
(৭)
আতহার সাহেবের শরীরটা আজ ভালো যাচ্ছে না। শরীরে ঝিম ঝিম অনুভূতি। জ্বর আছে হালকা। প্যারাসিটামল খেয়েছেন। তার সন্দেহ হচ্ছে জন্ডিস হলো কি না। তিনি আয়নায় চোখ দেখছেন। না, হলুদ হয়নি। চোখ স্বাভাবিক সাদা। হাসানকে কাজ সেরে আসতে বলেছেন তিনি। এখনও আসছে না কেন? আচ্ছা আসুক, তাড়া নেই । ব্যালকনিতে গিয়ে শরীরে রোদ লাগানো যাক কিছুক্ষন। শরীরের ম্যাজম্যাজ ভাবটা যদি কমে। দরজায় নক পরল। হাসান এসেছে নিশ্চয়ই।
‘আসসালামু আলাইকুম স্যার।’
‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। বোস।’
‘তোমার শরীর সেরেছে পুরোপুরি?’
‘ জি আলহামদুলিল্লাহ।’
‘জার্নি করার মত সক্ষমতা ফিরেছে?’
হাসান চিন্তায় পড়ে গেল। জার্নি করার মত সক্ষমতা মানে? বাসের বড় জার্নি করতে পারবে সে সমস্যা নেই ইন শা আল্লাহ।
‘জার্নি বলতে স্যার?’
‘দ্বীপ কুকরিমুকরির নাম শুনেছ?’
‘না! এটা কেমন নাম! আগে শুনি নি।’
আতহার সাহেবের চোখ খুশি খুশি। হাসানকে চমকে দিতে পেরে মনে হয় তিনি আনন্দ পাচ্ছেন।।
‘কুকরিমুকরি ভোলা জেলার চরফ্যাশন এলাকার একটা দ্বীপ।’
‘ওহ আচ্ছা।’
‘দ্বীপ ঠিক না, চড় বলা যায়। আয়তন তিন হাজার বর্গকিলোর মত। তুমি তো জানো, আমার গ্রামের বাড়ি চরফ্যাশন উপজেলায়।’
‘হ্যাঁ, জানতাম স্যার।’
‘ চরফ্যাশন থেকে যেতে হয় নদি পথ ধরে।’
‘আচ্ছা।’
হাসান বুঝছে না আতহার সাহেব কী বলতে চাচ্ছেন। তার উদ্দেশ্য কী। আতহার সাহেব কি কোনো কারণে হাসানকে তার গ্রামের বাড়ি যেতে বলবেন? তা তো হওয়ার কথা না। প্রথম কথা উঠেছে চড় কুকরিমুকরি নিয়ে।
‘স্যার চরের নাম কুকরি মুকরি হলো কেন?’
‘জায়গাটা বনজঙ্গলে ভড়া ছিল একসময়। মানুষজন বসতি তৈরির আগে সেখানে কুকুর আর ইঁদুর ছিল অনেক। কুকুর আর ইঁদুর স্থানীয় ভাষায় কুকরিমুকরি। স্থানীয় লোকেরাই নাম দেয় কুকরিমুকরির চর।’
‘ওহ আচ্ছা! ইন্টারেস্টিং।’
‘ওটা একটা পর্যটন স্পট। বিদেশ থেকেও লোক যায় সেখানে। ভ্রমন, পর্যটন কেমন লাগে তোমার হাসান?’
‘সত্যি কথা বলতে, তেমন ভালো লাগে না।’
আতহার সাহেব হেসে ফেললেন। চেয়ারে হেলান দিয়ে আরাম করে বসলেন। দুললেন কয়েকবার।
‘হাসান, আমরা কুকরিমুকরি চরে যাবো ইন শা আল্লাহ। তবে পর্যটনের উদ্দেশ্যে নয়। ফ্রী মেডিকেল ক্যাম্প হবে ইন শা আল্লাহ দুই দিনের। সেখানের মানুষদের জন্য কোনো চিকিৎসার সুযোগ নেই। চরফ্যাশানে আসতে দুই ঘন্টা সময় লাগে। মানুষগুলো দরিদ্র।’
হাসানে চেহারায় আনন্দ ফুটে উঠল। একটা অদ্ভুত উত্তেজনা ভর করে বসল। উত্তেজিত হলে তার কথা আটকে যায়। তোতলাতে শুরু করে কিছুটা। বিশেষ করে ‘ক’ উচ্চারণ করতে কষ্ট হয়। হাসান ভাবল, উত্তেজনা প্রকাশ করা যাবে না।
‘কী ভাবছ হাসান?’
