
(৮)
মানিক মিয়া রিকশা গ্যারেজে রেখে দ্রুত মেসের উদ্দেশ্যে হাঁটা দিল। রাত দশটা বাজে। অন্যদিন হলে গ্যারেজে চা-সিগারেটের আড্ডায় থাকত সে। আজ আড্ডা ভালো লাগছে না। ঘরে গিয়ে শুয়ে থাকবে কিছুক্ষণ। মেসবাড়ির লাইট নেভানো। কেউ মনে হয় ফিরে নি এখনো। মোবাইলে আলো জালিয়ে ঘরের দিকে এগোলো সে। দরজার ভেতরে পা রাখতেই আঁতকে উঠল। ইঁদুরের উপর পা পড়েছে । ইঁদুর বেচারা কুৎসিত একটা গালি শুনল। সে গালি বুঝলে নিশ্চয়ই এ ঘরে আর আসার নাম করত না। ঘরটা টিনের বেড়ার, মেঝে মাটিরও না আবার পাকাও না। হালকা করে পাকা করা ছিল– জায়গায় জায়গায় ভেঙে গেছে। ঘরের কোণে ইঁদুরের গর্ত। সাঁপও আছে কিনা সন্দেহ। মানিক মিয়ার রাগ হঠাৎ মাথায় উঠে গেল । রাগ মাথায় উঠলে কপাল ঘেমে যায় তার। মনে মনে মেস মালিককে গালি দিল মানিক । গালি দিয়ে মনে হলো, ঠিক হয় নি গালি দেয়া। সে নিজেই এখন ফকির। এত কমে মেস ভাড়া পাচ্ছে, সে নিশ্চয়ই আগের মত পাকা মেঝের ঘর আশা করতে পারে না। ঘর ছিল দোতলায়, এক রুম, পাশে রান্নাঘর। স্ত্রী, তিন মেয়ে নিয়ে সংসার। ঘর ছিল আসবাব পত্রে গিজগিজ, অবশ্য সবই সেকেন্ড হ্যান্ড পুরাতন ফার্নিচার। তার ঘরটা ছিল সপ্নে ভরা। বড় মেয়ের অভিমান, মেঝ মেয়ের দুষ্টুমি, আর ছোট টার কান্না। কী দিনই না ছিল! সব স্মৃতি আজ। বুক হাহাকার করে উঠে মানিকের । এখন সে যেই ঘরে আছে সেই ঘরে স্বপ্ন নেই, পরিবার নেই। তার সাথে রাতে ঘুমায় তারই মত আরও তিনজন সিগারেটখোর কাটখোট্টা রিকশাওয়ালা। শুয়ে পড়ল মানিক। চোখ বন্ধ হয়ে আসতে চায় ক্লান্তিতে। কিন্তু চোখের পাতা বুজেও থাকতে পারবে না আজ, এটা নিশ্চিত। চোখ খুলে যাবে নিজে নিজে। আসলে এখন সুখনিদ্রার সময় নেই তার। তার বড় মেয়েটার বাচ্চা প্রসবের সময় হয়ে এসেছে। ১৫-২০ দিন সময় হয়ত আছে হাতে। তার স্ত্রীর ফোনকলে এসব শুনেই বুকটা ছ্যাৎ করে উঠল তার। এক টাকা হাতে নাই। কী করবে সে? মেয়ের জামাই ইঙ্গিতে জানিয়েছে– খরচ মেয়ের পরিবারকে দিতে হবে। ছেলে বলে কী? মেয়ের বাপ হয়ে কি মানিক মিয়া কঠিন পাপ করেছে? তার জন্য এই শাস্তি? বিয়ের সময় জমানো সব টাকা শেষ করে মেয়ের শ্বশুরপক্ষকে খুশি করার চেষ্টা করে নি সে? যৌতুক না হয় একবারে শোধ করতে পারে নি, ৬ মাসের মধ্যে তো পুরো শোধ হয়েছে। তাই না? নিজের স্ত্রী, বাচ্চাদের ভরণপোষন এখন ঠিকমত দিতে পারছে না সে, এর মধ্যেই জামাইয়ের আবদার। আল্লাহ, আল্লাহ রক্ষা করো। মানিক মিয়া শোয়া থেকে চকিতে উঠে বসল। কিছুই ভালো লাগছে না তার। মাঝে মাঝে তার ইচ্ছা করে সব কিছু ছেড়ে, তাবলীগওয়ালাদের সাথে মসজিদে মসজিদে ঘুরতে। এই অশান্তির জীবন ভালো লাগে না ।
চায়ের পিপাসা পেয়েছে মানিক মিয়ার। উঠে যেতে হবে আবার গ্যারেজে। তার আগে শাহেদা বেগমকে কল দিতে হবে। শাহেদা বেগম মানিকের স্ত্রী। সন্ধ্যা বেলা ভরপুর টিপের (ট্রিপের) সময় ফোন দিয়েই মেয়ের কথা বলা শুরু করল শাহেদা বেগম। মানিক কিছুক্ষণ কথা বলে কেটে দিয়েছিল । রাস্তাঘাট কথা বলার জায়গা না। মানিকের হাতে ফোন। রিং হচ্ছে।
‘হ্যালো। রিয়ামনির বাপ, মেসবাড়ি আইছেন?’
