নদীর ধারের সাপ্তাহিক হাটে, দুপুরের কড়া রোদ যখন ত্রিপলের ছাউনির ফুটো দিয়ে তেরছাভাবে এসে পড়ে, তখন লোকটির ব্যস্ততা বাড়ে। তার সামনের চটের ওপর সারি সারি সাজানো থাকে নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় কাঠের জিনিস—ভাত নাড়ার খুন্তি, বেলন-চাকি, ছোট পিঁড়ি, আর সস্তার খেলনা। ক্রেতারা আসে, দরদাম করে, দশ-বিশ টাকা কমায়, এবং কিনে নিয়ে যায়। কিন্তু এই সমস্ত সাধারণ, দ্রুত বিক্রি হয়ে যাওয়া জিনিসগুলোর ঠিক মাঝখানে, একটি পুরোনো সুতির কাপড়ে অতি সযত্নে মোড়ানো থাকে অন্য একটি বস্তু। প্রতিদিন সকালে লোকটি অত্যন্ত সন্তর্পণে কাপড়টি খোলে। ভেতরে রাখা থাকে মেহগনি কাঠের একটি সূক্ষ্ম, জটিল কারুকাজ করা প্যানেল। হয়তো কোনো প্রাচীন মন্দিরের দরজার খোদাই করা পাল্লা, অথবা দীর্ঘশ্বাসের মতো প্রবহমান লতাপাতার এক নিখুঁত জ্যামিতি, যা তৈরি করতে তার জীবনের সবচেয়ে নিরবচ্ছিন্ন ছ'টি মাস ব্যয় হয়েছে।
লোকটি অপেক্ষা করে। তার চোখ সাধারণ ক্রেতাদের এড়িয়ে এমন কাউকে খোঁজে, যার দৃষ্টি ওই বেলন-চাকিগুলো পার হয়ে মেহগনি কাঠের নকশাটিতে গিয়ে আটকাবে। মাঝেমধ্যে কেউ থামে। তারা নকশাটির ওপর হাত বোলায়। কাঠখোদাইয়ের সেই অভূতপূর্ব মসৃণতা তাদের আঙুল অনুভব করে। কিন্তু তাদের প্রথম প্রশ্নটিই হয়, "এটা দিয়ে কী হয়?"
লোকটি ইতস্তত করে বলে, "তেমন কিছু না। এটা এমনিই রাখার জন্য।"
"কাজে লাগে না?"
"না।"
"তাহলে এত দাম কেন?"
লোকটি চুপ করে থাকে। সে কীভাবে বোঝাবে যে, ওই কাঠের ভেতরে তার গত ছ'মাসের বিনিদ্র প্রহর, তার সবচেয়ে নিবিড় মনোযোগ, এবং একজন কারিগরের সারা জীবনের অর্জিত সমস্ত নিপুণতা আটকে আছে? একটি সাধারণ খুন্তি তৈরি করতে তার সময় লাগে দশ মিনিট, যা তাৎক্ষণিকভাবে চাল বা ডালে রূপান্তরিত হওয়ার যোগ্যতা রাখে। আর এই নকশাটি তৈরি করতে লেগেছে অগণিত দিন। কিন্তু বাজার তো সৃষ্টির সময় দিয়ে মূল্য নির্ধারণ করে না, বাজার মূল্য নির্ধারণ করে তার ব্যবহারের তাৎক্ষণিকতা দিয়ে। ক্রেতা জিনিসটা নামিয়ে রেখে পাশের দোকান থেকে একটা সস্তা প্লাস্টিকের মগ কিনে হাঁটা দেয়।
প্রথমদিকে, লোকটি এই প্রত্যাখ্যানগুলোকে খুব স্বাভাবিকভাবেই নিত। সে ভাবত, হাটের এই বিপুল জনসমুদ্রে সবাই তো আর শিল্পের সমঝদার নয়। সঠিক মানুষটি ঠিক একদিন আসবে। তখন সে নকশাটি প্রতিদিন সকালে সযত্নে মুছত, একটু তেল মাখিয়ে পালিশ করত, এবং চটের ঠিক মাঝখানে, সবার চোখের সামনে সাজিয়ে রাখত।
