বাজার গুলো রাখল তার কাছে। পাঁচশ টাকা হাতে দিল হাসান। পুরোটাই খুচরা করা। ৫০ টাকা ২০ টাকার নোট মিলিয়ে। খরচ করতে সুবিধা হবে।
‘বাপজান, বাইরে যাইতে পারি না। পায়ে বেদনা। আরেকজন আছে না, মঞ্জু সাহেব? হ্যার টাকাটা আনবার যাবো যে, পারি না। হেইদিন মাথা ঘুইরা পইড়া গেছিলাম রৌদ্রে। কিছু কইতে পারি না।’
‘মঞ্জু সাহেবের বাসা মানে ঐ পাঁচতলা নীল বাসাটা না?’
‘হ।’
‘আচ্ছা আমি এনে দিব ইন শা আল্লাহ।’
‘আইনা দিও বাবা, বের হইতে পারি না। মাইয়াডার জ্বর।’
‘আচ্ছা ওষুধ এনে দিচ্ছি, প্যারাসিটামল।’
‘ডিম রানমু বাবা, খাইয়া যাও? হা হা।’
‘হা হা। ইন শা আল্লাহ খাবো অন্য একদিন।’
‘আইচ্ছা বাবা।’
‘যাই খালা।’
‘যাও, যাওগো বাবা। কাম কাইজ করো সারাদিন, অহনে আরাম করবা। ইনকাম করবা আর আমগো মত গরীবরে দান করবা, হা হা।’
‘হা হা।’
‘আমগো মাইনসের হাত থিকা নেওনেরই কপাল গো বাবা। তাহেরার বাপ বাইচা থাকতে এমন ভাবি নাই।’
বৃদ্ধা সুযোগ পেলেই কথা চালিয়ে যায়। থামার খেয়াল থাকেনা। হাসান উঠতে চাচ্ছে, কিন্তু কথার মাঝে আবার কথা টেনে নিবে বৃদ্ধা, এটা নিশ্চিত। বৃদ্ধ বয়সে সবারই কথা বলার রোগ হয়। হাসান নিজেকে বোঝায়– তুমিও বৃদ্ধ হবে হাসান।
‘তোমার বাপ মায়ে কেমন আছে বাজান?’
‘আছে খালা, ভালোই আলহামদুলিল্লাহ।’
‘তোমার বাপে জানি কি করে? ভুইলা গেছি বাজান।’
ভাত ঠিকা দিচ্ছে তমিজন বেগম। হাসানকে তিনি ছাড়তে চান না। একা একা থাকেন। কথা বলার সুযোগ পাওয়া যায় না সহজে। আর হাসান পোলাডার অতি নরম ব্যবহার, নরম মানুষের দুনিয়া অবশ্য এহন নাই– বৃদ্ধা ভাবে।
‘হাসান বাজান। যাও বাড়িত যাও।’
হাসা চমকে উঠে। তমিজন খালা হঠাৎ কথা বন্ধ করে তাকে বাড়ি যেতে বলছে? খালার চোখে উদাস ভাব।
‘আমার নাতিডা যে কেমন হইব। বাড়িত আইলে যাইবার চায় না। হ্যার মায়ে কিছু বুঝে না। কিন্তু পোলাডারে যাইবার সময় হাতে টাইনা রাখে।’
‘আল্লাহ রহম করুন সবার উপর। যাই খালা।’
হাসান ১০০ টাকা বের করে এগিয়ে দিল। খালা হেসে ফেলে।
‘আপনার নাতির হাতে দিয়েন খালা।’
‘আইচ্ছা বাবা, আল্লাহ তোমার ম্যালা ভালো করুক।’
তমিজন বেগমের নাতি যে এতিমখানায় থাকে, হাসান সেখানে গিয়েছিল। অর্ধেক ছাত্র সেখানে অন্ধ। অন্ধদের হিফয শেখানো হয়। এতিমখানা চলে মানুষের দানে। হাসান দেখেছে, ছাত্র শিক্ষক সবার চোখেই উদাস ভাব প্রবল। আর সবার পোশাকই পুরাতন জীর্ন। মুখ গুলো শুকনো। শুকনো মুখের একটাই অর্থ– খেয়ে ক্ষুধা মেটে নি। পরেরবার খেয়েও সেই ক্ষুধা মিটবে না । তবে তাদের সবচেয়ে কষ্ট হয় শীতকালে। মেঝের উপর শুতে হয়। পাতলা তোশকে ঠান্ডা কমে না ।
শোনা যাচ্ছে সরকার কিছু ঐতিহ্যবাহী মসজিদের সৌন্দর্য বর্ধনে ৮০ কোটি টাকার বাজেট বরাদ্দ দিয়েছে। মসজিদের সৌন্দর্য বর্ধন কি খুব জরুরী, নিঃস্ব অসহায় মানুষদের পেটের ক্ষুধা দূর করার চেয়ে?
হাসান হাঁটছে। রিকশা নেবে নাকি হেঁটে হেঁটেই বাসা যাবে– সে দোটানায় পড়েছে। আশপাশ রিকশাও দেখা যাচ্ছে না। রিকশা নিতে হলেও একটু হাঁটতে হবে সামনের দিকে। হাঁটতে ভালো লাগছে না তার। ক্লান্তিতে কেমন পিঠ বাঁকা হয়ে যাচ্ছে। অস্বস্তি, উদাসী আর একাকিত্ব তিন মিলিয়ে অদ্ভুত এক ধরণের অনুভূতি হচ্ছে। ভালো লাগছে না তার। কিছুই ভালো লাগছে না। মাথার মধ্যে হঠাৎ বাজতে শুরু করল তার বন্ধু জহিরের কবিতা–
দিন যায় পেরিয়ে,
সন্ধ্যা এলো ঘনিয়ে,
সকালের আলো আসবে বলে,
অপেক্ষার অস্থিরতা থামিয়ে,
দীঘল কালো রাতের আবরণে,
গুমোট কান্নাগুলো জড়িয়ে,
বন্দি করেছি নিজেকে,
আজ আমি বন্দি করেছি নিজেকে।
বন্ধু জহিরকে সত্যিই কবি হিসেবে ১০০ তে ১০০ দেয়া যায়। অন্তত হাসান দেবে এই মার্ক। এই মার্কের কথা আবার জহিরকে বলা যাবে না। তাহলে বেচারা অস্থির হয়ে উল্টা পাল্টা বলা শুরু করবে! হা হা। হাসানের মন হঠাৎ ভালো হতে শুরু করল। আশ্চর্য! মানুষের মন কত দ্রুত খারাপ হয়, আবার ভালো হয়। মানুষ বড়ই দুর্বল, বড়ই দূর্বল। আল্লাহ তাআলা কুরআন পাকে বলেছেন, “আর মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে দূর্বলরূপে।” (সূরা নিসা, আয়াত ২৮)
(চলবে ইন শা আল্লাহ)
পূর্বের পর্বের লিংকঃ
https://fictionfactory.org/posts/13908
https://fictionfactory.org/posts/13909
https://fictionfactory.org/posts/13911
https://fictionfactory.org/posts/13923
https://fictionfactory.org/posts/13968
https://fictionfactory.org/posts/13969