‘হ, আইছি। খাওয়া করছ তোমরা?’
‘হ খাইলাম। মাইয়া খাইতে চায় না, শাকপাতার (শাকপাতা) দিয়া ভাত।’
‘কী রানছিলা?’
‘নাপা শাকের ঝোল। আলু ভর্তা।’
‘জাউজ্ঞা ভালোই। শাকসবজি খাওন লাগে।’
‘হ, তোমার মাইয়ারে কইয়ো। রিয়ামনি কল দিছিল। যাইতে কয়। আমার হাতে ১০০ টাকা। কেমনে যাই?’
‘তোমরা সবাই মিলে আমারে মাইরা ফ্যালো। তাইলেই হয়।’
‘রাগতাছেন ক্যান?’
‘রাগমু না? তোমার মেয়ে জামাই কী আবদার করে? আমি কি টাকার গাছ? কাম কইরা খাই আমি। হ্যাগোর জিবলায় (জিভে) লোভের পানি পড়তে থাকে সবসময়? লোভী মানুষ আমার ভালো লাগে না।’
‘জামাইরে নিয়া খারাপ কথা কইয়েন না।’
‘ক্যান কমু না? হ্যারা নিকৃষ্ট জাতের মানুষ।’
‘আর আপনে ভালো কাম করেন সবসময়?’.
‘কী কইতে চাও?’
‘আজমলের লগে মিল্যা জুয়া না খেললে আইজ আপনের হাতে টাকা থাকত না? ভ্যানগাড়ি দুইটা বেইচা দিলেন।’
রাগ আবার মানিক মিয়ার মাথায় উঠে যাচ্ছে । কপাল ঘামতে শুরু করেছে। কঠিন গালি দেবে সে শাহেদাকে। হঠাৎ বড় একটা মশা প্যান প্যান করে গালে এসে বসল মানিকের । মানিক ঠাস করে চড় মারল নিজের গালে। আশ্চর্য্য, মশা মড়ল না। পালিয়ে গেল। কি যন্ত্রনা! যন্ত্রনার উপর যন্ত্রনা। ফোন কেটে দিল মানিক। শাহেদা বেগমকে গালি শুনতে হলো না। মানিক শুয়ে পড়ল বিছানায়। মৃদু হাঁফাচ্ছে সে। শাহেদা বেগমের সাথে ফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও মানিকের মস্তিষ্কের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয় নি। তার মস্তিষ্ক কথা শোনাচ্ছে শাহেদাকে। মহিলা মানুষের জ্বালাতন বড়ই বিরক্তির। বুঝে কম। কথা কয় বেশি। আরে মানিক কি এমনি এমনি জুয়া ধরছে? মামলায় পড়ে লুকায় ঘরবন্দি থাকার সময়টাতেই তো জুয়ার শুরু, তাই না? সময় কাটানোর জন্য খেলা। মজা। ফান। ভাগনে আজমল খেলে লাভ করেছে। সেও তো লাভ করতে পারত, পারত না? কিন্তু ভ্যান দুইটা বেঁচে দিয়ে ৫ দিনের মাথায় ৫০ হাজার টাকা নাই হয়ে গেল। ভাগনে বলল হাল না ছাড়তে। এই হাল না ছাড়া একসময় নেশা হয়ে গেল মানিকের। জুয়ার নেশা। টাকার গন্ধ। একবার ১ লাখ টাকা জিতে গেল সে। ভাবল খেলা বন্ধ করে দিবে। কিন্তু না, বন্ধ আর হলো না। গেল গেল সবই গেল। ১ লাখ গেল। দুই লাখ টাকা ঋন করে জুয়া খেলল মানিক। সেই দুই লাখও গেল। ৫ মাসের বাড়ি ভাড়া বাকি পড়ল। বস্তিতে আর মুখ দেখানো যায় না। শাহেদা আর বাচ্চাদের গ্রামে রেখে এলাকা ছাড়ল মানিক। তার ঘর, সেকেন্ড হ্যান্ড