কিন্তু মাস গড়িয়ে ঋতু বদলায়। হাটের ধুলো, মানুষের ক্রমাগত দরদাম, এবং অবহেলার একঘেয়েমি লোকটির মনস্তত্ত্বকে ধীরে ধীরে গ্রাস করতে শুরু করে। সে লক্ষ করে, যে জিনিসটির জন্য সে তার সবচেয়ে বেশি শ্রম দিয়েছে, যার ভেতরে সে তার শ্রেষ্ঠ সম্ভাবনাকে ঢেলে দিয়েছে, সেটি দিনের পর দিন অবিক্রীত পড়ে থাকে। অথচ যে বেলন-চাকিগুলো সে যন্ত্রের মতো, কোনো ভাবনা ছাড়াই প্রতিদিন ডজন ডজন তৈরি করে, সেগুলো নিমিষেই বিক্রি হয়ে যায়।
আস্তে আস্তে তার আচরণে একটা সূক্ষ্ম পরিবর্তন আসে। সে আর নকশাটিকে চটের একেবারে মাঝখানে রাখে না; একটু একপাশে, অন্য জিনিসগুলোর আড়ালে সরিয়ে রাখে। কেউ যদি ভুল করেও ওটার দিকে হাত বাড়ায়, সে নিজে থেকেই বলে ওঠে, "ওটার দাম বেশি, এই পিঁড়িটা দেখতে পারেন, খুব ভালো কাঠ।" যেন সে আগেই ধরে নিয়েছে যে, এই জিনিসের কদর বোঝার মতো কেউ এখানে নেই। অথবা তার এই শ্রেষ্ঠ কাজটির মুখোমুখি হওয়াটা এখন তার নিজের জন্যই এক ধরনের অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে তার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টিটিকে প্রত্যাখ্যানের হাত থেকে রক্ষা করার জন্যই সেটিকে মানুষের চোখের আড়াল করতে শুরু করে।
বাজার এক অদ্ভুত জায়গা। সে কেবল উপযোগিতা আর চাহিদার ভাষা বোঝে। একটি জিনিসের দাম কত, তা নির্ধারিত হয় সেটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কতটুকু দৃশ্যমান কাজ করতে পারে তার ওপর। কিন্তু একটি দীর্ঘ সাধনা, একটি স্বপ্ন, বা একটি সৎ সৃষ্টির মূল্য কি কেবল তার বিক্রি হওয়ার যোগ্যতার ওপরই নির্ভরশীল?
লোকটির ভেতরে এক নীরব, ধ্বংসাত্মক রূপান্তর ঘটতে থাকে। সে প্রথমে ভেবেছিল, বাজার তার কাজকে বুঝতে পারছে না। কিন্তু দিনের পর দিন সেই একই অবিক্রীত বস্তুর ভার বহন করতে করতে, তার মনে হতে থাকে, হয়তো বস্তুটিই ত্রুটিপূর্ণ। হয়তো এই কারুকাজের আসলেই কোনো দাম নেই। 'মানুষ এটা কিনছে না'—এই বাস্তব সত্যটি তার মনের ভেতরে ধীরে ধীরে রূপান্তরিত হয় 'আমার এই কাজের কোনো মূল্য নেই'—এই আত্মঘাতী বিশ্বাসে। সে তার নিজের শ্রেষ্ঠত্বকে বাজারের মাপকাঠিতে বিচার করতে শুরু করে। যে জিনিসটির দিকে তাকিয়ে একদিন সে গর্ব বোধ করত, আজ সেই জিনিসটিই তার কাছে নিজের ব্যর্থতার এক অবিরাম সাক্ষী হয়ে ওঠে। সে একটি বস্তুর অবিক্রীত থাকাকে নিজের অস্তিত্বের মূল্যহীনতা বলে ভুল করতে শুরু করে।
হাটের এই ধুলো আর কোলাহলের ভেতর দাঁড়িয়ে, এই লোকটির গুটিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখতে দেখতে আমি আমার নিজের ভেতরে এক তীব্র অপরাধবোধ অনুভব করি। আমি কি তার চেয়ে খুব আলাদা? আমি কি আমার নিজের জীবনের সেই সবচেয়ে প্রিয়, সবচেয়ে সৎ কাজগুলোকে ঠিক এভাবেই সযত্নে লুকিয়ে ফেলিনি?