‘স্যার প্রোগ্রাম ক্ক-বে?’
‘আজ কী বার?’
‘সোমবার।’
‘তাহলে আগামী বৃহস্পতিবারের পরের বৃহস্পতিবার আমরা রওনা হতে পারি । শুক্রবার শনিবার ক্যাম্প হবে সেখানে, ইন শা আল্লাহ।’
‘ইন শা আল্লাহ। স্যার কে কে থাকছেন প্রোগ্রামে?’
আতহার সাহেব হাসলেন। তিনি হাসানের চোখে আনন্দ ও উত্তেজনা বুঝতে পেরেছেন। হাসানকে যদি পুরো প্রোগ্রাম পরিচালনার দায়িত্ব দেয়া হয়, তাহলে কি তার মনোভাব কী হবে?
‘হাসান। সব আলোচনা হবে ইন শা আল্লাহ। তবে প্রোগ্রামের পুরো দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে। আমি শুধু যাবো, বসে থাকব।’
হাসান স্তম্ভিত। তার আগের কোনো অভিজ্ঞতা নেই এরকম প্রোগ্রাম পরিচালনার। দায়িত্ব নেয়া কি ঠিক হবে? সে মনে মনে কয়েকবার ইস্তেগফার করল। আল্লাহ সঠিক পথ দেখান। আল্লাহ আল্লাহ।
‘স্যার দায়িত্ব সিনিয়র কাউকে দেয়া যায় না?’
‘না, তোমাকে দায়িত্ব নিতে হবে।’
হাসান রাজি হয়ে গেল। আল্লাহ ভরসা। হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি’মাল ওয়াকীল। প্রোগ্রামের পরিসর কত বড় হবে, এটা বুঝতে হবে আগে। অনেক কাজ এটা বোঝা যাচ্ছে। একা করা সম্ভব কি না? যদি স্যার ভলান্টিয়ার এলাউ করেন, তাহলে জহিরকে বলে দেখতে হবে। প্রোগাম যেহেতু শুক্র-শনি। ইন শা আল্লাহ জহির থাকতে পারবে।
‘স্যার। পুরো ব্যাপারটা একটু বিস্তারিত জানতে চাচ্ছি। আর ভলান্টিয়ার কি থাকবে?’
‘হ্যাঁ, ভলান্টিয়ার থাকতে পারে। মিটিং রুমে আসো। আজিজকে ডাকো। একসাথে কথা বলি। তোমার অনুপস্থিতে, তোমার কাজগুলো ও দেখবে।’
অফিস থেকে বাসা এল হাসান। শরীর কেমন ঘেমে আছে। গোসল করবে কি না বুঝতে পারছে না। গোসল করা ভালো, ফ্রেশ লাগবে। গোসল করে এসে হাসান ঘড়ি দেখল। মাগরিবের আর বেশি নেই । অন্যদিন হলে বাইরে হাঁটতে বের হত সে। আজ আর হাঁটতে যেতে ইচ্ছা করছে না। কুকরিমুকরি চর মাথায় চড়ে আছে হাসানের! এক হাজার থেকে বার’শ জন মানুষের সেবা দিতে হবে। ডাক্তার থাকবেন ৬ জন। সোজা কথা নয়। নাহ! এক্ষুনি তাকে ল্যাপটপ নিয়ে বসতে হবে কাজে। জানালা খুলে দিয়ে হাসান বিছানায় আধশোয়া হয়ে বসল। বাইরে ছোট ছেলেদের দৌড়াদৌড়ি, চিৎকারের শব্দ শোনা যাচ্ছে। হাসান তাকাল সেদিকে । কুকুরের ছোট বাচ্চা নিয়ে খেলছে তারা। মা কুকুর আরাম করে শুয়ে আছে। নিশ্চিন্ত। যেন তার কুকুর শিশুরা মানুষ শিশুদের হাতে নিরাপদ। হাসান ল্যাপটপের স্ক্রীনে চোখ ফেরালো। যাতায়াতের ব্যাপারটা আগে ঠিক করতে হবে। । ঢাকা থেকে কুকরিমুকরি চরে যাওয়ার সহজ উপায় কী? শুধু মানুষ তো যাবে না, অষুধপত্র যাবে। অষুধ কী ঢাকা থেকে কিনে নেবে নাকি ভোলা গিয়ে কিনবে? আচ্ছা, ডাক্তার সাহেবের সাথে কথা বলে এটা ঠিক কর যাবে। আতহার সাহেব তার বন্ধু ডাক্তার মঞ্জুরুল ইসলামের ফোন নাম্বার দিয়ে দিয়েছেন। যাতায়াতের জন্য কী করা যায়, এটা আগে দেখা যাক । হাসান তথ্য নোট করতে শুরু করল। ভোলা সদর থেকে কুকরিমুকরি চর ১৩০ কিলোমিটারের মত। খুব দূরে না। চর বঙ্গোপসাগরের কোলঘেঁষে। ভোলা থেকে প্রথমে যেতে হবে আইচা কচ্ছপিয়া লঞ্চ টার্মিনাল। এখান থেকে ট্রলারে করে চরে যেতে হবে। ইলিশা ঘাট পর্যন্ত বাসে নাকি লঞ্চে যাওয়া হবে, এটা পরে ঠিক হবে।
মাগরিবের আর ১০ মিনিট বাকি। হাসান বের হলো। ফোন করল জহিরকে। হাসানের মত জহিরও চমকালো নাম শুনে! কুকরিমুকরি চর! জহিরকে বিস্তারিত শোনালো হাসান। সে ভলান্টিয়ার হতে রাজি। একবাক্যেই রাজি! আলহামদুলিল্লাহ।
‘জহির খুশি তুই?’