কিন্তু প্রিয় সব আসবাবপত্রগুলো ঘরেই পড়ে রইল। হায় শাহেদা! শাহেদা কি জানে না, কী পরিমাণ কষ্ট করে মানিক সংসার চালিয়েছে একসময়? বাচ্চাদের বড় করেছে ভারি ভ্যান টেনে টেনে। আজ শাহেদা কথা শোনাতে দুইবার ভাবে না? ফর ফর করে কথা শোনায়। হঠাৎ মানিকের মনে হতে লাগল তার বুকটা যেন পাখির বাসার মত হালকা। পাখির বাসা অল্প বাতাসেই নড়ে চড়ে। তার বুকটাও কেমন উঠানামা করছে, এই উঠানামায় ছন্দ নেই। ভেজা চোখগুলো তার বুকের উঠানামায় সাড়া দিচ্ছে।
সকাল ৮ টা। মানিক মিয়ার মন অস্থির। এই অস্থিরতাকে বলে মন আনচান করা। গ্রামের বাড়ি যাওয়ার জন্য তার মন আনচান করছে। কিন্তু খালি হাতে কিভাবে যায়? নন্দীপাড়ার এই অপরিচিত এলাকায় তার ভালো লাগছে না। গ্যারেজে মাথা ঝুলিয়ে বসে আছে সে । রইসুদ্দিন ডাক দিল, মানিক ভাই, রিকশা বাইর করবেন না?
‘কি যে করমু, ফাঁপর লাগে।’
‘বাইত থিকা ঘুইরা আন।’
‘হাত খালি, কিছু টাকা ধার দেন! দশ হাজার, বিশ হাজার!’
‘হা হা হা। গরীবরে লইয়া মজা লন ভাই? ট্যাকা আমার লাগবো। আছে?’
রইসুদ্দিন রিকশা নিয়ে বের হয়ে গেল। মানিক ভাবছে, হাকিম ভাইর কাছ থেকে ১ লাখ টাকা ধার নিয়ে ভুল করেছে সে। টাকা টা কাজে লাগে নি। জুয়ায় পুরোটা চলে গেছে। হাকিম ভাইর থেকে তখন টাকা না নিয়ে, এখন নিলে উপকার হত। বলার সাথে সাথে দিয়ে দিয়েছিল। মানিক বলেছিল, সে ক্যারেটের ব্যাবসা শুরু করেছে। ১ লাখ টাকা ইনভেস্ট করলে মাসে ৫ হাজার টাকা লাভ দিবে। হাকিম কী বুঝে রাজি হয়ে গেল সাথে সাথে। সেই থেকে মানিক হাকিমকে মাসে মাসে ৩/৪ হাজার করে পাঠাচ্ছে ব্যাবসার লাভ বলে। টাকা ম্যানেজ করতে হয় রিকশা চালিয়ে। কিন্তু এভাবে কতদিন? ‘তুই বড় ভন্ড মানিক,’ মানিকের মনের একটা অংশ বলে উঠল।
‘হ্যালো, রিয়ামনির মা।’
‘হ্যাঁ, কন।’
‘সপ্তাহের মধ্যে বাড়িত যামু। চিন্তা কইরো না।’
‘হ। টাকার ব্যাবস্থা কিছু কইরা আইসেন।’
‘হেইডা নিয়া তোমার কাম নাই। আমার চিন্তা আমারে করতে দাও। মাইয়াগুলা আছে কেমন?’
‘খেলতাছে দুই বইনে। পেয়ারার গাছটায় ছোট ছোট পেয়ারা হইছে। হ্যারা মানবো না, অহনই খাইবো। চাবায় আর থু কইরা ফ্যালে।’
‘আইচ্ছা।’
রিকশা রাস্তায় বের করতেই একজন ডাক দিল। ফর্সা, লম্বা, স্বাস্থ্যবান ছেলে। চোখে চশমা। দেখে মনে হয় ভদ্রলোকের ছেলে।
‘মামা, কোনাপাড়ায় যাবেন?’
‘হ, যামু। কোন মোড়া দিয়া যাইবেন?’
‘রাস্তা জানি না। যেদিক দিয়ে সুবিধা হয় সেদিক দিয়ে নেন। ভাড়া কত?’
