ভোর ছয়টা। ছুটির দিন।
যদিও ছুটির দিন আর কাজের দিন দুটোই এখন রাহেলা বেগমের জন্য সমার্থক।
শফিক সাহেব ফজরের নামাজ পড়ে ডাইনিং রুমে বসে অপেক্ষা করছেন। রাহেলা বেগম পাতিলে খাবার পানির মধ্যে অল্প আদা, কাঁচা-হলুদ ও রসুন-কুচি দিয়ে জ্বাল দিচ্ছেন। সবশেষে একটুকরো লেবু টিপে চায়ের চামচ দিয়ে ঘুটে শফিক সাহেবের সামনে রাখলেন।
এটা শফিক সাহেবের নতুন রেসিপি। এর কাজ হচ্ছে লিভার থেকে সব ধরনের টক্সিক পদার্থ বের করে তাকে শিশুর লিভারে পরিণত করা। শফিক সাহেব ইউটিউবে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন স্বাস্থ্যবিষয়ক চ্যানেল ফলো করেন। সেসবের কোনো একটা থেকে পাওয়া এই রেসিপি। এসব রেসিপিতে রাহেলা বেগমের খুব একটা বিশ্বাস নেই। বিশ্বাস না থাকলেও তিনি বানিয়ে দেন। কথা বাড়ান না।
আগে থেকেই তার স্বামী বদমেজাজি ছিলেন। রিটায়ারমেন্টের পর আরও খিটখিটে হয়ে গেছেন। অল্পতেই রেগে যান। তাই খুব প্রয়োজন না থাকলে রাহেলা বেগম কথা বলেন না।
শফিক সাহেব প্রায় সারাদিন শুয়ে-বসে ফোন দেখেন এবং বই পড়েন। ব্যায়ামের মধ্যে ফোনটা পাশে রেখে দু-তিন মিনিটের জন্য হাতের আঙুল ও পায়ের আঙ্গুল নাড়াচাড়া করেন। হাত মুঠো করে আবার খোলেন। রাহেলা বেগমের ধারণা এটা তিনি করেন রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখার জন্য।
আদা-রসুন জ্বাল দেয়ার আগের রেসিপিটা ছিল কাঁচা-আদা, কাঁচা-হলুদ, বিটরুট আর লেবুর রসের জুস। এটা খাওয়ার পর শফিক সাহেব চোখ মুখ কুঁচকে ফেলতেন। একবার ‘কেমন খেতে?’ জিজ্ঞেস করায় এমনভাবে রাগ হয়ে তাকিয়েছিলেন যেন এই রেসিপির তিক্ততার পেছনে তার বিশেষ চেষ্টা আছে।
স্বাস্থ্যবিষয়ক টোটকা ছাড়াও শফিক সাহেব আরও কিছু কাজ নিয়মিত করার চেষ্টা করেন। তারমধ্যে একটা হলো সকালে পত্রিকা পড়া। তিনি খুব যত্ন করে সময় নিয়ে পত্রিকা পড়েন চা খেতে খেতে। দৈনিক পত্রিকায় একটা বিভাগ আছে যেখানে ছোট ছোট করে বিভিন্ন বিষয় থাকে, সাথে ছবি। এমনকি ‘রসের হাড়ি’ নামে বস্তাপঁচা কিছু জোকসও থাকে। সেই পাতাটা ইদানিং শফিক সাহেবের প্রিয়’র তালিকায়। পাতার সবকিছু তিনি খুঁটে খুঁটে পড়েন।
রাহেলা বেগমের মনে হয় কেউ পাঁচশ জোকসের একটা বই কিনে প্রতিদিন সেখান থেকে একটা করে ছাপতে দেন। তিনিও মাঝে মাঝে পড়ে দেখেন।
গতকালকের জোকসটা ছিল এরকম,
‘রোগী ও ডাক্তারের কথোপকথন
-ডাক্তার সাহেব, এই চশমা পড়লে কি আমি পড়তে পারবো?