একসময় আমারও এমন কিছু বিশ্বাস ছিল, এমন কিছু কথা ছিল, যা আমি পৃথিবীর সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিলাম। আমি ভেবেছিলাম, মানুষ তার সারমর্ম বুঝবে। কিন্তু পৃথিবীর নির্লিপ্ততা, মানুষের উপযোগিতাবাদী দৃষ্টি, আর বারবার প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ভয় আমাকেও সেই কারিগরের মতোই সতর্ক করে দিয়েছে। আমি শিখে গেছি, সমাজ ঠিক কী চায়। সমাজ এমন জিনিস চায় যা সহজে পরিমাপ করা যায়, যা দিয়ে তাৎক্ষণিক কোনো লাভ হয়। তাই আমি আমার সেই গভীরতম স্বপ্নগুলোকে, আমার সেই সবচেয়ে সৎ প্রকাশগুলোকে লোকচক্ষুর আড়ালে সরিয়ে ফেলেছি। আমি এখন মানুষকে কেবল ততটুকুই দেখাই, যতটুকু তারা বিনা দ্বিধায় গ্রহণ করতে পারে। আমার ভেতরের সেই শ্রেষ্ঠ অংশটি এখন আর আমি কারো সামনে বের করি না, পাছে কেউ জিজ্ঞেস করে বসে, "এটা দিয়ে কী লাভ?" আমি ভয় পাই যে, যদি আমার শ্রেষ্ঠ স্বপ্নটি কেউ না বোঝে, তবে হয়তো আমাকে মেনে নিতে হবে যে আমার নিজেরই কোনো মূল্য নেই। আমরা সবাই আসলে এক একজন অবিক্রীত স্বপ্নের ফেরিওয়ালা, যারা নিজেদের সবচেয়ে দামি জিনিসটিকে সস্তা বাজারের কাছে বারবার প্রত্যাখ্যাত হতে দেখে একদিন তাকে চিরতরে গুটিয়ে ফেলতে শিখেছি।
অথচ এই বাজার তো কোনো খলনায়ক নয়। যে মানুষটি ওই মেহগনি কাঠের নকশাটি না কিনে একটা সস্তা খুন্তি কিনে বাড়ি ফিরল, সে তো কোনো অপরাধ করেনি। তার ঘরে হয়তো উনুন জ্বলছে, তার হয়তো সত্যি সত্যিই একটা খুন্তির প্রয়োজন। তার দৈনন্দিন সংগ্রামের জীবনে একটি অর্থহীন, সুন্দর কারুকাজের জন্য খরচ করার মতো বাড়তি টাকা বা সময় কোনোটাই নেই। এখানেই জীবনের সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডিটি লুকিয়ে থাকে। প্রত্যাখ্যান সবসময় কোনো বিদ্বেষ বা ষড়যন্ত্র থেকে আসে না। বেশিরভাগ সময়ই তা আসে এক চরম নির্লিপ্ত, বাস্তব উপযোগিতার প্রয়োজন থেকে। পৃথিবী আপনার শ্রেষ্ঠ কাজটিকে বাতিল করে দিচ্ছে না, সে কেবল তার নিজের বেঁচে থাকার সমীকরণে আপনার সেই কাজটিকে মেলাতে পারছে না।
কিন্তু যে মানুষটি তার সমস্ত সত্তা দিয়ে ওই জিনিসটি তৈরি করেছে, তার কাছে এই নির্লিপ্ততা যেকোনো নিষ্ঠুরতার চেয়েও বেশি যন্ত্রণাদায়ক। কারণ সে তো কেবল একটা কাঠের টুকরো বিক্রি করতে আসেনি, সে এসেছিল তার নিজের ভেতরকার এক অদেখা, অচেনা সম্ভাবনাকে পৃথিবীর কাছে সত্য বলে প্রমাণ করতে। সে চেয়েছিল কেউ একজন ওই কাঠের বুননে হাত রেখে বলুক, "হ্যাঁ, তুমি আছ এবং তোমার এই শ্রমটুকু বৃথা যায়নি।"
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে। হাটের ভিড় পাতলা হয়ে আসে। ত্রিপলগুলো একে একে গোটানো হতে থাকে। লোকটি তার অবিক্রীত বেলন-চাকি আর পিঁড়িগুলো গুনতে শুরু করে। আজকের বিক্রি খারাপ হয়নি। চাল-ডাল কেনার মতো যথেষ্ট টাকা তার পকেটে আছে। কিন্তু তার হাত যখন সেই সুতির কাপড়ে মোড়ানো মেহগনি কাঠের প্যানেলটির ওপর পড়ে, তখন তার কাঁধটা একটু যেন বেশিই নুয়ে আসে।