‘২০০ টাকা দিবেন।’
মানিকের চোখে চতুরতা খেলা করছে। কোনাপাড়ার ভাড়া ৮০-১০০ টাকা। সে একটা সুযোগ নিতে চায়। ছেলেটা নতুন এই এলাকায়। রাস্তা চিনেনা।
‘১৮০ রাখেন মামা।’
ছেলেটার চোখে কেমন একটা ভীতি ভাব। ভাব দেখে মনে হচ্ছে, সে দাম কমানোয় রিকশাওয়ালা মাইন্ড করে কি না– এই চিন্তা করছে সে।
‘আঁকা বাঁকা রাস্তা। ঘুইরা যাইতে হয়। ২০ টা ট্যাকা কম দিয়া আপনের কী লাভ কন?’
ছেলেটা উঠে গেল রিকশায়। মানিক ভাবছে, কোনোদিন যদি ছেলে টা জানতে পারে যে, সে দ্বিগুন ভাড়া নিয়েছে। তাহলে নিশ্চিত গালি দিবে। অবশ্য ভদ্রলোকের ছেলে ভদ্র গালিই দিবে। দিক গালি, দিক। কিন্তু মানিকের কেমন খারাপ লাগছে হঠাৎ। ভদ্র ছেলেটাকে ঠকালো, এটা কি ঠিক হলো? ছেলে টা ভদ্র না হলে নিশ্চয়ই মানিক দ্বিগুন ভাড়া চাওয়ার সাহস করত না। তাহলে কী দাঁড়াল? ভদ্র লোকেরাই ঠকবে? ভদ্র ছেলে জন্ম দিয়ে ছেলেটার বাবা-মা অপরাধ করেছে? তুই ইদানিং অনেক খারাপ হয়ে গেছিস মানিক, অনেক খারাপ– আবার কথা বলে উঠল মানিকের মনের ভালো অংশটা । মানিক মিয়া আস্তে করে জিভে কামড় দিল।
‘মামা, রাস্তায় অনেক উচা-নিচা, ভাঙ্গা। আমি দেইখা নিতাছি। ধাক্কা কম লাগে না?’
‘হ্যাঁ, রিকশা মনে হয় ভালোই চালাচ্ছেন, মামা। ধন্যবাদ।’
(৯)
আতহার সাহেবের জ্বর বেড়ে গেছে। সকাল নয়টা। এখনো বিছানায় শুয়ে আছেন। তিনি কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকার মধ্যে আছেন । জ্বর হওয়ার কারণটা কী? ঠান্ডা লাগে নি, অতিরিক্ত পরিশ্রমও করেন নি। হঠাৎ শরীর ম্যাজম্যাজ করা শুরু করল। এরপর থেকে জ্বর। আতহার সাহেবের বড় মেয়ে সকাল থেকে মন খারাপ করে আছে। আতহার বলেছিলেন এই সুযোগে তাদের সবাইকে নিয়ে চরফ্যাশনে গ্রামের বাড়ি ঘুরে আসবেন। সবাই প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু এরকম জ্বর নিয়ে তো যাওয়া সম্ভব না। আজ সকালে তিনি জানিয়েছেন যে, প্রোগ্রাম ক্যানসেল হতে পারে। এজন্য বাচ্চাদের মন খারাপ। বিশেষ করে বড় মেয়ের। তবে তার ছেলে টা অন্যরকম হয়েছে। কোনোকিছুতেই মন খারাপ করে না। কোনো কিছু পেলেও খুশি না পেলেও খুশি। অদ্ভুত স্বভাব।
তিনি ছেলেকে ঘরে ডাকলেন।
‘উসমান।’
‘হ্যাঁ, বাবা। ডেকেছ?’
‘হ্যাঁ, কী করছিলে?’
‘আরবি আদাদ মুখস্থ করছিলাম, আব্বু।’
‘আদাদ মানে সংখ্যা?’
‘হ্যাঁ।’
‘কতদূর শিখলে?’
‘সময় লাগে আব্বু, প্রাকটিস করতে হয়। হাজারের ঘরের সংখ্যা শিখছি এখন।’
‘শোনাও দেখি!’
‘ধরো, ৬৫৪৩ জন্য ছাত্র। এর আরবি হবে– ছালাছাতুন ওয়া আরবাঊনা ওয়া খমছুমিয়াতিন ও ছিত্তাতু আলাফি তলিবিন। ‘
‘আমি তো আরবি জানি নারে বাবা! ভুল বললে নাকি ঠিক বললে বুঝব কীভাবে! হা হা।’
‘না, ঠিকই বলেছি আব্বু ইন শা আল্লাহ। তোমাদের প্রোগ্রাম ক্যানসেল করে দিয়েছ?’