‘অনেক ভালো লাগছে দোস্ত। উড়বেই উড়বেই বিহঙ্গ, উড়বেই উড়বেই!’
‘মুক্ত বিহঙ্গ নিয়ে গান লিখে ফেলেছিস নাকি?’
‘আলবৎ লিখে ফেলেছি।’
‘হা হা।’
‘গান না শুনেই হাসছিস কেন?’
‘হা হা। গান শোনা।’
জহির গান শোনাচ্ছে। হাসান আগ্রহ নিয়ে শুনছে তার গান। গানের লিখিত রূপ এমন হতে পারে–
উড়বেই উড়বেই বিহঙ্গ
নীলাকাআশ, প্রাতরাআশ
ঝাপটানো পাখা,
অবিনাআআআশ
দূরেএর ওওই সমুদদ্রেএএ,
আকাশেএএর সফেদ বক্ষে–
ফেরারী ই ই ই ই ই
অবিশ্রান্ত —
আমাআআর বিহঙ্গওও
উড়বেই উড়বেই বিহঙ্গ
উড়বেই উড়বেইইই বিহঙ্গ
হাসান বলল, এতটুকুই জহির? ভালো লাগছিল।
‘ইয়েস, এতটুকুই। আমাদের কাকরিমাকরি প্রজেক্টের সাথে মিল আছে না গানের?’
‘হ্যাঁ! আসলেই তো মিল আছে, আশ্চর্য!’
‘অলৌকিক!’
‘তাই তো মনে হচ্ছে, সুবহানাল্লাহ। প্রজেক্টের নাম কি যেন বললি?’
‘কাকরিমাকরি।’
‘ না, চরের নাম কাকরিমাকরি না। কুকরিমুকরি।’
‘আচ্ছা, প্রজেক্ট কুকরিমুকরি। ইশার পর নক দিব ইন শা আল্লাহ তোকে। বিস্তারিত কথা হবে!’
‘কথা বলার সময় কম দোস্ত, প্রচুর কাজ। হেল্প লাগবে তোর’
‘ইয়েস, প্রচুর কাজ, কাজের কথাই হবে তোর সাথে ইন শা আল্লাহ।’
হাসানের কেমন যেন অবসন্ন বোধ হচ্ছে। এই অবসন্ন বোধের উৎপত্তি পরিশ্রম না, ক্লান্তিও না। হঠাত একইসাথে উত্তেজনা ও আনন্দময় কিছু ঘটলে, কিছু সময় পর শরীরের মধ্যে কেমন একটা ঢিলেমি ভাব আসে। চোখ বন্ধ করলেই আনন্দময় পরিকল্পনার দৃশ্যগুলো স্পষ্ট ধরা দেয় । হাসান শুয়ে পড়ল। অবসন্ন ভাব দূর হোক। স্নায়ু স্বাভাবিক হতে একটু সময় নিবে। আনন্দিত সে, অনেক আনন্দিত। আলহামদুলিল্লাহ, অনেকদিন পর একটা কাজের কাজ করার সুযোগ মিলল। নিজের খুশিভাব অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়ার মধ্যে একধরণের তৃপ্তি আছে। ইতিমধ্যে হাসান নিজের খুশি জহিরের মধ্যে ছড়িয়েছে । এখন আরো ছড়াতে ইচ্ছে করছে! হাসান তার ছোট ভাইকে কল দিল ।
‘আসসালামু আলাইকুম, শোন।’
‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম, ভাইয়া। কেমন আছো?’