বস্তুটির নিজস্ব একটা ওজন আছে। কিন্তু গত কয়েকমাসে প্রতিদিন এই জিনিসটিকে বাড়ি থেকে হাটে এবং হাট থেকে বাড়িতে বয়ে নিতে নিতে এর ওজন যেন বহুগুণ বেড়ে গেছে। এটি এখন আর কেবল একটি কাঠের টুকরো নেই; এটি হয়ে উঠেছে এক বিশাল, নীরব প্রত্যাখ্যানের বোঝা। লোকটি খুব দ্রুত, প্রায় এক ধরনের বিরক্তি নিয়ে, জিনিসটিকে তার থলের একেবারে নিচে ঢুকিয়ে ফেলে। যেন সে জিনিসটিকে নয়, নিজের ভেতরের এক লজ্জাকে সবার চোখ থেকে আড়াল করতে চাইছে।
লোকটি নদী পেরিয়ে নিজের গ্রামে ফেরে। ঘরে কেরোসিনের বাতিটা জ্বালিয়ে সে তার থলেটা উপুড় করে। অবিক্রীত জিনিসগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ে। মেহগনি কাঠের নকশাটি সশব্দে একপাশে গড়িয়ে যায়।
আগে সে প্রতিদিন ফিরে জিনিসটিকে আবার মুছে, সযত্নে তুলে রাখত। কিন্তু আজ সে সেটির দিকে ফিরেও তাকাল না। সে তার ভাত খাওয়ার প্রস্তুতি নিতে লাগল। তবে কি সে হার মেনে নিল? সে কি চিরকালের জন্য বিশ্বাস করে ফেলল যে তার এই সৃষ্টির কোনো মূল্য নেই?
কাজকর্ম শেষ করে লোকটি যখন বাতি নেভানোর জন্য উঠে দাঁড়ায়, তখন তার চোখ পড়ে মেহগনি কাঠের প্যানেলটির ওপর। বাতির ম্লান আলোয় সে লক্ষ করে, গত কয়েক মাস ধরে প্রতিদিন থলের ভেতর অন্য সাধারণ জিনিসগুলোর সাথে ঘষা খেতে খেতে, প্যানেলটির একটি ধারের সূক্ষ্ম কারুকাজ সামান্য একটু ক্ষয়ে গেছে। বারবার সুতির কাপড়ের ঘষায় কাঠটার নিজস্ব একটা অদ্ভুত ঔজ্জ্বল্য তৈরি হয়েছে, যা কোনো কৃত্রিম পালিশে আনা সম্ভব নয়।
লোকটি নিচু হয়ে জিনিসটি হাতে তুলে নেয়। তার আঙুলগুলো সেই ক্ষয়ে যাওয়া অংশটির ওপর দিয়ে আলতো করে ঘুরে আসে। সে বুঝতে পারে, এই জিনিসটি হয়তো হাটের আর দশটা জিনিসের মতো বিক্রি হয়নি, কিন্তু এটি আর সেই প্রথম দিনের তৈরি করা নির্জীব বস্তুও নেই। প্রতিদিন হাটের ধুলো, মানুষের স্পর্শ, প্রত্যাবর্তনের ক্লান্তি, আর তার নিজের দীর্ঘশ্বাস—এই সবকিছু মিলে বস্তুটির ভেতরে এক নতুন, অমোচনীয় ইতিহাস তৈরি করেছে।
লোকটি বস্তুটিকে আর মোড়কে আবদ্ধ করে না। সে সেটিকে ঘরের এক কোণে, পুরোনো বাক্সের ওপর রেখেই বাতি নিভিয়ে দেয়। সে আর এটিকে হাটে নিয়ে যাবে কি না, তা সে নিজেও জানে না। কিন্তু জিনিসটিকে ওই আধো অন্ধকারে রেখে দেওয়ার সময় তার মনে আর আগের মতো কোনো তীব্র হাহাকার বা লজ্জা কাজ করে না।
হয়তো বিক্রি না হওয়া মানেই মূল্যহীন হয়ে যাওয়া নয়। হয়তো কিছু কিছু জিনিস তৈরিই হয় কেবল একটা দীর্ঘ, ক্লান্তিকর পথ হাঁটার পর নিজের ঘরে ফিরে আসার জন্য, যাতে একদিন তার কারিগর বুঝতে পারে যে, পৃথিবীর কাছে যা অবিক্রীত, নিজের কাছে তার চেয়ে
বিশ্বস্ত আর কিছুই নেই।