‘না, আমাদের গ্রামে যাওয়া ক্যানসেল হতে পারে। কিন্তু প্রোগ্রাম হবে ইন শা আল্লাহ।’
‘তুমি না থাকলে কীভাবে হবে?’
‘একটা ছেলেকে দায়িত্ব দিয়েছি। খুব ভালোভাবে কাজ গুছিয়ে এনেছে আলহামদুলিল্লাহ। আমি যদি যেতে না পারি, তাহলে তুমি যেতে পারবে তাদের সাথে? তোমার ডাক্তার চাচা থাকবেন।’
উসমান চুপ করে আছে। হ্যাঁ বলবে নাকি না বলবে বুঝতে পারছে না। আতহার সাহেবও কিছু বললেন না। তিনি তার ছেলের স্বভাব জানেন। যেতে বললে যাবে, না যেতে বললে যাবে না। তিনি এখনই কিছু বললেন না । পাশ ফিরলেন। পানির পিপাসা পেয়েছে তার। জ্বরে কেমন যেন গলা শুকিয়ে যায়। তৃষ্ণা পায়। কিন্তু পানি খেলেও সেই তৃষ্ণা যায় না। এক গ্লাস পানি টেবিলেই ছিল, পিরিচ দিয়ে ঢাকা। পুরোটাই খেলেন তিনি। মনে মনে আল্লাহর প্রশংসা করলেন। যদি প্রোগ্রামের দায়িত্ব নিজে নিতেন, তাহলে হয়ত ক্যান্সেল হয়ে যেত। আল্লাহর দয়া। হাসান সব কিছু গুছিয়ে নিয়েছে প্রায়। তিনি না গেলেও আশা করা যায় কাজ হয়ে যাবে। তবে না গেলে ভালো লাগবে না। কত বছর ধরে অপেক্ষা করছেন তিনি? এই সময়েই তার অসুস্থ্যতার কারণই বা কী? আল্লাহ কী তার প্রতি কোনো কারণে অসন্তুষ্ট? তিনি মনে মনে ইস্তেগফার করলেন কয়েকবার। আল্লাহ সুস্থ্য করে দাও, ক্ষমা করো। তিনি উঠে পড়লেন বিছানা থেকে। গোসল করবেন ভালো করে। মাথায় ঠান্ডা পানি দেবেন। এরপরে প্যারাসিটামল খেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করবেন। ঘুম থেকে উঠে ডাক্তার দেখাতে যাবেন। সুস্থ্য হওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে তাকে। প্রয়োজনে শেষ মুহুর্তে ভোলার উদ্দেশ্যে রওনা করবেন। মেডিকেল ক্যাম্পে গরীব মানুষদের দীর্ঘ লাইন তার চোখে ভাসছে। সেখানে তাকে বাস্তবেও থাকতে হবে ইন শা আল্লাহ। তিনি ফোন উঠালেন। হাসানকে কল দেবেন একবার। খোঁজ নেবেন, কাজ কতদূর হলো।
ফুটপাত ধরে ধীর লয়ে হাঁটছে সিয়াম। দানে দানে তিন দান হয়। তবে সিয়াম তিন দান পূর্ণ করতে পারে নি। দুই দান মেরেছে । দ্বিতীয় বাড়ি ভাড়ার টাকা পেয়ে গেছে সে। তবে, এই বাসাটা ছোট। বেশি টাকা পাওয়া যায় নি। ১৪ হাজার টাকা পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ৪ হাজার বাদ যাবে। এই ৪ হাজার সে মূল বাড়িওয়ালাকে দিয়ে প্রথমে বাড়ি ভাড়া কনফার্ম করেছিল। সিয়াম যাচ্ছে আজমলের মেসে। পুলিশ মেস। বয়সের পার্থক্য থাকলেও আজমল ভাই বন্ধুর মতই। সিয়াম আনন্দ নিয়ে ভাবছে। আজমল পাক্কা জুয়ারি, সিয়ামের লাইনেরই ! হাসছে সিয়াম। হাসি বেশ উচ্চস্বরে হয়ে গেল। আশেপাশে তাকালো সে। না, কেউ নেই। নিজে নিজে হাসলে মানুষ সন্দেহ করবে। সিয়াম রিকশা ডাক দিল।