‘শোন।’
‘আচ্ছা।’
‘ইংরেজিতে জ্ঞানের সংজ্ঞা কী জানিস?’
‘কী?’
‘লেজকে জানা বা লেজ সম্পর্কে জানা হলো জ্ঞান।’
‘কী বলো?’
‘ Knowledge মানে know ledge. লেজকে জানা। ‘
‘হা হা।’
‘হা হা হা।’
হাসানের ছোট ভাই মাহের বুঝে ফেলেছে– তার ভাইয়া জোক বলার জন্যই কল দিয়েছে। জোক বলা শেষে আবার কল কেটে দিবে। ভাইয়া বড় অদ্ভুত, কল দিয়ে জোক শোনায়! হা হা।
‘মাহের!’
‘জি ভাইয়া।’
‘আমার এদিকে অনেক মশা। তোদের ওদিকে?’
‘হুম অনেক মশা।’
‘মশা কামড়াচ্ছে?’
‘হ্যাঁ, কামড়ায় তো।’
‘মিথ্যা বললি কেন?’
‘মানে?’
‘মশা তো কামড়ায় না, মশুকী কামড়ায়। হা হা হা।
‘হা হা হা।’
‘এক ইঞ্জিনিয়ারের পায়ে ব্যাথা। গেল ডাক্টারের কাছে। ডাক্তার সদ্য পাশ করেছে, বয়স কম।’
‘হুম।’
‘ডাক্তার পা চেক করে বলল, মনে হয় আপনার পায়ের হাড়ের স্ট্রাকচারে সমস্যা, আর…। ডাক্তার কথা শেষ না করতেই ইঞ্জিনিয়ার সাহেব গলায় মৃদু হুমম হুমম আওয়াজ করল। ডাক্তার বলল, কী? ইঞ্জিনিয়ার বলল হুমমম, আমি স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার। আমার ডিপার্টমেন্টে রেকর্ড পরিমাণ মার্ক পেয়ে ফার্স্ট হয়েছি, হুমমম। কম বয়সী ডাক্টার এবার ভয়ে ভয়ে ঢোক গিলল। সে স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের হাড়ের স্ট্রাকচার নিয়ে কথা বলতে ভয় পাচ্ছে। ডাক্টার, ইঞ্জিনিয়ার উভয়েই কিছুক্ষন চুপ করে থাকল। ডাক্টার হঠাৎ ভাবল, আরে আমিই তো ডাক্তার। ইঞ্জিনিয়ার ভাবল, আরে আমি তো ইঞ্জিনিয়ার।’
‘হা হা হা।’
হাসান মাহেরকে মেডিকেল ক্যাম্পের কথা এখন জানালো না। জানাতে হবে, তবে ইন শা আল্লাহ ক্যাম্প শেষ হওয়ার পর। মা-বাবা যেন কিছু জানতে না পারে। জানলে টেনশন করবে। রিস্ক নেয়া যাবে না। তবে জার্নির আগের দিন মাকে কল করে দুআ করতে বলতে হবে। হাসান মনে মনে দুআ করছে, আল্লাহ সবকিছু সহজ ও সুন্দরভাবে সমাপ্ত করার তৌফিক দিন। আপনিই ভরসা, আপনিই কর্মবিধায়ক। স্নায়ু শান্ত হয়েছে তার। আল্লাহর কথা স্মরণ করলে নার্ভ শান্ত হয়ে যায়। আলহামদুলিল্লাহ। হাসান উঠে বসল। ল্যাপটপ হাতে নিল। টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। শরীর ভালো লাগছে এখন।
(৮)
মানিক মিয়া রিকশা গ্যারেজে রেখে দ্রুত মেসের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল। রাত দশটা বাজে। অন্যদিন হলে গ্যারেজে চা-সিগারেটের আড্ডায় থাকত সে। আজ আড্ডা ভালো লাগছে না। ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকবে কিছুক্ষণ। মেসবাড়ির লাইট নেভানো। কেউ মনে হয় ফিরে নি এখনো। মোবাইলে আলো জালিয়ে ঘরের দিকে এগোলো সে। দরজার ভেতরে পা রাখতেই আঁতকে উঠল।
(চলবে ইন শা আল্লাহ)
পূর্বের পর্বের লিংকঃ
https://fictionfactory.org/posts/13908
https://fictionfactory.org/posts/13909
https://fictionfactory.org/posts/13911
https://fictionfactory.org/posts/13923
https://fictionfactory.org/posts/13968
https://fictionfactory.org/posts/13969
https://fictionfactory.org/posts/15954