Story

আদরের আড়ালে ১

September 27, 2026

16 views

কাঁচের ঘরের বাসিন্দা

সকালের সোনালী আলোটা তখনও বসার ঘরের মার্বেল মেঝেতে পুরোপুরি জেঁকে বসেনি। এর মধ্যেই বসুন্ধরার অত্যাধুনিক অ্যাপার্টমেন্টের ফ্ল্যাটটিতে দিনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। রাশেদের অফিসের জন্য তৈরি হওয়া, ছয় বছরের রিয়ার স্কুলের টিফিন গোছানো আর নিজের অনলাইন বুটিকের নতুন অর্ডারের চাপ—সবকিছু শাইলা সামলায় এক অদৃশ্য রিমোট কন্ট্রোলে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, এ যেন কোনো ম্যাগাজিনের পাতা থেকে উঠে আসা এক নিখুঁত সুখী পরিবারের ছবি।

“মা, আমার প্রজাপতি আঁকাটা দেখেছো? টিচার বলেছে আমি ক্লাসে ফার্স্ট হয়েছি!” হলদে ফ্রক পরা ছোট্ট রিয়া দৌড়ে এসে তার আঁকার খাতাটা শাইলার সামনে মেলে ধরল।

ব্যস্ততার মধ্যেও শাইলার মুখে এক ঝলক তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। মেয়ের চুলে বিলি কেটে দিয়ে বলল, “দেখেছি তো সোনা, কী সুন্দর হয়েছে! তোমার বাবা দেখুক, আজকেই এটা ফ্রেমে বাঁধিয়ে ফেলব।”

ডাইনিং টেবিলে বসে টাইয়ের নট বাঁধতে বাঁধতে রাশেদ বলল, “আমার মেয়ে বলে কথা! ফার্স্ট তো হবেই। দেখি মা, কী এঁকেছো?”

রিয়া ছুটে গিয়ে বাবার কোলে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাশেদ মেয়েকে আদর করতে করতে বলল, “বাপের মতোই আর্টিস্ট হয়েছো দেখছি।”

এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই তাদের জীবনের চালিকাশক্তি। রাশেদ একটি বহুজাতিক কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা আর শাইলা নিজের উদ্যোগে সফল। তাদের জগৎটা সুন্দর, গোছানো এবং সুরক্ষিত। তারা বিশ্বাস করে, আধুনিকতার অর্থ হলো সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখা, তাকে স্বাধীনতা দেওয়া এবং অযথা পুরনো দিনের ধ্যানধারণা দিয়ে বেঁধে না রাখা। তাদের এই বিশ্বাসই ছিল তাদের সুন্দর কাঁচের ঘর, যার দেওয়ালে সামান্য আঁচড় লাগার সম্ভাবনাও তারা কল্পনা করতে পারতো না।

সকালের প্রথম ভাগের তুমুল ব্যস্ততা শেষে রাশেদ আর রিয়া বেরিয়ে যাওয়ার পর শাইলা একটু ফুরসত পেল। নিজের ঘরে এসে আলমারি থেকে দিনের জন্য পোশাক বের করতে লাগল। রিয়া আজ স্কুলে যায়নি, তার একটু জ্বর। সে মায়ের বিছানাতেই শুয়ে তার প্রিয় টেডি বেয়ারের সাথে খেলছিল। শাইলা তাড়াহুড়োয় ঘরের দরজা বন্ধ করার কথা ভাবলও না। সে রিয়ার সামনেই অবলীলায় রাতের পোশাক ছেড়ে দিনের পোশাক পরতে শুরু করল।

রিয়া খেলা থামিয়ে মায়ের দিকে তাকিয়ে নিষ্পাপ গলায় প্রশ্ন করল, “মা, তুমি এই জামাটা পরবে? লাল জামাটা পরো না, ওটায় তোমাকে প্রিন্সেসের মতো লাগে।”

শাইলা মেয়ের দিকে তাকিয়ে হাসল। তার মনে একবারের জন্যও অস্বস্তি এলো না। বরং ভাবল, ‘ও তো বাচ্চা, ও আর কী বোঝে? ওর সামনে আবার লজ্জা কীসের!’ সে মেয়ের পছন্দের কথাই রাখল। এই ভাবনাটাই ছিল সেই সুন্দর কাঁচের ঘরে প্রথম অদৃশ্য ফাটল, যা বাইরে থেকে কারো চোখে পড়ার কথা নয়। শাইলা তার নিজের হাতেই মেয়ের মন থেকে লজ্জা ও গোপনীয়তার প্রথম প্রাচীরটি আলগা করে দিল। তাকে শিখিয়ে দিল, শরীরের ব্যক্তিগত অঙ্গ প্রদর্শন করাটা খুবই স্বাভাবিক একটা ঘটনা।