আজমল ফোন ধরছে না। ঘুমাচ্ছে মনে হয়। আরও এক ঘন্টা পর কল দিতে হবে। সিয়ামের ক্ষুধা পেয়েছে। ভেবেছিল আজমলের সাথে দুপুরে খাবে। স্টার রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবে, যাই খেতে চায় খাওয়াবে। কিন্তু সেই সুযোগ আর হচ্ছে না। একা খেতে হবে এখন। ক্ষুধা বেশিই লেগেছে। এখানে একটা হোটেল আছে, ডিমের কোর্মা যা বানায়! আলুর চাকা আর টমেটো দিয়ে। কোনো তুলনা নাই। পোড়া তেলের কারবার নাই, বোতলের সয়াবিন দিয়ে রান্না করে নিশ্চয়ই। খেলে পেটে সমস্যা হয় না । খাওয়ার পর পেটে ঠান্ডা অনুভূতি হয়। আর পাম বা পোড়া তেলের রান্না খেলে পেট জ্বলে। এইতো চলে এসেছে দিনাজপুর হোটেলে। মালিক মনে হয় দিনাজপুরের। নিজ জেলার প্রতি ভালোবাসার প্রমাণ দিতে গিয়ে হোটেলের নাম রেখে দিয়েছে ।
সিয়ামের মন আনন্দে পূর্ণ হয়ে গেল। তার সামনে প্লেটে ধোঁয়া ওঠা ধবধবে সাদা ভাত। ডিমের কোর্মা দিয়ে দিয়েছে । তেলে ডুবানো মাঝারি সাইজ তেলাপিয়া মাছ ভাজা, সাথে মরিচ ভাজা। এগুলোও গরম গরম মনে হচ্ছে। বেগুন ভর্তা। পিউর কাগজি লেবু। সালাদ। আয়োজন দেখেই তৃপ্তি লাগে! আলহামদুলিল্লাহ বলতে গিয়ে থেমে গেল সিয়াম। বলা কি উচিত হবে? খাবার কেনার টাকাটা তো! সিয়ামের চেহারায় লজ্জা লজ্জা ভাব। ফোন বাজছে। এই সময় কে ফোন করল? সিয়াম বিরক্ত। দেখল আজমল ফোন করেছে!
‘আসসালামু আলাইকুম, বস!’
‘ওয়া আলাইকুমুস সালাম। সিয়াম কই তুমি?’
‘বস, আপনার এলাকাতেই আছি। আপনি ফ্রেশ হয়ে স্টার হোটেলে চলে আসেন। আমি যাচ্ছি কিছুক্ষনের মধ্যে।’
‘ওকে। পকেট ভারি মনে হচ্ছে তোমার!?’
‘কী যে বলেন বড় ভাই!’
‘আচ্ছা আমি আসতেছি, মসলাদার নিউজ আছে ছোট ভাই। মজা পাইবা শুনে।’
‘জ্বী, জ্বী। আসেন বড় ভাই!’
আজমল সাদা পাঞ্জাবী পরেছে। সাদা পাজামা। আয়নার সামনে দাড়াল সে। ঠিক মানাচ্ছে না। চেহারা কালো হয়ে গেছে, চিমসানো ত্বক। সে ডিউটি করে রাতে, রোদের আলো চেহারায় পড়ে না। চেহারা কালো হবে কেন? বেশি কালো হয়েছে দু’চোখের নিচের দিকটা । রাতে না ঘুমানোর ফলেই এই অবস্থা হয়ত। বেশি চিন্তার কারণেও চেহারার জ্বলে যায় মনে হয়! লাইফটা পানি ভাতের মত সরল হয়ে গেছে রে। এই পানি ভাতে লবন নেই, সরষে তেল নেই। পেঁয়াজও নেই। স্বাদহীন খাদ্য । ভাবছে আজমল, চুলে চিরুনি দিচ্ছে । হঠাৎ উচ্চস্বরে বলে উঠল, স্বাদ খুঁজে নিতে হবে! চোখে সানগ্লাস লাগিয়ে নিল সে ।
‘তুমি খেয়ে ফেলছ এটা কোনো কথা?’