-অবশ্যই পারবেন।
-তাহলে চশমা দেন।’
হাস্যকর। শুধু হাস্যকর বললে রাহেলা বেগমের মনের জ্বালা মিটে না। তাই তিনি জোর দিয়ে মনে মনে বলেন, হাইস্যকর।
শফিক সাহেব একটা নোটবই কিনেছেন। সেখানে পত্রিকায় ছাপা হওয়া বিখ্যাত ব্যক্তিদের উক্তি লিখে রাখেন ।
রাহেলা বেগমের খুব কৌতুহল হচ্ছিল নোটবইটা ঘিরে। এরমধ্যে একদিন তার স্বামী কলপ দিতে গোসলখানায় ঢুকলে তিনি খুলে এক ঝলক দেখেছেন।
প্রথম পাতায় বড় করে নকশা এঁকে লেখা ‘স্মরণীয় বাণী।’
নোটবইয়ের প্রথমাংশে প্রায় প্রতিটি পাতায় তারিখসহ সেদিনের বাণী লেখা। মাঝখানে বেশ কিছু পাতা বাদ দিয়ে শেষের দিকে একটা পাতায় বড় করে লেখা ‘আমার বাণী’ ।
তিনি খানিকটা বিস্মিত হন। শেষের পাতাগুলোতে শফিক সাহেবের নিজের লেখা বাণী! বেশিরভাগই স্ত্রীর উদ্দেশ্য লিখেছেন। বাকিগুলো জীবন সম্পর্কে।
যেমন:
১১/৪/২৬
প্রেম ছাড়াও জীবনে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে।
১২/৪/২৬
সত্যকে কখনো ঘুরিয়ে বলা যায় না।
ঘুরিয়ে বলা কথা সত্য নয়।
১৩/৪/২৬
প্রকৃতি হৃদয়কে হালকা করে। তাই প্রকৃতির মাঝেই মানুষের মুক্তি।
১৪/৪/২৬
কারো সত্যিকারের মনের ভাব জানতে চাইলে তাকে সবচেয়ে কঠিন কাজটা করতে বলো তোমার জন্য।
১৫/৪/২৬
মৃত্যুকে খুঁজে পেতে জীবনের শেষ পর্যন্ত যাও।
এই পর্যন্ত পড়ে রাহেলা বেগম বিরক্ত হন মনে মনে। মৃত্যুকে খোঁজার জন্য এতদূর যাওয়ার কি দরকার! মৃত্যু যেকোনো সময় চলে আসতে পারে। এর জন্য এত দৌড়াদৌড়ির প্রয়োজন নেই।
বিরক্ত হলেও তিনি এটা নিয়ে বেশি ভাবেন না। কারণ এই অভ্যাসও তার স্বামী বেশিদিন ধরে রাখতে পারবেন না। আগেও এরকম একটা খাতা ছিল তার। সেখানে মলাটে বড় বড় করে লেখা ছিল, 'পর্যবেক্ষণ'।
আশেপাশে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনা, তার ব্যাখ্যা ও পর্যবেক্ষণ ছিল সেই খাতার বিষয়।
যেমন, তার সম্পর্কে সেখানে থাকা একটা পর্যবেক্ষণ ছিল অনেকটা এরকম।
ঘটনা: আমার স্ত্রী দ্রুত রাগ হয় এবং দ্রুত তার রাগ পড়ে যায়। তারপর সে আমার জন্য এককাপ চা নিয়ে আসে।
ব্যাখ্যা: এতে বুঝা যায় রাহেলা তার আচরণের জন্য অনুতপ্ত।
পর্যবেক্ষণ: অনুতপ্ত হৃদয়ের মানুষ ফুলের মত সুন্দর।
রিটায়ারমেন্টের পর শফিক সাহেব ভালো আছেন। বিভিন্ন কিছু নিয়ে ব্যস্ত থাকার চেষ্টা করছেন। কিন্তু রাহেলা বেগম নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েছেন। সকালবেলা যদি কখনো স্বামীর সাথে মর্নিং ওয়াকে যেতে চান, উত্তর আসে, ‘না।’
বিকেলে কোথাও যদি ঘুরতে যেতে চান একসাথে তার উত্তরও, ‘না।’
সবকিছুতে শুধু না আর না।
রাহেলা বেগমের দুই ছেলে। বড়জন ফ্লোরিডা থাকে, ছোটছেলে কৃষি বিশ্বিবদ্যালয়ে পড়ে ঢাকার বাইরে। ছেলেরা দূরে থাকায় তার আরও একা লাগে। ছোটছেলে দুই-তিন মাস পর পর আসলে রাহেলা বেগমের একটু ভালো সময় কাটে কিছুদিন। ছেলেকে সাথে নিয়ে তিনি বিভিন্ন জায়গায় ঘুরতে যান তখন।
রাহেলা বেগমের মাঝেমধ্যে একটা অদ্ভুত ইচ্ছা হয়। কাউকে বলেন না তিনি।
তারও স্বামীর মত রিটায়ারমেন্টে যেতে ইচ্ছে করে। এমন সুযোগ আসলে তিনি কুশিকাটার কাজ শিখবেন। ছবি তোলাও শিখতে পারেন। আজকাল কত জায়গায় কত ধরনের কোর্স করায়। শুধু একটা ক্যামেরা লাগবে তার। বড়ছেলেকে বললেই পাঠিয়ে দেবে।
এছাড়া, স্বামীর সাথে কাছাকাছি কোনো দেশে ভ্রমণে যেতে ইচ্ছে করে। সেখানে দুজন হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়াবেন। মাথায় থাকবে চওড়া বারান্দাওয়ালা টুপি আর রোদচশমা।
পনশ্চ: গল্পটি প্যারিস মেইলে জুলাই ৩১, ২০২৬ তারিখে প্রকাশিত।