বিকেল নাগাদ রিয়ার জ্বরটা কমে গেল। আর ঠিক তখনই কলিংবেল বেজে উঠল। দরজা খুলতেই একগাল হাসি নিয়ে ঘরে ঢুকল রাশেদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু সগির। হাতে রিয়ার জন্য একটা বড় ক্যাডবেরি সিল্ক।

“আমার মামণিটার নাকি জ্বর হয়েছে শুনলাম, তাই দেখতে চলে এলাম,” বলতে বলতেই সগির রিয়াকে কোলে তুলে নিল। রিয়াও চকলেট পেয়ে সগির মামাকে পেয়ে আহ্লাদে আটখানা।

রাশেদ ড্রয়িং রুমে বসেই বন্ধুর সাথে কথা বলছিল। শাইলা নাস্তা নিয়ে এলো। সগির রিয়াকে কোলে বসিয়েই তার গালে চুমু খেয়ে বলল, “আরে! আমার প্রিন্সেস তো দেখি দিন দিন আরও সুন্দর হচ্ছে। বড় হলে তোকেই আমি বিয়ে করবো, বলে দিলাম! হবি তো আমার বউ?”

নিষ্পাপ রিয়া ‘বউ’ শব্দের অর্থ না বুঝলেও, আদরের অর্থ বোঝে। সে খিলখিল করে হেসে উঠল।

রাশেদ হো হো করে হেসে সগিরের পিঠ চাপড়ে দিল। বলল, “আর বলিস না সগির, এখন থেকেই লাইন দিয়ে রেখেছে। তোর চান্স পেতে দেরি আছে!”

শাইলাও মৃদু হাসল। তবে তার বুকের ভেতরটায় এক মুহূর্তের জন্য কেমন যেন খচ করে উঠেছিল। কিন্তু পরক্ষণেই চিন্তাটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল। ‘সগির তো ওর মামার মতোই, রিয়াকে নিজের বোনের মেয়ের মতো ভালোবাসে। ও তো মজা করেই বলছে।’ এই ভেবে সে নিজেকে আশ্বস্ত করল। তার এই হাসিটাই ছিল সেই বিষাক্ত রসিকতাকে দেওয়া নীরব সম্মতি, যা তাদের কাঁচের ঘরের দেওয়ালে দ্বিতীয় ফাটলটি তৈরি করল।

সেদিন রাতে রিয়া ঘুমিয়ে যাওয়ার পর রাশেদ আর শাইলা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে কফি খাচ্ছিল। ঠাণ্ডা বাতাস আর শহরের নিয়ন আলোয় চারপাশটা মোহময় লাগছিল। রাশেদ শাইলার কাঁধে হাত রেখে বলল, “দেখেছো, আমাদের জীবনটা কত সুন্দর! ভালো চাকরি, নিজের বাড়ি আর রিয়ার মতো একটা লক্ষ্মী মেয়ে। আর কী চাই!”

শাইলা স্বামীর বুকে মাথা রাখল। তাদের চোখেমুখে ছিল পরিপূর্ণ তৃপ্তি। তারা জানতো না, তাদের এই সুন্দর, সুরক্ষিত কাঁচের ঘরের দেওয়ালে ফাটল ধরতে শুরু করেছে। তারা জানতো না, যে বন্ধুকে তারা পরিবারের অংশ ভাবে, সেই বন্ধুর বলা কথাগুলো কোনো নির্দোষ মজা নয়, বরং একটি অসুস্থ মানসিকতার প্রথম প্রকাশ। তারা তাদের আধুনিক ভাবনার ছত্রছায়ায় এমন এক ভুলের বীজ বপন করছিল, যার চারা গজিয়ে উঠলে তাদের এই সাজানো বাগান তছনছ হয়ে যেতে পারে। তারা ছিল সেই কাঁচের ঘরের সুখী বাসিন্দা, যারা ঘরের বাইরের জমতে থাকা কালো মেঘটা তখনও দেখতে পায়নি।

(চলবে)

Picked up where you left off

Comments

Be this story’s first reader

+35 XP

Nobody has commented yet. Sign in, read it, and be first with a thoughtful comment to earn the bonus.

Sign in to claim

    Please login to post comment. Login