‘ভাই, ভাবলাম আপনি ঘুমাচ্ছেন। আর ফোন করা ঠিক হবে না। রাতে ঘুমাতে পারেন না। এক ঘন্টা পরে কল দিতে চাইলাম।’
‘আমার তো একা খেতে ভালো লাগে না। আচ্ছা, খাইছ ভালো করছ।’
‘আচ্ছা আমিও কিছু খাবো হালকা পাতলা, সমস্যা নাই। এই যে মেনু। অর্ডার দিয়ে দেন।’
আজমল ওয়েটার ছেলেটাকে বলল, মাছের ডিম ভাজি আইটেম টা আছে? জ্বি স্যার– বলল ছেলেটা।
‘দাও তাহলে। প্লেইন ভাত দাও। গরম করে দিও সব।’
‘আর কিছু স্যার?’
‘খাসির রেজালা দাও। খাওয়া শেষে লাচ্ছি দিও।’
দুজনে খাওয়ায় মগ্ন। সিয়াম খাচ্ছে আনারসের জুস। সিয়াম আর ধৈর্য ধরতে পারছে না। আজমলের মশলাদার নিউজ কী হতে পারে? সে প্রশ্ন করে বসল আজমলকে। আজমল হাসল। বলল, তিন পাত্তি খেলতে জানো?
‘হ্যাঁ, জানি ভাই।’
সিয়ামের চোখে বিজয়ীর হাসি।
‘কেমন জানো?’
‘মোটামুটি জানি ভাই।’
‘মোটামুটির ভাত নাই।’
‘তা ঠিক। ঠিক।’
‘ভালো মত শিখে নাও। সামনের সপ্তাহে আসরে নিয়ে যাবো।’
আজমল আর সিয়াম দুজনেরই মুখে অদ্ভুত এক হাসি। এই হাসিতে খানিকটা লজ্জাও মেশানো আছে। সিয়াম বলল, আসর কোথায় ভাই? তার চোখ চকচক করছে।
‘যখন যাবা চিনবা। অস্থির হয়ো না। তুমি আসল খেলাই জানো না। যেয়ে মোবাইল মানিব্যাগ সব খোয়ায় আসবা।’
‘আপনি আছেন না, বড়ভাই?’
‘না আমি নাই।’
‘মানে?’
‘তুমিও যাবা, আমিও যাবো। এমন ভাবে থাকব যেন কেউ কাউরে চিনি না। বুঝছ?’
‘বুঝছি ভাই।’
‘না, বুঝো নাই। কার্ড পামিং জানো? সিগনাল বুঝো?’
‘অল্প অল্প জানি ভাই!’
‘আমার বাসায় আসবা এই কয়েকদিন, দুপুর বেলা। শিখায় দিব।’
‘আচ্ছা, আচ্ছা ভাই।’
সিয়ামের মনে হচ্ছে, আজমলের সামনে সে শিশু। আজমল গভীর পানির মাছ। সিয়াম যা ভেবেছে, হয়ত তার চেয়েও গভীর পানিতে বাস করে আজমল। সিয়ামের ভয় লাগছে কিছুটা। হাত ধুতে উঠে গেল আজমল। খাওয়া শেষ। এরপরে আজমল যা বলল, এতে সিয়ামের ভয় কেটে গেল। বড় দান মারার অপেক্ষায় অস্থির হয়ে উঠল সে! আজমলের মূল কথা হলো, সিয়ামকে আরেকজনের মাধ্যমে আসর চিনিয়ে দিবে সে । কয়েকদিন সিয়াম এমনি এমনি হালকা পাতলা খেলে কিছু টাকা হেরে ফিরে আসবে। এরপর ফাইনাল ডে তে, দুজনে একই আসরে খেলবে। কেউ কাউকে না চিনার ভান ধরে থাকবে। শুরুতে কয়েক পার্ট হারবে। টাকা বাড়াতে থাকবে। অপর পার্টি যখন লোভ পেয়ে বেশি টাকা লাগানো শুরু করবে, তখন শুরু হবে আসল খেলা। আজমল ভেলকি দেখাবে। কার্ড পামিং, সুইচিং করতে থাকবে খুব নীরিহ চোখ মুখ নিয়ে। সিয়ামকে সিগনাল দিবে। সিয়াম সিগনাল বুঝে ঠিকঠাক দান ফেললেই বাজিমাত! অনেকদিন ধরে ভালো দিনের অপেক্ষায় আছে আজমল। সিয়ামকে ভালোই চালু মনে হয়েছে তার। দেখা যাক ভাগ্যে কী আছে! আজমল সিগারেট ধরিয়ে রাস্তায় নেমে হাঁটা শুরু করল । সাথে হাঁটছে সিয়াম।
‘ভাই, ঐ পার্টি যদি ধরে ফেলে?’
‘সাহস হারায় ফেললা, ছোট ভাই?’
‘না ভাই, মানে…’
‘জুয়ারি হবে, তো কলিজা লাগবে। ছোট কলিজায় হবে না! হা হা।’
‘হা হা।’
‘ওইখানে আমার ভালো ইমেজ আছে, প্রবলেম নাই। অবশ্য কিছু মাস্তান পোলাপান খেলে ওইখানে। খেলা যেনতেন। জিনিস খেয়ে সময় পার। Arms রাখে। রাখুক, সেটাতে আমাদের সমস্যা কী? আমি পুলিশ না? হা হা।’
‘তা ঠিক।’
‘সবাই চিনে আমাকে। আর কোমড়ে জিনিস নিয়া ঘুরি তো!’
‘নাইন এম এম পিস্তল!’
‘হ্যাঁ, চাইনিজ! কত রাউন্ড গুলি থাকে বলো তো।’
‘৬ রাউন্ড ভাই।’
‘হয় নাই! হা হা।’
‘৬ রাউন্ডই তো থাকে জানি।’
‘আমার টা glock 26. ৯ রাউন্ড গুলি থাকে। ভরপুর।’
দুটি তরুন ছেলে হেঁটে যাচ্ছে ফুটপাত ধরে । একজনের বয়স ২৪ কিংবা ২৫। আরেকজন হয়ত তার চেয়ে কিছু কম । দুজনই কথায় খুবই মগ্ন। তারা এগিয়ে যাচ্ছে মধ্যম গতিতে। তারা প্রাণোচ্ছল। চোখে তাদের স্বপ্ন। সপ্ন তাদের ডেকে ডেকে এগিয়ে যেতে বলছে। রাস্তায় রিকশা চলছে, নতুন গাড়ি চলছে। পুরাতন গাড়ি চলছে ধোঁয়া ছেড়ে ছেড়ে। অটোরিকশা চলছে। সবকিছুই চলছে মগ্ন হয়ে। বিভিন্ন বয়সের মানুষ রাস্তা পারাপার হচ্ছে । তারাও মগ্ন, ঠিক ছেলে দুটির মত। কেউ কারও মগ্নতা নষ্ট করছে না। কারও সেই ফুরসত নেই।
(১০) (নতুন পাতা)
অনেক কাজ থাকলে, পরিশ্রম হলে সময় যেন ধীরগতির হয়ে যায়। সময় আগাতে চায় না, কাজ ফুরাতে চায় না। কিন্তু, হাসান আশ্চর্য্য হয়ে ভাবছে ৭-৮ দিন কীভাবে এত দ্রুত চলে গেল? অবশ্য তার এই আশ্চর্য ভাব চেহারায় ফুটে উঠবে এমন অবস্থাও নেই। তার শরীর প্রায় অবশ হয়ে আছে। আরেকজন অবসন্ন হয়ে বাসের সিটে ঘুমিয়ে পড়েছে। জহির। হাসান জহিরের ঘুমানোর দৃশ্য দেখছে। প্রীতিকর দৃশ্য বলা যাবে না। জহির ঘুমাচ্ছে মুখ হা করে। অতিরিক্ত ক্লান্তিতে মানুষ মুখ হা করে ঘুমায়। তাদের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে আসতে হয়েছে। এখন বাস ডেমরা যেতে আধা ঘন্টা বা ২৫ মিনিট সময় নিতে পারে । রাত প্রায় দশটা বেজে গেছে। হাসান ডেমরায় নেমে পড়বে। জহির সাইনবোর্ড হয়ে চাঁনখারপুলে যাবে। দুজনের শরীর এমন অবসন্ন! বাস থামলেও মনে হয় নামতে ইচ্ছে করবে না। শরীর ছেড়ে দিয়েছে। তাদের উপর দিয়ে কয়েকদিনের একটা ঘূর্ণিঝড় বয়ে গেছে বলা চলে। এই ঘুর্ণিঝড় ক্যামেরাবন্দিও হয়েছে। প্রোগ্রাম ভিডিও করার কথা ছিল না। কিন্তু আতহার স্যার এত অসুস্থ্য! যেতে পারলেন না।
(চলবে ইন শা আল্লাহ)
পূর্বের পর্বের লিংকঃ
https://fictionfactory.org/posts/13908
https://fictionfactory.org/posts/13909
https://fictionfactory.org/posts/13911
https://fictionfactory.org/posts/13923
https://fictionfactory.org/posts/13968
https://fictionfactory.org/posts/13969
https://fictionfactory.org/posts/15954
https://fictionfactory.org/posts/15955